বিশেষ সংখ্যা

মে দিবসের মর্মার্থ ও বাস্তবতা

মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান খান প্রকাশিত হয়েছে: ০১-০৫-২০১৭ ইং ০১:২৭:০২ | সংবাদটি ১৬৭ বার পঠিত


এ পৃথিবীতে যা কিছু সুন্দর, সৌন্দর্যময়, সৃষ্টিশীল এবং নান্দনিক শিল্প সব কিছুর মূলে যাদের অবদান সবচেয়ে বেশি তারা হচ্ছেন এ বিশ্বের মেহনতি মানুষ যাঁদের মাথার ঘাম এবং দু’হাত-দু’পায়ের শক্তির সন্মিলিত প্রয়াসের ফসল এমন সুন্দর একটি পৃথিবী। আমাদের সমাজের মানুষ তাঁদেরকে যথার্থভাবে মর্যাদা দিতে পারুক বা না পারুক, মেহনতি শ্রমজীবি মানুষরাই আমাদের মহান সম্পদ এবং অহংকার। আমাদের পরম অহংকারতূল্য মেহনতি সন্মানিত মানুষদের দু’হাতের স্পর্শে মাথা উঁচু করে গর্বিত চিত্তে দাড়িয়ে আছে পৃথিবীর সুউচ্চ সকল ভবন, আইফেল টাওয়ার, চীনের মহাপ্রাচীর, বড়-বড় সামুদ্রিক জাহাজ, বড়-বড় সুরম্য অট্রালিকা, আমাদের মহান জাতীয় সংসদ ভবন, মহান জাতীয় স্মৃতি সৌধ এবং পৃথিবীর আশ্চর্য সকল সৃষ্টি।
কিন্তু যে মহান শ্রমজীবিদের অক্লান্ত পরিশ্রমের ফসল আমাদের সুন্দর দেশ এবং সৌন্দর্যময় এ বিশ্ব সে শ্রমজীবিদের যথার্থ মর্যাদা এখনো সেভাবে প্রতিষ্ঠা হয়নি এবং যথাযথভাবে অনুসরণ হচ্ছে না শ্রমজীবিদের প্রকৃত শ্রমঘন্টা। যদিও প্রতি বছর ১লা মে বিশ্বব্যাপী যথাযথ মর্যাদায় পালন করা হয় ‘মহান মে দিবস’ যার একটি ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট সত্যি অর্থে আমাদের মনে করিয়ে দেয় শ্রমজীবি মানুষেরাও আমাদের সমাজের অপরিহার্য অংশ, আমাদের অহংকার, তাঁদেরও ক্লান্তি আছে, আছে নির্ধারিত শ্রমঘন্টা এবং কাজের বিপরীতে প্রকৃত মজুরী পাওয়ার যথার্থ অধিকার। আন্তর্জাতিক শ্রম দিবসের (মে দিবস) সূত্রপাত হয় মূলত আমেরিকাতে শ্রমিকদের দৈনিক আট ঘন্টা কাজের অধিকার আন্দোলন থেকে। ১৯শ শতাব্দীর শেষ দিকের কথা যখন শিল্প-কারখানার শ্রমিকদের ১৬ ঘন্টার মত কাজ করতে হতো। এ অবস্থায় সমাজতন্ত্রী সংগঠনসমূহ পরিস্থিতি উত্তোরনের লক্ষ্যে এবং শ্রমিকদের অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বিশ্বব্যাপী প্রচারনা শুরু করেন এবং রাজনৈতিক ব্যবস্থায় সম্পদশালীদের কর্তৃত্বের উপর চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেন। এর প্রেক্ষিতে ১৮৮৪ সালে ঋবফবৎধঃরড়হ ড়ভ ঙৎমধহরুবফ ঞৎধফব ধহফ খধনড়ঁৎ টহরড়হং ঘোষণা দেন- ১৮৮৬ সালের ১লা মে থেকে আমেরিকায় দৈনিক আট ঘন্টা শ্রমিকদের কর্মঘন্টা নির্ধারিত হবে যা কাজের ক্ষেত্রে একটা স্ট্যান্ডার্ড