বিশেষ সংখ্যা

স্বাধীনতা যুদ্ধে বিলাত প্রবাসীদের ভূমিকা

আফতাব চৌধুরী প্রকাশিত হয়েছে: ২৬-০৩-২০১৭ ইং ০২:৩০:৫৫ | সংবাদটি ১৭৮ বার পঠিত



মার্চ মাস, বাংলাদেশের ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা একটি চিরশাশ্বত মাস। এ মাসটিতেই  বাঙালি জাতি তাঁর অতি আকাক্সিক্ষত স্বাধীনতাকে পরম গৌরবে জয় করে নিয়েছিল। সময়ের ¯্রােত বয়ে চলে অবিরত, নানা বাধা-বিপত্তি অতিক্রম করে বিজয়ের ৪৫ বছর পেরিয়ে সাফল্যমন্ডিত বাংলাদেশ নামক মধ্যবয়সী  যুবাটি ৪৬ বছরের দোরগোড়ায় কড়া নাড়ছে। দুঃসহ দীর্ঘ নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধে জানা-অজানা অসংখ্য নারী-পুরুষ অপরিসীম আত্মত্যাগের মাধ্যমে চিরস্মরণীয় করে রেখেছেন ১৯১৭ সালটিকে। আর এ অপরিসীম অবদান রাখা অকুতোভয় জনতার একটি বড় অংশই হল বিলেত প্রবাসী বাঙালিরা।
স্বাধিকার আদায়ের আন্দোলনের সূচনার গল্পটি ১৯৫২ সালের রক্ত রাঙা ফাগুনের পথ ধরেই এসেছিল। প্রবাসী বাঙালিরা বরাবরই অধিকার সচেতন আর তৃতীয় বাংলা বলে সুপরিচিত বিলেতবাসী বাঙালি তো কোন অন্যায়ের কাছেই মাথা নত করে না। মুক্তি সংগ্রামের তাঁতানো আঁচের উত্তাপটি শুধু বিলেত নয় সমগ্র আন্তর্জাতিক অঙ্গনে জোরালোভাবে ছড়িয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যেই ১৯৬৯ সালের আগস্ট মাসের শেষ ভাগে বার্মিংহাম ১৫ নং ডাউন স্ট্রীটে আস্টনে ‘ইস্ট পাকিস্তান লিবারেশন ফ্রন্ট নামে ৩০ সদস্যের একটি সর্বদলীয় এ্যাকশন কমিটি গঠন করা হয় যাতে, সকলের সম্মতিক্রমে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন মরহুম আব্দুস সবুর চৌধুরী ও সেক্রেটারী মরহুম আজিজুল হক ভূঁইয়া। এই লিবারেশন ফ্রন্টের একটি মুখপাত্র ছিল ‘বিদ্রোহী বাংলা’ যা প্রতি ১৫ দিন পর পর প্রকাশ মোস্তাফিজুর রহমানের সুচিন্তিত তত্ত্বাবধানে। সচেতন ভাবেই, পশ্চিম পাকিস্তানের পূর্ব পাকিস্তানের উপর দীর্ঘদিনের জোরপূর্বক শোষণ নীতির, ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে বিভিন্ন দেশ হতে অস্ত্রশস্ত্র আমদানি ও আর্থিক সাহায্য প্রাপ্তির কথা এতে গুরুত্ব সহকারে ছাপা হতো।
কমিটির কার্যক্রম শুধুই অফিস কেন্দ্রিক নয় বরং গণমানুষের কাছে পৌঁছানোর প্রয়াসেই ১৯৭০ সালের ২৯শে নভেম্বর বার্মিংহামের দিগবাত সিবিক এলাকায় এক জনসভার আয়োজন করা হয়। সাড়া মিলেছিল অভূতপূর্ব, বিপুল সংখ্যক পাকিস্তানি, ভারতীয় আর স্বাধীনতাকামী বাংলাদেশি এতে উপস্থিত ছিলেন। পাকিস্তানের তৎকালীন বিখ্যাত ছাত্র নেতা তারেক আলীর উপস্থিতিতে একটিমাত্র কথাই উচ্চারিত হতে থাকে সভাস্থ সকল জনতার মুখে মুখে; পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধীনতা ছাড়া আর কোনো কিছু বিকল্প হতে পারে না। আন্দোলন বাস্তবায়নের জন্য নানা পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়, পাগলা ঘোড়ার মতই যেখানে ওত পেতে থাকে পাকিস্তানের সবের্ক্ষাচ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত গুপ্তচর সি.আই.ডি।
বিশ্বজনমতকে সোচ্চার করতেই ৫ মার্চ ১৯৭১ সালের কাকডাকা ভোরে কমিটির কর্মমুখর সদস্য বোঝাই একটি কোচ বার্মিংহাম হতে লন্ডন অভিমুখে পাকিস্তান দূতাবাসের উদ্দেশ্যে  রওয়ানা হয়। বিদ্রোহী বাঙালিরা অতীব সাহসের সাথেই পাকিস্তান হাই কমিশন অফিস ঘেরাও করে পাকিস্তানি পতাকা ও স্বৈরশাসক ইয়াহিয়ার প্রতিমূর্তিতে আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেয়। ইস্ট পাকিস্তান লিবারেশন ফ্রন্টের সেক্রেটারী আজিজুল হক স্বাধীন বাংলার স্মারকলিপি পাকিস্তানের হাই কমিশনার সুলেমান আলীর হাতে তুলে দেন। দীর্ঘসময় ব্যাপি সাহসী বাঙালিরা কমিটির নেতৃত্বে সভা, মিছিল, বিক্ষোভ প্রদর্শন করে। বিদ্রোহের এ বিস্ফোরিত আগুনটি অলইন্ডিয়া রেডিও এবং ভয়েস অব আমেরিকা বার বার প্রচার করতে থাকে। সেদিনের, পোড়া পাকিস্তানি পতাকাটিই ছিল বিবিসির সংবাদের অন্যতম হেডলাইন। ইংল্যান্ডসহ পুরো বিশ্বে রাজনীতি সচেতন সাধারণ জনতা তুমুল প্রতিবাদে ফেটে পড়ে। বিশ্বের আনাচে-কানাচে প্রতিবাদমুখর বাঙালিরা একযোগে জেগে উঠে। বঙ্গবন্ধুর সে ঐতিহাসিক ৭ মার্চের রেসকোর্সের উজ্জীবিত ভাষণের ঢেউটি আছড়িয়ে পড়ে সুদূর বিলেতেও। ৭ই মার্চ ডাকা সর্বদলীয় সভাটিতে প্রায় ১০,০০০-এর বেশি বাঙালি জড়ো হন। সকাল ১০ টায় শুরু হওয়া এ সভাটির বিদ্রোহরত মানুষগুলো পুনরায় পাকিস্তান হাই কমিশন ঘেরাও করে বাংলার স্বাধীনতা ঘোষণা করে। তিন ঘন্টা ব্যাপি যানজটে বন্ধ থাকা সেন্ট্রাল লন্ডনে আটকে পড়া পথচারীরা বিন্দুমাত্র অসহিষ্ণুতা প্রদর্শন করেনি। বরং হাসিমুখেই স্বাগত জানিয়েছেন স্বাধীনচেতা বাঙালির এ ন্যায্য দাবি। তৎকালীন মেট্রোপলিটন পুলিশ সূত্রে বলা হয়, দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর লন্ডনে এটিই ছিল সবচেয়ে বড় সমাবেশ।
২৫ ’শে মার্চের কালোরাত্রি, অপারেশন সার্চলাইট নামের সে ভয়াবহ ধক্ষংসযজ্ঞের শুরু। প্রতিনিয়ত সতর্ক আন্দোলনরত কর্মীরা উৎসুক দৃষ্টি ছিল কাপুরুষ পাকিস্তানি আর্মির এ হঠকারী আক্রমণে বিধ্বস্ত স্বদেশের প্রতি। হতাশ, মুষড়ে পড়া স্বদেশীদের চাঙ্গা করতেই মানুষের কানে কানে পৌঁছানো হয় সে অমোঘ মন্ত্রটি, দেশে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়েছে। হাজার হাজার স্বতস্ফূর্ত জনতার পদচারণায় ভরে উঠে বার্মিংহামের স্মলহিথ পার্ক মার্চ মাসের ২৭ তারিখ। অতি আকাক্সিক্ষত স্বাধীনতার আন্দোলনের বৃহত্তর সার্থেই লিবারেশন ফ্রন্টকে