শিশু মেলা

নীলকণ্ঠ চা বিতান

দেলোয়ার হোসেন দিলু প্রকাশিত হয়েছে: ০৮-০৬-২০১৭ ইং ০২:০৬:১৫ | সংবাদটি ৯১ বার পঠিত

খোলা জানালা দিয়ে হাসনাহেনার মিষ্টি ঘ্রাণ আসছে, শোবার ঘরের কাছেই হাসনাহেনার গাছ,আমার দাদী গাছটি লাগিয়ে ছিলেন, তিনি নেই, তার হাতের লাগানো গাছটি বারবার আমাদের স্মৃতি কাতর করছে। আজ গাছে বেশি ফুল ফুটছে মনে হয়, ঘ্রাণের মাত্রাটা একটু বেশি মনটা ভরিয়ে দিচ্ছে, অসম্ভব মন-মাতানো ঘ্রাণ, হাসনা হেনার ঘ্রাণ মানুষকে মাতাল করার মত যথেষ্ট ক্ষমতা রাখে, শুনেছি হাসনা-হেনার ঘ্রাণে সাপও নাকি মাতাল হয়ে ঘ্রাণের উৎস খুঁজে। সেলফোনটা হঠাৎ বেজে উঠল, মনিরুল হক স্যার, যুবউন্নয়নের টাইপিং বিভাগের শিক্ষক, আমিও ঐ বিভাগের একজন ছাত্র। ফোনটা ধরতেই তিনি বললেন- নোটিশ বোর্ড টাঙ্গিয়ে দিয়েছে আগামী শুক্রবার সকালে শিক্ষা সফরে যাব শ্রীমঙ্গলে। তবে সঙ্গে কেবল একজন সঙ্গিই নিতে পারবে। তার অধিক নয়। আমি বললাম ঠিক আছে স্যার। আমি কয়টার দিকে আসব। তুমি সকাল আটটায় দিকে আসবা, তোমাকে নিয়ে বাদবাকি আয়োজন শেষ করব। দেখো ঠিক সময়ে আসবা। আমি জী বলে রেখে দিলাম।
শুক্রবারে আমি ঘুম থেকে উঠেই রেডি হয়ে গেলাম,এমনিতেই আমি সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠি, ওটা আমার ছোট বেলার অভ্যাস। রিক্সা নিয়ে স্যারের বাসায় এসে দেখি স্যার অলওয়েজ রেডি, অফিসের গাড়ি বের করার জন্য ড্রাইভারকে বললেন। রাতে হোটেলে কিছু খাবারের অর্ডার দেওয়া ছিল সকালে ৮টার ভেতরে তৈরী করে রাখবে আমরা গিয়ে আনব। আরো আছে পানির বোতল টিস্যু রেডিমেট খাবার বক্স  আরো অন্যান্য  যা আমাদের যাত্রায় বিভিন্ন কাজে লাগবে। আমরা খাবার গুলি নিয়ে ফিরে আসতেই দেখলাম অনেকই সেজে-গুজে এসে গেছেন। বড় বড় দুটি গাড়িও এসে গেছে কেউ কেউ গাড়িতে  উঠে পড়েছেন, স্যার বললেন দেখ তো কোন কিছু বাদ পড়ল কি না, বা কেউ বাদ পড়ল কি না। আমি যে বাসে উঠেছি সে গাড়ি  চেক কললাম কোন সিট খালি নেই, স্যার কে বললাম আমার গাড়িতে কোন সিট খালি নেই স্যার। তিনি ও বললেন- এই গাড়িতেও কোন সিট খালি নেই। তাহলে আমরা সবাই যাচ্ছি ।  গাড়ি গন্তব্যের দিকে ছেড়ে দিল।
শহর থেকে বের হতেই হৈ-হুল্লোড়, নাচ গান শুরু হল, যে যা পারে নেচে গেয়ে দেখাতে লাগল। কৌতুক বলতে ওস্তাদ বলে যাকে মানতে হয় আব্দুর রহিম সারা পথই হাসি আর আনন্দে মাতিয়ে রাখল। আমরা প্রায় ২ ঘন্টায়ই শ্রীমঙ্গল চা বাগানে এ সে পৌঁছে গেলাম। চোখ জুড়ানো চা বাগান দেখে আমরা সত্যিই অবিভুত ও মুগ্ধ হলাম। চারদিকেই চায়ের বাগান, মাঝে মাঝে দু’একটি নাম না জানা গাছ  প্রহরীর মত দাঁড়িয়ে আছে। পাশে চোখে পড়ল মণিপুরীদের ঘরবাড়ি, সুন্দর ঝকমক করছে খুব সুন্দর দৃশ্য, সবুজের মাঝে এক টুকরো বাংলাদেশ। স্যারকে বললাম- এখানে বাস থামানো যায় না? স্যার বললেন- নিশ্চয়, চা বাগান দেখতে  এসেছি বাগান না দেখলে কি চলে। চা বাগান দেখব না তো কি দেখব। থামাও বাস সবাই চিৎকার দিয়ে উঠল থামাও থামাও থামাও, ড্রাইভার স্যারের দিকে তাকল, স্যার সম্মতি সুচক মাথা নাড়ালেন বাস থেমে গেল। সবাই  হৈচৈ করে নেমে গেলাম। ড্রাইভারকে স্যার বললেন বাস টি ভাল কোন  জায়গাতে দাঁড় করিয়ে রাখার জন্য, যাতে কারো অসুবিধা না হয়। আমরা এক এক দলবেঁঁধে এক এক দিকে ছড়িয়ে পড়লাম, স্যার বলে দিলেন ঠিক দুটোর সময় চা বাগানের বাংলায় সবাই মিলিত হবো এবং দুপুরের খাবার খাব। আমি এক দলের সঙ্গে হাঁটতে লাগলাম সে দলে প্রায় ১৩ জন সদস্য আমাদের দলে আব্দুর রহিম ভাইও আছেন। আমরা মণিপুরী পাড়ার দিকে  এগোতে লাগলাম। মণিপুরী পাড়ায় ঢুকতেই বড় রাস্তার পাশে একটি সাইন বোর্ড দেখতে পেলাম যাতে লেখা আছে ‘নীলকণ্ঠ চা বিতান’। শাড়ী বিতান,  পর্দা বিতান নাম পেয়েছি কিন্তু চা বিতান এই প্রথম নাম দেখলাম, সবার কৌতূহল হল  নাম পড়ে। আমরা নীল কণ্ঠ চা বিতানের দিকে এগুলাম, গিয়ে যা দেখলাম তাজ্জব ব্যাপার। একতলা নয় দোতলা নয় সাততলা চা ভেরি ইন্টারেসটিং, আবার চা কে গ্লাসে সাজিয়ে রেখেছে সবাইকে দেখানোর জন্য। এখানেও যেন হুমড়ি খেলাম দালান শুনেছি মার্কেট শুনেছি দশতলা পাঁচতলা হয়, চা যে সাততলা হবে শুনিনি কখনো, আজব ব্যাপার তো? সবুজ নয়, লাল নয়, রঙ-বেরঙের চা। অসম্ভব ব্যাপার। এই চা কে সবাই রমেশের রঙ চা বলে ডাকে। চায়ের দেশে জম্ম বলেই চায়ের নাম শুনেই চা খাবার ইচ্ছা জাগল। আমি বলতেই সবাই বলল চা খেয়ে দেখি কি রকম, আর কেমন এর টেস্ট। আব্দুর রহিম বললু চায়ের দেশে এসে যদি চা না খেয়ে যাই অপূর্ণ থেকে যাবে সবই। চা খেতে অনেক লোক এসেছে আমরা ভীড় ঠেলে ভেতরে গেলাম। দেখলাম  প্রত্যেকের হাতেই দোতলা, তিনতলা চায়ের গ্লাস। অনেকগুলি দামী গাড়িও বিতানের সামনে দেখলাম দাঁড়িয়ে আছে। চোখ পড়ল চায়ের এক এক গ্লাস দামের তালিকার উপর। একতলা চা এক রঙের ২০ টাকা, দু রঙের ৪০ টাকা, এভাবে ক্রমান্বয়ে তলা প্রতি বাড়তে থাকে দাম। আমরা দু রঙের চায়ের অর্ডার দিলাম। এক গ্লাস চায়ের ভেতর সাতটি রঙ। রং ধনুর সাত রং দেখেছি কিন্তু চায়ের গ্লাসে সাত রং তাজ্জব ব্যাপারই তো।
প্রত্যেকটি চায়ের স্তরে ১ ইঞ্চির মত পুরু, প্রত্যেক স্তরে আলাদা আলাদা রঙের চা, সাততালা চায়ের গ্লাসের দিকে তাকালে রয়েল বেঙ্গল টাইগারের কথা মনে হবে সবার । এক এক রঙের চা আবার আলাদা আলাদা স্বাদেরও। গ্লাস তুলে ঝাঁকুনি দিলে এক রং আরেক রঙের সাথে মিশে না। এক স্তর খাওয়া শেষ হলে আরেক স্তরে প্রবেশ, চুমুকে চুমুকে তৃপ্তি। চায়ের ঘ্রাণে মনিপুরী পাড়া মৌ মৌ করছে।
নীল কন্ঠ চা বিতানে লোকের ভীড় লেগেই আছে, সিলেট থেকে ঢাকা যাবার পথে অনেক যাত্রী  এই নীল কন্ঠ চা বিতানের ভিন্ন রঙের চায়ের স্বাদ পেতে এই চা বিতানের সামনেই যাত্রা বিরতী নেন।
এই নীল কন্ঠ চায়ের মূল কারিগর রমেশ তালুকদার, তার বাপ-দাদার বাড়ি ময়মনসিংহের মুক্তাগাছায়।  বাপ জীবিকার সন্ধানে এখানে এসে বসতি স্থাপন করেছেন, বিয়ে সাদী করেন। রমেশের জম্ম এখানেই। বাপ এই ব্যবসা করতেন, বাপের কাছ থেকে শিক্ষা নিয়ে তিন ভাই মিলে এই ব্যবসা করছেন । আগে ছোট টং দোকান ছিল, ব্যবসা ভাল হওয়াতে  এখন অনেক বড় হয়েছে। রমেশকে জিজ্ঞেস করে জানা গেল চায়ের ভেতর কোন ক্যামিক্যাল ব্যবহার করা হয় কি না। সে জানাল ক্ষতিকর কোন ক্যামিক্যাল ব্যবহার করা হয় না। বড় বড় রিচার্স অফিসার  এসে চা নিয়ে গেছেন, মানব দেহের খারাপ করে এমন কোন ক্যামিক্যাল পান নি। ধন্যবাদ দিয়ে গেছেন। মন্ত্রী সহ উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা চায়ের স্বাদ নিয়েছেন, ধন্যবাদ দিয়ে গেছেন তবে চা কিভাবে বানানো হয় তা সে বলতে নারাজ। সে বলে ব্যবসায়িক গোপনীয়তা, দেখছেন না চা বানানো ঘরে কাউকে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। এই গোপনীয়তা শুধু আমাদের তিন ভাইয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। আমি গরম গরম আরো এক গ্লাস চা নিলাম, অনেক সময় নিয়ে চা খেলাম, না তেমন কোন ফাঁরাক আমার চোখে ধরা পড়েনি যে খারাপ কিছু এতে আছে। তবে কনডেন্স মিল্ক এর ফ্লেভারটি মনকাড়ে সবার।  অরজিন্যাল চা পাতার গন্ধ মনকে চাঙ্গা করে তুলে, আমি আনমনে চা খাচ্ছি আর এর ভেতর-ই আমাদের বাদ বাকি সঙ্গিরা এসে হাজির, তাদের সাথে আরো একবার চা পান করা হলো। ঘড়িতে চেয়ে দেখলাম দুটো বাজতে আরো ১৫ মিনিট বাকি, সবাইকে চা বাগানের বাংলাতে যাবার জন্য তাগদা দিয়ে উঠে পড়লাম। বাংলাতে এসে যেন আর কিছুই মনে হচ্ছে না রমেশের চা ছাড়া। স্যার বললেন- খাওয়া-দাওয়া শেষে  আমাদের যাত্রা হবে চা প্রক্রিয়াকরণ ও বাজারজাতকরণ এলাকা পরিদর্শন। কিভাবে চা পাতা এনে মেশিনের সাহায্যে প্রক্রিয়া করে চা পাতা খাবার উপযোগি করা হয়। আমরা এক এক করে ঘুরে ঘুরে সব দেখলাম, নোট করলাম পরবর্তিতে কাজে লাগতে পারে ভেবে। দেখতে দেখতে সন্ধ্যা প্রায় ঘনিয়ে এলো, চা বাগানে এক উদ্ভুত সন্ধ্যা কাটালাম। ঝিঁঝিঁদের  ডাক বন্য পরিবেশে  মনকে অভিভূত করার জন্য এই রকম সন্ধ্যা জীবনে প্রয়োজন। এখন আমাদের ফেরার পালা স্যার সবাইকে বাসে উঠার জন্য আহবান করলেন। কেউ যেন বাসে উঠতে চাচ্ছে-ই না। এত সুন্দর পরিবেশ ফেলে কারো যেতে কি ইচ্ছে করে? সবার মনকে যেন বিমোহিত করে রেখেছে চায়ের বাগানের আকর্ষণীয় পরিবেশ, কি আর করা ফিরতে যে হবেই। সবাই ধীরে সুস্থে বাসে উঠে পড়ল। চেয়ে দেখলাম বাসে আর কোন সিট খালি নেই। সিটে বসেই আমার বার বার মনে পড়ছে রমেশের চা, নীলকণ্ঠ চা বিতান আর চা বাগানের অদ্ভুত সন্ধ্যা, যেন এক ঘোরের ভেতরই টেনে নিয়ে যায়। গাড়ি ছেড়ে দিল  তার নিদিষ্ট গন্তব্যের দিকে, পেছনে ফেলে যাচ্ছি অসংখ্য স্মৃতির দিগন্ত।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT