বিশেষ সংখ্যা

প্রসঙ্গ ক্ষুদ্র ঋণের মারপ্যাচ বনাম বৃহৎ ঋণ

রাজু আহমেদ প্রকাশিত হয়েছে: ০১-০৫-২০১৭ ইং ০১:৩৪:৩৮ | সংবাদটি ১৫৭ বার পঠিত

একটি বেসরকারী ব্যাংক থেকে মাসিক কিস্তিতে পরিশোধের শর্তে মাত্র দ’ুলাখ টাকা ঋন নিয়েছিলেন দর্জি কারিগর রাসেদা বেগম (ছন্দ নাম)। তার স্বপ্ন ছিল এই টাকা ব্যবসায় বিনিয়োগ করে ব্যবসার পরিধি আরো বৃদ্ধি করবেন। কিন্তু ব্যবসার লাভ আর সংসারের ব্যয় সংকুলান করতে গিয়ে ধীরে ধীরে পুঁজি হারাতে হয় তাকে। আর ব্যাংকের মাসিক কিস্তি দেয়াও বন্ধ হয়ে যায় রাসেদার। ফলে ঋন গ্রহণের মাত্র কয়েক মাসের মাথায় ঋন খেলাপি হয়ে যান তিনি। ব্যাংক তার উপর মামলা টুকে দেয় কোর্টে। মামলার হাজিরা আর জামিন নিতে গিয়ে আরো প্রায় ত্রিশ থেকে চল্লিশ হাজার হাজার টাকা খরচ হয় এই কর্মজীবি নারীর। কিন্তু তার পরেও রাসেদা পালিয়ে যাননি। বর্তমানে অনেক কষ্ট করে মামলা মাথায় নিয়ে ব্যাংকের দেনা সুদ করে যাচ্ছেন জীবন সংগ্রামী রাসেদা।। অন্যদিকে একই ব্যাংক ব্যাংক থেকে কয়েক কোটি টাকা একক নামে ঋন নিয়ে খেলাপি হয়েছেন তবারক (ছন্দ নাম)। গা ঢাকা দিয়ে তিনি দেশে বিদেশে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। অথচ ব্যাংক তার বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নিতে পারছেনা। কারণ তার হাত অনেক লম্বা। ব্যাংক কর্তৃপক্ষ অসহায়ের মত একের পর এক নোটিশ করে যাচ্ছে কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হচ্ছেনা। শোনা যাচ্ছে তবারক নাকি ব্যাংক থেকে ঋণ সুবিধা নিয়ে বিদেশে বাড়ি করছেন যাতে সেখানে শান্তিতে বসবাস করা যায় ক দিন পর।
 এই হচ্ছে আমাদের দেশের ক্ষুদ্র আর বৃহৎ ব্যাংক ঋণের চিত্র। আর এই চিত্রই সারা দেশে বহমান। সেটার প্রমাণ পাওয়া গেল সম্প্রতি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক সভায় সরকারি বেসরকারি ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীদের বক্তব্যেও। দেশের একটি শীর্ষ দৈনিক পত্রিকা থেকে জানতে পারলাম সরকারি বেসরকারি বিভিন্ন ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীদের সাথে বৈঠক করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। আর সেই বৈঠকে একটি বেসরকারি ব্যাংকের এমডি বাংলাদেশ ব্যাংককে জানিয়েছেন, তার ব্যাংকের বড় কয়েকজন গ্রাহক নাকি মোটা অংকের টাকা ঋণ নিয়ে বিদেশে পাচার করেছেন। তারা নাকি মালেশিয়ায় সেকেন্ডহোম বাড়ি ক্রয় করছেন। কেউ কেউ বসবাসও শুরু করে দিয়েছেন। বিষয়টি জানার পরও  তাদের বিরুদ্ধে কিছুই করতে পারছেনা ব্যাংক কর্তৃপক্ষ। এমন বক্তব্য শুনে বাংলাদেশ ব্যাংক সতর্ক সংকেত দিয়ে বলেছে, এসব ঋণ আদায় করতে না পারলে ব্যাংক গুলো অস্তিস্ত সংকটে পড়বে। আর ব্যাংকের অস্তিত্ব সংকটে পড়া মানে দেশে অর্থনৈতিক সংকট দেখা দেয়া। মূল্যস্ফীতি বেড়ে গিয়ে প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়া। তার মানে অনেক অনেক অশণি