বিলীন ঘোষণা করে মরহুম জগলুল হক পাশাকে প্রেসিডেন্ট ও পূর্বোক্ত সেক্রেটারী পদটি অবিকল রেখে গঠন করা হয় বাংলাদেশ অ্যাকশন কমিটি। কমিটির প্রতিদিনের কার্যক্রমে ব্যয়িত অর্থের হিসাবপত্রের প্রকৃত বিবরণীটি ঠিকভাবে পাওয়ার উদ্দেশ্যে মোহাম্মদ ইসরাইলকে নতুন কমিটির নির্দেশিত অডিট কমিটির চেয়ারম্যান পদে নিযুক্ত করা হয়। বাঙালির প্রাণ প্রিয় নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব তখন পাকিস্তানের কারাগারে বন্দি। তবে জাতির পিতার সার্বক্ষণিক সংবাদ যে তাদের চাইই চাই। অলক্ষ্যে থেকেও যে তিনি মুক্তিকামী বাঙালির সাব্র্ক্ষণিক অনুপ্রেরণা, যুদ্ধরত দামাল মুক্তিযোদ্ধাদের নিত্য সাহস। আর তাইতো, বন্দি সে নেতার সঠিক খবর জানতে অ্যাকশন কমিটি ৫০০ পাউন্ড ব্যয়ে ব্যারিস্টার কিউ সি উইলিয়ামসকে পাকিস্তান প্রেরণ করে। তারপর, বুক থেকে সে পাষাণভার নেমে যাওয়া। হাজার বছরের সে শ্রেষ্ঠ বাঙালি বহাল তবিয়তেই আছেন চার দেওয়ালের সে অন্ধকার কারাগারে।
গণতন্ত্রের সূতিকাগার বলে পরিচিত ব্রিটিশ পার্লামেন্টে সেসময় প্রতিদিন বাংলাদেশের বিষয় নিয়ে একটা এজেন্ডায় আলোচনা করা হতো। ব্রিটেনের বর্তমান রাণীমাতা এলিজাবেথ সেসময় ব্যক্তিগত উদ্যোগে পাকিস্তানের কারাগারে বঙ্গবন্ধুর সংবাদ জেনে তাঁকে জীবিত রাখা ও তাঁর স্বাস্থ্যের প্রতি যতœ নেওয়ার জন্য পাক প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়াকে এক সতর্কবার্তায় হুঁশিয়ার করে দেন। ব্রিটিশ রাজের সে হুঁশিয়ারী বার্তা স্বাধীন বাংলার স্থপতির জন্য আশীর্বাদস্বরূপ ছিল। হয়তোবা সে কারণেই পাক সরকার তাঁকে হত্যা করতে সাহস পায়নি। বাঙালি জাতি চিরদিন রাণীমাতার এ সময়োচিত উদ্যোগকে সাধুবাদ জানাবে।
পরবর্তীতে, রাণীর পদাংক অনুসরণ করেই ৩রা মে ১৯৭১ সালে ব্রিটিশ পার্লামেন্টে দীর্ঘকাল বাংলাদেশ পরিস্থিতি নিয়ে আলাপ-আলোচনা করে মোট ৩০০ জন এমপি বাঙালির স্বাধীনতার পক্ষে একমত হয়ে ব্রিটিশ সরকার হতে বিপুল গোলা বারুদসহ অন্যান্য সাহায্য পাকিস্তানকে দেওয়া বন্ধ করে দেওয়া হয়। ২৭ শে মার্চের স্মলহিথ পার্কের সফল জনসমাবেশ দারুণভাবে উজ্জীবিত করেছিল প্রবাসীদের। ২৮ শে মার্চ স্বাধীন বাংলার গৌরবময় পতাকা সে জনারণ্যে মুখর পার্কে উত্তোলন আর মুক্তিযুদ্ধে যোগদানকারীদের একটি সুলিখিত তালিকা প্রণয়নের মাধ্যমে অ্যাকশন কমিটি দেশের প্রতি দায়বদ্ধতা আরো অনেকখানি বেড়ে যায়। মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক বঙ্গবীর ওসমানী সে সময় তাঁর বিজ্ঞ মতামত ব্যক্ত করেন। মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণেচ্ছু কিশোর-তরুণের সংখ্যা নেহাত কম নয় দেশে! আর প্রবাসে স্বদেশের তরে আন্দোলন এতো আরেক মুক্তিযুদ্ধ! তাঁর এ প্রাজ্ঞ মতামতের ফলাফল চমকপ্রদ, ফোন করে এবং বার্মিংহাম হতে লোক পাঠিয়ে অতি অল্প সময়ের মাঝে মিডলইস্টসহ সর্বমোট ৮৫টি দেশে অ্যাকশন কমিটি গঠিত হয় যারা একযোগে দুর্বার গতিতে বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের জন্য কাজ করে যেতে থাকে অবিরাম। তবে, কেন্দ্র হতেই সমস্ত কিছুর উৎপত্তি আর এ কেন্দ্রকে ঘিরেই আবর্তিত হয় সবকিছু। এ অতীত সত্য বাক্যটিকে সামনে রেখেই সকল অ্যাকশন কমিটির কার্যক্রম একত্রে পরিচালনা করতে মরহুম বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরীকে প্রেসিডেন্ট ও আযিযুল হক সাহেবকে পুনরায় সেক্রেটারী পদে নিয়োগ করে ৫ সদস্যের একটি স্টিয়ারিং কমিটি ২৪ শে এপ্রিল ১৯৭১ সালে কভেন্ট্রিতে গঠন করা হয়। অল্প সময়ের মাঝেই স্টিয়ারিং কমিটি বিশ্বজোড়া মোট ৮৫টি অ্যাকশন কমিটি হতে সর্বমোট ৪,০৬,৮৫৬ পাউন্ড চাঁদা তুলতে সমর্থ হয় যা হতে কমিটি পরিচালনা বাবদ সরাসরি  ব্যয়িত অর্থের পরিমাণ ৩৩, ২১২ পাউন্ড। অডিট কমিটির চেয়ারম্যান মোহাম্মদ ইসরাইল সেসময়কাল পূর্নাঙ্গ হিসাব বিবরণীটি বাংলাদেশ ফান্ডের হিসাব রক্ষক জেনারেল কাজী মুজিবুর রহমানের কাছে পাঠিয়ে দিয়ে যুদ্ধ বিধ্বস্ত বাংলাদেশকে মানসিক ভাবে চাঙ্গা রাখতে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন।

এক কিশোর মুক্তিযোদ্ধার কথা
চঞ্চল মাহমুদ ফুলর
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে সিলেট অঞ্চলে যে ক’জন কিশোর মুক্তিযোদ্ধা সরাসরি সম্মুখ সমরে অংশ নিয়েছিলেন তাদের মধ্যে অন্যতম, বীর মুক্তিযোদ্ধা মোঃ মুজিবুর রহমান মানিক। তিনি ৪ নং সেক্টরের তামাবিল সাব-সেক্টরের একজন তুখোড় ও লড়াকু মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছিলেন। মুক্তিযুদ্ধে যাত্রার প্রাক্কালে এই কিশোর যোদ্ধার বয়স ছিল মাত্র ১৪ বছর ৫ মাস। সে সময় তিনি সিলেটের রাজা গিরিশ চন্দ্র (জিসি) হাইস্কুলে দশম শ্রেণিতে অধ্যয়ন করতেন। গ্রামের বাড়ি সিলেটের কানাইঘাট উপজেলার রতনপুর গ্রামে। ওই গ্রামেরই অধিবাসী হাতেম আলী ও গুলজান বিবি দম্পতির তৃতীয় সন্তান। মানিক ভাইয়ের সহোদর  ছিলেন তৎকালীন সিলেট-৫ আসন-এর এমপিএ এবং আওয়ামী লীগের জেলা পর্যায়ের একজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা। এ কারণে মানিক ভাই বেড়ে উঠেছিলেন রাজনৈতিক পরিমন্ডলের মধ্যে। আর বড় ভাই এমপিএ হওয়ার সুবাদে ওই অল্প বয়সেই ছিলেন তিনি রাজনৈতিক সচেতন।
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী যখন বাঙালিদের ওপর কাপুরুষের মত পৈচাশিক আক্রমণ চালায় তখন সিলেট শহরের টিলাগড়ের বাসা ছেড়ে পালিয়ে যেতে হয়। প্রাণরক্ষার্থে মানিক ভাইদের পরিবার গ্রামের বাড়িতে আশ্রয় নেয়। তখনকার প্রেক্ষাপটে অজ-পাড়াগাঁয়ের বাড়িতেও স্বস্তি ছিল না। পাক-হানাদার বাহিনী বাঙালি অমুসলিম জনগোষ্ঠী এবং আওয়ামী লীগ নেতাদের বাড়িঘরে হামলা চালিয়ে সেগুলো জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে ধ্বংস করে দিচ্ছিল। আর যেহেতু মানিক ভাইয়ের সহোদর হাবিবুর রহমান তখনকার এমপিএ, তাই তাঁদের পৈতৃক নিবাস যে পাক হানাদারদের লক্ষ্যবস্তু হবে, এটা নিশ্চিত বলেই ধরে নিয়েছিলেন পরিবারের লোকজন। উপজেলা সদর থেকে ‘জ্বালাও-পোড়াও’ করে পাক সৈন্যরা মানিক ভাইদের রতনপুর গ্রামের পাশের গ্রামে চলে এসেছে। পাশের গ্রাম সরুখেলের বাসিন্দা ও পুরোনো জমিদার গৌরীচরণের সুদৃশ্য বাড়িটি ছাই করে দেয় পাক সেনারা। পুরনো এই জমিদার বাড়িটি দখলের উদ্দেশ্যে স্থানীয় এক দালাল পাক সৈন্যদের সরুখেলে নিয়ে এসেছিল। নিয়তির কি নির্মম পরিহাস! যে দালাল অন্যের বাড়ি দখল করার অসৎ উদ্দেশ্যে পাকসেনাদের নিয়ে এসেছিল, সেই দালালের বাড়িই পাক বাহিনী জ্বালিয়ে ধ্বংস করে আসার পথে দালালকে বুকে গুলি করে হত্যা করে চলে যায়। এই দালালরা যে স্বার্থের মোহে কতটা অমানবিক হতে পারে সে দৃশ্যও দেখেছেন কিশোর মানিক। ওই গ্রামের আরেক দালাল ছিল মোহাম্মদ চৌধুরী। সে দালালের নেতৃত্বে রাজাকাররা দিনে-দুপুরে জমিদার গৌরীচরণের বাড়ির কয়েক হাজার মন ধান লুট করে নিয়ে যায়।
সম্ভ্রান্ত পরিবারের গৌরীচরণের সাথে মানিকের বাবা হাতেম আলীর ছিল ঘনিষ্ট সম্পর্ক। আর ওই পরিবারের ওপর এমন পৈচাশিক অত্যাচার কিশোর মানিকের মনে প্রচন্ড দাগ কাটে। তিনি ভাবতে থাকেন এই অত্যাচারিদের প্রতিহত করার পাশাপাশি ওদের হাত থেকে যেকোন উপায়ে দেশ ও জাতিকে রক্ষা করতে হবে। তখনই তিনি সিদ্ধান্ত নেন মুক্তিযুদ্ধে যাবার। আর সে উদ্দেশ্যে রওয়ানা করেন বড় ভাই এমপিএ হাবিবুর রহমানের কাছে। এর অনেক আগেই এমপিএ হাবিবুর রহমান ভারতে চলে গিয়েছিলেন। মানিক ভাইও গেলেন মুক্তারপুরে যেখানে তাঁর ভাই থাকার কথা। জানতে পারেন সহোদর এমপিএ ডাউকিতে আছেন। অবশেষে সেখানে গেলেন মানিক ভাই এবং বড় ভাইয়ের সাথে রইলেন কয়েকদিন। অতঃপর যোগ দেন ইস্টার্ন কমান্ড ওয়ান-এর ইকো-ওয়ানে। ইকো-ওয়ান ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ ক্যাম্প। দেখলেন তাঁর মতো অনেক কিশোর-তরুণ সেখানে যুদ্ধের প্রশিক্ষণ নিচ্ছে। তাদের দেখে মানিক ভাইয়ের উৎসাহ আরো বেড়ে যায়। যোগ দেন প্রশিক্ষণ শিবিরে। ভারতীয় সেনাবাহিনীর গোর্খা রেজিমেন্টের ‘সুবেদার থাব্বা’ প্রশিক্ষণ প্রদান করছেন। কোমলে-কঠোরে মেশানো মিঃ থাব্বা ছিলেন অসম্ভব সাহসী আর পরিশ্রমী সেনা কর্মকর্তা। ট্রেনিংকালে তিনি ছিলেন অত্যন্ত কড়া আবার ব্যক্তিগত সময়ে একজন অমায়িক মানুষ। বিশেষ করে কিশোর যোদ্ধাদের তিনি সন্তানের মতো ভালোবাসতেন। আরেক প্রশিক্ষক ছিলেন শিখ ধর্মাবলম্বী এক ক্যাপ্টেন। আলাপকালে মানিক ভাই ওই শিখ ক্যাপ্টেনের নামটি মনে করতে পারছিলেন না। এ দু’জন ছাড়াও আরো কয়েকজন প্রশিক্ষকের অধীনে মাসাধিককাল প্রশিক্ষণ নিতে হয়েছে তাঁদের। প্রশিক্ষণ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মন অস্থির হয়ে যায় মানিক ভাইয়ের। দেশে না গেলে যে যুদ্ধ করা যাবে না। শেষ পর্যন্ত এলো সেই মাহেন্দ্রক্ষণ, জানিয়ে দেয়া হলো ‘তোমরা এবার যুদ্ধে যাওয়ার জন্য উপযুক্ত হয়েছো।’
তারপর মানিক ভাইসহ একদল মুক্তিযোদ্ধাকে পাঠানো হলো ভারতীয় সীমান্তের নো-ম্যান্স ল্যান্ডস সংলগ্ন সিলেটের তামাবিলে। প্রশিক্ষণকালেই জানতে পারেন সরাসরি রাইফেল চালানোর যুদ্ধে তিনি যুক্ত হবেন অন্যদের তুলনায় কম। তবে যা করবেন তা হবে বেশ আনন্দায়ক। কাছে থেকেই সুফল দেখা যাবে সেই যুদ্ধের। তাঁকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছিল ‘বিস্ফোরক প্রতিস্থাপন’ প্রক্রিয়াটি। কাজটি ছিল শত্রু বাহিনীর চলার পথের ব্রিজ ও কালভার্ট ধ্বংস করে দেয়া। প্রয়োজনে অন্য স্থাপনাও গুঁড়িয়ে দেয়া যাবে। সামনা-সামনি ফল দেখার সুযোগ পাওয়ার আনন্দও আছে। সেই কারণেই হয়তো তিনি কাজটিকে আগ্রহের সাথে নিয়েছিলেন। আর বাস্তবে তাঁর দক্ষতার প্রমাণ দেখালেন। আর দক্ষতা ও আন্তরিকতার কারণে মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে ওই সাব-সেক্টরে তিনি এক্সপ্লোসিভ ইনচার্জ হওয়ার গৌরব অর্জন করেছিলেন। ওই এলাকার অধিনায়ক ছিলেন ভারতীয় সীমান্ত রক্ষীবাহিনী (বিএসএফ)-এর ‘মেজর রাও’। তামাবিল পৌঁছার পর নিরাপদ স্থান দেখে নিজের জায়গা করে নিলেন। তামাবিলে এখন যেখানে কাস্টমস্ অফিস তাতেই তিনি বিস্ফোরক দ্রব্যসহ নিজের থাকার জায়গা করেন। দেশের মাটিতে এবং একজন সাহসী যোদ্ধার অধীনে থাকার সুযোগ পেয়ে কিশোর মুক্তিযোদ্ধা মানিক নিজেকে ধন্য মনে করলেন।
বিস্ফোরক দিয়ে ব্রিজ কিংবা স্থাপনা উড়িয়ে দেওয়ার কাজটি প্রতিদিন করতে হতো না। ফলে তিনি বাড়তি সুযোগ হিসেবে সম্মুখ সমরে অংশ নেওয়ার চেষ্টা করেন। অন্যদিকে যুদ্ধের প্রয়োজনেও বাড়তি যোদ্ধা সঙ্গে নিতে হতো মুক্তিযোদ্ধাদের। যারা সমানতালে যুদ্ধের ময়দানে অস্ত্র চালিয়েছেন।
স্মরণে থাকা একটি অপারেশনের কিছু কথা বললেন মানিক ভাই। গোয়াইনঘাট রাস্তার আটালিয়াই নামে একটি ব্রিজ ধ্বংস করার জন্য তাঁকে দায়িত্ব দেয়া হয়। সে অপারেশনে লেঃ রফিকুল আলম ছিলেন অধিনায়ক। গভীর রাতে তাঁরা রওয়ানা হন অপারেশনের উদ্দেশ্যে। আগেই ‘রেকি’ (অর্থাৎ আগাম খোঁজ-খবর নেয়া। যুদ্

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT