স্বাস্থ্য কুশল

রোগ প্রতিরোধে লিচুর ভূমিকা

মো. জহিরুল আলম শাহীন প্রকাশিত হয়েছে: ০৫-০৬-২০১৭ ইং ০১:১৯:২৪ | সংবাদটি ৯৯ বার পঠিত





দেশের বিভিন্ন জেলার বাড়ি বাড়ি বা ঘরের পাশে বা বাগানে লিচু গাছে থোকায় থোকায় ঝুলছে আকর্ষণীয় লাল রঙের লিচু। লিচু একটি গ্রীষ্মকালীন মৌসুমী ফল। পৃথিবীর সবচেয়ে সুস্বাদু ফলের মধ্যে লিচু অন্যতম। এর গন্ধ, স্বাদ, রস আর দেখার সুন্দরের জন্য এ ফল ছোট-বড় সকলেরই অত্যন্ত জনপ্রিয়। এটি অত্যন্ত রসালো ফল। লিচু ফলের বাইরের আবরণটি লালচে হলুদ, এর ভিতরে রসালো সাদা অংশ খাদ্যাংশ, এর ভিতরে কালচে বাদামি রঙের বিচি। লিচুর আদিনিবাস চীনের দক্ষিণ অঞ্চল কাওয়াংতুং এবং ফুকিং প্রদেশ। পরে ধীরে ধীরে লিচু গাছ পৃথিবীর নানান দেশে ছড়িয়ে পড়ে। আমাদের দেশে নানা জাতের লিচু জন্মে। রাজশাহী, দিনাজপুর, রংপুর, যশোর, চট্টগ্রাম, ঢাকা, সিলেট, মৌলভীবাজার, পাবনা, কুষ্টিয়ায় ভালো মানের প্রচুর লিচু জন্মে।
লিচু উদ্ভিদ জগতের ঝধঢ়রহফধপবধব পরিবারের উদ্ভিদ। এর বৈজ্ঞানিক নাম খরঃপযর ঈযরহবহংরং, ইংরেজি নাম খরঃপযর লিচু পুষ্টি উপাদানে ভরপুর। এতে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন সি, বি, পটাশিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, ক্যালসিয়াম, লৌহ বিদ্যমান। তাছাড়া মানবদেহের জন্য অতি প্রয়োজনীয় অন্যান্য উপাদানও পাওয়া যায়। যা দেহকে মারাত্মক রোগ থেকে বাঁচিয়ে রাখে। যেমন লিচুতে পর্যাপ্ত ডায়াটারি ফাইবার বা আঁশ যা মানবদেহের জন্য অতিরিক্ত ওজন কমাতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাছাড়া লিচুতে অলিগেনল নামে উপাদান থাকে। যা অ্যান্টি অক্সিডেণ্ট ও অ্যান্টি ইনফ্লুয়েঞ্জা হিসাবে কাজ করে। এ উপাদান রক্ত লালচে রাখতে, স্বাভাবিক রাখতে সাহায্য করে, ত্বককে ক্ষতিকর অতি বেগুনি রশ্মির প্রভাব থেকে রক্ষা করে। লিচুতে পেকটিন নামের উপাদান থাকে যা মানবদেহের অন্ত্রের মল পরিষ্কার করে বের করে দেয়। পলিফেনল নামে আরেকটি উপাদান থাকে যা চর্বি কোষকে ভাঙতে সাহায্য করে এবং যকৃতে চর্বি জমতে বাধা দেয়। তাছাড়া ফ্ল্যাভনয়িডস নামক একটি উপাদান থাকে যা স্তন ক্যান্সার প্রতিরোধ করে। পুষ্টি বিজ্ঞানীদের মতে, প্রতি ১০০ গ্রাম লিচুতে খাদ্য উপাদান হলো শক্তি-৬৬ কিলোক্যালরি, শর্করা ১৭ গ্রাম, জলীয় অংশ ৮১.৭৫ গ্রাম, প্রোটিন ১.১ গ্রাম, চর্বি ০.৪৪ গ্রাম, কার্বোহাইড্রেট ১৬.৫৩ গ্রাম, আঁশ ১.৩১ গ্রাম, চিনি ১৫.২৩ গ্রাম, লোহা ০.৩১ মিলিগ্রাম, ভিটামিন সি ৭২ মিলিগ্রাম, ভিটামিন বি-১০.০২ মিলিগ্রাম, ভিটামিন বি-২ ০.০৭ মিলিগ্রাম, নিয়াসিন ০.৬ মিলিগ্রাম, ভিটামিন ই ০.০৭ মিলিগ্রাম, ভিটামিন কে ০.৪২ মিলিগ্রাম, ম্যাগনেসিয়াম ১০ গ্রাম, ফসফরাস ৩১.১ মিলিগ্রাম, পটাশিয়াম ১৭০ মিলিগ্রাম, ক্যালসিয়াম ১০ মিলিগ্রাম।
লিচুতে কোলেস্টেরল নেই বললেই চলে। সুতরাং উপরের তথ্য মতে, আমাদের শরীরের যেসব খাদ্য উপাদান অতি প্রয়োজন তার প্রায় সব উপাদানই লিচুতে পাওয়া যায়। তাই শরীরকে সুস্থ ও সুন্দর রাখতে পরিমিত লিচু খাওয়া অতি প্রয়োজন। ভিটামিন বি আমাদের দেহের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর অভাবে বেরি বেরি রোগ হয়, ¯œায়ুবিক দুর্বলতা, মানসিক অবসাদ, ক্লান্তি, খাওয়ায় অরুচি, মুখে-জিভে ঘা, চামড়ায় লালচে দাগ পড়া, খসখসে হওয়া ও দেহের ওজন কমে যাওয়া এবং দেহে রক্তশূন্যতা দেখা দেয়। ভিটামিন সি দেহে আয়রণ শোষণে সহায়তা করে। দাঁতের নানা সমস্যা দূর করে। মুখের ঘা, চুলের সমস্যা, চামড়ার সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে। লিচুতে বিভিন্ন খনিজ উপদানের মধ্যে পটাশিয়াম, ক্যালসিয়াম, ফসফরাস প্রচুর রয়েছে। পটাশিয়াম দেহের রক্ত প্রবাহ, হার্ট বিট নিয়ন্ত্রণ করে এবং উচ্চ রক্তচাপ বা হাই প্রেসার নিয়ন্ত্রণ করে। ক্যালসিয়াম দাঁত, হাঁড় গঠনে বিশেষ ভূমিকা পালন করে।
তাছাড়া লিচু খেলে আমাদের আরো যে সব উপকার সাধিত হয় তাহলো : মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ বা স্ট্রোক এবং হৃদরোগের ঝুঁকি কমে। যারা হাঁড়ের বিষ ব্যথা বা নানা সমস্যায় ভুগছেন লিচু খান উপকার পাবেন। লিচুতে প্রচুর পরিমাণে ভিটা ক্যারোটিন ও লিজোনল থাকে। যা হৃদরোগীদের জন্য বেশ উপকারী। লিচু মানবদেহের ক্যান্সার কোষ সৃষ্টি করতে দেয় না এবং টিউমার সৃষ্টিতে বাধা দেয়। ফলে ক্যান্সার নামক ঘাতক রোগ থেকে বাঁচা যায়। বয়স্ক মহিলাদের লিচু খুবই উপকারী। পোকা, মাকড়, বোলতা, বিছা কামড়ালে পাতার রস দিলে উপকার পাওয়া যায়। মহিলাদের স্তন ক্যান্সার প্রতিরোধ করে। সর্দি, কাশি, গলা ব্যথা, জ্বর সারাতে লিচু বেশ উপকার করে। যারা শ্বাসনালী রোগে বা হাঁপানি (অ্যাজমা) রোগে ভুগছেন তারা লিচু খেলে উপকার পাবেন। লিচু হজমের সমস্যা কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে। লিচু বয়সের ছাপ ও চামড়ার সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে। যাদের মুখে ঘন ঘন ব্রুণ হয় বা মুখে কালো দাগ পড়ে কপালে ভাঁজ পড়ে তারা পরিমিত লিচু খেলে উপকার পাবে। লিচুতে আছে আন-স্যাচুর্যটেড ফ্যাট যা দেহে অন্যান্য ভিটামিন শোষণে সাহায্য করে। এটি শরীরের রক্ত জমাট বাঁধতে ও শরীরে বিষ ব্যথা কমাতে সাহায্য করে। কচি লিচু বসন্ত রোগের কাজ করে। যাদের মুখের রুচি কমে যায় তারা  নিয়মিত লিচু খান উপকার পাবেন।
সাবধানতা : লিচু একটি গরম ফল। মজা বেশি পেয়ে বেশি খাওয়া উচিত নয়। পরিমাণে বেশি খেলে অনেকেরই অ্যাসিডিটি আর ডায়রিয়া হতে পারে। যাদের ডায়বেটিস আছে তারা অত্যন্ত সতর্কতার সাথে খেতে হবে। কারণ লিচুর সুগার আপনার ডায়বেটিস বাড়িয়ে দিতে পারে। তাই আপনার চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া লিচু খাবেন না।
লিচুতে মিথাইলিন, সাইক্লোপ্রোপাইল, গ্লাইসিন, এমসিপিজি নামক রাসায়নিক উপাদান থাকে যা খাবারের পর শরীরে ঢুকে দেহের শর্করা উৎপাদন মারাত্মকভাবে কমিয়ে দেয়। ফলে শরীরের ভারসাম্য ঠিক থাকে না। শরীর দুর্বল হয়ে পড়ে। শিশুদের বেলায় মারাত্মকভাবে শরীর দুর্বল হয়ে পড়ে এমনকি শিশুর মৃত্যুও হতে পারে। এই উপাদানগুলো কাঁচা লিচুতে বেশি থাকে। তাই টকটকে পাকা লিচু ভরা পেটে খেতে হবে। খালিপেটে লিচু খাবেন না। এমন তথ্যই গবেষকরা প্রকাশ করেছেন। নিয়ম মেনে লিচু খান দেহের পুষ্টি যোগান।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT