উপ সম্পাদকীয়

দারিদ্র্য বিমোচনের চ্যালেঞ্জ

এএইচএম ফিরোজ আলী প্রকাশিত হয়েছে: ১৭-১০-২০২০ ইং ০৩:২৭:৪২ | সংবাদটি ৪৩ বার পঠিত
Image

স্বাধীনতার পর রিক্ত হস্তে যাত্রা শুরু করেছিল স্বাধীন বাংলাদেশের অর্থনীতি। দেশ ছিল বিরান ভূমি। মানুষের পেটে ছিল না ভাত, গায়ে ছিল না কাপড়। রাজকোষ ছিল প্রায় শূন্য। পাক হানাদার বাহিনী নিশ্চিত পরাজয় জেনে সব ধ্বংস করে দিয়েছিল। স্বাধীনতার আগে ও পরে অভাবী মানুষের চোখে ছিল শুধু কান্না, অপুষ্টিতে মানুষের দেহ ছিল কঙ্কাল। সেই বাংলাদেশ আজ বিশ্বে উন্নয়নের রোল মডেল। তলাবিহীন ঝুড়ির দেশ এখন দক্ষিণ এশিয়ার ইমাজিং টাইগার। স্বাধীনতার পর বলা হয়েছিল, বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জন করলেও টিকিয়ে রাখা সম্ভব হবে না। সে সময়ের বিশ্বব্যাংকের দুই অর্থনীতিবিদ ফ্যালান্ড ও পার্কিনসন বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশের যদি উন্নয়ন হয়, তাহলে যেকোন দেশই উন্নতি করতে পারবে’। যে পাকিস্তান, এ ভূখন্ড ২৩ বছর শাসন-শোষণ করেছে, তারা এখন অবাক নয়নে বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা দেখছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও সামাজিক উন্নয়নের অনেক সূচকে বাংলাদেশ অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জন করছে। উন্নয়নশীল দেশের গড় হারের তুলনায় সকল বাধা বিপত্তি মানবসৃষ্ট ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলা করে দারিদ্র্য বিমোচন সংগ্রামের বাংলাদেশের হিসাব কষছেন বিশ্বমোড়লরা। এদেশের পরিশ্রমী মানুষের হাড় ভাঙ্গা শ্রম, সঠিক নেতৃত্ব ও পরিকল্পনায় বাংলাদেশের অর্থনীতি বিশ্বে চমক সৃষ্টি করেছে। এমডিজি সফলভাবে অর্জনের পর এসডিজি অর্জনের পথে বাংলাদেশ। প্রাকৃতিক সম্পদের চেয়ে জনসংখ্যার চাপ, মহামারী করোনার ধাক্কার পরও উন্নয়নে বাধা সৃষ্টি করতে পারেনি বাংলাদেশকে। ১৯৭৬ সালে স্বল্পোন্নত এবং ২০১৮ সালে মধ্যম আয়ের দেশের তালিকাভুক্ত হয় বাংলাদেশ। প্রবৃদ্ধি অর্জনের দিক থেকে নরওয়ের চেয়ে বেশি সম্ভাবনা রয়েছে বাংলাদেশের। বাংলাদেশের অর্জিত জ্ঞান-মেধা, অভিজ্ঞতা, কৌশল বিশ্বের কাছে এখন নতুন চমক। যে কারণে বহিঃর্বিশ্বে বাংলাদেশ সম্পর্কে ইতিবাচক ভাবমূর্তি তৈরী হয়েছে।
১৯৪৭ সালে পাকিস্তান সৃষ্টির পর, এ ভূখন্ডের (পূর্ব পাকিস্তান অংশে) প্রতি ১শ জনের মধ্যে ৮০ জন ছিলেন দরিদ্র। স্বাধীনতার পর ১৯৭২-৭৩ সালে ছিল ৮৮ শতাংশ। ১৯৯১ সালে ৫৫.৭ শতাংশ, ২০০৫ সালে ৪৩ শতাংশ, ২০০৯-১০ সালে ছিল ১৮ শতাংশ এবং হতদরিদ্র মানুষের সংখ্যা ছিল ১১.৩ শতাংশ। ২০০০ থেকে ২০০৫ সালের মধ্যে বছরওয়ারি ১.৮ শতাংশ হারে দরিদ্র কমছিল। ২০১৬ সালে দরিদ্রের সংখ্যা ছিল ৪ কোটি, তখন ভারতে ছিল ২৫ কোটি। ২০১০ থেকে ২০১৬ সাল সময়ে দারিদ্র্যের হার কমেছে ১.২ শতাংশ হারে। বর্তমানে ১৭ কোটি মানুষের মধ্যে ২ কোটি ৮০লাখ লোক হতদরিদ্র হলেও বর্তমান সময়ে আশ্বিন-কার্তিক ও ফাল্গুন-চৈত্র মাসে দুর্ভিক্ষ, মঙ্গা ও ক্ষুধার্ত মানুষ দেখা যায় না। গণমাধ্যমের তথ্যমতে, গত ১৫ বছরের চরম দারিদ্র্যের হার ৩৪ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৩ শতাংশে আনা হলেও বাংলাদেশে ২ কোটি লোক হতদরিদ্র বিবেচিত অবস্থায় বসবাস করছেন। ২০৩০ সালে হতদরিদ্রের হার ৩ দশমিক শূন্যের নিচে আনা সম্ভব হলে বাংলাদেশ উন্নত রাষ্ট্রের তালিকায় নাম লেখাতে পারে। দারিদ্র্যের হার কমাতে প্রবৃদ্ধি ৮.৮ শতাংশ এবং কয়েক বছর তা অব্যাহত থাকতে হবে। তখন দারিদ্র্য কমে যাবে ১.৫ শতাংশ হারে। উন্নয়নের ধারা অব্যাহত থাকলে ২০২৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশ পৌছে যাবে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে।
করোনা ভাইরাস বিশ্বে মানব সভ্যতার উপর চরম আঘাত হানে। বাংলাদেশেও সীমাহীন ক্ষতি করেছে এ ভাইরাস। বিশ্ব ব্যাংক বলেছিল, চলতি বছর বিশ্বের অর্থনীতি ৫.২ শতাংশে সংকোচিত হতে পারে এবং মন্দা কাটিয়ে উঠতে ৫ বছর সময় লাগবে। এশিয়ার ৩ চতুর্থাংশ দেশের অর্থনীতি সংকোচিত হলেও চলতি বছর বাংলাদেশে করোনা মোকাবেলা করে প্রবৃদ্ধির হার হবে ৬.৮ শতাংশ। করোনার কারণে দেশে শহরাঞ্চলে ৬৬ শতাংশ এবং গ্রামাঞ্চলে ৪১ শতাংশ মানুষ চাকুরী হারিয়েছেন। এ মহামারী থেকে মানুষের জীবন বাঁচাতে ১ লাখ ১২ হাজার ৬৩৩ কোটি টাকার (জিডিপির ৪৩ শতাংশ), ২১টি প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এসময় ৭ কোটি মানুষকে খাদ্য সহায়তা ও ২ কোটি মানুষকে নগদ অর্থ সহায়তা দিয়ে এক নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।
১৭ অক্টোবর ১৯৮৭ সাল থেকে এ দিবসটিকে বিশ্ব দারিদ্র্য বিমোচন দিবস হিসেবে পালন করছে জাতিসংঘ। যেসব দেশ দারিদ্র্য বিমোচনে সাফল্য অর্জন করে, সেসব দেশ এ দিবসটি পালন করে থাকে। সাফল্যের যাত্রা পথে এ দিবসটি বাংলাদেশের জন্য একটি সু-সংবাদ। বাংলাদেশের দারিদ্র্য বিমোচনের অগ্রযাত্রার পেছনের সুদক্ষ এক কারিগরের ভূমিকায় আছেন, জাতির পিতার সুযোগ্য তনয়া প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সাম্প্রতিককালে নারী ও শিশু নির্যাতন খুবই বেড়েছে। দলবাজ, প্রতারক, দুর্নীতিবাজদের কারণে প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর সরকারের সকল অর্জন ম্লান হচ্ছে। বাংলাদেশে বছরে ১৫ হাজার কোটি টাকার ঘুষ লেনদেন হয়, ৭০ হাজার কোটি টাকা যারা ঋণ নেয় তারাই আবার ৩০/৪০ হাজার কোটি টাকার ঋণ খেলাপী হয় এবং এসব টাকা বিদেশে পাচারও করা হয়। দারিদ্র্য বিমোচনের স্বার্থে শক্ত হাতে এসব দমন করতে হবে। সবমিলিয়ে বাংলাদেশের উন্নয়ন বা দারিদ্র্য বিমোচনে পিছনের দিকে তাকানোর এখন কোন সুযোগ নেই। সামনের দিকে এগিয়ে যাবে বাংলাদেশ। এখনই সময় বাঙালির মাথা উচুঁ করে দাড়াঁবার।
লেখক : কলামিস্ট।

শেয়ার করুন

ফেসবুকে সিলেটের ডাক

Image

Developed by:Sparkle IT