বিশেষ সংখ্যা

বিজয় দিবস : ইতিহাসের সিঁড়ি বেয়ে

বেলাল আহমদ চৌধুরী প্রকাশিত হয়েছে: ১৬-১২-২০১৬ ইং ০২:৩১:৪৫ | সংবাদটি ২৩৫ বার পঠিত

সূর্যসেন বলেছেন, আগামী দিনের বংশধরেরা জানুক যে, তাদের পূর্ব পুরুষগণ মোটেই কাপুরুষ ছিলেন না। স্বাধীনতা সংগ্রামের জন্য বাংলায় কখনো প্রাণের অভাব হয়নি। একটি জাতির স্বাধীনতা আনতে হলে বহু প্রাণের প্রয়োজন হয়।
১৯৫৭ সালের ২৩ জুন পলাশীর আ¤্রকাননে বাংলার নবাব সিরাজ উদ্দৌলার সঙ্গে লড়াই হয়েছিল ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির রবার্ট কাইভের। এ লড়াইয়ে নবাব সিরাজ উদ্দৌলার তার সভাসদ মীরজাফরদের মোনাফিকের কারণে পরাজিত হন এবং বিনিময়ে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী ভারতবর্ষ শাসনের ভীত রচনা করে। গত দুশ বছর ধরে পলাশী যুদ্ধ হয়ে দাড়িয়েছে বিদেশী শাসনের বিরুদ্ধে বাঙালির লড়াইয়ে প্রতীক হিসেবে।
ইংরেজ শাসন শোষণে মানুষ বিপর্যস্ত হয়ে উঠলে  তা প্রতিরোধে এগিয়ে আসেন মুসলমান ফকির ও কৃষকেরা। ১৭৬০ সালে ঢাকায় ইংরেজ বাণিজ্য কুঠি আক্রমণের মাধ্যমে এই বিদ্রোহ শুরু হয়। ১৮০০ সাল পর্যন্ত বাংলা ও বিহারের বিভিন্ন অঞ্চলে বিদ্রোহ ছড়িয়ে পড়ে। এই বিদ্রোহের নেতৃত্বে ছিলেন ফকির মজনু শাহ, ভবানী পাঠক, দেবী চৌধুরী রানী প্রমুখ।
১৮৭৩ সালে ইংরেজ তাঁবেদার দেবী সিংহের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে উত্তরবঙ্গের কৃষকেরা সংঘটিত হয়ে বিদ্রোহ শুরু করে। তখন কৃষক বিদ্রোহের নেতা ছিলেন নুরুলদীন, দিরিজানাথ রায় প্রমুখ। ১৮৩১ সালে ওহাবী মতবাদে দীক্ষিত ফরিদপুরের হাজী শরীয়তউল্লাহ অত্যাচারী জমিদারের বিরুদ্ধে আন্দোলন  শুরু করেন।
ঊনিশ শতকে বাংলায় ব্যাপক আকারে ছড়িয়ে পড়েছিলে নীলচাষ, ইংরেজ নীলকররা জোর জবরদস্তির মাধ্যমে কৃষকদের বাধ্য করে নীল চাষে। ১৮৫৯-৬০ সালে খুলনা, যশোহর ও নদীয়া জেলার  নীলচাষীরা নীলকরের বিরুদ্ধে ব্যাপক বিদ্রোহ শুরু করে।
ভারতশাসন থেকে বিট্রিশ রাজকে উৎখাতের জন্য ভারতের বিভিন্ন জায়গায় আন্দোলন তীব্র আকার ধারণ করে। ১৯৩০ সালের ১৮ এপ্রিল মাস্টারদা সূর্যসেনের নের্তৃত্বে চট্টগ্রামে সশস্ত্র অভ্যুত্থান ঘোষণা করা হয়। এতে অসংখ্য বিপ্লবী শহীদ হন এবং কারাবরণসহ আন্দামান দীপপুঞ্জে নির্বাসিত হন।
১৯৩৭-৪৯ ময়মনসিংহের  গারো পাহাড়ের পাদদেশে শুরু হয় ‘টঙ্ক’ আন্দোলন। এই অঞ্চলের জমিতে ফসল না হলে কৃষকেরা জমিদারকে খাজনা দিতে বাধ্য ছিল। এই অমানবিক প্রথার বিরুদ্ধে কমিউনিস্ট নেতা কমরেড মনি সিং এর নের্তৃত্বে আন্দোলন শুরু হয় এবং ১৯৫০ সালে টঙ্ক আন্দোলন ব্রিটিশ সরকার বাতিল করতে বাধ্য হয়।
১৯৪৯-৫০ সালে রাজশাহীর নাচোলে ইলা মিত্রের নেতৃত্বে গড়ে ওঠে তেভাগা আন্দোলন। ‘জান দিব তবু ধান দিব না’ এই শ্লোগান নিয়ে আন্দোলন শুরু হয়।
১৯৫৭ সালের ২৩ জুন বাংলার স্বাধীনতার সূর্য অস্তমিত হওয়ার ১৯২ বছর পর ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন জন্ম হয় তদানিন্তন পূর্বপাকিস্তান মুসলিম আওয়ামী লীগ। ১৯৫৫ সালের ২১-২৩ অক্টোবর সম্মেলনে মুসলিম শব্দ বাদ দিয়ে অসাম্প্রদায়িক নাম রাখা হয়। তখন দলের নামকরণ করা হয় পূর্ব পাকিস্তান ‘আওয়ামী লীগ’।
১৯৪৭ সালে ব্রিটিশদের নিকট থেকে স্বাধীনতা লাভের পর থেকেই একটি জাতি অন্য জাতির উপর আধিপত্য করার ফলেই দুই প্রদেশের সম্পর্কের  অবনতি ভৌগলিক কারণে চরম আকার ধারন করে। সেগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল ১৯৫২’র ভাষা আন্দোলন, স্বাধীনতার দর্পণ ঐতিহাসিক ৬ দফা আন্দোলন, ৬৯’র গণআন্দোলনসহ ১৯৭০ এর সাধারণ নির্বাচন। জাতীয় পরিষদে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের ১৬৯ টি আসনের মধ্যে ১৬৭ টি আসনে আওয়ামী লীগ বিপুল ভোটে জয়লাভ করে।
ঘটনা প্রবাহে একসময় রুপ নেয় দেশভিত্তিক আন্দোলনে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সারা দুনিয়ায় নির্যাতিত মানুষের আপোষহীন অবিসংবাদিত নেতা, হিরোদের হিরো হয়ে আবির্ভূত হন। মূল কারণ ছিল - তাঁঁর ব্যক্তিগত সততা, নীতির প্রতি দায়বদ্ধতার সঙ্গে যোগ করতে হয় অসীম সাহস, তার মনে ক্ষুদ্র চিন্তা বা ক্ষুদ্র উদ্দেশ্যের অনুপস্থিতি ছিল। বঙ্গবন্ধুর দৃষ্টিভঙ্গি ছিল অভিজ্ঞতায়, স্বতন্ত্র ভাবধারায় চিন্তাশীল। তার একমাত্র চিন্তা ছিল পাকিস্তানীদের ঔদ্ধত্য থেকে বাংলাদেশের মুক্তি। কিন্তু পরিতাপের  বিষয় পাকিস্তানের সামরিক জান্তা বঙ্গবন্ধুর হাতে রাষ্ট্রের ক্ষমতা হস্তান্তর না করে  ‘অপারেশন সার্চ লাইট’ পরিচালনা করে বাংলার বুকে গণহত্যা শুরু করে। ১৯৭১ সালে আওয়ামীলীগের নেতৃত্বে মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে এক সাগর রক্তের বিনিময়ে একটি বিশিষ্ট জাতির আলাদা ভুখন্ড অর্জিত হয় বাংলাদেশের স্বাধীনতা। জাতি মুক্তিযুদ্ধের হিরোদের অবদান শ্রদ্ধা ও মুগ্ধতায় হৃদয়ের গহীনে ধারণ করে আছে।
ইংরেজী বর্ষের শেষ মাস ডিসেম্বর  বাঙালির জীবন ইতিহাসের পরিক্রমায় এই মাসটির গুরুত্ব ও উচ্ছ্বাস অপরিসীম। বিজয় দিবসে আমাদের শপথ হউক - অতীতের অবিশ্বাস ও বিরুপতা সরিয়ে রেখে ভ্রাতৃপ্রতিম মনোভাব নিয়ে নতুন বাংলাদেশ গড়ার অঙ্গীকার নিয়ে বলব চেঞ্জ উই নিউ। ১৯৭১ সালের ২৬ শে মার্চ মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয় এবং ১৬ ই ডিসেম্বর স্বাধীনতা অর্জনের মধ্য দিয়ে  এর পরিসমাপ্তি ঘটে।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT