⬇ PDF VERSION

একটা রিকশাওয়ালাকে আপনি যুক্তি দিয়ে কোন কথা বোঝালে সে অনেক সহজেই তাতে সায় দেবে। মাথা নেড়ে বলবে "হ, আপনি ঠিকই কইছেন।" কিন্তু একটা শিক্ষিত ডিগ্রিওয়ালা লোককে আপনি তার চেয়ে শক্তিশালী যুক্তি দেখালেও তার মেনে নিতে অনেক কষ্ট হবে, যদি সেটা তার মতের বিরুদ্ধে যায়। কেন?

এর কারণ রিকশাওয়ালাটি স্বল্পশিক্ষিত হওয়ায় তার মাথা ফিলোসফি আর নানা তত্ত্বকথার বাহুল্যে পরিপূর্ণ হয়ে যায়নি। নতুন আগত বিষয়কে সে খুব সহজেই মাথায় বসাতে পারে। কিন্তু সেক্যুলার শিক্ষিত লোকটি তার সারাজীবনের ধ্যানধারনা, আদর্শ আর থিওরি দিয়ে মগজটা ভরিয়ে রেখেছেন, নতুন কোন থিওরি বা যুক্তিকে জায়গা দেওয়াটা তার মস্তিষ্কের পক্ষে কঠিন। আরবের সাধারন লোকগুলো ইসলামের বেসিক প্রিন্সিপাল যত সহজে আয়ত্ত করেছিল আজকের শিক্ষিত সমাজ তত সহজে তা গ্রহণ করতে পারে না। এর মূলেও একই ব্যাপার।

তাওহীদের বাণীটা খুবই সহজ-সরল। কিন্তু এই সহজ সরল বাণীটা ধারন করতে হলে বাকি সব কঠিন কঠিন আদর্শ, ফিলোসফিকে বিসর্জন দিতে হয়। এক আল্লাহ্‌র দাসত্ব মেনে নিলে অন্যসব তত্ত্ব আর প্রবৃত্তির দাসত্ব ছুঁড়ে ফেলতে হয়। একটা অসুস্থ মানুষের কাছে মুখরোচক খাবার ভালো লাগে না। সেটাকে ভালো লাগানোর জন্য রোগটাকে তাড়ানোর দরকার হয়।

রোগ যদি প্রাকৃতিকভাবে হয়ে থাকে তবে তা প্রাকৃতিকভাবেই সেরে যায়। হয়তো কিছু চিকিৎসা দরকার হয়, ওষুধের জন্য কয়টা টাকা খসে। তবু যায়। তবে যে রোগ ইনজেকশন দিয়ে শরীরে ঢুকিয়ে দেওয়া হয় তা থেকে মুক্তি পাওয়া সহজ নয়। রোগী রোগ নিয়ে ঘুরে বেড়ায়, জানতেও পারে না। পয়সনিং এর এফেক্ট রাতারাতি ধরা পড়ে না, তবে যখন পড়ে তখন অলরেডি সেভিয়ার কেস।

এমন এক ইনজেকশনের বিষ নিয়ে আমরা ঘুরে বেড়াচ্ছি। বিষের নাম জাতীয়তাবাদ।

অনেকে জাতীয়তাবাদকে দেশপ্রেমের সাথে গুলিয়ে ফেলেন। দুটো দুই জিনিস। দেশপ্রেম মানুষের সহজাত বৈশিষ্ট্য। শুধু মানুষ কেন, প্রতিটি প্রাণীর মধ্যে তা বর্তমান। একটা কুকুরকে বাড়ি দিয়ে তাড়িয়ে দিলে সে আবার ফিরে আসে। ফিরে আসে মনিবের টানে, ঐ জায়গাটার টানে। এটা দেশপ্রেমের সাথে তুল্য। অন্যদিকে জাতীয়তাবাদ এক মানসিক রোগ, যা মানুষের মনকে সংকীর্ণ করে দেয়, সত্যের আলো টেনে নেওয়ার পথটাকে রুদ্ধ করে দেয়।

'দেশপ্রেম' বুঝতে গেলে 'দেশ' কী সেটা বোঝা দরকার। আসুন আমরা 'দেশ'কে ডিফাইন করার চেষ্টা করি।

আমি আপাদমস্তক শহুরে মানুষ। জন্মেছি ঢাকায়, বেড়ে ওঠাও এখানেই। ইট-পাথর-কংক্রিটের সাথে আজীবনের সখ্য। যেখানে আমার জন্ম, এখনো সে জায়গায় গেলে পুরনো দিনের কত স্মৃতি এসে ভীড় জমায়, কত না বলা কথা বাষ্প হয়ে আবার বুকে আসে, মিলিয়ে যায়। শিশুকালের কত ঘটনা, কত রোমাঞ্চ মিশে আছে জায়গাটাতে। সেখানকার প্রতি আমার অন্যরকম একটা ফিলিংস কাজ করবে সেটাই স্বাভাবিক। যে গ্রামে জন্মেছে তার নিজ গ্রামের আলো-বাতাস আর মাটির গন্ধ তাকে যে স্বাদ দেয়, যে অনুভূতি দেয় তা আর কোন কিছুতেই সে পাবে না। জন্মস্থানের সাথে, বেড়ে ওঠার মাটির সাথে এ এক অনন্য সখ্য প্রত্যেকের। এই সহজাত ভালোলাগা-ভালোবাসার ব্যাপারটিই দেশপ্রেম, যা হৃদয় থেকে উঠে আসে, একে বানিয়ে নিতে হয় না।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম মক্কা থেকে মদীনায় হিযরতের পর মুহাজির সাহাবাদের কেউ কেউ মক্কা নিয়ে কবিতা লিখতেন। রাসূল তাঁদের নিষেধ করেন নি, কারণ তিনি জানেন জন্মভূমির প্রতি এই ভালোবাসা প্রত্যেকের মজ্জাগত। তাঁর নিজেরও মক্কার প্রতি এক বিশেষ আকর্ষণ ছিল। মদীনার জীবন এই সাহাবাদের কাছে প্রবাস জীবনের মতই মনে হয়েছিল। কেননা মক্কা তাঁদের জন্মস্থান, মদীনা তো দূরদেশ।

আজকে 'সৌদি আরব' নামে বিশ্বে একটা দেশ আছে। মক্কা আর মদীনা দেশটির দুই শহর। আজকে মক্কার লোক মদীনায় থাকাকে প্রবাস জ্ঞান করবে না। কারণ উভয় জায়গা ই সৌদি আরবের 'সীমানা'র মধ্যে। উভয়ই একই 'দেশ'। মানে 'দেশ' কোনটা আর 'প্রবাস' কোনটা সেটা নির্ধারণ করছে জন্ম নয়, বরং বেঁধে দেওয়া এক সীমানা। অদ্ভুত ব্যাপার।

আরো সহজ করে বলি। সাতচল্লিশের আগে কলকাতা আমাদের 'দেশ' ছিল। তখনো পাকিস্তান হয়নি। পাকিস্তান হবার পর কলকাতা হয়ে গেল 'বিদেশ', অথচ কলকাতার চেয়ে বহুদূরের করাচি হয়ে গেল 'দেশ'!! একাত্তরের পর আবার কলকাতাও বিদেশ, করাচিও বিদেশ। আজকে সিলেট-চট্টগ্রাম আমাদের 'দেশ', কে বলতে পারে, হয়তো পঞ্চাশ বছর পর এগুলো আলাদা হয়ে যাবে। তখন সিলেটবাসীকে বলব 'বিদেশী।' আবার উল্টোটাও হতে পারে। হয়তো ভারত-পাকিস্তান ইউনিফাইড হয়ে গেল। দুদিন আগে যারা ছিল 'বিদেশী', তারা হয়ে যাবে 'দেশী', তারা হয়ে যাবে ভাই!!

