বিশেষ সংখ্যা

শ্রমিকদের সংগঠিত হওয়া একান্ত জরুরী

আফতাব চৌধুরী প্রকাশিত হয়েছে: ০১-০৫-২০১৭ ইং ০১:২৬:২২ | সংবাদটি ৯৬ বার পঠিত


ভূমিদাস ব্যবস্থা উচ্ছেদের মধ্যে দিয়ে সামন্ততন্ত্রের অবসান এবং পুঁজিবাদী উৎপাদন ব্যবস্থার ভিত্তিস্থাপন এবং আধুনিক শ্রমিকশ্রেণির জন্ম। একথা বলা যায়, গ্রামীণ কৃষি-ব্যবস্থার সাথে যুক্ত নিঃস্ব কৃষকরা এবং বিধক্ষস্ত কুটির শিল্প ও কারিগররাই পুঁজিবাদী যন্ত্র-শিল্পের  শ্রমের প্রথম যোগানদার। শিল্প বিকাশের সাথে সাথে শ্রমিকশ্রেণির সংখ্যাগত বৃদ্ধি ঘটতে থাকে। ‘সমান্ততান্ত্রিক সমাজের ধক্ষংসাবশেষ থেকে আধুনিক যে বুর্জোয়া সমাজ জন্ম নিয়েছে, তার মধ্যে শ্রেণি বিরোধ শেষ হয়ে যায়নি। এ সমাজ শুধু প্রতিষ্ঠা করেছে নতুন নতুন শ্রেণী, অত্যাচারের নতুন অবস্থা, পুরাতনের বদলে সংগ্রামের নতুন ধরন।’
পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় শ্রমিক শোষণের ক্রুরতম পদ্ধতি হল কম মজুরিতে মাত্রাতিরিক্ত সময় কাজ করিয়ে অতিরিক্ত উৎপাদন করিয়ে নেওয়া, মুনাফা বৃদ্ধি। শোষণের তীব্রতা বৃদ্ধির সাথে সাথে শ্রমিকশ্রেণিও সংগঠিত হতে থাকে। দুনিয়াজুড়েই শ্রমিকশ্রেণির সংগ্রাম নতুন নতুন স্তরে উন্নীত হয়। শোষণের তীব্রতা কিছুটা কমাবার জন্য দাবি তোলা হয়-কাজের ঘন্টা কমাবার। ৮ ঘন্টা কাজের দাবি। কেবল আমেরিকার শ্রমিকশ্রেণিই নয়, সারা দুনিয়াজুড়ে দেশে-দেশে শ্রমিকশ্রেণি কাজের ঘন্টা কমাবার দাবিতে মুখর হয়ে ওঠে। যার চূড়ান্ত পরিণতি আমেরিকার শিকাগো শহরে ধর্মঘটী শ্রমিকদের ওপর পুলিশের গুলি চালনা ও শ্রমিক হত্যা।
পুঁজিবাদী বিকাশের প্রথম যুগে বৃহৎ বৃহৎ কারখানা গড়ে ওঠে। একই ছাদের নীচে অনেক শ্রমিক কাজ করে। বড়ো বড়ো শিল্পগুলোকে কেন্দ্র করে অনুসারী শিল্প হিসাবে অনেক ছোট ছোট কারখানাও গড়ে ওঠে। একই সাথে নগরায়ণও ঘটতে থাকে। শিল্পের প্রয়োজনে সমাজের প্রয়োজনে নানা পরিষেবা, হোটেল, দোকান, স্কুল, হাসপাতাল, যানবাহন ব্যবস্থা গড়ে ওঠে। প্রত্যক্ষভাবে শিল্প কারখানাগুলোতেই নয়, এসব পরিষেবাগুলো চালু রাখার জন্য প্রয়োজন হল আরও শ্রমজীবী মানুষ। এরও বাইরে আরও অনেক মানুষ রইলেন যারা নিজেদের জীবিকার প্রয়োজনে হকার, মুটিয়া-মজদুর প্রভৃতি বিভিন্ন পেশায় স্ব-নিযুক্তি শ্রমিক। এরা প্রত্যক্ষভাবে কোনো মালিকের অধীনে উৎপাদনমুখী কাজের সাথে যুক্ত না-হলেও সামাজিক ও অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে এদের একটা বড়ো ভূমিকা আছে।
ইংরেজ আমলেই আমাদের দেশে ধনতন্ত্রের বিকাশ ঘটে। পুঁজির স্বার্থেই ইংরেজরা এদেশে রেলপথ, রাস্তাঘাট, বিমানবন্দর, পানিবন্দর, বিদ্যুৎ শিল্প প্রভৃতি গড়ে তোলে। এদেশে সস্তায় শ্রমিক ও কাঁচামাল, খনিজ সম্পদ প্রভৃতিকে ব্যবহারের জন্য কিছু কারখানাও গড়ে তোলে। স্বাধীনতার পরে, পুঁজিবাদের বিকাশ সত্ত্বেও বাংলাদেশ একটি অনগ্রসর কৃষিপ্রধান দেশ।
পুঁজিবাদ আজ বিকাশের সর্বোচ্চ স্তরে। উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করে আজকের পুঁজিবাদের এমনই বাড়বাড়ন্ত যে এক সময় পুঁজিবাদী অর্থনীতিবিদরা যে বৃদ্ধিকে  ‘কর্মহীন বৃদ্ধি’ বা ঔড়নষবংং এৎড়ঃিয হিসাবে আখ্যায়িত করেছিলেন তাঁরাই এখন বলছেন ‘কর্মনাশক বৃদ্ধি’ বা ঔড়নষবংং এৎড়ঃিয  অর্থাৎ বৃদ্ধি হচ্ছে কিন্তু কর্মসংস্থান কমছে। বিশ্বায়ন ও উদারীকরণ নীতির নামে আন্তর্জাতিক লগ্নিপুঁজির দাপট বাড়ছে। পুঁজি আজ দ্রুত  সঞ্চরণশীল। যেখানেই বাড়তি মুনাফার সুযোগ সেখানেই সেখানেই সে ধাবমান। এক্ষেত্রে দেশ-বিদেশের সীমারেখা নেই। এমনকি নিজের দেশকেও এই পুঁজি রেহাই দেয় না। যখন কোনো দেশ থেকে পুঁজি অন্যত্র সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়, তখন সেই দেশের অর্থনীতি ধসে পড়ে। প্রকৃত পক্ষে আন্তর্জাতিক পুঁজি আজ আর শিল্পক্ষেত্রে বিনিয়োগে বিশেষ আগ্রহী নয়। তাদের লক্ষ্য শেয়ার বাজার, ইনশিয়োরেন্স, ব্যাঙ্ক প্রভৃতি। আন্তর্জাতিক পুঁজির বাড়-বাড়ন্ত এমনই যে বাংলাদেশের মতো বাজারে তারা ‘খুচরো ব্যবসায়ে’ পুঁজি বিনিয়েগে বিশেষ আগ্রহী আর বাংলাদেশ সরকারও এই ব্যবসায়ের সাথে যুক্ত লক্ষ লক্ষ মানুষের স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়ে এদের সাদরে অভ্যর্থনার জন্য প্রস্তুত।
প্রকৃতপক্ষে প্রযুক্তিগত উন্নতির ফলে আজ আর একই ছাদের তলায় একটা উৎপাদন পরিচালিত হয় না। উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করে একটি পণ্যকে টুকরো টুকরো করে উৎপাদন ছাড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে শুধু দেশের মধ্যেই নয়, পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে আর এক প্রান্তে। এমনকি, উৎপাদনের অংশ বিশেষ গ্রামাঞ্চলে ঘরে-ঘরে করিয়ে নেওয়া হচ্ছে। যে শ্রমিক কাজ করছে, সে জানে না কোন কোম্পানির হয়ে কাজ করছে। ফলে একদিকে যেমন সস্তার শ্রমকে ব্যবহার করা যাচ্ছে অপরদিকে শ্রম-আইন মেনে চলারও বাধ্য-বাধকতা থাকছে না। যে সমস্ত কারখানাতে কিছু উৎপাদনমুখী কাজ হয়, সেই সব কারখানাকেও ঠিকাদার নিযুক্ত শ্রমিক ও চুক্তিভিত্তিক শ্রমিক সংখ্যা বাড়ছে। অসংগঠিত ক্ষেত্র ও প্রথাবর্হিভূত শ্রমিকদের এই যে বিপুল বৃদ্ধি, এটি একটি বিশ্বব্যাপী ঘটনা। বিশ্বায়ন ও উদারীকরণ নীতির ফলশ্রুতি। বাংলাদেশ তৃতীয় বিশ্বের একটি দেশ, সে কারণে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ।
বিভিন্ন শিল্পের শ্রমিক ও পেশাগত শ্রমিকদের দাবির বিভিন্নতা থাকলেও কয়েকটি সাধারণ দাবি হল-সামাজিক সুরক্ষার দাবি, পেশাগত রোগ থেকে রক্ষা এবং কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তামুলক ব্যবস্থা, কাজের ঘন্টা, ন্যূনতম মজুরিসহ একটা সামাজিক আইন প্রণয়ন করার। এই অংশের শ্রমিকদের জন্য অনেকেই চোখের পানি ফেলেছেন। পুর্বতন সরকার পরিচালিত জোট সরকার থেকে শুরু করে আজকের সরকার অনেকেই অনেক প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। এই বিষয়ে আইনের একাধিক খসড়াও তৈরি হয়েছে, কিন্তু সেই বিলগুলো এখনও জাতীয় সংসদ টেবিলে জায়গা করে নিতে পারেনি। বর্তমান সরকারের শ্রমমন্ত্রী বিগত জাতীয় নির্বাচনের প্রাক্কালে অসংগঠিত শ্রমিকদের জন্য একটি সামাজিক সুরক্ষা তহবিল গঠনের প্রকল্প সাড়ম্বরে উদ্বোধনও করেন। যেটি নিছক প্রবঞ্চনা ছাড়া আর কিছুই ছিল না। ভোটের বাক্সের দিকে নজর রেখে প্রকল্প না প্রকৃতই মানুষের কল্যাণের  জন্য প্রকল্প?
আমাদের দেশের সংবিধানে রাষ্ট্র পরিচালনা সংক্রান্ত নীতি নির্ধারণ বিষয়ে সংবিধানের বিভিন্ন ধারার সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, রাষ্ট্র তার আর্থিক ক্ষমতা ও বিকাশের পরিধির মধ্যে থেকে কাজের অধিকার, শিক্ষার অধিকার নিশ্চিত করার ব্যবস্থা নেবে এবং শারীরিকভাবে অক্ষমদের সাহায্য করার পাশাপাশি অন্যান্য অনভিপ্রেত পরিস্থিতিতে সাহায্য করবে। রাষ্ট্র মাতৃত্বকালীন সুবিধাসহ মানুষের উপযোগী কাজের পরিবেশ ও কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করছে। রাষ্ট্র প্রয়োজনীয় আইন করে অথবা আর্থিক ব্যবস্থা নিয়ে অথবা অন্য কোনো পদ্ধতি ব্যবহার করে সমস্ত শ্রমিক যারা কারখানায়, কৃষিক্ষেত্রে অথবা অন্যত্র কাজ করছে, তাদের জীবনযাপনের মানকে এমন স্তরে নিয়ে যাবে, যা হবে সুন্দর। তাদের অবসর যাপন উপভোগ করা সুনিশ্চিত করতে হবে এবং বিশেষভাবে সামাজিক সাংস্কৃতিক সুযোগ-সুবিধা উপভোগ করার ব্যবস্থা করতে হবে। কিন্তু কোথায় কী? প্রকৃতপক্ষে সংবিধানে যাই লেখা থাক না কেন তা শুধু কথার কথা।
আজ শ্রমের বাজারে ভাঁড় বাড়ছে। বেকার শিক্ষিত যুবকদের সামনে কর্মসংস্থানের সুযোগ নেই। অপর দিকে বিশ্বায়ন ও উদারীকরণ নীতির অনিবার্য পরিণতিতে একটার পর একটা কারখানা বন্ধ হচ্ছে। বেকার বাহিনী স্ফীত থেকে স্ফীততর হচ্ছে। পুঁজিবাদের সাথে অঙ্গাঙ্গীভাবে যুক্ত হল বেকার সমস্যা। ক্রমবর্ধমান বেকার বাহিনীর কাঁধে ভর করেই সৃষ্টি হয় ফ্যাসিস্ত শক্তি। যা যে-কোনো দেশের শ্রমিক আন্দোলন তথা গণতান্ত্রিক আন্দোলনের পক্ষে চরম বিপজ্জনক।
শহরের কল-কারখানার মজুরি শ্রমিকরা হাজার হাজার ও লক্ষ লক্ষ সূত্রে গাঁয়েব মজুরি শ্রমিকদের সঙ্গে গ্রথিত। প্রথমের কাছ থেকে দ্বিতীয়ের  কাছে আহক্ষান নিস্ফল হতে পারে না কিন্তু ব্যাপারটা শুধু আহক্ষানেই সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। শহরের শ্রমিকদের অভিজ্ঞতা, জ্ঞান, সংগঠন ও শক্তি  আছে অনেক বেশি। গ্রাম্য শ্রমিকদের উত্থিত হতে সাহায্য করার জন্য সরাসরি সে শক্তির একাংশ দিতে হবে।’ ‘রাশিয়ার প্রলেতারিয়েতের অগ্রবাহিনীর শিল্প শ্রমিকদের ট্রেড ইউনিয়নগুলোর মহত্তম ও তর্কাতীত কর্তব্য হল নিজেদের ভাইদের, গ্রাম্য শ্রমিকদের সাহায্য করতে এগুনো।’ জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ শিল্পগুলোতে শ্রমিকদের সংগঠিত করা যেমন গুরুত্বপূর্ণ তেমনই অসংগঠিত ও প্রথাবর্হির্ভূত শ্রমিকদের সংগঠিত ও করার বিষয়টিকেও অগ্রাধিকার দিতে হবে।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT