বিশেষ সংখ্যা

বেগম রাবেয়া খাতুন চৌধুরী

প্রফেসর ড. জহুরুল আলম প্রকাশিত হয়েছে: ১২-১২-২০১৬ ইং ০২:৫০:০২ | সংবাদটি ১৮৩ বার পঠিত

জন্ম ও মৃত্যু মানব জীবনে দুই সত্য। এই দুই সত্যের মাধ্যমে মানুষ পৃথিবীতে আসে আবার চলেও যায়। মানুষ জন্মগ্রহণ করে, বংশ বিস্তার করে আবার পরিণত বয়সে মৃত্যুবরণ করে এটা মানব জাতির স্বাভাবিক নিয়ম। কিন্তু কিছু কিছু মানুষের জীবন ও তার স্ব-প্রাণ তৎপরতা সমাজের মানুষের জন্য অমূল্য হয়ে ওঠে। দানবীর ড. সৈয়দ রাগীব আলীর প্রাণপ্রিয় সহধর্মিণী বেগম রাবেয়া খাতুন চৌধুরীর জীবন ও স্ব-প্রাণ তৎপরতা, আদর্শ, কর্তব্যপরায়ণতা ও মূল্যবোধ ছিল মানব সমাজের জন্য অমূল্য সম্পদ।
সিলেট শহরে এ পর্যন্ত যতোজন মহীয়সী নারী সামাজিক অঙ্গনে নিজেদের আসন পাকাপোক্ত করতে পেরেছেন বেগম রাবেয়া খাতুন চৌধুরী তাদের অন্যতম। সিলেট শহরে স্কুল কলেজের মাঠে খেলে, লেখাপড়া করে শৈশব ও কৈশোর পার করলেও তার জীবনের অধিকাংশ সময় কেটেছে লন্ডন শহরের প্রাচুর্য ভরা পরিবেশে। দারিদ্র্যে ভরা বাংলাদেশে প্রাচুর্য রয়েছে এমন লোকের সংখ্যা কম নেই। কিন্তু খুব কম ধনবান লোকেরাই সমাজ ও গ্রাম নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করেন। এ ক্ষেত্রে দানবীর ড. সৈয়দ রাগীব আলী ও তার স্ত্রী বেগম রাবেয়া খাতুন চৌধুরী ছিলেন ব্যতিক্রমধর্মী। সামাজিক দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে সমাজের মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের জন্য তিনি সদা-সর্বদা চিন্তা-ভাবনা করতেন। সমাজের মানুষের জন্য তার চিন্তা চিরদিনের জন্য থেমে গেছে ২০০৬ সালের ১২ ডিসেম্বর। চিন্তা থেমে গেছে না বলে আমরা বলতে পারি, একজন সমাজদরদি, মানবদরদি রাবেয়া খাতুন চৌধুরীর স্ব-প্রাণ তৎপরতা ও চিন্তা চিরদিনের জন্য বন্ধ হয়ে গেছে।
মানব শিশু যে পরিবেশে জন্মগ্রহণ করে এবং পরিবেশ থেকে যে মূল্যবোধ লাভ করে সেই অনুযায়ী পরবর্তীতে সমাজে আচরণ করে। আচরণের মধ্যে দিয়েই একজন মানুষের চিন্তার বৈশিষ্ট্য ফুটে ওঠে। চিন্তার সেই বৈশিষ্ট্য ও স্বকীয়তা দিয়েই সমাজে একজন ব্যক্তির স্থান নির্ধারিত হয়। আর সেই বৈশিষ্ট্য, চিন্তা ও তৎপরতার জন্যেই আমরা কাউকে বলি ভালো বা মন্দ, সাধারণ বা অসাধারণ। যে চিন্তা মানুষকে সমাজে তার স্থান নির্ধারণ করে দেয় লক্ষ কোটি মানুষের মধ্যে বৈশিষ্ট্যম-িত করে তোলে, মানুষকে সেই চিন্তার চর্চা করতে হয়। অর্জন করে নিতে হয় চিন্তা ও মূল্যবোধ। আসলে সকল মানুষ সমাজ নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করে না বরং অধিকাংশ মানুষ জন্ম নিয়ে সমাজে বিদ্যমান বিধি ব্যবস্থা রপ্ত করে এবং তাতে অভ্যস্ত হয়ে সেই অভ্যাসই পালন করে। সমাজ ও রাষ্ট্রে যে বিধি-ব্যবস্থা মানুষ তৈরি করেছে তার প্রতিটি সচেতন মনোযোগ এবং তাকে বিবেচনা ও প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করাবার প্রয়াস খুব কম লোকই করে থাকে। এদিক দিয়ে বেগম রাবেয়া খাতুন চৌধুরী ছিলেন অনন্য।
তিনি কিশোরী মোহন উচ্চ বিদ্যালয় থেকে মেট্রিক পাশ করেন। পরে সিলেট সরকারি মহিলা কলেজে ভর্তি হন এবং ওই সময়ে লন্ডন প্রবাসী দানবীর রাগীব আলী সাহেবের সাথে পারিবারিক সিদ্ধান্তে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। বিয়ের পর পরই ১৯৬৪ সালে তিনি স্বামীর সাথে লন্ডনে চলে যান। ১৯৬১ সালে লন্ডনের স্টেথাম হিলে তাজমহল নাম দিয়ে রেস্টুরেন্ট ব্যবসা শুরু করেন ড. রাগীব আলী। স্বামী স্ত্রী দুজন মিলেই রেস্টুরেন্ট পরিচালনা করতেন। তাদের কঠোর পরিশ্রমের ফলে তাজমহল লন্ডনে বেশ সুনাম ও ব্যবসায়িক সাফল্য পায়।
মহীয়সী নারী বেগম রাবেয়া খাতুন চৌধুরী চিন্তা ও চেতনায় একজন সফল নারী উদ্যোক্তা ও দেশপ্রেমিক ছিলেন। তাই তিন স্বামীকে নিয়ে লন্ডনের মতো প্রাচুর্য ভরা শহর ছেড়ে নিজ শহর সিলেট এসে মানবকল্যাণে নিয়োজিত হন। গরিব, দুঃখী ও দুস্থ মানুষের জন্য ছিল তার হাত সর্বদা প্রসারিত ও উদার। তিনি নিজ শহর সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে জনকল্যাণমূলক বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান স্কুল, কলেজ, মসজিদ, মাদ্রাসা, মেডিকেল কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনায় সরাসরিভাবে জড়িত ছিলেন।
সিলেটে আসলেই অধিকাংশ সময় উক্ত চা বাগানের বাংলোতে কাটাতেন। সমস্ত তনু মন প্রাণ, সমগ্র জীবন দিয়ে তিনি ভালোবেসেছিলেন জননী জন্মভূমি সিলেটের নীল আকাশ, শীতল বাতাস, সবুজ বনানী, আর শ্যামল প্রান্তর। আর তেমনি ভালোবেসেছিলেন এই প্রকৃতির লীলা নিকেতনে মালনীছড়া চা বাগানের দরিদ্র, মলিন, অসুন্দর জীবন যাপনকারী ভাগ্যাহত মেহনতি মানুষদের। চা বাগানের শ্রমিকদের সমস্যার কথা তিনি মনোযোগ দিয়ে শুনতেন এবং তৎক্ষণাৎ সমাধান দিতেন। মালনীছড়া চা বাগানকে তিনি কতো বেশি ভালোবাসতেন তার ঊজ্জ্বল দৃষ্টান্ত তার জীবনের শেষ সময় তথা শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন উক্ত বাগানের বাংলোতে।
প্রতিটি জন্ম আলিঙ্গন করে নেবে মৃত্যুকে। এ কথাটি অতি সত্য জেনে নিয়েও মেনে নিতে কষ্ট হয় মৃত্যুকে। আরও বেশি কষ্ট হয় খারাপ লাগে যখন দেখি ভালো মানুষগুলো নির্দিষ্ট সময়ের আগেই বিদায় নেয় পৃথিবীর বুক থেকে। অর্থ অনেকেরই থাকতে পারে কিন্তু প্রাচুর্য ও দিল দরাজ লোকদের সংখ্যা সমাজে নগণ্য। বেগম রাবেয়া খাতুন চৌধুরীরা সমাজে গ-ায় গ-ায় জন্মায় না। এক রাবেয়া খাতুন চৌধুরী চলে গেছেন আমরা আরেক রাবেয়া খাতুন চৌধুরীর জন্য অপেক্ষায় থাকবো।
রাগীব-রাবেয়া দম্পতি সমাজসেবা, মানকল্যাণ, দানশীলতা ও ভালোবাসার জগতে এক ঊজ্জ্বল নক্ষত্র। বাংলাদেশে আজকে দানবীর ড. রাগীব আলী যে সামাজিক ও ব্যবসায়িক অবস্থান তার পেছনে বেগম রাবেয়া খাতুন চৌধুরীর অবদান নিঃসন্দেহে অতুলনীয়। সত্যিকার অর্থে ¯েœহপ্রবণ, মমতাময়ী, প্রজ্ঞাময়ী ও কল্যাণব্রতী নারীর জীবন্ত ছবি বেগম রাবেয়া খাতুন চৌধুরী।
দমশ মৃত্যুবার্ষিকীতে তার স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানাই এবং তার রুহের মাগফেরাত কামনা করি।
লেখক : অধ্যাপক, লিডিং ইউনিভার্সিটি।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT