উপ সম্পাদকীয়

প্রসঙ্গ : মহামারিতে ধৈর্য ধারণ

এম এ মালেক চৌধুরী প্রকাশিত হয়েছে: ১৮-০৯-২০২০ ইং ০২:৫৩:৫৬ | সংবাদটি ১২১ বার পঠিত
Image

করোনা মহামারি প্রসঙ্গে গত ২৫ আগস্ট এ কলামে প্রকাশিত নিবন্ধের কথা সম্ভবতঃ পাঠকবৃন্দের মনে থাকতে পারে। তো, করোনা পৃথিবীর বেশীরভাগ দেশে দ্বিতীয় ধাপ চলছে। সময়ের বিবেচনায় বিজ্ঞজনদের ধারণায় বাংলাদেশও এই ধাপ অতিক্রম করছে। ইতিমধ্যে মানুষের জীবন ও জীবিকার তাগিদে এবং দেশের অর্থনীতি মেরামতের প্রচেষ্ঠায় করোনার সতকর্তা বহুদেশেই শিথিল করা হচ্ছে। বাংলাদেশেও মানুষের জীবনযাত্রা, চলাচল আগের ন্যায় স্বাভাবিক অবস্থায় ক্রমশঃ ফিরে আসছে। যদিও পৃথিবীর কোন দেশেই করোনা মহামারির ছোবল প্রতিহত করা সম্ভব হয়নি বরং অনেক দেশেই তা পুনঃবিস্তার লাভ করেছে। মাস্ক পরিধান এবং সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে চলাচল করোনার যৌবন কালেও পৃথিবীর কোন দেশে অর্ধশত ভাগও মানা হয়নি। রাজধানী ও জেলা শহরগুলোতে প্রথম দফায় কিছুটা মেনে চলা হলেও বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে হাটে বাজারে এর সিকিভাগও সাধারণ জনগুষ্টি মেনে চলেনি। আর এখনতো সব জায়গায় একেবারে ঢিলেঢালা অবস্থা। মানুষের ভাবটা যেন ‘রাখে আল্লাহ মারে কে’ বা ‘মারে আল্লাহ রাখে কে’-এ বিশ্বাসে। কথা হলো, করোনায় যতটা না মৃত্যু হচ্ছে তার চেয়ে হাজারগুণ বেশী মানুষের মনে আতংক ও ভয়ভীতি সৃষ্টি হয়েছে। পৃথিবীর সব দেশের সব মানুষকে এক সাথে আতংকে রাখার ‘কারিশমা তথা শক্তি’ একমাত্র আল্লাহ সর্বশক্তিমানের রয়েছে- অবিশ্বাসীরা তা বিশ্বাস করুক আর না করুক।
এ প্রসঙ্গে মহাগ্রন্থ আল কোরআনের একটি আয়াত উল্লেখ করা যায়। সুরা বাকারার ১৫৫নং আয়াতে বলেছেন “আমি তোমাদেরকে কিছু ভয়, ক্ষুধা এবং ধন সম্পদ, জীবন ও ফয়ফসলের ক্ষতি দ্বারা অবশ্যই পরীক্ষা করিব। তুমি সু-সংবাদ দাও ধৈর্যশীলগণকে।” কাজেই প্রত্যেক মহামারি রোগ ব্যাধি মানুষের উপর আল্লাহ তায়ালার পরীক্ষা স্বরূপ এবং চলমান মহামারি করোনায় উপরোক্ত কুরআনের আয়াতের পাঁচটি লক্ষণই রয়েছে। মহান আল্লাহর এ পরীক্ষায় যারা ধৈর্য ধরে আল্লাহ তায়ালার কাছে শুধু ক্ষমা প্রার্থনা করবে করজুড়ে নত মস্তকে, তারাই লাভবান হবে দুনিয়া আখিরাতে। যেহেতু প্রত্যেক জীবের মৃত্যু অবধারিত। পারস্যের বিখ্যাত কবি শেখ সাদী (রহ:) ও বলেছেন “এ দুনিয়া মুসাফিরখানা নাইকো সন্দেহ, কেহ বা আগে যাবে পিছে যাবে কেহ” (কাব্যানুবাদ)। কোন কারণ ছাড়া কারো মৃত্যু হয়না। তাই তো আল্লাহ রাব্বুল আ’লামীন মানুষের রোগ-বালাই দিয়েছেন। মানুষ কখন, কোথায় কিভাবে মারা যাবে তা আল্লাহ রাব্বুল আ’লামীনের কাছে রক্ষিত এবং নির্দিষ্ট করা আছে। কখনো এর ব্যত্যয় ঘটেনা। মহাগ্রন্থ আল-কোরআনের সুরা আম্বিয়ার ৩৫ নং আয়াতে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা মানুষকে জানিয়ে দিয়েছেন “মউতের স্বাদ করিবে গ্রহণ প্রাণ ধরে যতজন/ আমি তোমাদের পরীক্ষা করি নহে তাহা অকারণ/ মঙ্গল-অমঙ্গল দিয়া যখন যেভাবে চাই/ ফিরিবে তোমরা আমার কাছে, হেথা তোমাদের ঠাঁই।” (কাব্যানুবাদ)। মানুষ যখন আল্লাহ জাল্লে শানুহুর সীমা লংঘন করে, তার প্রতিপক্ষ হয়ে দাঁড়ায় তখনই তিনি মহামারি, রোগ বালাই, তুফান, সাইক্লোন, ভূমিকম্প ইত্যাদি দুর্যোগ নামীয় আজাব দিয়ে মানুষকে সতর্ক করে দেন- এ ব্যাপারে ১ম পর্বে কিঞ্চিত আলোকপাত করেছি।
প্রত্যেক মুসলমানমাত্রই জানেন যে মানুষ সহ সব জীবের প্রাণ বায়ু (রুহ কবজ্) বের করার দায়িত্ব মহান পালনকর্তা আল্লাহ অর্পণ করেছেন মালাইকা/ফেরেশতা হযরত আজরাঈল আলাইহিস সালামকে দোষারোপ করতে না পারি সে কৌশল (ব্যবস্থা) ও আল্লাহ রাব্বুল আ’লামীন রেখেছেন। তাই কেহ মারা গেলে এর কারণে বলা হয় অমুক ক্যান্সারে বা যক্ষ্মায় বা টাইফয়েড বা ম্যালেরিয়া- ডেঙ্গু ইত্যাদি যে কোন রোগে মারা গেছেন। এখন যেমন বলা হচ্ছে করোনায় মারা গেছেন। তেমনি হার্ট এ্যাটাক, ব্রেন স্ট্রোক, এক্সিডেন্ট, জাহাজ ডুবি, লঞ্চ ডুবি, নৌকা ডুবি, পানিতে ডুবে, বজ্রপাতে, ভূমিকম্পে, ভূমি ধ্বসে, অগ্নিদগ্ধে, তুফান, সাইক্লোন, টর্নেডোয়, গুলিবিদ্ধ হয়ে, জবাই হয়ে, আত্মহত্যায়, পুলিশি হেফাজতে, ক্রস ফায়ারে ইত্যাদি ইত্যাদি বিভিন্ন কারণে মারা গেছে বলা হয়। অথচ “মহান আল্লাহ পালনকর্তার অবগতি ব্যতিত বৃক্ষ হতে একটি পাতাও ঝরে পড়ে না” (সুরা আনআম, আয়াত নং ৫৯)।
বাংলাদেশে মুসলমানদের নব্বই শতাংশের এ নিবন্ধকারের ন্যায় ধর্মীয় বিষয়ের জ্ঞান অত্যুল্প। ঈমানের ৭৭টি শাখা-প্রশাখার মধ্যে মুখের জবানের সঙ্গে সাতটি (৭) বিষয়ের মধ্যে দ্বিনি জ্ঞান অর্জন করার শর্ত রয়েছে। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় যে আমরা শৈশবে মক্তবে বা গৃহ শিক্ষক এর কাছে যে দ্বিনি জ্ঞান লাভ করেছিলাম তারপরে আর ধর্মীয় পুস্তকাদি হাতে নেইনি। সে জন্য মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে আসা রোগ ব্যাধি মহামারী ও প্রাকৃতিক দুর্যোগে আমরা অতিকথন হরহামেশা করে থাকি যাহা আল্লাহ জাল্লে শানুহুর বিধানের বিপরীত, সে দিকে ভ্রুক্ষেপ থাকে না। “করোনা যত বড় শক্তিশালী হোক, আমরা তার চেয়ে শক্তিশালী, অমুকের জন্য দেশ করোনা ম্ক্তু রয়েছে, এবারও দুর্যোগ মোকাবিলা করবো”- ইত্যাদি অসংখ্য বাক্য আমাদের মুখ থেকে বেরিয়ে আসে যে সব কথা মহান আল্লাহর শান কে চ্যালেঞ্জ জানায়। মাখলুকের বিন্দুমাত্র শক্তি, ক্ষমতা নেই মহান সৃষ্টিকর্তা প্রদত্ত মহামারি ও বিভিন্ন রকমের দুর্যোগের “মোকাবিলা” করার। ‘মোকাবিলা’ তো সম্মুখ যুদ্ধ। ঝড়, সাইক্লোন, ভূমিকম্প, বন্যা এসব বন্ধ করা বা জমিনে না আসার ক্ষমতা তো মানুষের আয়ত্বে নয়। নতুন নতুন রোগ, মহামারির আগমনকে মানুষের রোখে দেয়ার শক্তি নেই। বৃষ্টি না হলে মানুষ বৃষ্টি আনতে পারে না, অনুরুপ বৃষ্টিকে মানুষ ঠেকাতেও পারে না। সুরা হিজর এর ২১নং আয়াতে মহান আল্লাহ বলেন, “আমারই কাছে আছে প্রত্যেক বস্তুর ভান্ডার এবং আমি তা সুসম পরিমাণেই সরবরাহ করে থাকি।” এ আয়াতের ব্যাখ্যায় বিজ্ঞজনেরা বলেছেন যে, আল্লাহ তায়ালা খবর দিচ্ছেন যে, সমস্ত কিছুর তিনি একাই মালিক। সমস্ত কিছুর ভাণ্ডার তার কাছে বিদ্যমান রয়েছে। যেখানে যখন যতটা ইচ্ছা তিনি অবতীর্ণ করেন। তার হিকমাত ও নিপুণতা তিনিই জানেন। বান্দার কল্যাণ সম্পর্কে তিনি সম্যক অবগত। এটা একমাত্র তাঁর মেহেরবাণী, নচেৎ এমন কে আছে যে তাকে বাধ্য করতে বা জোর করতে পারে তার উপর? তবে হ্যাঁ, বন্টন আল্লাহ তায়ালার হাতে রয়েছে। আল্লাহর ফেরেশতাগণ বৃষ্টির এক একটি ফোটার খেয়াল রাখেন যে, ওটা কোথায় বর্ষিত হচ্ছে এবং তা থেকে কি উৎপন্ন হচ্ছে। সব বিপদ আপদ কাটিয়ে উঠতে মহান সৃষ্টিকর্তার সাহায্য অগ্রে চাইতে ‘ইনশাআল্লা’ (আল্লাহ চাহে তো) বলতে তিনি মানুষকে শিখিয়েছেন।
পরিশেষে, পরম করুণাময় দয়াল আল্লাহ যেন বিদ্যমান মহামারি করোনা সহ সব রকমের বিপর্যয় কাটিয়ে উঠার ব্যবস্থা ও ধৈর্য ধারনের শক্তি আমাদেরকে দান করেন এবং সেই সাথে আমরা বেফাঁস অতিকথন থেকে তার আশ্রয় ও ক্ষমা প্রার্থনা করছি।
লেখক: সাংবাদিক, কলাম লেখক।

 

শেয়ার করুন

Developed by:Sparkle IT