উপ সম্পাদকীয়

বৈচিত্র্যের সৌন্দর্য

শেখর ভট্টাচার্য প্রকাশিত হয়েছে: ২৩-০৯-২০২০ ইং ০২:৪১:২৪ | সংবাদটি ৬৭১ বার পঠিত
Image

সারা পৃথিবী জুড়ে আপনি এমন কোন মানুষ খুঁজে পাবেন না , যার হাতের ছাপ বা ফিঙ্গার প্রিন্ট অন্য আর একটি মানুষের মতো। এমন দুজন ব্যক্তি পাবেন না যাদের চেহারা হুবহু একই রকম। যমজদের চেহারার মধ্যেও আপনি “ফটোকপি ইমেজ” খুঁজে পাবেন না, কোনভাবেই। এই যে মানুষে মানুষে দৈহিক ভিন্নতা, তা’হলো প্রতিটি মানুষ যে “অনন্য” তাঁর নিদর্শন। এবার আসি মানসিক গঠন এবং চিন্তা শক্তির ভিন্নতা নিয়ে। মানুষের ভাবনা, চিন্তার জগৎ এতো সুন্দর কেনো? মানুষের দৈহিক গঠনের মতো, মানসিক গঠন ও অনন্য। এই অনন্য চিন্তা শক্তি দ্বারা মানুষ অনবরত “মস্তিষ্কে ঝড়” বা ব্রেইন স্টোর্মিং করে নিত্য নতুন ধারণা, নিত্য নুতন আবিষ্কার করে পৃথিবীতে যাদুকরী পরিবর্তন নিয়ে আসছে। এই যে নুতন নুতন ধারণা, আবিষ্কার এর সব কিছুই মানুষের চিন্তা শক্তির ভিন্নতার জন্য। ভিন্নতা যদি না থাকতো তাহলে পৃথিবী কী এতো সুন্দর হতো? সারা পৃথিবীর মানুষ যদি একই রকম ভাবতো তা’ হলে জ্ঞান, বিজ্ঞান, শিক্ষা, সংস্কৃতি কি এ’ভাবে এগিয়ে যেতো?
চিন্তা শক্তির অনন্য সত্ত্বা না থাকলে পৃথিবী স্থবির হয়ে পড়তো। মানুষে মানুষে চিন্তার এ’ ভিন্নতা আছে বলেই প্রতিদিন আমরা বিজ্ঞানের নুতন নুতন আবিষ্কারের খবর পেতে থাকি। সাহিত্য, সংস্কৃতি, দর্শনে নুতন নুতন মতামত পেতে থাকি। চিত্রশিল্পীরা অনিন্দ্য সুন্দর ছবি একে যেতে পারেন। পৃথিবীর প্রতিটি কোণে কবিরা ভিন্ন ভিন্ন বিষয়ে প্রতিদিন কবিতা, গল্প, উপন্যাস উপহার দিয়ে যেতে পারছেন। চিন্তার অনন্যতাই প্রেম ভালোবাসা, দ্রোহ, ভক্তি এ’সব বিষয় নিয়ে মানুষ ভিন্ন স্বাদ, ভিন্ন ভিন্ন মেজাজের হাজার হাজার রকমের সাহিত্য সংস্কৃতির সৃজন করে যাচ্ছে। মানুষের মধ্যে এই অনন্য চিন্তা শক্তি আছে বলেই বিজ্ঞানীরা মনে করেন, সব কিছু হাতের মুঠোতেই চলে এসেছে। প্রতিদিন নব আনন্দে তাঁরা জেগে ওঠেন নুতন কিছু আবিষ্কারের নেশায়। তাঁরা মনে করেন এ’ পর্যন্ত যা আবিষ্কার হয়েছে তা’ থেকে ঢের বেশি বিষয় অনাবিষ্কৃত, তাইতো তাদের জানার ইচ্ছা, নুতন নুতন ভাবনার ইচ্ছাকে তাঁরা দমন করে রাখেন না।
এই যে প্রতিটি মানুষ অনন্য তার এই “অনন্য” সত্বাকে আমাদের শ্রদ্ধা করতে হবে। মানুষই যে পৃথিবীতে একমাত্র “অনন্য” তা’ কিন্তু নয়। আপনি প্রথমত আপনার নিজের এই ছোট দেশটির দিকে তাকান, পার্বত্য অঞ্চলের বন, পাহাড়। তার পাশেই চট্টগ্রাম, কক্সবাজার অঞ্চলে পাহাড়, সমুদ্র পাশা পাশি থেকে কথা বলে। আবার সিলেট অঞ্চলে প্রকৃতি যে কতো ভিন্নতা নিয়ে আমাদের মনের ক্ষুধা মিটায় তা উপলদ্ধি করার জন্য আপনাকে কবি বা দার্শনিক হতে হবেনা, আপনাকে প্রকৃতি প্রেমিক মানুষ হলেই চলবে। সারা দেশের মানুষগুলো বিভিন্ন ঋতুতে প্রকৃতির কাছে ছুটে যায়, হৃদয় দিয়ে প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য উপভোগ করে। ছোট এই বাংলাদেশে ভিন্ন ভিন্ন এলাকার ভিন্ন ভিন্ন প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে মানুষ উন্মন হয়ে পড়ে। এখন বিশ্ব চরাচরের সাতটি মহাদেশের ভিন্ন এলাকার অনন্য সৌন্দর্যের কথা ভাবুন। কী বিস্ময়কর মনে হয় সবকিছু।
সামাজিক বৈচিত্র্য বা সোশ্যাল ডাইভার্সিটি নিয়ে আমাদের বিজ্ঞজনেরা আলোচনা করেন খুব কম এবং বৈচিত্রের গুরুত্ব নিয়ে লেখালেখি করেন তার চেয়েও কম। আমাদের দেশে স্কুল পর্যায়ে ক্ষুদ্র নৃ গোষ্ঠীর জীবন ধারণ সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে, তাদের জীবনাচার এবং সংস্কৃতি যে বৈচিত্র্যময় এই তথ্যটুকুই শিক্ষার্থীদের প্রদান করা হয়ে থাকে। তথ্যের সাথে কোন কোন গোষ্ঠীর বিশেষ দিন উদযাপনের হাতে আঁকা একটি ছবি দিয়ে সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যকে উপস্থাপন করা হয়। তথ্য ও ছবি থেকে তাদের সঙ্গীত ও শিল্পকলা খুব আকর্ষণীয় এরকম একটি ধারণা নিয়ে শিক্ষার্থীরা বেড়ে উঠে এবং শিক্ষার্থীদের অবচেতন মনে সামিজিক বৈচিত্রের এরকম অগভীর ধারণাই চিরদিন থেকে যায়।
বৈচিত্র্যে কে শ্রদ্ধা করতে না জানলে আপনি উদার এবং প্রকৃত আধুনিক মানুষ হতে পারবেন না। আমাদের দেশে যখন বিদেশী কোন মান্যগন্য অতিথি আসেন তাঁদেরকে, সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য প্রদর্শনের জন্য আমরা আমাদের ক্ষুদ্র নৃ গোষ্ঠীর নৃত্য, গীত জীবন আচরণের বিষয়টি নানাভাবে তুলে ধরি। আমাদের উন্নত সংস্কৃতির ভান্ডার আছে তা প্রদর্শনের জন্য বিদেশে যখন সাংস্কৃতিক দল পাঠানো হয় তখন আমরা জনসংখ্যার সবচেয়ে ক্ষুদ্রতম অংশের সংস্কৃতিকে তুলে ধরি। এই তুলে ধরার মধ্যে সম্মান, শ্রদ্ধা কিংবা তাদের জনগোষ্ঠীর প্রতি ভালোবাসা কতোটুকু থাকে তা’বলা খুব কঠিন। বৈচিত্র্যকে গ্রহণের মধ্যে একটি জাতি শুধুমাত্র সুসভ্য হয়েই উঠেনা, জাতীয় উন্নয়নে বৈচিত্র্যময় অনন্য মানুষগুলোর অপার সম্ভাবনাকে ও কাজে লাগাতে পারে।
আজকের উন্নত আমেরিকাকে কিন্তু গড়ে তুলেছে অভিভাবাসিরা। সারা বিশ্বের বিভিন্ন কোণের মানুষকে আমেরিকা অভিবাসি হিসাবে সম্মানের সাথে গ্রহণ করেছে। অভিভাসিদের অনন্য মেধাকে স্বীকৃতি দিয়েছে, সেই সম্ভাবনাময় মেধাকে বিকাশের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করে দিয়েছে। আমরা অনেক সময় বলে থাকি আমেরিকানরা ব্রেনড্রেন করে তাদের নিজেদের উন্নত করেছে। শুধু আমেরিকা কেনো ইউরোপের যে কোন দেশ সম্ভাবনাময় অভিবাসিদের আমন্ত্রণ জানায়। আমার প্রশ্ন হলো আপনি যদি আপনার সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে না পারেন, আপনার মেধা লালনের অভাবে যদি তার অপচয় কিংবা বিনাশ ঘটে তাহলে অন্য দেশ সেই মেধাকে কাজে লাগালে সমস্যা কোথায়?
বিশ্ব বিখ্যাত বাঙালী স্থপতি ও পুরকৌশলী ফজলুর রহমান খানের কথা ভাবুন। ফজলুর রহমান খান মাদারীপুরে জন্ম নেয়া মানুষ, ঢাকার আর্মানিটোলা স্কুলে পড়েছেন। তাকে বিংশ শতকের শ্রেষ্ঠ প্রকৌশলী বলা হয়। পৃথিবীর অন্যতম উচ্চভবন শিকাগোর সিয়ার্স টাওয়ার (বর্তমানে উইওলস টাওয়ার)-এর নকশা প্রণয়ন করেছেন তিনি। এ’ ছাড়া ও তিনি তাঁর স্থাপত্য ও প্রকৌশল জ্ঞান দিয়ে সারা পৃথিবীতে নমস্য ব্যক্তিতে পরিণত হতে পেরেছেন। আমেরিকান স্থপতি ও প্রকৌশলীরা তার অবদানকে এখনও কাজে লাগান এবং শ্রদ্ধার সাথে তাঁকে স্মরণ করে থাকেন। ধর্ম, বর্ণ, গোত্র নির্বিশেষে পৃথিবীর সকল মানুষের মধ্যে অপার সম্ভাবনা লুকিয়ে আছে, এই বিষয়টি উন্নত বিশ্বের দেশগুলো মনে প্রাণে বিশ্বাস করে বলে তাঁরা সকল সম্ভাবনাকে একসাথে জড়ো করে জ্ঞান ভিত্তিক সমাজ গড়ে তুলতে পেরেছে।
জাতি হিসাবে কি আমরা বৈচিত্র্য কে অপছন্দ করি? আমাদের সাহিত্যে ও সংস্কৃতির ঐতিহ্য অনুসন্ধান করলে কিন্তু ভিন্ন চিত্র পাওয়া যায়। আমাদের জাতীয় কবি কিন্তু আমাদের সাহিত্য কে বৈচিত্র্যময় ও সমৃদ্ধ করেছেন প্রচুর বিদেশী শব্দ তাঁর কবিতা ও গানে যথাযথ আত্মীকরণের মাধ্যমে। রবীন্দ্রনাথ যে কতো দেশের সুর তাঁর সঙ্গীতে ব্যাবহার করে সঙ্গীতকেই শুধু সমৃদ্ধ করেননি, বাংলা সঙ্গীতে অনেক বৈচিত্র্যময়তার স্বাদ এনে দিয়েছেন। বড়ু চণ্ডীদাস থেকে শুরু করে আধুনিক ও উত্তরাধুনিক বাংলা সাহিত্যিকেরা বিশ্ব চরাচরের বৈচিত্র্যময়তা খুজে বেড়িয়েছেন অবিরত।
সম্প্রতি আমাদের দেশে একটি ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়াতে দেখা যাচ্ছে, যেখানে বোরকা পরিহিত একজন মা, তার সন্তানের সাথে ক্রিকেট খেলছেন। এই ছবি দেখে অনাধুনিক, পিছিয়েপড়া, বৈচিত্র্যময়তা সম্পর্কে অপর্যাপ্ত ধারণা সম্বলিত মানুষেরা, অনাকাংখিত মন্তব্য করে সোশ্যাল মিডিয়া সয়লাব করে দিচ্ছেন। মানুষের চলার, বলার, পোষাক পছন্দের ধারণা সম্পর্কে তাদের মানসিকতার দীনতা দেখে হতাশ হলাম। আমাদের মধ্যে মানুষের অনন্য সত্ত্বা, ব্যক্তির পছন্দ, ব্যক্তির নিজস্ব বিশ্বাসের প্রতি সম্মান দেখানোর শিক্ষা না থাকায় আমরা নির্বিবাদে এরকম মন্তব্য করে যাচ্ছি। একজন মা, বোরখা পরে তার সন্তানের সাথে ক্রিকেট খেলছেন, আমার কাছে এটি একটি অনন্য সুন্দর দৃশ্য। মা ক্রিকেট খেলছেন সন্তানের সাথে এরকম একটি অপার্থিব দৃশ্য আমি দেখতে পেলাম আমার অর্জিত শিক্ষা দিয়ে। সেই মা কী বোরকা পরিহিত, তাঁর কপালে কি সিঁদুরের ফোটা, কিংবা তিনি কি আমাদের মনিপুরি, খাসিয়া সম্প্রদায়ের পোষাক পরিহিত আমার কাছে তা’ মোটেই মুখ্য বিষয় নয়। মানুষকে সম্মান, ধর্মকে সম্মান, মানুষের জীবনাচরণকে সম্মান, মানুষের সংস্কৃতিকে সম্মান হলো বৈচিত্র্যময়তার সৌন্দর্যকেই সম্মান করা। এই বিষয়টি যারা বুঝেন না তাদের জন্য আমার করুণা হয়।
আমাদের সমাজের সকল বঞ্চিত ও প্রান্তিক মানুষ, সংখ্যালঘু কিংবা সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়ভুক্ত হতে পারেন, শারীরিক, মানসিক ভাবে যারা প্রতিবন্ধকতা নিয়ে জীবন গড়ার সংগ্রাম করছেন, তৃতীয় লিঙ্গের মতো বিশেষ সম্প্রদায়, দলিতদের মত অচ্ছুৎ সম্প্রদায়, চা বাগান শ্রমিকদের মত মানবেতর জীবন যাপনকারী, সকল মানুষের সকল সম্ভাবনাকে নিয়ে যদি আমরা এগিয়ে যাই, উন্নত মূল্যবোধ সম্পন্ন সভ্য জাতি হিসাবে বিশ্বসমাজে পরিচিত হতে মনে হয় আমাদের বেগ পেতে হবে না। স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর পূর্তির পূর্বে আমরা কি এরকম চ্যালেঞ্জ নিতে পারি না? শতভাগ অর্জন হয়তো দুরূহ, কিন্তু বৈচিত্রের সৌন্দর্য ও শক্তিকে অনেক বলীয়ান করা সম্ভব হবে। পদযাত্রা শুরু করতে হবে আমাদের, না হলে হয়তো আমাদের চিন্তাশীল, প্রজ্ঞাবান মানুষেদের আর্তনাদের সুরে বার বার আহ্বান জানাতে হবে, “মানুষ তুমি মানুষ হও। আমরা কি “কালের যাত্রার ধ্বনি” শুনতে পাচ্ছি?
লেখক : কলামিস্ট।

শেয়ার করুন

ফেসবুকে সিলেটের ডাক

Image

Developed by:Sparkle IT