উপ সম্পাদকীয়

সুনামগঞ্জের তিন কৃতি ব্যক্তিত্বের মৃত্যুতে

হোসেন তওফিক চৌধুরী প্রকাশিত হয়েছে: ২৪-০৯-২০২০ ইং ১৪:৪৭:০০ | সংবাদটি ৯৭ বার পঠিত
Image

সারা বিশ্বেই এখন অভূতপূর্ব ক্রান্তিকাল চলছে। সর্বত্র মৃত্যুর মহড়া। এই দুঃসময়ে মানুষ যেন সহমর্মিতা ও সামাজিকতা থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। সর্বত্রই এক অজানা আতংক বিরাজ করছে। মানুষ যেন মনুষত্ববোধ হারিয়ে ফেলেছে। মানুষ এখন নিজের আপনজনের মৃত্যু ও অসুস্থতায় আগের মত সাড়া দিচ্ছে না, পাশ কাটিয়ে চলছে। জানিনা এর ভবিষ্যৎ কী। আমরা অজানা গন্তব্যের দিকে ধীরে ধীরে এগিয়ে চলেছি।
সম্প্রতি সুনামগঞ্জের ৩ জন কৃতি ব্যক্তিত্ব আমাদের ছেড়ে না ফেরার দেশে চলে গেছেন। একজন হচ্ছেন সুনামগঞ্জ সরকারী কলেজের সাবেক উপাধ্যক্ষ প্রফেসার আব্দুল বারী। অপর দুইজন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের সাবেক যুগ্ম সচিব ইফতেখার আহমদ ও আব্দুর রশিদ চৌধুরী। এই ৩ জনই সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার কৃতি সন্তান ছিলেন। এদের প্রথম ২ জনই সুনামগঞ্জ সরকারী জুবিলী উচ্চবিদ্যালয় এবং সুনামগঞ্জ কলেজের ছাত্র। আবার এই ৩ জনই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহাসিক ছাত্রাবাস সলিমুল্লা মুসলিম হলের আবাসিক ছাত্র ছিলেন। তাঁরা স্ব-স্ব কর্মক্ষেত্রে বিখ্যাত হয়েছেন এবং সুনাম অর্জন করে মানুষের শ্রদ্ধা ভালবাসা পেয়েছেন।
আব্দুল বারী সুনামগঞ্জ সদরের নিলপুর বাজারের লাগোয়া রাবার বাড়ী গ্রাম নিবাসী। তিনি সুনামগঞ্জ সরকারী জুবিলী উচ্চবিদ্যালয় এবং সুনামগঞ্জ কলেজে লেখাপড়া করেন। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাস বিভাগে ভর্তি হয়ে এম.এ ডিগ্রি লাভ করেন। তিনি সুনামগঞ্জ কলেজের প্রভাষক হিসাবে ১৯৭৭ সালের দিকে যোগদান করেন যোগ্যতার সাথে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি কলেজের উপাধ্যক্ষ হিসাবে উন্নীত হন এবং এরপর থেকেই অবসর লাভ করেন। অবসরের পর তিনি সুনামগঞ্জ পৌর কলেজের অধ্যক্ষ হিসাবে দীর্ঘ ৬ বছর দায়িত্ব পালন করেন। তিনি একজন নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষক ছিলেন। তাঁর চালচলন, চলাফেরা এবং আচার-আচরণ ছিল অত্যন্ত মনোমুগ্ধকর। তিনি অত্যন্ত সহজ, সরল জীবন যাপন করতেন। কখনও দাম্ভিকতা বা কালিমা তাকে স্পর্শ করতে পারেনি। তিনি অবসর জীবনে গ্রামের বাড়ীতে বাস করে সমাজ কর্মে লিপ্ত হন। এ জন্য তাকে এলাকার মানুষ অত্যন্ত শ্রদ্ধা ও ভালোবাসত। মানুষের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় দীর্ঘদিন তিনি মানুষের অন্তরে জীবিত থাকবেন।
ইফতেখার আহমদ সুনামগঞ্জের ইব্রাহিমপুর নিবাসী প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ আলী ফরিদ আহমেদের ২য় পুত্র। সে ছোট বেলায় টুটুল নামে পরিচিত ছিল। তাঁর পিতা আলী ফরিদ আহমদ সুনামগঞ্জ সরকারী জুবিলী উচ্চবিদ্যালয় এবং ফরিদপুরের ভাঙ্গা হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক ছিলেন। ইফতেখার আহমদ সরকারী জুবিলী উচ্চবিদ্যালয়ের ছাত্র ছিল। তাঁর পিতা ভাঙ্গায় বদলী হলে সে ভাঙ্গায় চলে যায়। সেখান থেকেই সে এস.এস.সি পাশ করে। আলী ফরিদ সাহেব অবসরে গেলে সুনামগঞ্জ কলেজে ভর্তি হয়। ইংরেজী ভাষায় তাঁর অসাধারণ দক্ষতা ছিল। সে ইংরেজীতে ক্রিকেট খেলার ধারা বিবরণী পেশ করত সে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনার্স সহ এম.এ পাশ করে এবং বি.সি.এস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে সরকারী চাকুরীতে যোগদান করে। সে ফেনী, রাজশাহী এবং খুলনায় জেলা প্রশাসক হিসাবে দায়িত্ব পালন করে। চাকুরী জীবন শেষে সে একটি এনজিওর উপদেষ্টা হিসাবে নিযুক্ত ছিল। সে তাঁর পিতার স্মৃতি রক্ষার্থে সুনামগঞ্জের ষোলঘরে আলী ফরিদ একাডেমি স্থাপন করে।
আব্দুর রশিদ চৌধুরী সুনামগঞ্জ উপজেলার আহমদাবাদ (আন্দাবাজ) গ্রামের অধিবাসী। তিনিও সুনামগঞ্জ বুলচান্দ উচ্চবিদ্যালয় এবং সুনামগঞ্জ কলেজের ছাত্র ছিলেন। এম.এ ডিগ্রি নেওয়ার পর তিনি ইউনাইটেড ব্যাংকের চাকুরীতে যোগদান করেন। পরে চাকুরী ছেড়ে দিয়ে প্রিন্টিং ব্যবসায় আত্মনিয়োগ করেন। তিনি ঢাকাস্থ জালালাবাদ সমিতির সাধারণ সম্পাদক হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ঢাকা থেকে ঢাকা ডাইজেস্ট নামে একটি উন্নতমানের সাময়িকী সম্পাদনা করেন। তিনি ইসলামি ব্যাংকের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ও ডাইরেক্টর ছিলেন।
এই ৩ জন কৃতি ব্যক্তিত্বের সাথে আমিও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সলিমুল্লা হলের আবাসিক ছাত্র ছিলাম। আব্দুল বারী এবং ইফতেখার আহমদ আমার অনুজ হাসান শাহরিয়ারের সতীর্থ। আব্দুর রশিদ চৌধুরী ও আমি একসাথে এম.এ ডিগ্রি লাভ করি। এদের প্রত্যেকের সাথেই আমার ব্যক্তিগত সম্পর্ক ও স্মৃতি আছে।
সম্প্রতি এরা ৩ জনই না ফেরার দেশে চলে গেছেন। তাঁদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করি এবং রূহের মাগফিরাত কামনা করি। মানুষের শ্রদ্ধা ভালোবাসায় মানুষের অন্তরে তাঁদের স্মৃতি জাগরুক থাকবে। আল্লাহ তাঁদের জান্নাত দান করুক। আমি এ দোয়া করি।
লেখক : আইনজীবী, কলামিস্ট।

শেয়ার করুন

ফেসবুকে সিলেটের ডাক

Image

Developed by:Sparkle IT