সংকেত। তাহলে এ থেকে উত্তরনের উপায় কি। উত্তরনের অন্যতম একটি উপায় হিসাবে বাংলাদেশ ব্যাংক বিগত কয়েক বছর যাবৎ দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংক গুলোকে ক্ষুদ্র ঋণ প্রবণতা বাড়ানোর উপর জোর দিয়ে আসছে। এ কারণে জোর দিচ্ছে যে, এই ঋণ একদিকে যেমন দেশের ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক ব্যবসায়ীদের স্বাবলম্বী করতে পারবে অন্যদিকে মজবুদ হবে দেশের অর্থনৈতিক কাঠামো। আর ব্যাংক গুলোও সহজেই তাদের ঋণ আদায় করতে পারবে। কিন্তু দুংখ জনক হলেও সত্য, দেশের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা এখনো ব্যাংক থেকে সহজে ঋণ সুবিধা পাননা। আর যারা পান তাদেরকে অনেক ঝক্কি ঝামেলা আর কাঠখড় পুড়িয়ে ঋণ পেতে হয়।
এমন সব ঝামেলা পেরিয়ে সম্প্রতি একটি ব্যাংক থেকে মাত্র দুলাখ টাকা ঋণ পেয়েছেন শাহিনা খাতুন নামে এক নারী উদ্যোক্তা। তাও আবার ব্যাংক তাকে সরাসরিঋণ দেয়নি। কারণ তিনি নতুন উদ্যোক্তা হয়েছেন। তার দু বছরের বেশি সময়ের ট্রেড লাইসেন্স নেই। তাই ব্যাংকের নিয়ম অনুযায়ী তিনি ব্যাংক থেকে সরাসরি ঋণ নিতে পারেননি। নিয়েছেন একজন এজেন্ট এর মাধ্যমে। তার মানে মধ্যসত্ব ভোগীর সহযোগিতায় ব্যাংক তাকে ঋণ দিয়েছে। অথচ শাহিনা খাতুনের নিজের একটি গ্রোসারী শপ রয়েছে। যেটি তার স্বামীর টাকায় ক্রয় করা। ব্যবসা নতুন তাই ব্যাংক তার উপর আস্থা রাখতে পারেনি। ব্যাংক আস্থা রাখে তাদের উপর যারা কোটি টাকা ঋণ নিয়ে লাপাত্তা হয়ে যান। আর খেলাপি ঋণের বোঝা বহন করে ব্যাংক গুলো আদালতের সরনাপন্ন হয়। সেখানেও ব্যবসায়ীরা ফন্ধি আটেঁন। মোটা অংকের টাকা দিয়ে দক্ষ আইনজীবি নিয়োগ দিয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের বিরুদ্ধে রীট করে টাকা আটকে রাখেন বছরের পর বছর। আর এভাবে দেশে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দিন দিন শুধু বাড়ছেই। বাংলাদেশ ব্যাংক এর দেয়া তথ্য অনুযায়ী যেখানে ২০১৫ সালে সারাদেশে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৫১ হাজার ৩৭১ কোটি টাকা। সেখানে ২০১৬ সালে এই পরিমাণ এসে দাড়িয়েছে ৬২ হাজার ১৭২ কোটি টাকায়। অর্থাৎ এক বছরে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়েছে ১০ হাজার ৮০১ কোটি টাকারও বেশি। এর মধ্যে ৪২ হাজার কোটি টাকা ঋণ অবলোপন করা হয়েছে। তার মানে এই ৪২ হাজার কোটি টাকা ঋণ মন্দ হিসাবে আখ্যায়িত করে আর্থিক প্রতিবেদন থেকে মুছে ফেলা হয়েছে। এই অবলোপন কৃত ঋণ যদি হিসেবে আনা হত তবে খেলাপি ঋণ হতো একলাখ কোটি টাকারও বেশি। যা আমাদের মত দরিদ্র উন্নয়নশীল দেশের জন্যে সত্যি অশনি সংকেত। কেননা এই টাকা গুলোও এদেশের সাধারণ মানুষের কষ্টর্জিত আমানত। দু একটাকা লভ্যাংশের আশায় তারা ব্যাংকে তাদের সামান্য সঞ্চিত আয় জমা রেখেছেন।
লেখক : সিলেট প্রতিনিধি বার্তাসংস্থা রয়টার্স।       

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT