উপ সম্পাদকীয়

কতো অজানারে

ইনাম চৌধুরী প্রকাশিত হয়েছে: ১৭-১০-২০২০ ইং ০৩:৩০:৫৪ | সংবাদটি ৬০ বার পঠিত
Image

আমাদের দেশটিতে নানা অঘটন, অপতৎপরতা, দুর্ঘটনাসহ নানাবিধ ব্যাখ্যাতিত ঘটনাসমূহ ঘটেই চলেছে। একটি যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশ গড়তে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান অহর্নিশ পরিশ্রম করেছিলেন। পাক হানাদার বাহিনী সড়ক, রেলসহ সব ধরনের যোগাযোগ ব্যবস্থা ধ্বংস করে দিয়েছিল। এমম্বিধ অবস্থায়ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব কখনোও দিশেহারা হন নাই। তিনি সারা বিশ্ব বিবেকের কাছে বাংলাদেশের দুর্ভোগ কবলিত জনগণকে বাঁচানোর নিমিত্তে সবধরনের সহায়তা প্রদানের আকুল আহবান জানান। স্বাধীনতা যুদ্ধকালীন সময়ে ক্ষেতের ফসল ক্ষেতেই শুকিয়ে বিনষ্ট হয় নতুবা পাকবাহিনী জ্বালিয়ে ছারখার করে দেয়। তারপরও জাতির পিতা অক্লান্ত পরিশ্রম আর আপন ব্যক্তিত্বকে কাজে লাগিয়ে তৎকালীন সময়ের সাড়ে সাত কোটি বাঙালির খাবার জোগাতে তৎপরতা অব্যাহত রাখেন।
যখন সবকিছু প্রায় স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসছিলো তখনই শকুনীদের দৃষ্টি যেন আমাদের দেশটির দিকে নিবদ্ধ হয়। খাদ্যবাহী জাহাজগুলিকে বাংলাদেশমুখী সমুদ্রপথের মধ্যস্থল থেকে ফিরিয়ে নেয়া হয়। ঔষধপত্র এবং অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি বহনকারী জাহাজগুলিকেও অনুরূপভাবে যাত্রাপথে আটকিয়ে দেয়া হয়। ফলশ্রুতিতে আমাদের দেশটিতে দেখা দেয় এক মহাদুর্ভিক্ষ। আনুমানিক এক লক্ষ বঙ্গ সন্তান প্রাণ হারান নিদারুণ খাদ্যাভাবে। বর্ণনাতীত কষ্টভোগ করে অশীতিপর বৃদ্ধি বৃদ্ধারা পর্যন্ত ভাতের ফেন জোগাড় করতে মানুষের দ্বারে দ্বারে ঘুরে বেড়ান। বঙ্গবন্ধুর সরকার নানা প্রকার কঠোর আইনী ব্যবস্থাবলীর মাধ্যমে দেশের অভ্যন্তরে মজুদদারদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। সরকারী খাদ্য গুদামগুলিতে রক্ষিত সামগ্রীসমূহ রেশনিং ব্যবস্থার মাধ্যমে বন্টন এর ব্যবস্থা গ্রহণ করেন অন্যদিকে সারাদেশের নানাপ্রান্তে খোলা হয় প্রায় ছিয়াত্তর হাজার লঙ্গরখানা। এ সকল লঙ্গরখানা মারফত অল্প পরিমাণ হলেও নৈমিত্তিক ব্যবস্থা হিসাবে নিরন্নদের জন্য খাবার সরবরাহ নিশ্চিত করা হয়। গোদের উপর বিষফোড়ার মতো চরমপন্থীদের কার্যক্রম ঠিক সে সময় মাথাচাড়া দিয়ে উঠে। তাদের কর্মতৎপরতা, চরম রাজনৈতিক কর্মপন্থা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে দেশ ও জাতির স্বার্থে বিভিন্ন কঠোর ব্যবস্থা নিতে বাধ্য করে। গৃহিত সেই ব্যবস্থার মাধ্যমে তিনি একটি শান্ত ও সুশৃঙ্খল অবস্থা ফিরিয়ে আনতে গিয়েও পুরোপুরি সফল হতে পারেননি। বিভিন্ন তথ্যসূত্র ও বক্তৃতা বিবৃতির মাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয় যে চর কুকরী মুকরী এলাকার জনপদটিকে একেবারে নিশ্চিহ্ন করে দেয়া হয়েছে। প্রায় বিশ হাজার বামপন্থী নেতা কর্মীকে হত্যা করা হয়েছে বলেও দাবি করা হয়। আজকালকার মতো তথ্যপ্রবাহ, যোগাযোগ বা প্রচার মাধ্যম কোন ব্যবস্থাই এতো অত্যাধুনিক আর নিরবচ্ছিন্ন ছিলো না। সে হিসাবে যে সংবাদটি আকাশে বাতাসে ফেনিয়ে উঠতো সেটিকে সাধারণ মানুষ লুফে নিতো এবং পল্লবিত হতে হতে তা মহীরূহে পরিণত হতো। এ সকল কিছুই সাধারণ্যে জ্ঞাত, তারপরেও আমাকে বর্ণনাটি সংক্ষিপ্তাকারে দিতে হলো এজন্য যে সেই মহাদুর্যোগের প্রেক্ষাপট, প্রকৃতি, কারণ এবং কুশীলবদের পরিচিতি আজ পর্যন্ত জাতি জানতে পারলো না। অদ্যাবধি কোন একটি তদন্ত কমিটি পর্যন্ত গঠিত হলোনা বিষয়টি খোলাসা করার জন্য। এটাই একটি বিস্ময়।
ঊনিশ শত পঁচাত্তর এর পনেরোই আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পরিবার এর সতেরো জন সদস্যসহ মর্মান্তিকভাবে নিহত হন। বঙ্গবন্ধু সহ সকলের লাশই পুরো বত্রিশটা ঘন্টা অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে থাকে। কেউ শুশ্রুষা করতে যেমন যায়নি তেমনি কেউই পনোরো আগস্টের প্রাতঃকালে বঙ্গবন্ধু নিহত হওয়ার প্রাক্কালে তাকে রক্ষা করতে এগিয়ে আসেনি। জাতির পিতা আপন প্রাণ রক্ষার্থে তথা পরিবারকে শত্রুর কবল থেকে রক্ষার জন্য যথাযথ স্থানে এবং যথোপযুক্ত ব্যক্তিকে পর্যন্ত দুরালাপনি মারফত সাহায্য পাঠাতে নির্দেশ দিয়েছিলেন। হয়তোবা সাহায্যকারীরা আদেশ অমান্য করেছেন আর নতুবা ব্যাপারটিকে হালকাভাবে নিয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধু কিন্তু টেলিফোনগুলি করার আগে হন্তারকদের কাছ থেকে অনুমতি নিয়েছিলেন। হত্যাকারীরা জাতির পিতার ব্যবহার্য জিনিসপত্র নিজ হাতে বহন করে তাকে নিয়ে যখন নিচে নামছিলো তখনই নির্মম হত্যাকান্ডটি সংঘটিত হয়। এমনকি বঙ্গবন্ধুর পরিবার এর যতো সদস্য বাসগৃহটিতে অবস্থান করছিলেন কেউই আর নিজেদেরকে বাঁচাতে পারেনি। এই হত্যাকান্ডটি সুচারুরূপে পূর্বপরিকল্পিত ও বাস্তবায়িত হয়েছিলো। কার মদদে, কিভাবে এবং কোন শক্তিতে বলীয়ান হয়ে অপকর্মটি সংঘটিত হয়েছিলো সেটি জানতে চাওয়ার অধিকার রয়েছে সকলের কিন্তু এ ব্যাপারেও কোন একটি সুষ্ঠু তদন্ত কমিটি গঠন, প্রতিবেদন প্রকাশ কোন কিছুই আজ পর্যন্ত প্রকাশিত হলো না। এরপরে বঙ্গবন্ধুর প্রাণের দলটি একুশটি বছর আর ক্ষমতায় যেতে পারেনি। সেই একুশটি বছরের ব্যর্থতার জন্য দলীয় দুর্বলতা, নাকি নেতৃত্বের ব্যর্থতা এসব কিছু খুঁজে দেখার জন্য একটি দল ভিত্তিক তদন্ত কর্মকান্ড পরিচালিত হওয়া উচিত বলে মনে হয়। এ জাতীয় একটি কর্মতৎপরতার প্রয়োজন রয়েছে এই জন্য যে, হারিয়ে যাওয়া এই একুশটি বছর কিন্তু অন্যান্য দলগুলি কাজে লাগিয়েছে শতভাগ এবং তাদের রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধি করেছে শতভাগের চেয়েও যেন আরো উপরে।
বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের পর মসনদে আসীন হন খোন্দকার মোশতাক সাহেব। তার মন্ত্রী পরিষদও গঠিত হয় বঙ্গবন্ধুর মন্ত্রিসভার সদস্যদের নিয়ে (গুটি কয়েক বাদে)। বঙ্গবন্ধুর হত্যাকন্ডের সংবাদটি অবগত হয়ে তৎকালীন সেনা উপপ্রধান নির্বিকার কণ্ঠে মন্তব্য করেন রাষ্ট্রপতি নিহত হয়েছেন তো কি হয়েছে উপ-রাষ্ট্রপতিতো রয়েছেন তাকেই ক্ষমতা গ্রহণ করতে বলো। এখানেও রয়েছে রহস্যের গন্ধ, যদিও এখন পর্যন্ত কেউই এ ব্যাপারে সত্যানুসন্ধানে এগিয়ে আসার প্রয়োজন অনুভব করেন নাই। তৎকালীন সেনা কর্মকর্তা হোসেইন মোহাম্মদ এরশাদ সাহেব তখন ভারতে ছিলেন প্রশিক্ষণ গ্রহণরত অবস্থায়। সেই অবস্থায়ই তাকে পদোন্নতি দিয়ে ব্রিগেডিয়ার বানিয়ে দেয়া হয়।
