উপ সম্পাদকীয়

অনিশ্চয়তার দোলাচলে

বেলাল আহমদ চৌধুরী প্রকাশিত হয়েছে: ১৬-১০-২০২০ ইং ০৯:৫২:৩৪ | সংবাদটি ৫৮ বার পঠিত
Image

কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জীবন সায়াহ্নে রচিত কাব্যগ্রন্থ ‘রূপ নারাণের কূলে’ কবিতার বিখ্যাত কয়টি লাইন নিজের মতো করে বলেছিলেন। সেটি হচ্ছে, ‘সত্য যে কঠিন/ কঠিনেরে ভালোবাসিলাম/- সে কখনো করে না বঞ্চনা’। বাংলাদেশের অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল ২০২০-২০২১ অর্থবছরের বাজেট ঘোষণাকালে বলেছেন, ‘সত্য যে বড় কঠিন/ তাই সব জেনেশুনে আমরা এই কঠিনকেই ভালোবেসেছি।’ অর্থমন্ত্রী ঠিকই বলেছেন, বিশ্বব্যাপী মহামারি সৃষ্টিকারী কোভিড-১৯-এর প্রভাবে রাষ্ট্রের আয় ও ব্যয় উভয়ই প্রত্যাশিত মাত্রার চেয়ে উল্লেখযোগ্য হারে কম হবে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) মনে করে ৩০ দশকের পরে সবচেয়ে বড় মন্দার মুখোমুখি এখন বিশ্ব। ১৯২৯ সালে শুরু হওয়া সেই মহামন্দার উৎপত্তি যুক্তরাষ্ট্র থেকে শেয়ার বাজারের পতনের হাত ধরে। সে সময় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ছিলেন হারবার্ট ক্লার্ক ওভার। তিনি দেশের ৩১তম প্রেসিডেন্ট ছিলেন। শেয়ার বাজারের পতন ঘটে ২৪ অক্টোবর। সেই দিনকে আজও কালো মঙ্গলবার বলা হয়ে থাকে।
কোভিড-১৯ বিশ্বব্যাপী যে মহামন্দা নিয়ে এসেছে তাতে বাংলাদেশ ইতিমধ্যে আক্রান্ত। দেশের অর্থনীতি স্থবির, আমদানী রফতানী হ্রাস পাচ্ছে, বেসরকারি বিনিয়োগের অবস্থা তথৈবচ। কর্মসংস্থান ক্রমশ: সংকুচিত হচ্ছে। কর্মচ্যুতি ঘটছে দ্রুতলয়ে, রেমিটেন্সের পারদ নিম্নমুখী। নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম বাড়ছে। জুন মাসে মূল্যস্ফীতি ৬ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে। যুগপৎ করোনাঘাত এবং বন্যার থাবায় মানুষের ভোগান্তি ও দুর্দশা চরমে পৌঁছেছে। অন্যদিকে অভিবাসী শ্রমিক কর্মচ্যুত হয়ে দেশে ফিরছেন সেই সাথে দেশের অভ্যন্তরে বেকারত্ব বাড়ছে দ্রুতলয়ে। জাতীয় জীবনে আজ হতাশার ক্যানভাসে অনিশ্চয়তার ছায়া।
২০২১ অর্থ বছরে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছিল ৮ দশমিক ২ শতাংশ। কিন্তু বিধিবাম। সর্বনাশা কোভিড-১৯ দেশের অর্থনীতিকে শ্লথ করে দিচ্ছে। কোভিড-১৯ বিশ্বব্যাপী যে অর্থনৈতিক মন্দার সৃষ্টি করেছে তা থেকে প্রচলিত ধারায় অর্থনীতির সূচক ধরে রাখা কোন দেশের জন্য সহজ হবে না। বিগত তিন দশকের অর্থনৈতিক সংকট সৃষ্টি হয়েছিল মূলত মুদ্রানীতিকে ঘিরে। কিন্তু কোভিড-১৯ সারা দুনিয়ার মানুষের জীবন ও জীবিকাসহ পর্যটন, এয়ার লাইন্স, ক্ষুদ্র শিল্প থেকে বৃহৎ শিল্পকে মারাত্মকভাবে ব্যহত করছে। অনানুষ্ঠানিক খাতে মরণদশা। পরিসংখ্যান ব্যুরো বলছে- ৮৬ শতাংশের ওপরে অর্থাৎ ছয় কোটি মানুষ অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে নিযুক্ত। জিডিপিতে এখাতের অবদান ৪০ শতাংশ। কৃষিখাতে ২ কোটি ৩৮ লক্ষেরও বেশি কৃষি কর্মী নিযুক্ত। শিল্প ও সেবা খাতে যথাক্রমে ১ কোটি ১১ লক্ষ ৬৮ হাজার এবং ১ কোটি ৭০ লক্ষ শ্রমিক নিযুক্ত। যারা দিন এনে দিন খান। তাদের কোন সঞ্চয় নেই।
নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ জোসেফ স্টিগলিজের মতে এবারের সংকটটি আর পাঁচটি সাধারণ অর্থনৈতিক সংকটের মতো নয়। এটি নির্দিষ্ট সময়ের একটি অর্থনীতির জন্য পণ্য ও সেবার পরিমাণ নির্ধারণের বিষয় নয়। এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, যারা সংকটের মুখোমুখি হতে যাচ্ছেন তাদের জন্য সামনে আমাদের বিপুল পরিমাণ অর্থের প্রয়োজন হবে। এটাকে আপনি হেলিকপ্টার মানি (কেন্দ্রীয় ব্যাংক যখন সরাসরি ব্যক্তিকে টাকা দিয়ে থাকে) বলতে পারেন।
একটি সমীক্ষা থেকে জানা যায় যে, মোট জনসংখ্যার ৬০ শতাংশই মধ্য ও নিম্নমধ্যবিত্ত। করোনা অভিঘাত দারিদ্র্যকে চরম দারিদ্র্য, মধ্যবিত্তকে নিম্নমধ্যবিত্ত এবং নিম্নবিত্তকে অতি দারিদ্র্যে রূপান্তরিত করছে। কোভিড-১৯ জনিত মহামন্দা দ্রুত কাটিয়ে উঠতে হলে সরকারকে সব শ্রেণী পেশার মানুষকে নগদ আয় সহায়তা দিয়ে অর্থনীতির চাকা সচল করতে কর্মসৃষ্টি করতে বাস্তব সম্মত পরিকল্পনা নিতে হবে। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিডিপি) বলছে- করোনার কারণে দারিদ্র্য বেড়ে ৩৫ শতাংশ হয়েছে।
গত এপ্রিল মাসে করা এক যৌথ সমীক্ষায় পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) এবং ব্র্যাক ইনস্টিটিউট গর্ভন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (বিআইডিজি) বলেছে মোট জনগোষ্ঠীর ৪৩ শতাংশ দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে গেছে। এই দরিদ্র জনগোষ্ঠীর সংখ্যা প্রায় সাত কোটি। গত জুন মাসে বিশ্বব্যাংক বলছে করোনার কারণে এ বছর ৭ থেকে ১০ কোটি মানুষ হতদরিদ্র হয়ে পড়বেন।
পরিস্থিতি কবে নাগাদ স্বাভাবিক হবে তা মানুষের জ্ঞানের বাইরে আজও রয়ে গেছে। ক্রমাবনতিশীল অর্থনীতির কষাঘাতে জীবন ও জীবিকা পর্যদস্থ হয়ে পড়েছে। বিরাজমান পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্য ও সেবা এবং কৃষিখাতে স্থায়িত্ব বজায় রাখার জন্য মধ্য মেয়াদী পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। মোট দেশজ উৎপাদনের জিডিপি (জিডিপি) অনুপাতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর আশঙ্কা মতে শীতে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ মোকাবেলার জন্য স্বাস্থ্য ও কৃষিখাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি সহ সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা ঢেলে সাজাতে হবে। প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি করতে হবে। উদ্ভাবনী উপায়ে সম্পদের জোগান বৃদ্ধির ব্যবস্থা নিতে হবে। সর্বজনের জীবনের নিরাপত্তা ও সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্য নগদ অর্থ সহায়তা দিয়ে অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে হবে। তাছাড়া অভিন্ন অগ্রগতি আসতে পারে নারীপুরুষ নির্বিশেষে সকল মানুষকে পরিপূর্ণভাবে দক্ষ হয়ে ওঠার সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে।
পরিশেষে বলতে চাই- সর্বনাশা বৈশ্বিক কোভিড-১৯ চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় স্বপ্ন ও সম্ভাবনা সৃষ্টিতে অপরিহার্য ভিত্তি হলো অর্থনৈতিক স্বচ্ছতা।
লেখক : কলামিস্ট।

 

শেয়ার করুন

ফেসবুকে সিলেটের ডাক

Image

Developed by:Sparkle IT