মানদন্ড হিসেবে বিবেচ্য। সে বছর (১৮৮৪ সাল) ১লা মে শিকাগোতে ৪ লক্ষ শ্রমিক দৈনিক আট ঘন্টা কাজের দাবী বাস্তবায়নের লক্ষ্যে রাস্তায় ধর্মঘট করে। শিকাগোতে ৩রা মে সে ধর্মঘট অনেক ভয়ংকর অবস্থায় রুপ নেয় এবং এক পর্যায়ে পুলিশ ও ধর্মঘটকারীরা মুখোমুখি সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে যাতে পুলিশ আন্দোলনকারীদের উপর প্রকাশ্যে গুলি করে এবং প্রতিত্তোরে আন্দোলনকারীরাও পুলিশের উপর বোমা নিক্ষেপ করে। উক্ত সংঘর্ষে অনেক শ্রমিক মারা যান এবং শিকাগোর ঐধুসধৎশবঃ ঝয়ঁরৎব এ চরম গণবিদ্রোহের ফলশ্রুতিতে সাতজন পুলিশ অফিসার ও একজন বেসামরিক ব্যক্তির মৃত্যু হয়। ১৮৮৬ সালের আগষ্ট মাসে আটজন ব্যক্তিকে নৈরাজ্যবাদী আখ্যা দিয়ে দন্ড দেয়া হয় এবং এর মধ্যে সাতজনকে মৃত্যুদন্ড প্রদান করা হয়। আর আঠারজন ব্যক্তিকে ১৫ বছর করে কারাদন্ডে দন্ডিত করা হয়। এভাবে একটি রক্তিম অধ্যায় শেষে অসবৎরপধহ ঋবফবৎধঃরড়হ ড়ভ খধনড়ঁৎ একটি ঐতিহাসিক গৃহিত সিদ্ধান্তে উপনীত হয়- ১৮৮৬ সালের ১ লা মে এবং তার পরবর্তী সময় থেকে শ্রমিকদের কর্মঘন্টা দৈনিক আট ঘন্টা নির্ধারন করা হলো এবং আট ঘন্টা শ্রমই স্ট্যান্ডার্ড ও আইনসিদ্ধ। সে থেকে প্রতি বছর বিশ্বব্যাপী যথাযথ মর্যাদায় ১লা মে দিনটিকে প্রতিটি দেশ ‘মহান মে দিবস (শ্রম দিবস)’ হিসেবে পালন করে আসছে।
যে দিনটিকে ঘিরে এতগুলো মর্মাহত ঘটনার অবতারনা ঘটে যায় বিশ্বে, সেদিনটির প্রতি সত্যি অর্থে রয়েছে আমাদের অগাধ শ্রদ্ধা এবং ভালবাসা এবং সেজন্যই দিবসটিকে আমরা আখ্যা দেই ‘মহান মে দিবস (আন্তর্জাতিক শ্রম দিবস)’ হিসেবে। কারণ দিবসটি আমাদের শৃংখলাবদ্ধ ও সৌন্দর্যময় এ পৃথিবীর জন্য যে এতটুকু তাৎপর্যপূর্ন যার মর্মার্থ এত গভীর! মে দিবস মানে মাথা নত করা নয়, মে দিবস মানে অধিকার আদায়ের প্রতিজ্ঞা এবং সংগ্রাম। সে দিবস থেকেই আমরা শিক্ষা পেয়েছি- মেহনতি মানুষেরা আমাদের অহংকার, তাঁদেরও যথার্থ মজুরী পাওয়ার সব ধরণের অধিকার রয়েছে এবং তাঁদেরও কর্মক্ষেত্রে নিদ্দিষ্ট সময় ঘন্টার বিধি অনুযায়ী কর্মক্ষমতা প্রদর্শনপূর্বক জীবনকে প্রকৃত অর্থে উপভোগ করার স্বাধীনতা রয়েছে। এ সৌন্দর্যময় পৃথিবীতে এত এত সৃষ্টিশীল কাজের নিখুঁত শিল্পীরা আমাদের সমাজেরই সন্মানিত মেহনতি মানুষ যাঁদের মর্যাদা প্রদান আমাদের পরম কর্তব্য- মহান মে দিবস আমাদেরকে সে শিক্ষাও প্রদান করে।  
এটা সত্যি যে, মহান মে দিবস আমাদেরকে গর্বিত করে অনেক অর্থে, আমরাও যথাযথ মর্যাদায় স্মরণ করি সেসব মহান ব্যক্তিদের যাঁদের রক্তে প্রতিষ্ঠিত বিশ্বব্যাপী অধিকার আদায়ের এমন একটি ইতিহাস এবং সে সাথে এটাও বাস্তব যে, যে লক্ষ্যকে ধারণ করে প্রতিষ্ঠিত এক অনুপম ইতিহাস আমরা সত্যি অর্থে আজো সে মহান দিবসটির মূল্যায়ন করতে পারিনি। আমরা যথাযথ মর্যাদা দিতে পারিনি মহান দিবসটির প্রকৃত মর্মার্থ ও যথার্থতাকে। যে আট ঘন্টা কাজের অধিকার নিয়ে প্রতিষ্ঠিত রক্তমাখা মহান ইতিহাস সে ইতিহাসের মর্যাদা প্রতিনিয়তই আমরা ক্ষুন্ন করছি- যখন আমাদের শ্রমিক ভাই-বোনেরা অনিচ্ছা সত্ত্বেও আট ঘন্টারও অধিক সময় কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন কিন্তু তবু তাঁরা পাচ্ছেন না যথার্থ মজুরী বা জীবন-মানের সঠিক নিশ্চয়তা ও নিরাপত্তা এবং ঠাঁই নিতে হচ্ছে শেষ আশ্রয়স্থল বস্তিতে; যখন আমাদের পোষাক কারখানার শ্রমিকেরা এত কষ্ট করে এবং ১০-১২ ঘন্টারও অধিক পরিশ্রম করেও পাচ্ছে না জীবনের এতটুকু নিরাপত্তা, অথচ তাঁদের মহান পরিশ্রম এবং জীবন উৎসর্গই আমাদের তৈরি পোষাক খাতকে আমাদের রপ্তানীতে শীর্ষে আহোরন করাচ্ছে। আর সে শ্রমিকদেরই প্রতি বছর বেতন-বোনাসের জন্য আন্দোলন করতে রাস্তায় নামতে হয়, শরীরের ঘাম ঝরাতে হয় এবং ছাটাইয়ের মত নির্মমতার শিকার পর্যন্ত হতে হয়। আসলে তাঁদের জীবনটাই যেন কার্ল মাক্সের আলোচনার সাথে একাকার হয়ে যাচ্ছে- নিঃস্বদের পাওয়ার যেমন খুব তেমন নেই, তেমনি তাদের হারানোরও কোন ভয় নেই।
মহান মে দিবসকে সামনে রেখে আমরা গভীর শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করছি এবং সন্মান জানাই রানা প্লাজা দুর্ঘটনায় নিহত মহান ভাই-বোনদের, আহত-পঙ্গুত্ব বরণকারী মহান মেহনতি শ্রমিক ভাই-বোনদের এবং স্বামী-স্ত্রী ও স্বজন হারানো মা-বাবা ও ভাই-বোনদের যাঁদের প্রতি এতটুকু স্বান্তনা দেয়ার ভাষা আমাদের জানা নেই, কিন্তু তাঁদের তিল তিল করে বিলানো শ্রমের বিনিময়ে বছর-বছর ধরে শাণিত হয়েছে আমাদের অর্থনীতি, রপ্তানী এবং আমাদের স্বাচ্ছন্দ্য। কত ভাগ মানুষ কর্মহারা, কতভাগ মানুষ সহায়-সম্বলহারা এবং স্বজনহারা- এটা আমাদের নিকট বিবেচ্য বিষয় হলেও আজ তা বড় কোন তর্কের বিষয় নয়, আজ আমাদের পরম কর্তব্য তাঁদের অধিকার নিশ্চিত করা, কর্মসংস্থানের যথার্থ ব্যবস্থা করা এবং তাঁরা যেন উপযুক্ত মজুরী, উন্নত জীবন-মান, কাজ ও জীবনের নিরাপত্তা পান এমনকি সন্তানদের যথার্থ মৌলিক চাহিদা পূরণপূর্বক বিকাশের সুযোগ সৃষ্টি করতে পারেন- সে অপরিহার্য বিষয়সমূহ আজ আমাদের সামনে অনুপম দায়িত্ব ও প্রকৃত আলোচ্য ইস্যু। আশার বিষয় বাংলাদেশ পোষাক শিল্প মালিকদের সংগঠন ‘বিজিএমইএ’ সম্প্রতি ঘোষনা প্রদান করেন- যদি দুর্ঘটনার শিকার কোন ব্যক্তি এবং পরিবার তাঁদের অসুস্থতা ও মানবিক সাহায্যের জন্য আবেদন করেন তাহলে সেটা অবশ্যই তাঁরা গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করবেন। এটা সত্যি শুধু আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশসমূহই নয়, বিশ্বব্যাপী কম-বেশি কর্মক্ষেত্রে শ্রমিকবৃন্দ শোষিত, শাসিত ও নির্যাতিত হচ্ছে এবং কর্মক্ষেত্রে আজো মে দিবসের তাৎপর্যকে (দৈনিক আট ঘন্টা কাজ) হেয় করা হচ্ছে, তবু তাঁরা পাচ্ছে না যথার্থ মজুরী এবং কর্মক্ষেত্রে যথার্থ নিরাপত্তার নিশ্চয়তা। তবে এটাও স্বীকার করতে হবে আমাদের দেশ ক্রমান্বয়ে উন্নয়নশীল দেশ থেকে প্রশংসনীয়ভাবে মধ্যম আয়ের দিকে এগিয়ে চলছে এবং প্রতিনিয়তই উন্নতি করছে যাতে সারা বিশ্বের দরবারে আজ বাংলাদেশ উন্নয়নের রোল মডেল (জড়ষব গড়ফবষ) হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, সেখানে আমাদের সার্বিক উন্নয়নের অহংকার মেহনতি মানুষদের অবদান ও ভূমিকা অনস্বীকার্য এবং তাঁদের সার্বিক অধিকার বাস্তবায়ন ও যথার্থ মর্যাদা প্রদান খুবই অপরিহার্য। সরকারি প্রতিষ্ঠানসমূহের পাশাপশি যদি পোষাক শিল্প সংগঠনসমূহ, অন্যান্য কল-কারখানা মালিক সংগঠনসমূহ, বিভিন্ন স্বায়ত্তোশাসিত প্রতিষ্ঠানসমূহ, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানসমূহ, গুরুত্বপূর্ণ এনজিওসমূহ, বিভিন্ন কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানসমূহ এবং প্রতিষ্ঠিত সমবায় প্রতিষ্ঠানসমূহ অপরিহার্য পৃষ্ঠপোষক হিসেবে মেহনতি মানুষদের অধিকার প্রতিষ্ঠা, কাজের উপযুক্ত পরিবেশ, নিরাপত্তা ও সুরক্ষা, যথার্থ মজুরী, যথার্থ কর্মঘন্টা নিশ্চিতকরণ এবং ন্যায়সঙ্গত মানবিক অধিকার সংরক্ষনের জন্য কাজ করেন তাহেলে সেটা শুধু মহান মেহনতি মানুষদের জীবন-মান উন্নত করবে না দেশের অর্থনীতির জন্যও বয়ে আনবে বিরাট সাফল্য- তবেই মর্যাদা পাবে মহান মে দিবসের তাৎপর্য, রানা প্লাজা দুর্ঘটনা এবং বিভিন্ন গারমেন্ট্স শিল্পে দুর্ঘটনায় জীবন উৎসর্গকারী মহান শ্রমিক ভাই-বোনদের স্বপ্নের হবে বাস্তবায়ন, তাঁদের বিদেহী আতœা পাবে এতটুকু প্রশান্তি এবং স্বপ্ন পুরণ হবে ত্রিশ লক্ষ শহীদ ও দুই লক্ষ মা-বোনের সম্ভ্রমহানীর বিনিময়ে প্রতিষ্ঠিত আমাদের প্রিয় জন্মভূমি স্বপ্নের সোনার বাংলাদেশ বিনির্মানের।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT