বিশেষ সংখ্যা

এক মহীয়সীর গল্প

মোঃ ছাদিকুর রহমান প্রকাশিত হয়েছে: ১২-১২-২০১৬ ইং ০২:৫৩:৪২ | সংবাদটি ৪১৭ বার পঠিত

জীবন নামক পালকিতে চড়ে কত মানুষ জন্মগ্রহণ করে ক্ষণস্থায়ী সুন্দর পৃথিবীতে। আবার একট নির্দিষ্ট সময় পার করে মৃত্যু নামক পালকিতে চড়ে মানুষ চলে যায় না ফেরার দেশে। মাঝখানে মানুষ যে সময়টুকু পৃথিবীতে থাকে সেই সময়ের তার কর্মের ওপর ভিত্তি করে ভালো কাজের মাধ্যমে সে চলে যাবার পরও মানুষের হৃদয়ে চির অমর হয়ে থাকে যুগ যুগ ধরে। তেমনিভাবে পৃথিবীর স্বাভাবিক নিয়মেই ১৯৪৬ সালের ৫ এপ্রিল সিলেট শহরের আম্বরখানার রায় হোসেন মহল্লার ‘মাহফিজ হাউজ’ (পাক্কা বাড়ি)তে এক ঐতিহ্যবাহী পরিবারে পিতা ইরফান আলী চৌধুরী ও মাতা নাঈমা বানু চৌধুরীর পঞ্চম সন্তান হিসাবে এই সুন্দর পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ করেন এক মহীয়সী নারী বেগম রাবেয়া খাতুন চৌধুরী। তিনি সিলেট সরকারি মহিলা কলেজে উচ্চ মাধ্যমিকে অধ্যয়নরত অবস্থায় বিশ্বনাথের তালিবপুর নিবাসী সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে আলহাজ্ব রাশিদ আলীর পুত্র রাগীব আলীর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। বেগম রাবেয়া খাতুন চৌধুরী একটি নাম, একজন নারী, একজন মমতাময়ী জননী, বহু প্রতিষ্ঠানের জনক, সিলেটের স্বনামধন্য পত্রিকা দৈনিক সিলেটের ডাকের সম্পাদক ছিলেন, সর্বোপরি তিনি একজন মহান মানবসেবী। যিনি তার জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে মানবসেবাকে ধর্ম হিসেবে নিয়েছিলেন। সুদূর বিলাতের ভোগ বিলাসী জীবন যাপন ত্যাগ করে তিনি ছুটে এসেছিলেন এই দেশে। কিভাবে দেশের গরিব, দুঃখী ও অসহায় মানুষকে সেবা করা যায়, কিভাবে শিক্ষা ক্ষেত্রে উন্নতি করা যায় সেই চেষ্টাই করে গেছেন। তিনি গরিব, দুঃখী ও অসহায় মানুষকে সেবা করার জন্যই সিলেটের প্রথম বেসরকারি মেডিকেল কলেজ জালালাবাদ রাগীব রাবেয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করেন। প্রতিষ্ঠা করেন উচ্চ শিক্ষা গ্রহণের জন্য সিলেটের প্রথম বেসরকারি ইউনিভার্সিটি ‘লিডিং ইউনিভার্সিটি’। তিনি প্রতিষ্ঠা করে গেছেন সিলেট সহ সারা বাংলাদেশের আনাচে কানাচে বহু স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা। অংশগ্রহণ করেছেন বিভিন্ন সেবামূলক কাজে। গরিব, দুঃখী, অসহায় ও এতিমদের দান করেছেন মুক্তহস্তে। এমন কোনো মানুষ নাই যে বলতে পারবে বেগম রাবেয়া খাতুন চৌধুরীর কাছে কিছু চেয়ে খালি হাতে ফিরে এসেছে। তিনি চা শিল্পের সাথে জড়িত ছিলেন। অনেক চা বাগান ছিল তাদের মালিকানাধীন। তার বাগানে শত শত শ্রমিক কাজ করত। তার প্রতিষ্ঠানের শত শত কর্মচারী, কর্মকর্তা এবং বাগানের শত শত শ্রমিক, কর্মকর্তাকে তিনি খুব আদর স্নেহ ও করতেন। তাদের বিপদে আপদে সবার আগে এগিয়ে যেতেন। অতি সহজেই তিনি মানুষকে আপন করে নিতে পারতেন, এটি ছিল তার অন্যতম গুণ। সাধারণ মানুষের সাথে ছিল তার নিবিড় সম্পর্ক। এত বিপুল অর্থ বিত্তের মালিক থাকা সত্ত্বেও অতি সাধারণ জীবনযাপন করতেন। কোনো রকম অহঙ্কার তাকে স্পর্শ করতে পারেনি। পৃথিবীতে কিছু কিছু মানুষের জন্ম হয় শুধু মানুষকে দিয়ে যাবার জন্য কোনো রকম প্রতিদানের আশা না করেই। তেমনিভাবে বেগম রাবেয়া খাতুন চৌধুরী জন্মগ্রহণ করেছিলেন। শুধু দু’হাত ভরে পৃথিবীর মানুষকে দিয়ে যাবার জন্য। সেই মানুষগুলোকে কোনো রকম প্রতিদান দেবার সুযোগ না দিয়ে বেগম রাবেয়া খাতুন চৌধুরী তার বহু স্মৃতি বিজড়িত মালনিছড়া চা বাগানের বাংলোতে প্রাকৃতিক অপরূপ পরিবেশে। ২০০৬ সালের ১২ ডিসেম্বর চলে গেলেন মৃত্যু নামক পালকিতে চড়ে দূর থেকে বহুদূরে জীবন নদীর পরপাড়ে না ফেরার দেশে। শত শত মানুষকে চোখের জলে ভাসিয়ে নিরবেই চলে গেলেন, রেখে গেছেন শুধু স্মৃতিটুকু। তিনি এই পৃথিবী থেকে চলে গেলেও মানুষের হৃদয় থেকে চলে যাননি। শত শত মানুষের হৃদয়ে চিরজাগ্রত হয়ে থাকবেন চিরকাল। তিনি চলে গেছেন ধীরে ধীরে ১০টি বছর পার হয়ে গেছে। কিন্তু আজও তার স্মৃতিতে কেঁদে উঠে মানুষের হৃদয়। আমি তার স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানাই। তার ১০ম মৃত্যুবার্ষিকীতে মহান আল্লাহতালার কাছে দোয়া করি উনি যেন তাকে জান্নাতুল ফেরদাউস নসিব করেন।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT