বিশেষ সংখ্যা

ডিসেম্বরের বীরত্বগাঁথা

বিশ্বজিত রায় প্রকাশিত হয়েছে: ১৬-১২-২০১৬ ইং ০২:৩০:৩৭ | সংবাদটি ১৪৮ বার পঠিত

‘‘বীরের এ রক্ত¯্রােত, মাতার এ অশ্রুধারা / এর যত মূল্য সে কি ধরার ধুলায় হবে হারা। / স্বর্গ কি হবে না কেনা। / বিশ্বের ভা-ারী শুধিবে না / এত ঋণ?’’ কবিগুরুর এই পঙক্তিমালা পাঠ করলে মনে হয় বাঙালির কপালের লিখন তিনি অনেক আগেই আঁচ করতে পেরেছিলেন। তাইতো স্বাধীনতা অর্জনের বহু পূর্বেই দুঃখ ভারাক্রান্ত মনের আবেগপ্রবণ কথায় রবিঠাকুর প্রশ্ন তুলেন কবিতার ছন্দে। লক্ষ যোদ্ধার তাজা রক্ত আর পুত্রহারা মায়ের কপোল বেয়ে গড়িয়ে পড়া নুনাজলের মিলিত ধারা মিশেছে দখিণ পাথারে। দীর্ঘ যন্ত্রণায় ব্যথিত মনের প্রশ্নÑ চড়া দামে কেনা এই অর্জন কি ধরিত্রী বক্ষের মিহি কণায় তলিয়ে যাবে, জননী জন্মভূমির মুক্ত সাধ কি মিটাবে না পিপাসা, আর কত প্রাণ ঝরালে যোগ্য পাওনার সমতুল্য হবে? বহু বছর আগে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গভীর জিজ্ঞাসায় লেখা এই কাব্যিক ভাষাগুলো একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বর বিজয় অর্জনের মধ্য দিয়ে তৃপ্তির শ্রেষ্ঠ স্থানে এসে পূর্ণতা পায়। তাই ডিসেম্বর সেই পূর্ণতার কথাই স্মরণ করিয়ে দেয় আমাদের।
বছর ঘুরে আবার এসেছে ডিসেম্বর। যে মাসটি জাতীয় জীবনে একটি ঐতিহাসিক ও অর্থবহ মাস হিসেবে বিবেচিত। বাঙালি জাতি তথা বাংলাদেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংগ্রাম, বীরত্ব, অর্জন, বিরল ত্যাগ, হাসি-কান্না মিশে আছে ওই মাসটিকে ঘিরে। ডিসেম্বর আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় বিজয়ের কথা। বিজয় যে কোনো মানুষ বা জাতির জন্য আনন্দের ফল্গুধারা। বিজয়ের আবার অনেক রঙ আছে। তবে আমাদের বিজয় রঙটি অন্য যেকোনো বিজয় থেকে একটু ভিন্ন। বিজয় হতে পারে কারো ব্যক্তিগত, দলীয় কিংবা অন্য বিশেষ কোনো ক্ষেত্রে। বিজয়ের রঙ ছড়িয়ে যেতে পারে পাড়া-মহল্লা, উপজেলা-জেলা, জাতীয় অথবা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে। কিন্তু বাঙালি জাতির বিজয় ছিলো পৃথিবী তাক লাগানো অন্য যেকোনো বিজয়ের থেকে আলাদা একটি বিজয়। গিরি উচ্চতার সেই বিজয়ের দিকে লক্ষ্য ছিলো সারা বিশ্ববাসীর। এমন বিজয় পৃথিবীর বুকে আর দ্বিতীয়টি নেই। হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের যোগ্য নেতৃত্ব এবং বাঙালি জাতির বীরত্ব আর দেশের প্রতি প্রগাঢ় মমত্ববোধই সেদিন বিজয় নামক শব্দটির সাথে অঙ্গাঅঙ্গিভাবে মিলিত হয় বাঙালি জাতি এবং গলায় গলায় শোভা পায় বিজয়মাল্য। পৃথিবীর মানচিত্রে বাংলাদেশ নামক নতুন একটি ভূখ-ের অভ্যুদয় ঘটে এবং বিশ্ববুকে জন্ম হয় নতুন আরেকটি বিজয়ী জাতির।
ইংরেজি বছরের সব শেষ মাসটি হলো ডিসেম্বর। অর্থাৎ অগ্রহায়ণ ও পৌষ এই দুটি বাংলা মাসের মিলিত অংশের নাম হচ্ছে ডিসেম্বর। এই মাসটিতে বাঙালির কাছে আত্মসমর্পণ করে পাকবাহিনী। জয় লাভ করে একটি জাতি, বিজয় হয় একটি দেশের। বিজয়ের আনন্দ ছড়িয়ে পড়ে বাংলার প্রতিটি পথ-প্রান্তর ও শহরের অলি-গলিতে। বিজয়ের ধ্বনিতে মুখরিত হয় প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের বিশাল জন¯্রােত পর্যন্ত। বিজয়ের হাসি ফুটে ওঠে স্বামী হারানো স্ত্রী, সন্তান হারানো মা, পিতা হারানো সন্তান এবং সম্ভ্রম হারানো প্রতিটি বীরাঙ্গনার মুখায়বয়বে। এ বিজয় ছিলো নতুন উদ্যোমে জেগে ওঠার। ১৯৪৭ সালের আগস্ট মাসে ব্রিটিশ শাসনাধীন ভারতীয় উপমহাদেশ স্বাধীন হয় এবং ভারত বিভক্ত হয়ে দুটি পৃথক স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্ম হয়। মুসলিম অধ্যুষিত এলাকা নিয়ে গঠিত হয় পাকিস্তান এবং হিন্দু ও অন্যান্য ধর্মাবলম্বী অধ্যুষিত অঞ্চল নিয়ে গঠিত হয় ভারত। নবগঠিত রাষ্ট্র পাকিস্তান দুই হাজার মাইলের ব্যবধানে অবস্থিত দুটি প্রদেশের সমন্বয়ে গঠিত হয় পূর্ব পাকিস্তান (বর্তমান বাংলাদেশ) ও পশ্চিম পাকিস্তান।
পৃথিবীতে কোনো জাতি বা গোষ্ঠী পরাধীনতার পিঞ্জর থেকে বের হয়ে স্বাধীনভাবে বেঁচে থাকার জন্য নিজেদের অধিকার ও সম্মান রক্ষায় শত্রুমুক্ত ভূখন্ডে নতুন রূপে জীবন পরিচালনা করতে শোষিত শক্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে অনেক রাষ্ট্র স্বাধীনতা অর্জন করে পৃথিবীর মানচিত্রে জায়গা করে নিয়েছে। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ কিংবা ১৬ ডিসেম্বরের বিজয় বিশ্ব ইতিহাসে অন্য যেকোনো অর্জন থেকে আলাদা একটি তাৎপর্য বহন করে। পশ্চিম পাকিস্তান কর্তৃক শোষণ ও বঞ্চনার শিকার পূর্ব পাকিস্তানের সাধারণ মানুষজন হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকে সাড়া দিয়ে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে। অখ- পূর্ব পাকিস্তান পশ্চিম পাকিস্তান কর্তৃক সর্বক্ষেত্রে বঞ্চনার শিকার হয়। শাসকগোষ্ঠীর লাঞ্চনা ও বঞ্চনার জবাব দিতে স্বাধীনতাকামী এ দেশের বাঙালি জাতিগোষ্ঠী নিজেদের অধিকার আদায়ে পাকবাহিনীর সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হয়। সুদীর্ঘকাল থেকে বঞ্চিত একটি জাতি নয় মাস যুদ্ধ করে পাক হায়েনাদের পরাজিত করে তাদের ন্যায্য অধিকার আদায় করে নেয়। ত্রিশ লাখ শহীদ আর দুই লাখ মা-বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর ‘বাংলাদেশ’ নামক নতুন একটি রাষ্ট্রের জন্ম হয়। স্বাধীনতা অর্জনে বাঙালি জাতি যেভাবে আত্মত্যাগের ইতিহাস সৃষ্টি করেছে, পৃথিবীর বুকে এমন ইতিহাস দ্বিতীয়টি আর নেই। যুদ্ধে আত্মোৎসর্গকারী সকল যোদ্ধা এবং যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধারা বাঙালি জাতি তথা বাংলাদেশের সূর্যসন্তান হিসেবে ইতিহাসের সর্বোচ্চ স্থানে জায়গা করে নিয়েছেন।
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ মধ্য রাত থেকেই শুরু হয় বাঙালিদের ওপর জুলুম নির্যাতন। পাকিস্তানী হায়েনাগোষ্ঠী তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে নির্বিচারে মানুষ হত্যা, ধর্ষণ, ধর্মান্তরিত, লুটতরাজ, বাড়িঘরে আগুন দেওয়া থেকে শুরু করে এমন কোনো ঘৃণ্য অপকর্ম নেই যে তারা করেনি। বিভিন্ন বাহিনী গঠন করে পাকিস্তানী প্রেতাত্মা গোষ্ঠী পূর্ব পাকিস্তানকে একটি মৃত্যুপুরীতে পরিণত করে। এ দেশে জন্মগ্রহণকারী পাকিস্তানপ্রেমী ঘৃণ্য অপরাধীরা জন্মভূমিকে অস্বীকার করে মাতৃভূমি ও বাঙালি জাতিসত্ত্বার বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। পাকিস্তানী হায়েনাদের সঙ্গে নিয়ে নিরস্ত্র বাঙালির ওপর চালায় বর্বর আক্রমণ। দীর্ঘ নয় মাস রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ, ত্রিশ লাখ শহীদের রক্ত ও দুই লাখ মা-বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে বাঙালি পায় তার কাক্সিক্ষত স্বাধীনতা।
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ মধ্য রাতেই হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি, বাংলাদেশের অবিসংবাদিত নেতা, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হন। কথিত আছে যে, গ্রেপ্তার হওয়ার পূর্ব মুহূর্তে ২৫ মার্চ রাত ১২টার পর (অর্থাৎ, ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে) বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাক্ষরিত বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রটি চট্টগ্রামস্থ তৎকালীন ইপিআর এর ট্রান্সমিটারে করে প্রচার করার জন্য প্রেরণ করা হয়। ঘোষণায় বলা হয়Ñ ‘‘এটাই হয়তো আমার শেষ বার্তা, আজ থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন। আমি বাংলাদেশের মানুষকে আহ্বান জানাই, আপনারা যেখানেই থাকুন, আপনাদের সর্বস্ব দিয়ে দখলদার সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে শেষ পর্যন্ত প্রতিরোধ চালিয়ে যান। বাংলাদেশের মাটি থেকে সর্বশেষ পাকিস্তানি সৈন্যদের উৎখাত করা এবং চূড়ান্ত বিজয় অর্জনের আগ পর্যন্ত আপনাদের যুদ্ধ অব্যাহত থাকুক।’’ ২৬ মার্চ বেলাল মোহাম্মদ, আবুল কাসেমসহ চট্টগ্রাম বেতার কেন্দ্রের কয়েকজন কর্মকর্তা ও স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা এমএ হান্নান প্রথম শেখ মুজিব এর স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রটি মাইকিং করে প্রচার করেন। পরবর্তীতে ওইদিনই পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর বাঙালি অফিসার মেজর জিয়াউর রহমান চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণাপত্রটি পাঠ করেন।
১৯৭১ সালের ৯ ডিসেম্বর এক বার্তায় গভর্নর মালিক পাকিস্তানের প্রেসিডেন্টকে সামরিক পরিস্থিতি ঘুলাটে এমন খবর জানিয়ে আশু যুদ্ধবিরতি ও রাজনৈতিক সমাধানের আহবান জানান। এরই প্রেক্ষিতে ১০ ডিসেম্বর গভর্নরের সামরিক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলী ও মুখ্য সচিব পশ্চিম পাকিস্তানি অফিসার মুজাফফর হোসেন ক্যান্টনমেন্টে জেনারেল নিয়াজির সঙ্গে একমত হয়ে ঢাকায় জাতিসংঘের প্রতিনিধির কাছে আত্মসমর্পণের আবেদন জানান। মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় সামরিক বাহিনীর সম্মিলিত আক্রমণের মুখে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর ঢাকার তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে পাকিস্তানী ইস্টার্ন কমান্ড সেনাবাহিনীর কমান্ডার লে জেনারেল এএকে নিয়াজি ৯৩,০০০ হাজার সৈন্যসহ মিত্র বাহিনীর প্রধান লে জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরা এবং হাজার হাজার উৎফুল্ল জনতার সামনে আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মসমর্পনের নির্দশনপত্রে স্বার করেন। বিপুল সংখ্যক সৈন্য নিয়ে আত্মসমর্পণ করার ইতিহাসটি ছিলো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সর্ববৃহৎ আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠান। বাঙালি জাতির বহু ত্যাগ-তীতিক্ষার পর আকাঙ্খিত বিজয় এসে ধরা দেয় ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর। ওই তারিখে পাকিস্তান সেনাবাহিনী আত্মসমর্পন করলেও সারা দেশে সকল পাকিস্তানীদের আত্মসমর্পণ করাতে সময় লাগে ২২ ডিসেম্বর পর্যন্ত। এরই মাধ্যমে দীর্ঘ নয় মাসের রক্তয়ী মুক্তিযুদ্ধের অবসান ঘটে; বিশ্ববুকে প্রতিষ্ঠিত হয় স্বাধীন রাষ্ট্র বাংলাদেশ। [সূত্র : উইকিপিডিয়া]
মুক্তিযুদ্ধ আমাদের অহংকার, মুক্তিযোদ্ধারা জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান। মুক্তিযুদ্ধের বীরত্বগাঁথা ইতিহাস পৃথিবীর বুকে আমাদেরকে শক্তিশালী জাতি হিসেবে স্থান করে দেয়। হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি, স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি, বাঙালি জাতির স্বপ্নদ্রষ্টা, বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে ১৯৭৫ সালে সপরিবারে হত্যার মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস ও বাঙালি জাতির আত্মত্যাগকে অস্বীকার করে বিকৃত ইতিহাস চর্চায় লিপ্ত হয় পঁচাত্তর পরবর্তী শাসকগোষ্ঠী। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানের কবল থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে ঠিকই কিন্তু বিকৃত ইতিহাস উপস্থাপন এবং জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান মুক্তিযোদ্ধাদের অবজ্ঞাসহ বাংলাদেশকে অকার্যকর রাষ্ট্র হিসেবে বহির্বিশ্বে তুলে ধরার জোর প্রচেষ্টা চালাচ্ছে স্বাধীনতা বিরোধি শক্তি। সকল অপপ্রচার ও অসত্য ইতিহাস চর্চা থেকে মুক্ত হোক বাংলাদেশ। প্রতিষ্ঠিত হোক মুক্তিযুদ্ধের মহান চেতনা। বিজয়ের মাস ডিসেম্বর যেন আমাদের সেই সত্য ও সুন্দরের পথ বাতলে দেয়।
লেখক : কলামিস্ট ও সিনিয়র গ্রাফিক্স ডিজাইনার।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT