উপ সম্পাদকীয়

সত্য যখন উক্তি হয়ে ফিরে আসে

ব্রজেন্দ্র কুমার দাস প্রকাশিত হয়েছে: ১৯-০৯-২০২০ ইং ০২:৪৭:০৪ | সংবাদটি ১০৫ বার পঠিত
Image

পত্রিকা কিনতে গেলেই খুঁজে দেখি কোন পত্রিকায় আবদুল গাফফার চৌধুরীর লেখা ছাপা হয়েছে। তিনি বরেণ্য কলাম লেখক বলেই যে সেটি করি, তা কিন্তু নয়। “আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারী, আমি কি ভুলিতে পারি” গানটির রচয়িতা তিনি। এ কারণেই আগ্রহটা এতো বেশি। কারণ এই গানটি শুধুই একটি গান নয়, এ গানটি বাঙালির শক্তি, সাহস, আর কোন সময় বাঙালির অস্তিত্বের ওপর আঘাত এলে প্রতিবাদী হয়ে উঠার মহাশক্তির জোগানদাতা এই গানটি। তাই সব মিলিয়ে তাঁর এক নগণ্য পাঠক আমি।
২০ আগস্ট (২০২০) দৈনিক সমকাল পত্রিকায় “আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মুখে একটি ঐতিহাসিক সত্য” শিরোনামে একটি নিবন্ধ প্রকাশিত হয়। তিনি লিখেন-“আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন সম্প্রতি এমন একটি ঐতিহাসিক মন্তব্য করেছেন, যা উপমহাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানের কোনো পররাষ্ট্রমন্ত্রী কিংবা অন্য কোনো মন্ত্রী উচ্চারণ করেননি, অথবা উচ্চারণ করতে সাহসী হননি। মুক্তিযুদ্ধকালীন স্বাধীন বাংলাদেশের রাজধানী মেহেরপুরের মুজিবনগর পরিদর্শনকালে সাংবাদিকদের কাছে এই উক্তি করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেছেন, “ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক রক্তের। আর চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক অর্থনৈতিক। ---- মুক্তিযুদ্ধে আমাদের বিজয় ছিল ভারতেরও বিজয়। ভারতের বিজয় ছিল আমাদেরও বিজয়’। উক্তিটি অবশ্যই একটি ঐতিহাসিক গুরুত্বপূর্ণ উক্তি এবং সেটি আরো গুরুত্বপূর্ণ এ কারণে যে বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তানের কোন পররাষ্ট্রমন্ত্রী এই চরম সত্য কথাটি বলেননি। তাই এ জন্য আমাদের সবাই আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মহোদয়কে আন্তরিকভাবে অভিনন্দন জানালে ইতিহাসের সত্যকেই অভিনন্দন জানানো হয়। আর এতে কোন প্রকার কার্পণ্যের আশ্রয় নেয়া উদারতার পরিচায়ক তো নয়ই বরং সত্যকে অস্বীকার করারই সামিল। তবে এখানে এটাও ঐতিহাসিক সত্য যে, চীনের সাথে অর্থনৈতিক সম্পর্কটা ইদানিং কালের। ১৯৭১ সালের নয়। এখানে রক্ত আর অর্থের পার্থক্যটা চিন্তায় রেখেই পথ চলতে হবে।
এদিকে আমরা যে যাই বলি না কেন, সময় কিন্তু চলমান বাস্তবতার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর। সময়ের সাথে সাথে সব কিছুই বদলায়। নানা জনের উক্তিরও বদল ঘটে। আর ঐ গুরুত্বপূর্ণ উক্তির মাধ্যমে যখন ঐতিহাসিক সত্যের বহিঃ প্রকাশ ঘটে, সত্যের কাছে মিথ্যার পরাজয় ঘটে তখনই দেশ-জাতি-রাষ্ট্র তথা দেশের জনগণের কল্যাণ সাধিত হয়। রাষ্ট্র হয় কল্যাণমুখী, গর্ব আর গৌরব করার মতো ইতিহাস-ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ হয় সমগ্র জাতি। যে গৌরবের অধিকারী হয়েছি আমরা ১৯৭১-এ। এমনি দু’টি উক্তি জাতিকে নতুন আলোর পথ দেখাচ্ছে। একটি হলো-‘বঙ্গবন্ধুকে অস্বীকার মানে বাংলাদেশকেই অস্বীকার’ ঃ বি. চৌধুরী। (বাংলাদেশ প্রতিদিন ১৬.৮.২০২০)। দুই-‘সোনারগাঁওয়ে কাদের-বঙ্গবন্ধু সব দলের নেতা’ (আমাদের সময় ৩০.৮.২০২০)
বাংলাদেশ প্রতিদিন লিখে-সাবেক রাষ্ট্রপতি ও বিকল্প ধারার প্রেসিডেন্ট অধ্যাপক ডা. এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী বলেছেন, ‘স্বাধীন বাংলাদেশের মহান স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের লালিত স্বপ্ন বাস্তবায়নের শপথ নিতে হবে। বঙ্গবন্ধুকে যারা অস্বীকার করে তারা বাংলাদেশের অস্তিত্ব, মুক্তিযুদ্ধ ও মানচিত্রকে অস্বীকার করে। বঙ্গবন্ধুকে যারা শ্রদ্ধা করে না, তারা দেশের মানুষকেও শ্রদ্ধা করে না। তারা মুক্তি সংগ্রামকেও শ্রদ্ধা করে না।---- ১৫ই আগস্ট বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি নিষ্ঠুরতম অধ্যায় শুরু হয়েছিল।’ বি. চৌধুরী শুধু বাংলাদেশের একজন সাবেক রাষ্ট্রপতিই নন, বর্তমানেও বাংলাদেশের রাজনীতির আকাশে একজন উজ্জ্বল নক্ষত্র। সর্বজন শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্ব।
এখানে একটা কথা অবশ্যই হিসেবে আনতে হবে যে সব ‘সাবেক’ কিন্তু সব সময় ‘সাবেক’ হয়ে যায় না। যেমন সদ্য প্রয়াত ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি কিন্তু গতানুগতিক ‘সাবেক’ হয়ে যাননি। যদিও তিনি বিজেপির নন, কংগ্রেসের। তারপরও বিজেপি’র প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি প্রণব মুখার্জির প্রয়ানে যা করেছেন বিশ্ববাসী তা যেমন দেখেছেন আমরাও দেখেছি। এই রাজনৈতিক সংস্কৃতি আমরা কতোটুকু ধরে রাখতে পারছি সেটা ভেবে দেখা যেতে পারে।
যাক গে সে কথা। বি. চৌধুরীর ঐতিহাসিক উক্তিটির প্রতি বিশেষভাবে একটু দৃষ্টি দিলে বোধ হয় কিছু কিছু প্রশ্ন এসে যায়। যেমন-বঙ্গবন্ধুকে কি এই বাংলাদেশে অস্বীকার করে কেউ? বাংলাদেশের অস্তিত্ব, মুক্তিযুদ্ধ ও মানচিত্রকে অস্বীকার করে? বঙ্গবন্ধুকে কি কেউ অশ্রদ্ধা করে? মুক্তি সংগ্রামকে শ্রদ্ধা করে না? বি. চৌধুরী বিজ্ঞ এবং প্রবীণ রাজনীতিবিদ। উনার পর্যবেক্ষণ অবশ্যই অর্থবহ এবং তাৎপর্যপূর্ণ। কোন হালকা বিষয় নয়। সাবেক এই মহামান্য রাষ্ট্রপতির উক্তির সংশ্লিষ্ট প্রশ্নগুলির যদি বিন্দুমাত্রও সত্য হয় তা অবশ্যই বাংলাদেশের জন্য কোন শুভ বার্তা বহন করে না। এবং তা কারো জন্যই কখনো কাম্য হতে পারে না। আর সেটা বাংলাদেশের জন্য তো মঙ্গলজনক নয়ই, বরং যারা এ ধরণের মানসিকতা পোষণ করেন তাদের জন্যও তা অবশ্যই ক্ষতিকারক, তাদের ভবিষ্যতের জন্যও কোন আশাপ্রদ বার্তা নয়। ইতিহাস তাই বলে। আর ইতিহাসকে অস্বীকার করে ক্ষণিকের জন্য জ্বলে উঠা যায় মহাকাল কখনো গ্রহণ করে না।
দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ উক্তিটি হলো জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জি.এম কাদের মহোদয়ের। তিনি বলেছেন ‘বঙ্গবন্ধুর কথা বলে আওয়ামী লীগ যা খুশী তা করতে পারে না। বঙ্গবন্ধু সব দলের নেতা। তাকে আওয়ামী লীগের নেতা হিসেবে ছোট করে দেখব কেন। বঙ্গবন্ধুর কাছে আমাদের অনেক কিছু শেখার আছে। উনি ছিলেন নেতার নেতা’।
বি. চৌধুরী এবং জি.এম কাদের স্ব স্ব দলের পক্ষে আয়োজিত ১৫ই আগস্টের শোক দিবসের অনুষ্ঠানে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে এইসব ঐতিহাসিক উক্তিগুলো করেছেন। ঐতিহাসিক বলছি এ কারণে যে, আওয়ামী লীগ ছাড়া দেশের অন্য কোন দল বা দলীয় প্রধান এর আগে ১৫ই আগস্ট উপলক্ষে এমনি শোক সভার আয়োজন করেছেন বলে মনে করতে পারছি না। এতে করে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে দীর্ঘ দিন পর সুবাতাস বইতে শুরু করছে বলেই মনে হচ্ছে।
তর্কের স্বার্থে, দলীয় স্বার্থে, গোষ্ঠী স্বার্থে আমরা যে যা-ই বলি না কেন, আমরা কিন্তু মনে মনে সবাই জানি বঙ্গবন্ধুকে বাদ দিয়ে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং বাংলাদেশকে কল্পনা করা যায় না। এটা বাস্তব সত্য যে, নতুন প্রজন্মকে আমরা আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস জানাতে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছি কিন্তু আমরা যারা ’৬৬, ’৬৯, ’৭০, ’৭১ দেখেছি আমাদের পক্ষে কিন্তু বঙ্গবন্ধুকে অস্বীকার করার কোন সুযোগ বা অবকাশ নেই। ‘যারে দেখতে নারি তার চলন বাঁকা’ এই প্রবাদটির কথা বাদ দিলে আজকে আমরা যারা ‘এই সাব’ ‘সেই সাব’ ‘এই মন্ত্রী’ ‘সেই মন্ত্রী’ ‘এই পতি’ ‘সেই পতি’ ‘সমাজ পতি’ ‘রাষ্ট্রপতি’ ‘এই পদ’ ‘সেই পদ’ যে পদেই আমরা অধিষ্ঠিত হই না কেন, সব কিছুর মূলে কিন্তু মুক্তিযুদ্ধ, বঙ্গবন্ধু আর বঙ্গবন্ধুর সারা জীবনের ত্যাগ-তিতিক্ষা সর্বোপরি বঙ্গবন্ধুর জীবন দান। এটা অস্বীকার করলে আমরা অকৃতজ্ঞ জাতির তকমা পেয়ে যাবো কিনা সেটা ভেবে দেখা জরুরি। সমাজবাদ, পুঁজিবাদ, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ইত্যাদি প্রতিষ্ঠা নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক অবশ্যই থাকবে। কিন্তু মহান মুক্তিযুদ্ধ আর বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে কোন প্রকার বিতর্ক থাকলে বিভেদের রাজনীতির অবসান সুদূরপরাহত থেকেই যাবে। টকশো’র খোরাখ হবে মাত্র। পাকিস্তান থাকলে আমরা কে কোন পদে থাকতাম আসুন সেটা আমরা একবার একটু ভেবে দেখি।
শুরু করেছিলাম আবদুল গাফফার চৌধুরীর ভাষ্যমতে ‘আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মুখে একটি ঐতিহাসিক সত্য’ দিয়ে আর শেষ করতে চাই। বি. চৌধুরী ও জি.এম কাদেরের মুখে একটি ঐতিহাসিক সত্য দিয়ে। আসুন আমরা সবাই সত্যানুসন্ধানে ব্রতী হই। এবং অবশ্যই তা বাংলাদেশের স্বার্থে।
লেখক : মুক্তিযোদ্ধা, কলামিস্ট।

শেয়ার করুন

Developed by:Sparkle IT