ইতিহাস ও ঐতিহ্য

ঐতিহ্যে সিলেটি ইফতার

তোফায়েল আহমদ প্রকাশিত হয়েছে: ৩১-০৫-২০১৭ ইং ০০:৫৯:৩৮ | সংবাদটি ২৫৫ বার পঠিত

সিলেটে ইফতারের আয়োজন ঘরোয়া পরিসরে হলে ভুনা কিংবা পাতলা খিচুড়ি। আর মেহমানদারিতে আখনি। ইফতারে এ দুটো পদই সিলেটিদের সবচেয়ে প্রিয়। খেজুর, শরবত, ছোলা-পেঁয়াজুসহ নানা পদের ইফতারি থাকলেও আখনি-খিচুড়ি থাকবেই। ইফতারিতে এ দুটো পদকেই স্থানীয় ঐতিহ্য বলে ধরে নেওয়া হয়। তবে হালে বিভিন্ন খাদ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান এখানকার বাজারে নানা উপাদেয় ও বৈচিত্র্যময় ইফতারসামগ্রী বাজারজাত করছে। সিলেটে ইফতারির আরেকটি অনুষঙ্গ বাখরখানি। ইফতারের সময় কিংবা রাতে চায়ের সঙ্গে বাখরখানি খাওয়ার প্রচলন চলে আসছে যুগ যুগ ধরে। চার প্রকারের মিষ্টি ও ঝালজাতীয় বাখরখানি রয়েছে, যেগুলো সিলেট ছাড়া অন্য কোথাও মেলে না বলে জানালেন কয়েকজন বিক্রেতা। পাঁচ টাকা থেকে শুরু করে ৩০ টাকা পর্যন্ত দাম একেকটি বাখরখানির।
সিলেটের বাইরে ইফতারিতে ছোলা, পেঁয়াজুর সঙ্গে মুড়ি যেমন আবশ্যক অনুষঙ্গ, সিলেটিদের কাছে এটি একেবারে অচল। আখনি কিংবা খিচুড়ি ছাড়া ইফতারের কথা চিন্তাই করা যায় না। তার সঙ্গে ছোলা ভুনা থাকবেই। তবে সিলেটে বসবাসকারী অন্য জেলার রোজাদারেরা মুড়ি ও ছোলা বুটের মিশ্রণের পদ চালু রেখেছেন। পোলাও রান্নার চাল দিয়ে তৈরি হয় আখনি। এ জন্য একে একসঙ্গে আখনি-পোলাও ডাকা হয়। গরু, খাসি কিংবা মুরগির মাংস ছাড়া আখনি হয় না। যে মাংস যুক্ত করা হয়, সেই মাংসের নাম উল্লেখ করে আখনি পরিচিতি পায়। যেমন, গরুর আখনি, খাসির আখনি প্রভৃতি। পোলাও-বিরিয়ানি রান্নার প্রণালির সঙ্গে আখনির মিল রয়েছে। তাই সিলেটের আখনি খেয়ে বাইরের জেলার মানুষেরা পোলাও-বিরিয়ানির স্বাদ অনুভব করেন। এ ছাড়া অন্যান্য সামগ্রীর মধ্যে জিলাপি, পেঁয়াজু, আলুর চপ, ডিমের চপ, বেগুনি, আলুনি, শাকের পাকুড়া, সবজির পাকুড়া, কাঁচকলার চপ, চিংড়ির বড়ার কদর বেশি। ফাস্টফুডের দোকানগুলোতে মেলে চিকেন ইরানি কাবাব, চিকেন টিক্কা, চিকেন ফ্রাই, রেশমি কাবাব, চিকেন রোস্ট, চিকেন রোল হরেক পদ। পাশাপাশি ইদানীং হালিম ইফতারির একটি অপরিহার্য অনুষঙ্গ হয়ে উঠেছে। মিষ্টিজাতীয় দ্রব্যের মধ্যে সিলেটের বিশেষত্ব হচ্ছে আমৃতি। একসময় এটি লাল রঙের হতো। ইফতারির জন্য বিশেষভাবে তৈরি আমৃতিতে রং দেওয়া হয় না। দেখতে অনেকটা জিলাপির মতো হলেও আকার ও স্বাদে রয়েছে ভিন্নতা। হাতে গোনা কয়েকটি মিষ্টির দোকানে আমৃতি মেলে।
সিলেটে বিভিন্ন পাড়া-মহল্লা থেকে মসজিদ, মক্তব, মাদ্রাসা ও এতিমখানায় ইফতারি পাঠানোর রেওয়াজ প্রচলিত রয়েছে। সিলেটের ইফতার সংস্কৃতিতে আখনি-খিচুড়িই প্রধান। এ দুটিতে সিলেটি চেনা যায়। পাশাপাশি কনের শ্বশুরালয়ে ইফতারি পাঠানোর সংস্কৃতি প্রচলিত রয়েছে। ইফতারি পাঠানোর রেওয়াজে আখনির প্রচলন বহু পুরোনো। ছানা, পেঁয়াজু, জিলাপিসহ মিষ্টি ও ফলমূল থাকলেও আখনি ছাড়া যেন ইফতারই হয় না।
সিলেটে ইফতারের অন্যতম প্রধান অনুষঙ্গ ঐতিহ্যের পাতলা খিচুড়ি। ইফতারিতে যতো বাহারি আইটেমই থাকুক না কেন, সিলেটের রোজাদাররা খিচুড়ি ছাড়া যেন শান্তি পান না।
রমজানে প্রতিদিন সিলেটের সর্বত্রই ইফতারিতে খিচুড়ি রান্না করা হয়। সুগন্ধি চিকন চালের সঙ্গে গাওয়া ঘি, কালিজিরা ও মেথিসহ নানাজাতের মসলা দিয়ে রান্না করা হয় খিচুড়ি। স্বাদে ভিন্নতা আনার জন্য অনেকেই খিচুড়িতে শাকসবজি কুচি করে মিশিয়ে থাকেন। অনেকেই আবার খিচুড়ির সঙ্গে গরু বা মুরগির মাংস, ছোলা প্রভৃতিও মিশিয়ে থাকেন। তবে সাধারণ চাল দিয়েও খিচুড়ি রান্না করা হয়। সারাদিন রোজা রেখে ইফতারিতে খিচুড়ি খাওয়া স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী বলে চিকিৎসকদের অভিমত।
ডাক্তারদের মতে রমজানে সারাদিন অভুক্ত থাকার পর খিচুড়ির মতো নরম খাবার খাওয়া স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী। ভাজাপোড়া না খেয়ে রমজানে ইফতারিতে খিচুড়ি খেলে অ্যাসিডিটি, হজমের সমস্যা কিংবা বুক জ্বালাপোড়ার সমস্যা হবে না।

শেয়ার করুন
ইতিহাস ও ঐতিহ্য এর আরো সংবাদ
  • চন্দ্রবিজয় ১৯৬৯ নিল আর্মস্ট্রংদের সঙ্গী ছিলেন সিলেটি বিজ্ঞানী রফিক
  • পার্বত্য তথ্য কোষ
  • ফিরে দেখা সিলেটে ঐতিহাসিক গণভোট
  • ঐতিহ্যে সিলেটি ইফতার
  • সিলেটের ঐতিহ্য ‘ফুড়ির বাড়ি ইফতারি’
  • পার্বত্য তথ্য কোষ
  • সিলেট বেতার : মুক্তিযুদ্ধকালীন খণ্ডচিত্র
  • জামাইবাড়িতে ইফতারি : আম-কাঠলী-সন্দেশ
  • আমাদের বর্জনীয় অভ্যাসগুলি
  • পার্বত্য তথ্য কোষ
  • ঐতিহ্য হারাচ্ছে ঢাকার প্রথম মসজিদ
  • সিলেটের ঐতিহ্য ও সুরমা নদী
  • সিলেটের ঐতিহ্যবাহী নাগা মরিচ
  • পার্বত্য তথ্য কোষ
  • শ্রীভূমি শ্রীহট্ট-কাছাড়ের প্রাচীন ইতিহাস
  • সিলেট নামটি যেভাবে এলো
  • পার্বত্য তথ্য কোষ
  • ঐতিহাসিক বাবরি মসজিদের প্রসঙ্গ কথা
  • বঙ্গ থেকে বাংলাদেশের ইতিহাস
  • পার্বত্য তথ্য কোষ
  • Developed by: Sparkle IT