উপ সম্পাদকীয়

পুষ্টি-অপুষ্টি প্রসঙ্গ

মো. লোকমান হেকিম প্রকাশিত হয়েছে: ১৯-০৯-২০২০ ইং ০২:৪৮:৩৫ | সংবাদটি ৮৫ বার পঠিত
Image

বাংলাদেশ চিরাচরিতভাবে খাদ্য ঘাটতির দেশ। তবে ইদানীং খাদ্য ঘাটতির অপবাদ অনেকটা ঘুচে গেলেও পুষ্টি ঘাটতির কবল থেকে মুক্তি পায়নি। ক্ষুদ্র ও গরিব বাংলাদেশের হাজারো সমস্যার মধ্যে অন্যতম মারাত্মক জাতীয় সমস্যা হলো অপুষ্টি। গর্ভবতী ও প্রসূতি মহিলাদের বেশিরভাগই রক্তাল্পতায় ভোগে। আয়োডিন নামক খনিজ লবণের অভাবে ঘ্যাগ বা গলাফোলা রোগও দেখা যাচ্ছে। শিশুরা ম্যারাসমাস বা হাড্ডিসার, কোয়াশিয়রকর বা গা ফোলা ও রাতকানা রোগে আক্রান্ত হয়। ভিটামিন-‘এ’র অভাবে এদেশে প্রতিবছর ৩০-৪০ হাজার শিশু একেবারে অন্ধ হয়ে যায়। অত্যন্ত দুঃখের বিষয়, যে বয়সে বাচ্চারা খেলাধূলা করবে, স্কুলে পড়বে সে বয়সে তারা অন্ধত্ববরণ করে পরিবার সমাজের বোঝা হয়ে আবির্ভূত হচ্ছে। দারিদ্র্য ও খাদ্যাভাব অপুষ্টির মূল কারণ বলে অনেকে চালিয়ে দিতে চান। পুষ্টি সম্পর্কে আমাদের সামাজিক কুসংস্কার বা ভুল ধারণা জ্ঞানের অভাবও কম দায়ী নয়। অনেকের ধারণা দামি মাছ, গোশত, দুধ, ডিম, বিদেশী ফল না খেলে স্বাস্থ্য ভাল থাকে না। আসলে তা সম্পূর্ণ ভুল। আমাদের আশেপাশে বা নাগালের মধ্যে এমন অনেক সস্তা খাবার রয়েছে যা খেলে অনেক মারাত্মক রোগ থেকে বাঁচা যায়। উদাহরণস্বরূপ- কচুপাতা সবচেয়ে ক্যারোটিনসমৃদ্ধ যা ভিটামিন-‘এ’র উৎস। অথচ আমাদের দেশে সবচেয়ে অবহেলিত হলো কচুশাক। রোজ ভাতের সাথে সস্তা দামের শাকসবজি খেলে রাতকানা, ঠোঁটের কোণায় ঘা এবং অনেক রোগ থেকে রেহাই পাওয়া যায়।
পারিবারিক খাদ্যের অসম বন্টন যেমন-ডিম,দুধ, মাছ, গোশত, শিশু, গর্ভবতী ও প্রসূতি মহিলাদের প্রয়োজন বেশি থাকা সত্ত্বেও তাদেরকে না দিয়ে পুরুষ বা স্বামীকে বেশি বেশি খাওয়ানোর রীতি অপুষ্টির জন্য অনেকাংশে দায়ী। রন্ধনজনিত জ্ঞানের অভাবেও অনেক পুষ্টির অপচয় হয়ে থাকে। আমাদের সমাজে একটা ধারণা আছে বেশি পুষ্টিকর খাবার খেলে পেটের ভেতরে বাচ্চা বড় হয়ে যাবে এবং প্রসবের সময় কষ্ট হবে। এর বিপরীত ধারণাও আছে। বেশি খেলে পেটে বেশি চাপ পড়বে এবং বাচ্চা বড় হতে পারবে না। মৃগেল মাছ খান না বাচ্চার মৃগী রোগ হবে। বোয়াল মাছ খেলে বাচ্চার মুখ বোয়ালের মত বড় হবে। আবার হাঁসের ডিম বা গোশত খান না কারণ হাঁপানি হবে এবং বাচ্চার গলার ফ্যাঁস ফ্যাঁস আওয়াজ হবে। জোট কলা খেলে যমজ সন্তান হবে, এ ভয়ে জোট কলা খেতে দেয়া হয় না। এসবই কুসংস্কার।
প্রসূতির বেলায় আরও কড়া নিয়ম। জীন-ভূতের আছর হবে এ ভয়ে ৪০ দিন পর্যন্ত বাড়িতে মাছ আনতে দেয়া হয় না। বাচ্চার হাম হবার ভয়ে মাছ, গোশত খেতে দেয়া হয় না। কোন কোন এলাকায় প্রসূতির জন্য ক্ষতিকর মনে করে ডিম, দুধও খেতে দেয়া হয় না। প্রচুর মরিচ বাটা দিয়ে তৈরি খাবার যাকে ‘মরিচ খোলা’ বলা হয় তা ভাতের সাথে খাওয়ানো হয়। চিংড়ি, ইলিশ, কাতলা মাছ, ডাল, শাকসবজি খেলে প্রসূতির দুধ খেয়ে বাচ্চার পেট খারাপ হবে এ ভয়ে খেতে দেয়া হয় না। পুষ্টি জ্ঞানের অভাবে অযথাই মাকে পুষ্টি থেকে বঞ্চিত রাখা হয়। ফলে বাচ্চাও আশানুরূপ দুধ না পেয়ে দুর্বল হয়ে পড়ে। শিশুর জন্মের পর শাল দুধকে পুঁজ বা বিষাক্ত মনে করে শিশুকে খেতে দেন না। শাল দুধ খুবই পুষ্টিকর এবং রোগবালাই থেকে শিশুকে বাঁচায়। তাই বোতলের দুধ খাওয়ানো মস্তবড় ভুল।
আসলে মায়ের দুধের কোন বিকল্প নেই। শিশুকে মুখে ভাত বা অন্ন প্রদান অনুষ্ঠানের জন্য এক বছর বা তারও বেশি দুধ খাওয়ানো হয়। অথচ ৪/৫ মাস বয়স থেকে অন্যান্য খাবার দিতে হয়। আমিষের প্রয়োজন শিশুকে ডাল খাওয়ানো দরকার। কিন্তু পেট খারাপ হবার ভয়ে ডাল দেয়া হয় না। পুষ্টিবিদরা বলেন, সস্তায় ভাল আমিষ চান, ভাতের সাথে ডাল খান। গুড়, চিনি, মিষ্টি আলু খেলে শিশুর ক্রিমি হবে তাই এসব খেতে দেয়া হয় না। এ ধারণা ভুল। গুড়কে চিনির চেয়ে নিকৃষ্ট মনে করা হয়। এটাও ভুল। গুড়ে লৌহ ও ক্যালসিয়াম থাকে যা চিনিতে নেই। অথচ গুড় দামেও সস্তা। তেলের চেয়ে ঘি উৎকৃষ্ট মনে করা হয়। বস্তুত ঘি খুব দামি এবং বেশি খেলে উচ্চ রক্তচাপ এবং হৃদরোগ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তেল বেশি খেলে ক্ষতি নেই এবং দামেও সস্তা। চাল বা ময়দার চেয়ে আটা পুষ্টিকর এবং দামেও সস্তা। সুতরাং ভালমন্দ চেনাটাই হলো বড় কাজ। অনেকে মাছ, গোশত, ডিম একত্রে খান না। এসবের পর দুধ খাওয়া নাকি নিষেধ। অথচ শরীর গঠনের জন্য এসব খুবই দরকার। দুধে লবণ দিলে নাকি বিষ হয়ে যায়। অথচ দুধভাত লবণ বা গুড় কিংবা চিনি মিশিয়ে খাওয়া বরং উপকারী। সুতরাং ভুল সবই ভুল। এমনিতে আমরা আর্থিক অভাব অনটনের কারণে দামি মাছ, গোশত, ডিম, দুধ নিয়মিত খাওয়ার সামর্থ রাখি না। যেটুকু যোগাড় করতে পারি তাও যদি নানা রকম ভুল ধারণা ও কুসংস্কারের বশবর্তী হয়ে হারাম বলে পরিহার করি তাহলে পুষ্টি পাবো কোথা থেকে? তাই আমাদেরকে পুষ্টি জ্ঞান সম্পর্কে সচেতন হতে হবে। তাহলেই কেবল আমরা সুস্থ খাবারের সমন্বয়ে দৈনিক সুষম খাদ্য গ্রহণ করে সুস্থ ও নীরোগ জীবন লাভ করে কর্মঠ ও উচ্চ মেধা শক্তির অধিকারী হয়ে বিশ্বের দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারব। তাই বলা হয়-পুষ্টিহীন আর কম দৃষ্টিহীন- শাকসবজি খাওয়ান প্রতিদিন।
লেখক : কলামিস্ট।

 

শেয়ার করুন

Developed by:Sparkle IT