কাজেই সীমানা দিয়ে 'দেশ', 'বিদেশ' নির্ধারণের প্রক্রিয়াটা উদ্ভট এবং হাস্যকর। আপনি নিজের জন্মস্থান পাল্টাতে পারবেন না, ওটা স্থায়ী। ওটাই আপনার জন্মভূমি, ওটাই আপনার 'দেশ।' এর বাইরে যা কিছু আছে তার সবই এক, তাদের মধ্যে পৃথিকীকরণের গ্রহণযোগ্য মানদণ্ড আপনি পাবেন না।

আরেকটা এক্সাম্পল দিয়ে ফ্যালাসিটা তুলে ধরি। আমরা সবাই বইয়ে পড়ি একাত্তরে মুক্তিযোদ্ধারা দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে যুদ্ধ করেছিলেন। বটে?? 'দেশ' তো তখনো ছিল পাকিস্তান !! বাংলাদেশের তো জন্মই হয় নি !! তাহলে 'দেশপ্রেম' মানে পাকিস্তানপ্রেম হওয়ার কথা, বাংলাদেশপ্রেম হয় কীভাবে??

এ কথা উঠলে আবার বলা হবে সীমানা অনুযায়ী 'দেশ' পাকিস্তান হলেও আমাদের 'বাঙ্গালিদের' 'দেশ' ছিল পূর্ব বাংলা। সেক্ষেত্রে আবার প্রশ্ন ওঠে, বাঙ্গালিরা তো পশ্চিমবঙ্গেও আছে, সেটা তবে 'বিদেশ' হয় কীভাবে?? তখন বলা হবে, মানে এ অঞ্চলের বাঙ্গালিদের 'জন্মভূমি' ছিল পূর্ব বাংলা। তারা জন্মভূমির হয়ে যুদ্ধ করেছিলেন।

ওই তো। শেষ পর্যন্ত জন্মভূমিতেই ফিরে যাওয়া লাগবে। দেশীয় সীমানা, ভাষাগত ঐক্য, কোনকিছুই 'দেশ' কে ডিফাইন করতে পারেনা। কেন পারেনা, সেটাই এতক্ষণ আলোচনার চেষ্টা করেছি। আশা করি বোঝাতে পেরেছি।

আমি ঢাকায় জন্মেছি, ঢাকা আমার জন্মভুমি। এখানে আমার নাড়ি পোঁতা। সিলেট আমার জন্মভূমি না। আমি সিলেট-কলকাতার পার্থক্য করি না। বৃটিশদের বেঁধে দেওয়া কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে আমি মানুষের পার্থক্য করি না। আমার আত্মমর্যাদায় লাগে।

জাতীয়তাবাদ কী?

জাতীয়তাবাদ মানে মানবতাকে কাঁটাতারের বেড়ায় আবদ্ধ করে ফেলা। জাতীয়তাবাদ মানে সীমানার এপারের মাটি 'সোনা', আর ওপারের মাটি কেবলই মাটি। জাতীয়তাবাদ মানে বৃটিশদের তৈরি করে দেওয়া সীমানা নিয়ে গৌরব করা।

বাংলাদেশের পার্বত্য অঞ্চলে একটা মন্দির ভাঙ্গা হলে আমাদের কীবোর্ডে ঝড় উঠে যাবে। সংখ্যালঘু নির্যাতন, সাম্প্রদায়িকতা ইত্যাদি ইত্যাদি। অথচ বর্ডারের ওপারে মায়ানমারে মুসলিমদের ওপর ধ্বংসযজ্ঞ চলছে, তাদের রক্ত দিয়ে স্নান করছে বৌদ্ধ ভিক্ষুরা, আরাকানে মুসলিমদের ওপর গণহত্যা চলছে, কাশ্মীরে পুলিশ গুলি করে মারছে মুসলিমদের, পাকিস্তানে আমেরিকা ড্রোন হামলা করে নিরীহ নারী-শিশুদের মারছে, এসব ক্ষেত্রে আমাদের মুখে ফেভিকলের কুলুপ। কারণ নির্যাতিতরা 'বার্মিজ', 'ভারতীয়', 'পাকিস্তানী।' আমার মানবতা বর্ডারের এপারের জন্য, ওপারের লোককে মানুষ হিসেবে কাউন্ট করিনা। এটাই জাতীয়তাবাদ।

জাতীয়তাবাদ মানে স্বজাতির প্রতি পক্ষপাতমূলক দৃষ্টিভঙ্গি। নিজের জাতি অন্যায় করলেও তা না দেখার ভান করা। সে আমার 'দেশী' বলে। জাতীয়তাবাদ মানে সত্যের ওপর সীমানার সম্পর্ককে প্রাধান্য দেওয়া।

ফেলানী নামের একটা মেয়ে সীমান্তে নিহত হল। তাকে নিয়ে হৈচৈ পড়ে গেল। কয়েকবছর পর ২০১৩ তে হত্যার বিচার বসল। প্রহসনের রায়ে হত্যাকারী ভারতীয় সেনা বেকসুর খালাস পেল। আমরা নিন্দা জানালাম। আর ভারতীয়রা বলল ন্যায়বিচার হয়েছে।

এটাই জাতীয়তাবাদ। ভারতীয়রা ভারতের সেনার দোষ দেখবে না। সে ভারতীয়?? অতএব সাতখুন মাফ। ভারতের জায়গায় আমরা থাকলে একই কাজ করতাম। মনে আছে, ২০১১ সালে সৌদি আরবে খুনের দায়ে ৮ বাংলাদেশীর শিরচ্ছেদ হল?? সে কী ঝড় এদেশে!! স্পষ্ট অপরাধ প্রমাণিত হওয়ার পরও তাদের মৃত্যুদন্ড দেওয়া নিয়ে সৌদি আরবের মুণ্ডুপাত করা হল। এমনকি আসামীদের কাজকে জাস্টিফাই করতেও কত লেখালেখি হয়েছে। কেন ?? কারণ আসামীরা বাংলাদেশী। তারা খুন করুক আর যা ই করুক, অন্যদেশ তাদের বিচার করতে পারবে না- এই মনোভাবটাই জাতীয়তাবাদ।

আরো সহজ উদাহরণ দিই। কদিন আগে সাকিব আল হাসান গ্যালারিতে অশ্লীল অঙ্গভঙ্গি করেছিল। প্রথমে সমালোচনার ঝড় উঠল। সে নিষিদ্ধ হল। এরপর আমরাই আবার "লঘুপাপে গুরুদণ্ড হয়েছে" বলে মাতম তুললাম। "সাকিবকে ফিরিয়ে আনো" বলে কত হাহাকার, কত ইভেন্ট খোলা। সাকিবের কাছাকাছি কোন আচরণ যদি বিরাট কোহলি বা শহীদ আফ্রিদি করত তাহলে আমরা কি এ কথা বলতাম?? গালি দিয়ে তাদের চৌদ্দগুষ্টি উদ্ধার করতাম না?? আজীবন নিষিদ্ধের দাবি তুলতাম না?? ভারতীয় বা পাকিস্তানী ফ্যানদের পচানোর জন্য আজীবনের উপকরণ পেয়ে যেতাম না?? অথচ সাকিবের ব্যাপারে আমরা কত সহনশীল। কারণ সে আমার 'দেশী।' এটাই জাতীয়তাবাদ।

এবার আরো গুরুতর প্রসঙ্গে যাচ্ছি। অনেকের বুকে চোট লাগতে পারে। তিক্ত সত্য হজম করার ক্ষমতা সবার নেই। তবু আমাকে বলতেই হবে।

একাত্তরে পাকিস্তানী আর্মি যে গণহত্যা আর নির্যাতন চালিয়েছে তাকে জাস্টিফাই করার কোন উপায় নেই। তবে অপরাধ যে কেবল একপাক্ষিক ছিল তা নয়। কুতুবউদ্দীন আজীজের "Blood and Tears" কিংবা শর্মিলা বসুর "Dead Reckoning" [i] জাতীয় বইগুলোতে আমরা ইতিহাসের উল্টোপিঠটাও পাই। মুক্তিযোদ্ধাদের দল বিহারীদের ওপর যে হত্যা আর ধর্ষণ চালিয়েছিল তা আমরা প্রচলিত ইতিহাসের কোন বইয়ে খুঁজে পাব না। যুদ্ধের পরে অস্ত্র থাকা যোদ্ধাদের অনেকে যে অস্ত্র জমা না দিয়ে ডাকাতিসহ বিভিন্ন কাজে লিপ্ত হয়েছিল তা আমরা এক জেনারেশন আগের মানুষের কাছে শুনি, কিন্তু কোন বইয়ে দেখিনা। কেন?? কারণ ইতিহাস লেখে বিজয়ীরা। বাঙ্গালিদের লেখা বইয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের নিষ্পাপ হিসেবে তুলে ধরা হবে এটাই জাতীয়তাবাদের দাবি। এটা ঠিক যে এদেশের কৃষক-শ্রমিকসহ অসংখ্য গরিব মানুষ শোষণ থেকে মুক্তির জন্য যুদ্ধ করেছিলেন। কিন্তু যোদ্ধাদের সবাই স্বার্থহীনভাবে কাজ করেছেন এমনটা ভাবার কোন কারণ নেই। কিন্তু জাতীয়তাবাদ আমাদের এমনটা ভাবতে বাধ্য করে।

জাতীয়তাবাদ একপাক্ষিক না। পাকিস্তানের ইতিহাস বইগুলোতে ওদের আর্মিকে বীর হিসেবে তুলে ধরা হয়। তাদের দোষকে, গণহত্যাকে উপেক্ষা করা হয়। বাঙ্গালিদের ওপর দোষ চাপিয়ে দেওয়া হয়। এদেশের লোককে "বিদ্রোহী", "দেশদ্রোহী" হিসেবে তুলে ধরা হয়। আমরা বড় হই পাকিস্তানীদের ঘৃণার চোখে দেখে, ওরা বড় হয় আমাদের ঘৃণার চোখে দেখে। আমরা পাকিস্তানকে 'Fuckistan' বলতে পেরে সুখলাভ করি, ওরাও আমাদের গালি দিয়ে পরম আনন্দ লাভ করে। এটাই জাতীয়তাবাদের স্বরূপ।

একাত্তরের যুদ্ধকে আমরা দেখি স্বাধীনতা যুদ্ধ হিসেবে, পাকিস্তানীরা দেখে দেশদ্রোহীদের দমনে সেনাবাহিনীর অভিযান হিসেবে, আর ভারতীয়রা দেখে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ভারতের জয় হিসেবে। জাতীয়াবাদ আমাদের ন্যায়, চিন্তাশক্তি আর বিবেককে ধ্বংস করে দেয়। পক্ষপাত আর ঘৃণাই হল জাতীয়াতাবাদের আউটপুট। এ সেই পচন ধরা মতবাদ যা প্রত্যেককে ভাবতে শেখায়-তার নিজের দেশ, নিজের জাতিই শ্রেষ্ঠ। তার জাতির ইতিহাস সবচেয়ে গৌরবান্বিত, সবচেয়ে নিষ্কলঙ্ক। ন্যায়-অন্যায়, সত্য-মিথ্যা বিচারের ভার বিবেক থেকে এমনিতেই চলে যায় জাতীয়তাবাদের হাতে।

এই সেই জাতীয়তাবাদ যার কারণে মানুষ নিজেকে কেবল বিশেষ জাতিতে জন্ম বলে দম্ভ করতে শেখায়। এক ব্যক্তি এশিয়ার অধিবাসী বলে ইউরোপ বা আমেরিকাবাসীদের নিকট ঘৃণিত, অত্যাচারিত, নিষ্পেষিত ও অধিকার বঞ্চিত হতে একান্তভাবে বাধ্য। এক ব্যক্তি শুধু কৃষ্ণাঙ্গ হওয়াই শ্বেতাঙ্গ ব্যক্তির দৃষ্টিতে তার ঘৃণিত হওয়ার জন্যে যথেষ্ট। সাদা-কালোর প্রভেদের মূলে এই জাত্যাভিমান, জাতীয়তার দম্ভ। নিগ্রোদেরকে জীবন্ত দগ্ধীভূত করা আমেরিকার সভ্য নাগরিকদের পক্ষে কিছুমাত্র অপরাধের কাজ নয়, কারণ তারা নিগ্রো। জার্মান জাতি এবং ফরাসী জাতি পরস্পরকে ঘৃণা করতে পারে কারণ তারা দুটি স্বতন্ত্র জাতিতে বিভক্ত। এদের একজনের গুণাবলী অন্যের দৃষ্টিতে সম্পূর্ণ দোষ ও ত্রুটি বলে নিরূপিত হয়। সীমান্তের স্বাধীন আফগানীদের আফগানী হওয়া এবং দামেশকের অধিবাসীদের আরব জাতির অন্তর্ভূক্ত হওয়া এমন একটা অপরাধ যে, কেবল এ কারণেই তাদের মাথার উপর বোমারু বিমান থেকে বোমা নিক্ষেপ করা এবং সে দেশের জনগণকে পাইকারীহারে হত্যা করা ইংরেজ ও ফরাসীদের পক্ষে একেবারে ন্যায়সংগত। কিন্তু ইউরোপের সুসভ্য (?) অধিবাসীদের উপর এরূপ বোমা নিক্ষেপ করাকে বর্বরতামূলক কাজ বলে তারা মনে করে।

হিটালার-মুসোলিনিরা জাতীয়তাবাদের গর্বে অন্ধ হয়ে মানুষহত্যাকে জায়েয করেছিল। আমাদের দুশো বছরের প্রভুরা নীলচাষীদের পেটে লাথি মেরে হত্যাকে বৈধ ভাবত কারণ নীলচাষীরা 'নিচুজাতি', আর বৃটিশরা 'উঁচু জাতি।' এই জাতীয়তাবাদ এনেছে যুদ্ধ, এনেছে অনর্থ, কেড়ে নিয়েছে লক্ষ লক্ষ প্রাণ, বয়ে এনেছে দাম্ভিকতা, ঘৃণা আর মজলুমের কান্না।

এই নোংরা বিষাক্ত বস্তুকে না ছাড়তে পারলে আত্মার মৃত্যু সুনিশ্চিত।

ইসলাম জাতীয়তাবাদের মত নোংরা মতবাদকে সমূলে প্রত্যাখ্যান করে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন--

“সে আমাদের দলভুক্ত নয় যে আসাবিয়্যাহর (জাতীয়তাবাদ) দিকে ডাক দেয়, বা আসাবিয়্যাহর কারণে লড়াই করে কিংবা আসাবিয়্যাহর কারণে মৃত্যুবরণ করে” [আবু দাউদ-৫১২১]

তাঁকে জিজ্ঞেস করা হল, হে আল্লাহর রাসূল, "আসাবিয়্যাহ কী?" তিনি উত্তরে বললেন, "আসাবিয়্যাহ হলো অন্যায়-অবিচার ও জুলুমের ক্ষেত্রে তুমি তোমার সম্প্রদায়কে সহযোগিতা করবে।" [আবু দাউদ-৫১১৯]

এখানে উল্লেখ্য, স্বহস্তে সহযোগিতা না করে সমর্থন দেওয়াও এর অন্তর্ভুক্ত, যেমনটা আমরা পূর্বের অনুচ্ছেদে আলোচনা করেছি। অপর এক হাদীসে রাসূল (সা) বলেন--

''যে জাতীয়তাবাদ তথা আসোবিয়্যাহর জাহেলী আহবানের দিকে মানুষকে ডাকে সে যেন তার পিতার লজ্জাস্থান কামড়ে ধরে পড়ে আছে (তাকে ছাড়তে চাইছে না)।" এরপর রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন, "এবং একথাটি লুকিয়ে রেখো না (অর্থাৎ বলার ক্ষেত্রে কোনো লজ্জা বা অস্বস্তিবোধ করোনা)।" [মুসনাদে আহমাদ - ২১২৩৬]

একটু চিন্তা করুন। রাসূলুল্লাহ (সা) তাঁর কথার মাধুর্যের জন্য বিখ্যাত ছিলেন। তাঁর বক্তব্য শ্রোতাদের মোহিত করে ফেলত, যা শুনে বহু অমুসলিম ইসলাম গ্রহণ করেছিল। এই মানুষটি কোনদিন কাউকে গালি দেবেন বা খারাপ ভাষা ব্যবহার করবেন, চিন্তা করা যায়?? অথচ তিনি এখানে তুলনা দিলেন "পিতার লজ্জাস্থান কামড়ে ধরা"র সাথে। এটুকুতেই স্পষ্ট, কতবড় নোংরা জিনিস এই জাতীয়তাবাদ, যার তুলনা দিতে আল্লাহ্‌র রাসূল (সা) পর্যন্ত এর চেয়ে ভালো শব্দ খুঁজে পান নি!!

ইসলাম কেন জাতীয়বাদকে প্রত্যাখ্যান করে?? কয়েকটি দিক আলোচনা করছি।

প্রথমত, জাতীয়তাবাদের কারণে ইসলামের একটি মূলনীতি "আল ওয়ালা ওয়াল বারাহ" [ii] সুস্পষ্টভাবে লঙ্ঘিত হয়। "আল ওয়ালা ওয়াল বারাহ" অর্থ আল্লাহ্‌র জন্যই ভালোবাসা আর আল্লাহ্‌র জন্যই ঘৃণা। একজন মুসলিমের প্রতি আরেকজন মুসলিমের ভালোবাসা থাকতে হবে আল্লাহ্‌র জন্যই। কোন পার্থিব স্বার্থের জন্য নয়। যে কালিমা পড়েছে, সে মুসলিম, সে আমার ভাই, পৃথিবীর যে প্রান্তেরই হোক না কেন। আমার ওপর তার হক্ব আছে। আর যারা ইসলামের সাথে দুশমনি করে, তারা যত কাছের লোকই হোক না কেন, তার সাথে আমার সম্পর্ক নেই। এটাই আল ওয়ালা ওয়াল বারাহ। অর্থাৎ ভালোবাসা ও শত্রুতা-কেবল আল্লাহরই জন্য। কিন্তু জাতীয়তাবাদ মুসলিমদের এই সম্পর্কের মধ্যে দেয়াল গড়ে দেয়। ভিনদেশের মুসলিমকে তখন আপন ভাবা যায়না, আবার নিজদেশের আল্লাহদ্রোহীর প্রতিও সহানুভূতি চলে আসে।

রাসূল (সা) আরবের লোক ছিলেন, তাঁর ভাষা ছিল আরবী। ওয়াল্লাহি, জাতীয়তাবাদ থেকে মুক্ত না হতে পারলে আপনি কখনোই রাসূল (স) কে সেভাবে ভালোবাসতে পারবেন না, যেভাবে ভালোবাসা উচিত। অথচ রাসূল (সা) কে নিজের সম্পদ, পরিবার এমনকি জীবন থেকেও বেশি প্রিয় না হলে আপনি পরিপূর্ণ ঈমানদার হতে পারবেন না। জাতীয়তাবাদ এমনি আপনার আর ঈমানের মাঝে বাধা হয়ে থাকবে।

দ্বিতীয়ত, মুসলিম উম্মাহর Universal Brotherhood ধ্বংস করে জাতীয়তাবাদ। রাসূল (সা) বলেছেন--

"সমগ্র উম্মাহ একটি দেহের মত। যদি দেহের এক অংশে ব্যাথা অনুভূত হয়, তাহলে দেহের অন্যান্য অংশ তাতে আক্রান্ত হয়” [মুসলিম]

অর্থাৎ পৃথিবীর যেকোন প্রান্তে একজন মুসলিমের কষ্টে সমস্ত মুসলিমের ব্যথা লাগবে। এটাই ইসলামের বৈশিষ্ট্য। অথচ জাতীয়তাবাদ আমাদের সেই অনুভূতি নষ্ট করে দিয়েছে। হাজ্জাজ বিন ইউসুফের কাছে একবার খবর এল সিন্ধু প্রদেশে একজন মুসলিম নারী অপমানিত হয়েছেন। সাথে সাথে তিনি মুহাম্মাদ বিন কাসিমকে সেনাবাহিনীসহ পাঠালেন সিন্ধু জয় করতে। এতটাই প্রবল ছিল উম্মাহর প্রতি ফিলিংস। বিশ্বের কোন একপ্রান্তে একজন মুসলিমের কান্নার আওয়াজ আমীরুল মু'মিনিনের রাতের ঘুম হারাম করে দিত। আর আজ লক্ষ মুসলিমের রক্তে রঞ্জিত ওবামার সাথে হাত মেলায় মুসলিম রাষ্ট্রপ্রধান। টাকার কাছে, জাতীয়তাবাদের কাছে আমাদের সব মানবতা, সব দায়িত্ব বিসর্জন দিয়ে ফেলেছি।

একজন মুসলিম, সে বিশ্বের যে প্রান্তেরই হোক, আমার ভাই। একজন বাংলাদেশি আমার ভাই, তদ্রুপ একজন পাকিস্তানি, ভারতীয়, আফ্রিকান, সিরিয়ান, আরব বা আমেরিকান মুসলিমও আমার ভাই। কিন্তু জাতীয়তাবাদ এই ভাতৃত্বকে অস্বীকার করে। সে শেখায় পাকিস্তানী সৈন্য আমাদের অত্যাচার করেছে, অতএব পাকিস্তানের সব মানুষ আমাদের শত্রু। তাদের ঘৃণা করতে হবে। অথচ বৃটিশরা দুশো বছর অত্যাচার করলেও তাদের গোলামি করতে আমাদের বাধেনা। তাদের পোশাক, ভাষা ইউজ করলে ভাবি জাতে উঠে গেছি। জাতীয়তাবাদ এমনই অন্ধ, এমনই বিকৃত।

আজকে আফিয়া-ফাতিমারা কুফফারদের কারাগারে রক্ত দিয়ে চিঠি লেখে, মুসলিম বিশ্বে মজলুমের হাহাকারে আকাশ-বাতাস প্রকম্পিত, লক্ষ লক্ষ শিশু জবাই হচ্ছে, মা-বোনদের ধর্ষণ করা হচ্ছে, ভাইদের গুলি করে বুক ঝাঁঝরা করে দিচ্ছে, কে তাদের চিৎকার শুনবে?? কে হবে খালিদ, কে হবে তারিক, কে হবে আব্দুর রহমান, কে হবে সালাউদ্দীন আয়্যুবী?? মুসলিম যুবকেরা আজ ব্যস্ত মেসি-মেইমার আর গার্লফ্রেন্ড নিয়ে, মা-বোনদের চিৎকার শোনার সময় তাদের হয়না। সিরিয়ায় হামলা হয়েছে, আমি তো বাংলাদেশি ! বার্মায় হত্যাযজ্ঞ চলছে, আরে আমি তো বাংলাদেশি!! আমার কী এসে যায়?? এটাই জাতীয়তাবাদের স্বরূপ।

রাসূল (সা) বলেছেন সে ব্যক্তি মুসলিমদের দলভুক্ত নয় যে রাতে ঘুমাতে যায় অথচ উম্মাহর কথা চিন্তা করেনা। আজকে একটু চিন্তা করলেই দেখি, কত মুসলিমের কান্নার দায় আমরা বহন করছি। আমরা সাক্ষী হয়েছি বসনিয়ার গণহত্যায় নিহত হাজার হাজার মুসলিমের, ধর্ষিতা মা-বোনের। আমরা সাক্ষী হয়েছি গুজরাটের গণহত্যায় নিহত তিন হাজার মুসলিমের লাশের। আমরা সাক্ষী আফগানিস্তান, ইরাক, সিরিয়া আর মিশরের লক্ষ মুসলিমের কান্না আর লক্ষ শিশুর আর্তনাদের। আমরা সাক্ষী হয়েছি পাকিস্তানের ড্রোন হামলায় বিধ্বস্ত মুসলিম জনপদের। কী ভাবছেন? তাদের ব্যাপারে আমরা জিজ্ঞাসিত হব না? তাদের জন্য আমরা কী করেছি, এটা আমাদের জবাব দিতে হবে না? আমরা কী জবাব দেব সেদিন যখন আমাদের বিরুদ্ধে দাঁড়াবে সেব্রেনিকায় ধর্ষিতা হয়ে মারা যাওয়া একটি বোন? কী জবাব দেব যখন আমাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেবে ইরাকের একটি শিশু? সে যদি এই কাপুরুষ মুসলিম উম্মাহর বিরুদ্ধে আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ করে, আমাদের কোন উপায় থাকবে কি?

না থাকবে না। জাতীয়তাবাদের দোহাই দিয়ে সেদিন রেহাই পাওয়া যাবে না। "ও তো ভিনদেশের লোক" বলে দায়িত্ব এড়িয়ে গেলে সেদিন নিস্তার নেই।

তৃতীয়ত, জাতীয়তাবাদ নিজের জাতিকে অন্য জাতি থেকে শ্রেষ্ঠ ভাবতে শেখায়, যা ইসলামে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন--

"লোকেদের উচিত হল তারা যেন তাদের জাতি নিয়ে গর্ব করা ত্যাগ করে, কারণ তা জাহান্নামের আগুনের কয়লাগুলোর মধ্যে একটি কয়লা। যদি তারা তা পরিত্যাগ না করে তবে আল্লাহ্‌ তাদেরকে সেই নিচু কীটগুলো থেকেও নীচ করে দেবেন যারা মল-বর্জ্যের মধ্যে নিজেরাই নিজেদের ঠেলে দেয়।" [আবু দাঊদ, তিরমিযী]

ইসলামে জাত্যাভিমান বা বংশমর্যাদার গৌরব চরম নিন্দনীয়। রাসূলুল্লাহ (সা) এই ব্যাপারগুলোকে জাহেলী যুগের কর্ম বলে উল্লেখ করেছেন। ইসলামে মানুষের সম্মানের মানদন্ড তার তাকওয়ায়, এখানে গায়ের রঙ, বংশ, জাতি, ভাষা-এসবই মূল্যহীন। নিগ্রো কৃতদাস বিলাল (রা) এর সম্মান কত বেশি সে কথা আমরা জানি। তাঁর জাতি ছিল সমাজে একেবারেই ঘৃণিত। আবার তৎকালীন আরবের উচ্চবংশ বলে পরিচিত কুরাইশ বংশের আবু জাহেল, আবু লাহাবরা ইতিহাসের আস্তাকুড়ে নিক্ষিপ্ত হয়েছে। তাদের জাতি তাদের মর্যাদা দিতে পারেনি।

"হে মানব, আমি তোমাদেরকে এক পুরুষ ও এক নারী থেকে সৃষ্টি করেছি এবং তোমাদেরকে বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে বিভক্ত করেছি, যাতে তোমরা পরস্পরে পরিচিতি হও। নিশ্চয় আল্লাহর কাছে সে-ই সর্বাধিক সম্ভ্রান্ত যে সর্বাধিক পরহেযগার। নিশ্চয় আল্লাহ সর্বজ্ঞ, সবকিছুর খবর রাখেন।" [হুজুরাতঃ ১৩]

অর্থাৎ আল্লাহ্‌র কাছে সম্মানের মাপকাঠি কোন জাতীয়তা নয়, বরং তাকওয়া এবং সৎকর্ম। কে কোথায় জন্মেছে সেটার কোন দাম নেই এখানে। পুরো পৃথিবী আল্লাহ্‌ তা'আলার সৃষ্টি। কোন মাটিকে ঘৃণা করার অবকাশ নেই। আমি জন্মেছি বলে সে মাটি পাক, আর আমার শত্রু জন্মেছে সে মাটি নাপাক, এমনটা মনে করার কোন অবকাশ ইসলাম দেয় নি।

রাসূল (সা) বিদায় হাজ্জের ভাষণে বলেছেন, আরবের ওপর অনারবের কিংবা অনারবের ওপর আরবের শ্রেষ্ঠত্ব নেই। এই একটা বাক্য দিয়েই জাতীয়তাবাদের গর্বকে ধুলিস্মাৎ করে ফেলা হল। অথচ আমাদের মাথায় ছেলেবেলা থেকে গেঁথে দেওয়া হয়, নিজের ভূমি, নিজের দেশ, নিজের ভাষা আর নিজের জাতি পৃথিবীর মধ্যে শ্রেষ্ঠ। জর্জ বার্নার্ড শ ব্যাপারটিকে সুন্দরভাবে তুলে ধরেছেন এভাবেঃ

"দেশপ্রেম হল এমন একটা বিশ্বাস বা ধারনা যে তোমার দেশ পৃথিবীর মধ্যে শ্রেষ্ঠ, কারণ তুমি সেখানে জন্মেছ।"

এখানে 'দেশপ্রেম' বলতে তিনি জাতীয়তাবাদকেই বুঝিয়েছেন। কথাটির যথার্থতা সহজেই বোঝা যায়। পৃথিবীর প্রতিটি দেশের জাতীয় সঙ্গীত এমনভাবে লেখা হয় যেন সে দেশটিই জগতের সেরা। আমরা যেমন আমাদের দেশকে "সকল দেশের রাণী" ভাবতে শিখি। অথচ এদেশের সাথে আমার সম্পর্ক এতটুকুই যে আমি এখানে জন্মেছি। আমি মিশরে জন্মালে মিশরকে সকল দেশের সেরা বলতাম, আমেরিকায় জন্মালে সেটা হত সেরা দেশ, ফিলিপাইনে জন্মালে বলতাম এটাই সকল দেশের রাণী।

চতুর্থত, জাতীয়তাবাদ সত্যকে অস্বীকার করতে শেখায়।

রাসূল (সা) যখন নিজেকে আল্লাহ্‌র প্রেরিত পুরুষ বলে দাবি করলেন, কুরাইশদের গোত্রগুলোর মধ্যে বিভেদ লেগে গেল। কেননা যদি তিনি সত্য নবী হয়ে থাকেন তবে যে গোত্রে তাঁর জন্ম তার সম্মান অনেক বেড়ে যাবে। অথচ রাসূল (সা) এসেছেন সমস্ত সৃষ্টিকুলের জন্য। তিনি আমাদের সবার গর্ব। কুরাইশরা জাতীয়তাবাদের কারণে তর্কে লিপ্ত হল। এরপর তারা বলতে লাগল তিনি সত্য নবী হতে পারেন না, কেননা কুরাইশদের নেতৃত্বস্থানীয় ব্যক্তিদের রেখে আল্লাহ্‌ কেন একজন সাধারন যুবকের ওপর কুরআন নাযিল করবেন ! আল্লাহ্‌ ব্যাপারটিকে বর্ণনা করেন এভাবেঃ

"তারা বলে, কোরআন কেন দুই জনপদের কোন প্রধান ব্যক্তির উপর অবতীর্ণ হল না?" [যুখরুফঃ ৩১]

একই ভুল করেছিল ইহুদি আর খ্রিস্টানরা। মূসা (আ) মুহাম্মাদ (সা) এর ভবিষ্যতবানী তাঁর উম্মাতকে শুনিয়েছিলেন, যেটা ছিল তাওরাত কিতাবে। তাই ইহুদিরা রাসূল (সা) এর আগমনের অপেক্ষা করছিল। অথচ যখন তিনি সত্যিই এলেন, তারা তাঁকে প্রত্যাখ্যান করল। কারণ তাদের ধারনা ছিল রাসূল (সা) হবেন বনী ইসরাঈলের একজন, অথচ তিনি ইসমাঈল (আ) এর বংশধারার রাসূল। শুধুমাত্র জাতিগত দাম্ভিকতা ইহুদিদের সত্য থেকে বিরত রাখল।

একই কথা খৃস্টানদের জন্য প্রযোজ্য। বাইবেলে আছে মূসা বলেন, "He (Muhammad) will be from our brothers." এখানে তিনি "Brother" বলতে বুঝিয়েছেন বনী ইসমাঈলকে, কারণ বনী ইসরাঈলের ভাই হচ্ছে বনী ইসমাঈল। অথচ পাদ্রীরা বাইবেলের এ কথাটিকে পরিবর্তন করে লিখেছে "From our 'own' brothers" এই 'own' কথাটা তারা নিজেরা ঢুকিয়েছে, যেন মনে হয় একই বংশ থেকে শেষ নবী আসবে, আর এজন্য খৃস্টানরা ধরে নিয়েছে মুহাম্মাদ (সা) আসবেন বনী ইসরাঈল থেকেই। পরবর্তীতে তাঁকে সত্য নবী মেনে নিতে এই জাতিগত বিদ্বেষ তাদের বাধা দিয়েছে।

এইভাবে যুগে যুগে সত্যকে স্বীকার করে নিতে জাতীয়াতাবাদ দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়েছে।

পঞ্চমত, জাতীয়তাবাদ ন্যায়-অন্যায় বোধকে নষ্ট করে দেয়। আদলকে ধ্বংস করে দেয়। রাসূলুল্লাহ (সা) একবার চুরির অপরাধে একবার এক কুরাইশ মহিলার হাত কাটার নির্দেশ দিলেন। মহিলাটি রাসূলের বংশের হওয়ায় তার শাস্তি লঘু করার সুপারিশ এল। ক্রোধে লাল হয়ে রাসূল (স) বললেন,

"আমার মেয়ে ফাতিমাও যদি চুরি করত, আমি তারও হাত কেটে দিতাম। এই ন্যায়বিচারের অভাবেই পূর্ববর্তী জাতিগুলো ধ্বংস হয়ে গেছে।"

জাতীয়তাবাদের দাবি ছিল রাসূল নিজের জাতিকে ন্যায়বিচারের উপরে স্থান দেবেন। আর ইসলামের দাবি হচ্ছে অপরাধ যে ই করুক, এমনকি নিজের ভাই বা সন্তান হোক, তার শাস্তি পেতে হবে। আলী (রা) যখন খলিফা তখন এক ইহুদির কাছে মামলা হেরে যান, কেবলমাত্র সাক্ষীর অভাবে। তিনি তা নির্দ্বিধায় মেনে নেন। অর্ধজাহানের শাহানশাহ মামলা হারলেন এক সাধারণ ইহুদির কাছে, এই দৃষ্টান্ত একমাত্র ইসলামী বিচারে সম্ভব। জাতীয়তাবাদ এই ন্যায়বোধের শিকড়ে পদাঘাত করে।

একাত্তরে যারা পাকিস্তানি আর্মিকে অপকর্মে সাহায্য করেছিল তারাও জাতীয়তাবাদের বশেই করেছিল। জাতীয়তাবাদের দাবিই হল নিজের স্বজাতিকে সাহায্য করে, যদি সে অন্যায় করে তবুও। আজকে যারা যুদ্ধের অনেক পরে জন্ম নেওয়া পাকিস্তানি লোকটিকে ঘৃণা করছি শুধুমাত্র সে "পাকিস্তানি" বলে, তারাও জাতীয়তাবাদে আক্রান্ত। আমরা রাজাকারের বিচার চাই সেক্যুলারদের কাছে। আমি আজকে সেসব লোককে বলতে চাই, যদি দেশে ইসলামী শাসন প্রতিষ্ঠিত থাকত তবে একাত্তরে না হলেও বাহাত্তরেই যুদ্ধাপরাধের বিচার হয়ে যেত। একদিন এরা বুঝতে পারবে, ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রের দাবি করে কতবড় ভুল করেছিল। জাতীয়তাবাদী ভণ্ডের দলের কাছে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার চেয়ে কতবড় বোকামি করেছে। ভণ্ডের দল কোন ভণ্ডামির বিচার করবে বলতে পারেন?

স্বজনপ্রীতি, পক্ষপাতিত্ব, অন্যায়, দুর্নীতি, অন্ধত্ব সব এই জাতীয়তাবাদের হাত ধরে আসে। এই বিষাক্ত বৃক্ষের মূল উপড়ে ফেলতে হবে।

শেষ কথাঃ আমরা মুসলিম, এটাই আমাদের প্রধান পরিচয়। হ্যাঁ, আমরা একইসাথে বাঙালি, বাংলাদেশী, সেসব আমাদের অবস্থান, ভাষা ইত্যাদি নির্দেশ করে, কোন সমস্যা নেই। কিন্তু আমাদের মানবতা, আমাদের হৃদয়ের আবেগ কোন কাঁটাতারের বেড়ায় আবদ্ধ নয়। পৃথিবীর সব মুসলিম আমাদের ভাই, আমাদের প্রাণ কাঁদে তাদের কষ্টে। জাতীয়তাবাদ এক বিষাক্ত মতবাদ, যা মানুষের রক্তের চেয়ে একটা কাগজের পতাকাকে বেশি মূল্যবান করে তোলে। সেক্যুলার শিক্ষা ব্যবস্থা ইনজেকশনের মত এই বিষ ঢুকিয়ে দিচ্ছে মানুষের শরীরে, অন্তরে, মগজে। সেই জাতীয়তাবাদ যা একটা পাথরের স্তম্ভতে ফুল নিবেদনকে পুণ্য জ্ঞান করায়, অথচ দেশের মানুষের স্বার্থবিরোধী চুক্তি হলে দেখেও না দেখার ভান করে পলিটিকাল ভিউ I hate politics লিখে মুড়ি চিবোতে শেখায়। সেই জাতীয়তাবাদ, যা হৃদয়কে করে সংকীর্ণ, চোখকে করে অন্ধ, কানকে করে স্তব্ধ। সেই জাতীয়তাবাদ যা মুসলিম পরিচয়ের চেয়ে সীমানার পরিচয়কে বড় ভাবতে শেখায়।

আমরা জন্মেছি মুসলিম পরিচয়ে, মৃত্যু হবে (ইনশাআল্লাহ্‌) এই পরিচয়ে, হাশরের ময়দানে উঠতে হবে এই পরিচয়ে। সেখানে অন্য কোন পরিচয় কাজে আসবে না, রাসূলের উম্মাত বলে নিজেকে পরিচয় দিতে না পারলে। জাতীয়তাবাদী সঙ্কীর্ণতা সেদিন ধূলিস্মাত হয়ে যাবে, অগ্নির গহ্বরে কোথায় মিলিয়ে যাবে।

এখনও কি সময় আসেনি এই বিষকে ছুঁড়ে ফেলে দেওয়ার??

টিকাঃ

i) Blood and Tears, Dead Reckoning

ii) ‘আল-ওয়ালা ওয়াল-বারা’ র অর্থ:

ওয়ালা অর্থ : হৃদ্যতা, বন্ধুত্ব ঘনিষ্ঠতা। বারা অর্থ: ঘৃণা, শত্রুতা, দূরত্ব। মূলত: ওয়ালা এবং বারা হচ্ছে মনের বিষয়। ওয়ালা বা বন্ধুত্ব আল্লাহ তা'আলা, তার রাসুল সা. এবং মুুমিনদের জন্য হয়ে থাকে— সেক্ষেত্রে সূরা মায়িদার ৫৫ নং আয়াতে আল্লাহ বলেন , “নিশ্চয় তোমাদের বন্ধু হল আল্লাহ, তার রাসুল এবং যারা ঈমানদার”। “আল ওয়ালা ওয়াল বারাহ্‌” এর ভিত্তিতে পুরো মানবজাতিকে তিন ভাগে ভাগ করা যায়।

- যাদেরকে খালেসভাবে ভালোবাসতে হবে:

এরা হলেন নবী-রাসূল, সিদ্দীকিন, সালেহীন এবং শুহাদা তাঁদের ঈমানের কোন ত্রুটি নাই। এর সর্বোচ্চ চূড়ায় অবস্থান করছেন মুহাম্মদ রাসুলুল্লাহ (সা) যাকে দুনিয়ার সব কিছু থেকে বেশী ভালোবাসতে হবে।

- যাদের সাথে খালেস দুশমনি ও শত্রুতা রাখতে হবে:

খাঁটি কাফের, মুনাফিক, মুশরিক, মুরতাদ, নাস্তিক এবং অনুরূপ লোক। যাদের সাথে দুশমনি করার কোন বিকল্প নাই।

- যাদের ঈমানের কারণে মুহাব্বাত করতে হবে এবং গুনাহের কারণে ঘৃণা করতে হবে:

এসব লোক হল তারা যারা ঈমান এনেছে, আবার পাপকাজেও লিপ্ত। গুনাহগার মুসলিমরা। তাদের ঈমানের কারণে তাদের প্রতি ভালোবাসা থাকবে আর গুনাহে লিপ্ত হওয়ার কারনে থাকবে ঘৃণা। এখানে একটা বিষয় বুঝতে হবে যে, কাফেরদের প্রতি বিদ্বেষ কিংবা শত্রুতা যেমন চিরন্তন, এদের বেলায় কিন্তু তা এরকম নয়। এদের প্রতি বিদ্বেষ হলো তাদের গুনাহের কারণে।

উল্লেখ্য, কাফেরদের মধ্যে যারা মুমিনদের কষ্ট দেয়া থেকে বিরত থাকে, কাফেরদের সাথী হয়ে যুদ্ধ করে না, এই ধরনের কাফেরদের সাথে সদাচরণ এবং ইনসাফভিত্তিক আচরণ করতে হবে। তবে কোনভাবেই তাদের প্রতি ভালোবাসা থাকতে পারবে না।

উপ সম্পাদকীয়

সমাজসেবা ও দেশপ্রেম

পিযুষ চক্রবর্তী প্রকাশিত হয়েছে: ১৬-০৯-২০২০ ইং ০২:২০:৪৯ | সংবাদটি ৪২ বার পঠিত
Image

নেতৃত্ব হচ্ছে নেতার বিশেষ গুণ যা অপরকে প্রভাবিত ও পরিচালিত করে এবং অভিষ্ট লক্ষ্য অর্জনে সহায়তা করে। সমাজ জীবনের প্রতিটি স্তরে, রাষ্ট্রে, সমাজে, পরিবারে, কল-কারখানায়, অফিস-আদালতে, খেলার মাঠে সর্বক্ষেত্রে নেতৃত্বের অবদান অনস্বীকার্য।
সামাজিক জীবন যৌথ কর্মপ্রচেষ্টার ফসল। এ প্রচেষ্টাকে সার্থক করতে হলে দরকার সঠিক নেতৃত্বের। জনগণকে সঠিকভাবে পরিচালিত করে, জাতিকে উন্নতির দিকে অগ্রসর করার জন্য রাজনৈতিক নেতাদের সুযোগ্য নেতৃত্ব আবশ্যক। জনপ্রিয় নেতা ও যোগ্য নেতৃত্বই গণতন্ত্রের বাহন।
সাধারণভাবে নেতৃত্ব বলতে কোন দলের নেতার গুণাবলীকে বুঝায়। সি.আই. বার্নাডের ভাষায়, “নেতৃত্ব বলতে ব্যক্তিবর্গের এরূপ আচরণ-গুণকে বুঝায়, যার মাধ্যমে তারা সংগঠিত কর্মপ্রচেষ্টায় জনগণকে বা জনগণের কার্যকলাপকে পরিচালিত করেন।”
একটি রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় সঠিক নেতৃত্ব সফলতার চাবিকাঠি। জ্বলন্ত উদাহরণ স্বরূপ বলা যায়-বাংলার মানুষের আত্মমর্যাদা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় ১৯৭১ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দৃঢ় পদক্ষেপ, বলিষ্ঠ নেতৃত্ব ও বজ্রকন্ঠে মুক্তি সংগ্রামের দিক নির্দেশনা সাড়ে সাত কোটি মানুষকে এক চেতনায় উদ্বুদ্ধ করা ভাষণ-এবারের সংগ্রাম, আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম, স্বাধীনতার সংগ্রাম।
রাজনৈতিক সমস্যা ও সংকট দূরীকরণের লক্ষ্যে কোন নেতৃত্বের বিকাশ বাংলাদেশে ঘটছে কি? ব্যক্তির চেয়ে দল বড়, দলের চেয়ে দেশ বড়, এই মানসিকতা-সকলস্তরের নেতার মধ্যে থাকা উচিত। রাজনীতি রাজার নীতি। রাজার নীতি হচ্ছে প্রজাদের দুঃখ-দুর্দশা লাঘব করা এবং রাজ্যের উন্নতি সাধন ঘটানো। মোট কথা রাজনীতি হচ্ছে মানুষের কল্যাণে ও সেবায় আত্মনিয়োগ করা।
অনেকে ধারণা করেন নেতৃত্ব একটি জন্মগত গুণ। আবার কেউ কেউ মনে করেন নেতৃত্ব হচ্ছে এক রকম নিপুণতা অভিজ্ঞতা, শিক্ষা ও জ্ঞানের উৎকর্ষ সাধন করে এই নিপুণতা অর্জন করা যায়। যিনি নেতৃত্ব প্রদান করেন সমাজের সর্বস্তরে তার যথেষ্ট মর্যাদা থাকা প্রয়োজন। অনুসারীগণ নেতার চিন্তা চেতনার সাথে একাত্মতা ঘোষণা করে। নেতা তার অনুসারীদের প্রাণ। সবাইর পক্ষ থেকে তিনি বক্তব্য রাখেন। সঠিক নেতৃত্বের জন্য সুগভীর জ্ঞান, প্রজ্ঞা, নৈতিক ক্ষমতা, আত্মবিশ্বাস, আত্মপ্রত্যয়ী ও সাহসী হওয়া উচিত। অতীত পর্যালোচনা করলে রাজনীতিবিদদের সুখ্যাতি ও আদর্শ পরিলক্ষিত হয়। মাওলানা ভাসানী, শহীদ সোহরাওয়ার্দী, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আরো অনেকেই। আঞ্চলিক ও জাতীয় নেতাদের মধ্যে-হুমায়ুন রশিদ চৌধুরী, সাইফুর রহমান, কিবরিয়া সাহেব, আব্দুস সামাদ আজাদ, সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত-এ রকম অনেকেই রয়েছেন যাদের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, মেধা, প্রজ্ঞা, দূরদর্শীতা ও জনসমর্থন ছিল যথেষ্ট এবং সিলেটের উন্নয়ন ও অগ্রযাত্রায় এমনকি জাতীয় স্বার্থে ও দেশপ্রেমে অবিচল ধারা।
মানবপ্রেম ও দেশপ্রেমকে চিন্তা ও চেতনায় প্রাধান্য দিয়ে নেতৃত্বের মনোভাব পোষন করলে ব্যক্তি, সমাজ ও জাতির কল্যাণের আবর্তে অগ্রগতি হবে। কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র, নানা সংগঠন ও শ্রেণী পেশা থেকেও নেতৃত্বের উন্মোচন ঘটতে পারে। সঠিক নেতৃত্বের জন্য প্রয়োজন ন্যায় নিষ্ঠতা কঠোরতা ও কোমলতার সংমিশ্রণ। রাজনৈতিক জ্ঞান অর্জনের জন্য সু-শিক্ষার প্রয়োজন রয়েছে। শিক্ষা ছাড়া প্রকৃত জ্ঞানের উদ্রেগ হয় না। দেশের সব এলাকাতেই ছাত্ররা ছড়িয়ে রয়েছে। আজকের ছাত্ররাই আগামী দিনের রাষ্ট্রের কর্ণধার। জাতীয় সংসদের মনোনীত সদস্য ও মন্ত্রীদের জীবনী পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে ছাত্র জীবন থেকেই রাজনৈতিক জ্ঞানচর্চা ও সমাজসেবার মধ্য দিয়ে বিচরণ করেই বড় রাজনীতিবিদ হয়ে দেশ ও অঞ্চলের মানুষের সেবার মধ্য দিয়ে রাজনীতি করছেন। অস্ত্র নির্ভর ও ত্রাসের রাজনীতি কেউ পছন্দ করে না এবং ঐ রাজনীতি দেশ ও সমাজে স্থায়ী হয় না, এমনকি কল্যাণ বয়ে আনে না।
এ দেশের ইতিহাসে ছাত্র সমাজের রয়েছে গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা। সেই ’৫২-র ভাষা আন্দোলন, ’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, ’৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধ থেকে শুরু করে ’৯০-এর স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে এদেশের ছাত্র-যুব সমাজ রেখেছে অসাধারণ ভূমিকা। কিন্তু আজ ছাত্র রাজনীতি অ-ছাত্র ও অস্ত্র প্রতিযোগিতায় কলুষিত। সমাজ ও দেশের স্বার্থে ছাত্র রাজনীতিকে কলুষমুক্ত রেখে এমনভাবে ঢেলে সাজানো উচিত যাতে লেখা-পড়ার পাশাপাশি জ্ঞান অর্জন, চারিত্রিক উন্নতি ও বাস্তবমুখি সমাজ সেবায় উৎসাহ সাধন ঘটে। ছাত্ররাই দেশপ্রেম ও দেশের আপদকালীন সময়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বই, খাতা, কলম, বক্তৃতা ও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার মধ্য দিয়ে জ্ঞান অর্জন ও সামাজিক গতিধারার পর্যবেক্ষণ থেকেই সেবার মনোভাব জাগ্রত করে ছাত্র ও শিক্ষিত সমাজ নেতৃত্বের গুণাবলী চর্চার মধ্য দিয়ে সমাজ ও দেশের সেবায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে পারে।
লেখক : কলামিস্ট।

শেয়ার করুন

ফেসবুকে সিলেটের ডাক

উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • ভেজাল থেকে বাঁচান
  • অসহায় শ্রমিকদের দিকে তাকান
  • ডিপ্লোমা শিক্ষা ও জাতির উন্নয়ন
  • সুনামগঞ্জের তিন কৃতি ব্যক্তিত্বের মৃত্যুতে
  • বৈচিত্র্যের সৌন্দর্য
  • আল্লামা আহমদ শফী চলে গেলেন
  • কর্তৃত্ববাদী রাজনীতির নব্য রূপকার
  • স্মরণ:ডা. দেওয়ান নূরুল হোসেন চঞ্চল
  • কোভিড-১৯ এর সম্মুখ সমরে লড়ছে জিন প্রকৌশলীরা
  • মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে তুরস্কের প্রভাব
  • বৃদ্বাশ্রম
  • পুষ্টি-অপুষ্টি প্রসঙ্গ
  • পুষ্টি-অপুষ্টি প্রসঙ্গ
  • সত্য যখন উক্তি হয়ে ফিরে আসে
  • প্রসঙ্গ : মহামারিতে ধৈর্য ধারণ
  • মা-বাবার সাথে থাকি
  • নব্যউদারনীতিবাদ নিয়ে কিছু কথা
  • মাওলানা আবুল কালাম আজাদ
  • বাউল সম্রাট ও গ্রামীণ সংস্কৃতি
  • সমাজসেবা ও দেশপ্রেম
  • Image

    Developed by:Sparkle IT