ইতিহাস ও ঐতিহ্য

পার্বত্য তথ্য কোষ

প্রকাশিত হয়েছে: ২৪-০৫-২০১৭ ইং ০২:৫০:৩০ | সংবাদটি ২৬৩ বার পঠিত

অরাজক ও বিক্ষুব্ধ পার্বত্য অঞ্চল থেকে সেনাবাহিনী প্রত্যাহৃত হলে, এতদাঞ্চলের শান্তি-শৃঙ্খলা আর অখন্ডতা রক্ষার দায়িত্ব কে পালন করবে? উপজাতীয় কোনো সংগঠন সে দায়িত্ব পালনের উপযোগী আস্থা এখনো অর্জন করতে পারে নি। তারা নিজেরাও ঐক্যবদ্ধ নয়। বরং পরস্পর সংঘাত ও বৈরীতায় লিপ্ত। এটা ঐক্যবদ্ধ রাজনৈতিক লক্ষ্য উদ্দেশ্যের ধারক নয়। উপজাতীয়রা পরস্পর রাজনৈতিকভাবে বিভক্ত ও সংঘাতে লিপ্ত। তারা গঠনমূলক রাজনীতির কোনো উদাহরণ স্থাপন করতে পারে নি। দেশ ও জাতি তাদের প্রতি আস্থাশীল নয়। জাতীয় সন্দেহ প্রবণতাকে কাটাতে তাদের কোনো রাজনৈতিক অবস্থান ও কর্মসূচিই নেই।
উপজাতীয় দাবী ও সংখ্যালঘু স্বার্থের পরিপ্রেক্ষিতেই বাঙালি জাতীয়তাবাদের পরিবর্তে বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ গৃহিত হয়েছে। এখন তারা তাতে স্থির নেই, বিকল্প জুম্ম জাতীয়তাবাদেরই প্রবক্তা। তাদের আগ্রহেই উপজাতীয় সুবিধাবাদ গৃহিত হয়েছিলো। কিন্তু এখন তাদের লক্ষ্য জাতিসংঘ ঘোষিত আদিবাসী পরিচয় গ্রহণ। দেশ ও জাতি থেকে তারা কেবল গ্রহণেই অভ্যস্ত, কিছু দিতে নয়। তারা দেশ ও জাতির বিপক্ষে বৈরি শক্তিরূপে প্রতিভাত। এই বৈরি ভাবমূর্তি কাটাবার দায়িত্ব তাদের নিজেদেরই। এমনটা ঘটলেই তাদের পক্ষে জাতীয় আস্থা গড়ে ওঠা সম্ভব। কেবল উত্যক্ত করা, দাবি দাওয়ার বহর বৃদ্ধি, আর নিজেদের স্বার্থকেই বড় করে দেখা, এই প্রবণতা, জাতীয় আস্থা ও সহানুভূতি গড়ে ওঠার অনুকূল নয়। পার্বত্য বাঙালিরা ঐ বাঙালিদেরই অংশ, যারা গোটা দেশ শাসন করছে এবং সংখ্যায় বাংলাদেশী জাতি সত্তার ৯৯%। সুতরাং পার্বত্য বাঙালিদের সাথে সদ্ভাব সৃষ্টি, গোটা জাতিকে প্রভাবিত করারই সূত্র। এই বোধোদয় না ঘটা, উপজাতীয়দের জন্য দুর্ভাগ্যজনক। বাঙালি প্রেমী সাধারণ উপজাতীয় লোক অবশ্যই আছেন এবং এমন উদার মনোভাব সম্পন্ন সাধারণ উপজাতীয় লোকেরও অভাব নেই, যারা পাহাড়ী বাঙালির শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান ও সম্প্রীতিকে গুরুত্ব দেন। কিন্তু এরা সংখ্যালঘু ও দুর্বল। এরা উপজাতীয় রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করেন না। সমাজে এদের অবস্থান নিরীহ।
দেশ ও জাতি অনির্দিষ্ট দীর্ঘকাল অনুকূল উপজাতীয় বোধোদয়ের জন্য অপেক্ষা করতে পারে না। ধ্বংসাত্মক উপজাতীয় শক্তিকে নিস্ক্রিয় ও নির্মূল করা রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব। তজ্জন্য গৃহিত রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপকে শিথিল বা পরিত্যাগ করা যথার্থ নয়। সেনাশক্তি ও জনশক্তি মোতায়েনের অতীত নীতিকে পরিহারের কোনো অবকাশ নেই। ইতোমধ্যে প্রদর্শিত শৈথিল্য ফলপ্রসূ প্রমাণিত হয়নি। নতুবা এতোদিনে উপজাতীয় বিদ্রোহী শক্তি এক ক্ষুদ্র অপশক্তিতে পরিণত হতো, পর্বতাঞ্চলে বাঙালিরাই হয়ে উঠতো সংখ্যাগরিষ্ঠ এবং এমনটি ঘটান ছাড়া এতদাঞ্চলে বাংলাদেশ নিরাপদ হবে না, আর একমাত্র তখনই উপজাতীয়রা হবে দেশ ও জাতির পক্ষে বাধ্য অনুগত। রাষ্ট্রের নিরাপত্তার প্রয়োজনে এমনটি ঘটান অন্যায় নয়। এমন শক্ত মনোভাব জাতীয় রাজনীতিতে থাকা আবশ্যক।
পার্বত্য নীতিতে বাঙালি বসতি স্থাপন ও পুনর্বাসন পুনর বিবেচিত হওয়া দরকার। বাঙালি বসতি স্থাপন ও পুনর্বাসন কাজ অসম্পূর্ণ আছে। তা বাস্তবায়ন না করা ভুল ও ক্ষতিকর। সরকারের এই দায় অপরিতাজ্য। লক্ষ বাঙালি সরকারি দায়িত্বহীনতার ফলে পর্বতের আনাচে কানাচে ভূমিহীন, আশ্রয়হীন ও বেকার। ভূমি দান ও পুনর্বাসনের অঙ্গিকারে তারা সরকারিভাবে এতদাঞ্চলে আনিত। এই অঙ্গীকার পালন করা সরকারের একটি দায়। নিরুপায় হয়ে ভূমি বঞ্চিত বাঙালিদের অনেকেই সর্বোচ্চ আদালতে মামলা করেছে। কিন্তু ঐ মামলাগুলোর অগ্রগতি নেই। এমনি একটি মামলা হলো রীট নং- ৬৩২৯/২০০১, যার শোনানীর দিন ধার্য্য ছিলো ২৫ আগস্ট ২০০৪। তবে শোনানী হয়নি। এ ছাড়া আরো কিছু মামলা বিচারাধীন আছে। তাতে নেংটি পার্বত্য বাঙালিরা আশান্বিত দিন যাপন করছে। একদিন তারা সুবিচার পাবে।
২২. পার্বত্য জন সংহতি সমিতির পাঁচ দফা দাবী নামায় স্বায়ত্তশাসন ও বিচ্ছিন্নতা :
এটাই ব্যাপক ধারণা যে, পার্বত্য উপজাতিদের পক্ষে জন সংহতি সমিতি ও তার সশস্ত্র অঙ্গ সংগঠন শান্তি বাহিনী বাড়াবাড়ি করলেও তারা জুলুম অত্যাচারের ন্যায্য অধিকারের জন্য লড়ছে। তাদের এই অধিকারের লড়াই, দেশের অখন্ডতা ও জাতীয় সার্বভৌমত্ব বিরোধী হলেও তা সরলভাবে মান্য নয়। দেশের অধিকাংশ বামপন্থী পন্ডিত ও কিছু মানব দরদী সরলপ্রাণ বুদ্ধিজীবী, এ ধারণাটির পরিপোষক। এরা যুক্তি ও দরদের মোড়কে, এ ধারণাটির পক্ষে কথা বলেন। কিন্তু দেশে বিদেশে এমন লোকেরও অভাব নেই, যাদের লক্ষ্য বাংলাদেশ ও বাঙালিদের বিপক্ষে মদদ দান। আমার এ প্রবন্ধটি লক্ষ্য : মৌলিক তথ্যের ভিত্তিতে সুধী ও দেশ প্রেমিকদের ঐ গূঢ় রহস্যটি ওয়াকিবহাল করান যা দ্বারা পরিস্কার হয়ে যাবে যে আসলে পাঁচ দফা দাবী নামায় কি ব্যক্ত করা হয়েছে। এখন পর্যন্ত পাঁচ দফা দাবী নামার চুল চেরা মূল্যায়ন হয়নি। ব্যাপক আলোচনা ছাড়া এর ঘের টোপ উন্মোচিত হবে না। জাতীয় সংকট ও স্বার্থের সাথে জড়িত এ বিষয়টি ব্যাপক আলোচনার অবকাশ রাখে। অবহেলার কারণে দিনে দিনে এটি জটিল হচ্ছে। উভয় পাক্ষিক বৈঠকের আগে বিষয়টির উপর পাঠ ও অভিজ্ঞতা নেওয়া দরকার। আরো দুঃখজনক বিষয় হলো, দীর্ঘদিন যাবৎ পার্বত্য সংকটটি প্রলম্বিত থাকলেও এখন পর্যন্ত এতদাঞ্চল ও অবাঙালি স্থানীয় বাসিন্দাদের সর্বাধুনিক ও নির্ভরযোগ্য কোনো পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস সংকলিত বা রচিত হয়নি। কোনো কর্তৃপক্ষই তার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন নি। হাঁ ইতোমধ্যে কিছু পুঁথি ও কিংবদন্তি পুস্তক রচিত, সংকলিত ও মুদ্রিত হয়েছে এবং সে সবের উপজাতীয় লেখকগণ অনুদানও পেয়েছেন। তবে ঐ সব লেখালেখিতে বিভ্রান্তি বেড়েছে, প্রকৃত তথ্যের বিশেষ যোগান মেলেনি। এতদাঞ্চল ও তার অধিবাসীদের পরিচয় জানার জন্য দরকার ছিলো তথ্য ভান্ডার গড়ার ও গবেষণার দ্বারা ঐ ভান্ডারটিকে ইতিহাসে রূপ দানের। প্রয়োজন কালে না হলে, এ আর কখন হবে? এটা দুর্ভাগ্যজনক যে অন্ধের হাতি দেখার মতো পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে বিচার হচ্ছে।
[চলবে]

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT