উপ সম্পাদকীয়

অসহায় শ্রমিকদের দিকে তাকান

হাকিম কানুলাল পাল প্রকাশিত হয়েছে: ২৫-০৯-২০২০ ইং ০২:০৩:৫৯ | সংবাদটি ১২৩ বার পঠিত
Image

আমাদের দেশে অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে কাজ করা শ্রমিকদের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশই দৈনিক মজুরির ভিত্তিতে কাজ করে থাকেন। তাদের যেমন কোনো মাসিক বেতন থাকে না, তেমনি থাকে না কোনো নিয়োগপত্র বা কাজের চুক্তিপত্রও। এই কারণে কর্মক্ষেত্রে সুরক্ষা কিংবা জীবিকার নিশ্চয়তাও নেই তাদের। সারা দেশের অকৃষি খাতে দৈনিক মজুরির ভিত্তিতে কাজ করা এমন শ্রমিকদের একটা বড় অংশই নির্মাণ শ্রমিক। রাজমিস্ত্রি, রডমিস্ত্রি, রংমিস্ত্রি, ওয়েল্ডিং মিস্ত্রি, ইলেকট্রিক মিস্ত্রি, টাইলস, গ্রিলসহ এ ধরনের ১১টি পেশায় নিযুক্ত শ্রমিকদেরই সাধারণভাবে নির্মাণ শ্রমিক বলা হয়ে থাকে। শ্রম গবেষণা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের (বিলস) ২০১৭ সালের জরিপ অনুযায়ী, দেশে নির্মাণশ্রমিকের সংখ্যা প্রায় ৪০ লাখ। আর ইমারত নির্মাণ শ্রমিক ইউনিয়ন বাংলাদেশের (ইনসাব) হিসাবে এই সংখ্যা ৩৫ লাখ। একজন নির্মাণ শ্রমিকের পরিবারে গড়ে চারজন করে সদস্য থাকলে প্রায় ১ কোটি ৪০ লাখ মানুষ সরাসরি নির্মাণ শ্রমিকদের আয়ের ওপর নির্ভরশীল। করোনাকালের সাধারণ ছুটিতে লাগাতার লকডাউন পরিস্থিতিতে আবাসন খাতসহ সব ধরনের নির্মাণকাজ বন্ধ থাকায় আয় রোজগার হারিয়ে অসহায় হয়ে পড়েন লাখ লাখ নির্মাণশ্রমিক। এখনো নির্মাণকাজে স্বাভাবিকতা না ফেরায় এই শ্রমিকরা যেমন জীবিকার সংকটে রয়েছেন, তেমনি বিগত কয়েক মাসের বেকারত্বে সংসারের চুলা জ্বালাতে চড়া সুদে এনজিও আর মহাজনী ঋণ নিয়ে ধারদেনায় জর্জরিত হয়ে পড়েছেন নির্মাণশ্রমিকরা।
একটি প্রতিবেদনে বলা হয় করোনাভাইরাসের মহামারীর কালে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বড় বড় শহর-বন্দরগুলোতে বিগত প্রায় পাঁচ মাস বন্ধ ছিল নির্মাণকাজ। এই সময়ে কোনো কাজ না থাকায় জীবিকার সংকটে থাকা শ্রমিকদের একটা বড় অংশই সংসার চালাতে চড়া সুদে স্থানীয় মহাজন, এনজিও ও স্বজনদের থেকে ২০ থেকে ৮০ হাজার টাকা পর্যন্ত ঋণ করেছেন। কাজ না থাকায় অনেক নির্মাণশ্রমিকই গ্রামে ফিরে যান। কিন্তু কৃষিকাজের অভিজ্ঞতা না থাকা কিংবা গ্রামেও কোনো কাজ না পাওয়ায় একপ্রকার বেকারই থাকতে হয়েছে তাদের। অনেক শ্রমিক জানিয়েছেন, গরু-ছাগল, হাঁস-মুরগিও বিক্রি করা থেকে নানা কাজ করেছেন তারা। আর জনপ্রতিনিধিদের দ্বারে দ্বারে ঘুরেও সরকারি কোনো সহায়তা মেলেনি তাদের।
নির্মাণ শ্রমিকদের নিয়ে সরাসরি কাজ করেন এমন সংগঠনগুলো বলছে, করোনা সংক্রমণের শুরুতে সরকার বিভিন্ন খাতের শ্রমিকদের জন্য প্রণোদনার ঘোষণা দিলেও নির্মাণশিল্পের শ্রমিকরা উপেক্ষিতই থেকে গেছে। এমনকি দরিদ্রদের সুরক্ষায় প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত ৫০ লাখ পরিবারের জন্য ঈদ উপহারের অর্থও পাননি বেশিরভাগ নির্মাণশ্রমিক। এই বিষয়টি খেয়াল করা জরুরি যে, দেশের বিদ্যমান বাস্তবতায় এমনিতেই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করতে হয় নির্মাণ শ্রমিকদের। কর্মক্ষেত্র বা নির্মাণস্থলে নানা দুর্ঘটনায় প্রতিনিয়তই নির্মাণ শ্রমিকদের অঙ্গহানি ঘটছে, কেউ চিরতরে পঙ্গু হয়ে যাচ্ছেন, কেউ অকালমৃত্যুর শিকার হয়ে এ ধরাধাম থেকে বিদায় নিচ্ছেন। শ্রমিকদের নিয়ে কাজ করেন এমন সংস্থাগুলোর হিসাব মতে, নির্মাণকাজে দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে ১৫ শতাংশ শ্রমিক মারা যান নির্মাণস্থলে উঁচু থেকে নিচে পড়ে, ৭-৮ শতাংশ শ্রমিক মারা যান আগুনে পুড়ে ও চোখে আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে এবং প্রায় ৪০ শতাংশ শ্রমিক দুর্ঘটনায় হাত-পা কেটে যাওয়া, আঙুল কেটে পড়ে যাওয়া বা এমন নানামাত্রার অঙ্গহানির শিকার হয়ে থাকেন। স্বাভাবিক সময়েও নিরাপত্তাহীনতায় থাকা এসব নির্মাণশ্রমিক এখন করোনাকালে জীবিকা হারিয়ে মারাত্মক সংকটে। এদের আর্থিক সুরক্ষা দিয়ে দেশের বিকাশমান নির্মাণ খাতের অগ্রযাত্রা ধরে রাখতে সরকারসহ সংশ্লিষ্ট সব শিল্পপ্রতিষ্ঠানেরই এগিয়ে আসা উচিত।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য মতে, বাংলাদেশে মোট শ্রমশক্তির পরিমাণ ৫ কোটি ৬৭ লাখ। এই শ্রমশক্তির মধ্যে ৮৭ দশমিক ৫ শতাংশই অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে আর মাত্র ১২ দশমিক ৫ শতাংশ প্রাতিষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত। সব মিলিয়ে অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত শ্রমিকের সংখ্যা ৪ কোটি ৭৩ লাখ আর প্রাতিষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত ৬৮ লাখ। যাদের মধ্যে ৩৫ থেকে ৪০ লাখই নির্মাণশ্রমিক। অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতকে ক্রমান্বয়ে প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে নিয়ে আসা প্রয়োজন। আর সেক্ষেত্রে অবশ্যই সরকারের দায়িত্ব রয়েছে। নির্মাণ শ্রমিকদের নিয়ে কাজ করা ইমারত নির্মাণ শ্রমিক ইউনিয়ন বাংলাদেশ-এর (ইনসাব) মতে, প্রায় ৭০ ভাগ নির্মাণ শ্রমিক দৈনিক উপার্জনের ওপর নির্ভরশীল। করোনাকালে এদের অন্তত ৭০ ভাগই এনজিও বা মহাজনী ঋণ নিয়ে কোনোরকমে টিকে থাকার চেষ্টা করছেন। কিন্তু সরকারি সহায়তা কর্মসূচির বাইরে থাকায় তাদের অবস্থা খুবই শোচনীয়। এমতাবস্থায় সুনির্দিষ্ট প্রণোদনা ঘোষণা করে সংশ্লিষ্ট শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে সঙ্গে নিয়ে নির্মাণ শ্রমিকদের এই মানবেতর পরিস্থিতি থেকে উদ্ধার করার দায়িত্ব নিতে হবে সরকারকে। শ্রমিকদের কথা সবার আগে ভাবতে হবে। শ্রমিকদের জীবনমান উন্নত সমৃদ্ধ করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। শ্রমিকরা বাঁচলে দেশ ও জাতি বাঁচবে। সুতরাং শ্রমিকদের দিকে রাষ্ট্র ও সমাজের দৃষ্টি দেওয়া জরুরি দরকার। তা হলেই বাঁচবে প্রাণ।
লেখক : কলামিস্ট।

শেয়ার করুন

Developed by:Sparkle IT