অন্যদিকে পনোরো আগস্ট সকালেই তৎকালীন তিন বাহিনী প্রধানকে অবমাননাকর অবস্থায় তুলে নিয়ে আসা হয় ঢাকা বেতার ভবনে। খোন্দকার মোশতাক সাহেব তিন বাহিনী প্রধানকে কয়েকটি শর্ত দিয়ে বলেন তারা যদি সেগুলিকে মেনে ঘোষণা দেন তাহলে তিনি ক্ষমতায় বসতে রাজী আছেন। প্রথমেই বলেন তিন বাহিনী প্রধানকে এই নৃশংসতম হত্যাকান্ড ও পট-পরিবর্তনের দায়িত্ব গ্রহণ করতে হবে। তিন বাহিনী প্রধানই ত্বরিৎ গতিতে বৈঠকে বসেন এবং খোন্দকার মোশতাক সাহেবকে তাদের সম্মতিটি জানিয়ে দেন এবং তদনুযায়ী বেতার টেলিভিশন মারফত তাদের বাহিনী সমূহকে নতুন সরকার এর প্রতি অনুগত থেকে সকল নির্দেশাবলী মেনে চলতে নির্দেশ প্রদান করেন। অনুরূপ আনুগত্যসূচক ঘোষণা প্রদান করে তৎকালীন রক্ষীবাহিনী প্রধান, পুলিশ প্রধান এবং আনসার বাহিনী প্রধানও। খোন্দকার মোশতাক সাহেব দ্বিতীয় শর্তটি দিলেন যে তিনি গণতান্ত্রিক রাজনীতির সমর্থক। সেই মত সকল প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক কর্মকান্ড পরিচালনা করা হবে। সেটিও সেই মহলটি মেনে নেন।
তারপর খোন্দকার মোশতাক সাহেব শপথ গ্রহণ পূর্বক রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন ও জাতির উদ্দেশ্যে প্রদত্ত ভাষণে একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের ঘোষণা দেন। অন্যায্য আর বিধিবহির্ভূত পদোন্নতি সমূহ চিহ্নিত করলে তিনি একটি কমিটি গঠন করে সত্বর কার্যক্রম চালু করার নির্দেশ প্রদান করেন। প্রশাসনিক কাঠামোতে ব্যাপক রদবদল ঘটান রাষ্ট্রপতি খোন্দকার মোশতাক। নানা ধরনের সমস্যাবলী ও সংকট মোকাবিলায় তিনি দক্ষতার পরিচয় দেন। টাঙ্গাইলের প্রভাবশালী নেতা জনাব আব্দুল লতিফ সিদ্দিকী খোন্দকার মোশতাককে অভিনন্দন জানিয়ে বার্তা প্রেরণ করেন। মরহুম জাতির পিতার মরদেহ দাফন কর্মে তিনি কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেন। হত্যাকারীদের স্মরণ করিয়ে দেন যে তিনি রাষ্ট্রপতি এবং তার আদেশ মান্য করতেই হবে। তৎকালীন আইনমন্ত্রী মনোরঞ্জন ধর মহাশয় দায়মুক্তি অধ্যাদেশটির মুসাবিদা করেন যা পরবর্তীতে আইনে রূপায়িত হয়। তারপরে অনেক উলটপালট হয়েছে। প্রেসিডেন্ট জিয়া নিহত হয়েছেন একইভাবে। জেনারেল মঞ্জুর নিহত হয়েছেন। খালেদ মোশাররফ সহ যারাই নিহত হয়েছেন সকলেই ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা। নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আব্দুস সাত্তার মরতে মরতে বেঁচেছেন ক্ষমতা ত্যাগ এর মাধ্যমে। এ জাতীয় সকল হত্যাকন্ডের পেছনের অজানা ইতিহাস নিয়ে একটি শ্বেতপত্র প্রকাশের অনুরোধ জানাই। দিল্লী হনুজ দূর আস্ত।

শেয়ার করুন

ফেসবুকে সিলেটের ডাক

Image

Developed by:Sparkle IT