ধর্ম ও জীবন

রোযার সওয়াব যেভাবে ধ্বংস হয়ে যায়

মো. আবদুল্লাহ আল মনসুর প্রকাশিত হয়েছে: ০৯-০৬-২০১৭ ইং ০২:৪৫:২৬ | সংবাদটি ৭৮ বার পঠিত

ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভকে দু’ভাগে ভাগ করা যায়: ১। করণীয় ২। বর্জনীয়।
কালেমা, নামাজ, হজ্জ্ব, যাকাত এ চারটি ইবাদতই করণীয়। কিন্তু রোযা একমাত্র ইবাদত, যা বর্জনীয়। নিদৃষ্ট কিছু বিষয়কে ত্যাগ করার নাম রোযা। যাকে আরবীতে বলে ‘সাওম’। সাওম মানেই বিরত থাকা। যেকোনো ধরণের বিরত থাকাকে শাব্দিক অর্থে সাওম বলে। পবিত্র কোরআনে শাব্দিক সাওমের একটি উদাহরণ আছে। যেমন, যখন মারইয়াম (আ:) ঈসা (আ) কে প্রসব করেছিলেন, তখন বলেছিলেন ‘নিশ্চই আমি সাওম পালন করছি। সুতরাং তিনদিন কারো সাথে কোনো কথা বলবনা’ (সুরা মারইয়াম)
সেটি ছিল কথা বর্জনের সাওম। কিন্তু পরিভাষায় সাওম বলে ‘‘রোযার নিয়তে সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত পানাহার ও কামাচার থেকে বিরত থাকা’’
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘রোযা এমন একটি ইবাদত যার সমান অন্য কোনো ইবাদাত নেই’। (নাসায়ি) অন্য হাদিসে নবী (সা) বলেন, রোযার প্রতিদান কেবল আমি নিজেই (বুখারী) অন্য হাদিসে নবী (সা) বলেন, যে ব্যাক্তি ঈমান ও সওয়াবের আশায় রমজানের রোযা পালন করবে, তার পেছনের সব গুনাহ মাফ করে দেয়া হবে (বুখারী)
আরো অনেক অনেক ফজিলত রয়েছে রোযা সম্পর্কে।
কিন্তু এত সব ফজিলত ও সওয়াব থেকে আমরা বঞ্চিত হব; যদি রোযার হক আদায় না করতে পারি। নবী (সা) আমাদেরকে যেভাবে রোযা রাখতে বলেছেন, আমরা যদি সেভাবে রোযা না রাখি। তাহলে রোযা শুধুমাত্র উপবাসই থেকে যাবে। দুনিয়া কিংবা আখেরাতে কোনো উপকার বয়ে আনবেনা। নাউযুবিল্লাহ।
অতএব, রোযা রাখার ক্ষেত্রে আমাদের সর্বাধিক গুরুত্ব দেয়া দরকার যে, আমাদের কোনো আমল যেন সওয়াব অর্জনের প্রতিবন্ধক হয়ে না দাড়ায়। সাধারণত যে সব কারণে রোযার সওয়াব ধ্বংস হয়ে যায় নি¤েœ তার কয়েকটি তোলে ধরছি।
ঈমানের দুর্বলতা ঃ আল্লাহ বলেন, “ওহে যারা ঈমান এনেছ, তোমাদের উপর রোযা ফরজ করা হয়েছে।” (সুরা বাকারা) রোযার বিষয়টাকে ঈমানের সাথে খুব দৃঢ়ভাবে সম্পৃক্ত করে দেয়া হয়েছে।
আল্লাহ তাআলা কে তার পূর্ণ গুণাবলী সহ শিরক মুক্ত হয়ে দৃঢ় বিশ্বাস করা। কুরআনের অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন, ‘কতক ঈমানদার এমন আছেন যারা শিরক করেন’’। শিরক মিশ্রিত কোনো আমলই আল্লাহর দরবারে কবুল হয়না। এজন্য শিরক মুক্ত ঈমান রোযার অন্যতম দাবী। হাদিসে এসেছে ঈমানের সর্বোত্তম শখা হল ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু’। অর্থাৎ আল্লাহ ব্যতিত কোনো ইলাহ নেই। যেকেনো ইবাদত কবুলের প্রথম ও প্রধান শর্ত ঈমান। যার ঈমান যত মজবুত তার ইবাদতে তত বেশী সওয়াব। জিবরীল (আ) একদিন রাসুল (সা:) কে প্রশ্ন করলেন ইয়া রাসুলাল্লাহ! ঈমান কী? রাসুল (সা:) বললেন ছয়টি বিষয়ের উপর দৃঢ় বিশ্বাস রাখার নাম ঈমান। আল্লাহ তার সকল ফেরেশতা গণ সকল আসমানী কিতাব সমূহ, সকল রাসুলগণ ও আখেরাতের উপর পূর্ণ বিশ্বাস স্থাপন করাকে ঈমান বলে। এই ছয়টির কোনো একটির প্রতি যদি কারো বিন্দুমাত্র সন্দেহ থাকে তাহলে তার ঈমান পূর্ণ নয়। এজন্য হাদিসে এসেছে “মান সামা ঈমানান” অর্থাৎ যে ঈমানের সাথে রোযা পালন করবে। রোযার বিষয়টাকে ঈমানের সাথে সম্পৃক্ত করে দেয়া হয়েছে।
রোযা আল্লাহর পক্ষ থেকে বিরাট একটি ইবাদত। রোযাকে বোঝা হিসেবে মনে করাও ঈমানের দূর্বলতার লক্ষণ।
সওয়াবের আশা না করা ঃ নবী (সা:) বলেন, যে ব্যাক্তি ঈমান ও সওয়াবের আশায় রমজানের রোযা রাখবে তার পেছনের সকল পাপ ক্ষমা করে দেয়া হবে। (বুখারী) এই হাদিসে ঈমানের সাথে আরেকটি বিষয় সম্পৃক্ত করে দেয়া হয়েছে। আর তা হল সওয়াবের আশা। ইবাদত হবে একমাত্র আল্লাহর জন্য। একমাত্র তার কাছ থেকেই প্রতিদান পাওয়ার আশা করতে হবে। লোক দেখানো কোনো ইবাদত কবুল হয়না। এজন্য লৌকিকতা কে ছোট শিরক বলা হয়েছে। অতএব, সওয়াবের আশা ছাড়া শুধুমাত্র সামাজিক একটি প্রথা হিসেবে রোযা পালন করলে সে রোযা কোনো কল্যাণ বয়ে আনবেনা।
ফরজ নামাজ ছেড়ে দেয়া ঃ রোযা যেমন, একটি ফরজ ইবাদত, ঠিক তেমনি নামাজও একটি ফরজ ইবাদত। ঈমানের পরই নামাজের অবস্থান। কুরআনে অসংখ্য বার নামাজের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। নবী (সা:) বলেন, ‘যে ব্যাক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে নামাজ ছেড়ে দিল সে কুফুরি করল। মুসলমান আর কাফেরের মাঝে পার্থক্য হল নামাজ। সাহাবায়ে কেরাম (রা:) তাকে মুসলিম হিসেবে মনে করতেন না, যে ব্যাক্তি নিয়মিত নামাজ ছেড়ে দিত। নবী (সা:) বলেন নামাজ বেহেশতের চাবি। তিনি আরো বলেন কিয়ামতের দিন সর্ব প্রথম নামাজের হিসেব নেয়া হবে (তিরমিযি)
রমজানে অনেকে ফরজ রোযা ঠিকই রাখেন কিন্তু ফরজ নামাজ আদায়ে সতর্ক থাকেন না। বিশেষত ফজরের নামাজ। সাহরি খেয়ে অনেকেই ঘুমিয়ে পড়েন। ফজরের ওয়াক্ত ঘুমে চলে যায়। যা নিতান্ত দু:খজনক। নবী (সা:) বলেন, ‘মানুষ যখন ঘুমায় তখন শয়তান তার মাথার কাছে এসে তিনটি গিঁরা লাগায়। যখন ঐ ব্যাক্তি ওযু করে ফজরের নামাজ আদায় করে তখন অনায়াসে তিনটি গিঁরা খুলে যায়। তার সারাদিন উদ্যামের সাথে কাটে’।
আর যে ব্যাক্তি ফজরের নামাজ না পড়েই ঘুমিয়ে থাকল, তার তিনটি গিঁরা রয়েগেল। তার সারাদিন অলসতার সাথে কাটবে। (বুখারী)
তাই পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ, বিশেষত ফজরের নামাজের প্রতি সবার বিশেষ গুরুত্ব দেয়া দরকার। ফরজ নামাজের প্রতি অলসতা যেন, আমাদের রোযার সওয়াব অর্জনের প্রতিবন্ধক হয়ে না দাড়ায়।
ফরজ পর্দা ছেড়ে দেয়া ঃ মহিলাদের জন্য পর্দা একটি ফরজ ইবাদত। পর্দ কোনো প্রথার নাম নয়। বরং তা নামাজ রোযার মতই ফরজ ইবাদত।
মহান আল্লাহ বলেন, ‘মুসলিম মহিলাদেরকে বলেদিন, তারা যেন জাহিলিযুগের মহিলাদের মত নিজেকে প্রকাশ না করে এবং তারা যেন নিজ গৃহে অবস্থান করে। (আল কুরআন)
অনেক মুসলিম বোনরা ফরজ রোজা যথাযথভাবে পালন করেন। ফরজ নামাজও সময়মত আদায় করে থাকেন। কিন্তু ফরজ পর্দা পালনের ক্ষেত্রে মোটেও গুরুত্ব দিতে দেখা যায়না। যা রোযার সওয়াব অর্জনের অন্যতম একটি প্রতিবন্ধক। এ ব্যাপারে সতর্কতা কাম্য।
হারাম খাদ্য ভক্ষণ করা ঃ আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাতের আকিদা হল ইবাদত কবুলের পূর্বশর্ত হালাল উপার্জন। ইনকাম সোর্স বৈধ না হলে কোনো ইবাদতই কবুল হয়না। নামাজ, রোযা, হজ্জ্ব, যাকাত, দুআ, সাদাকাহ এসব ইবাদত কবুলের অন্যতম শর্ত হালাল উপার্জন।
মহান আল্লাহ বলেন ‘‘কিয়ামতের দিন কিছু আমল ধূলিকণার ন্যায় উড়তে থাকবে’’। অর্থাৎ এসব আমলের কোনো মূল্য আল্লাহর কাছে থাকবেনা। উপরন্ত এর জন্য রয়েছে কঠিন শাস্তি। (আল কুরআন)
নবী (সা:) বলেন, নিশ্চই আল্লাহ পবিত্র এবং তিনি পবিত্র ছাড়া কোনো কিছু গ্রহণ করেন না এরপর তিনি এমন এক ব্যাক্তির উদাহরণ দিলেন, যে ছিল মুসাফির। সে আকাশের দিকে হাত তোলো দুআ করছে হে রব! হে রব! অথচ তার খাদ্য, পানিয়, পোষাক, রক্ত, মাংস সবই হারাম তাহলে কীভাবে তার দুআ কবুল হবে? (আবু দাউদ)
এই হাদিস দ্বারা প্রতিয়মান হারাম পন্থায় উপার্জিত খাবার খেয়ে রোযা রাখলে সে রোযা কবুল হবেনা। একজন মুসলিম হিসেবে এটাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়া ঈমানের দাবী।
অন্যায় কথা বা কাজে জড়িত থাকা ঃ নবী (সা:) বলেন, ‘যে ব্যাক্তি রোযা রেখে পাপ, মিথ্যা বা অন্যায় কথা, অন্যায় কাজ, রাগ, মূর্খতাও অজ্ঞতামূলক কর্ম ত্যাগ করতে না পারবে তার পানাহার ত্যাগ করাতে আল্লাহর কোনো প্রয়োজন নেই’। (বুখারী)
অন্যায় কথা বা কাজ এমনিতেই গুনাহ। নবী (সা:) বলেন, যখন মানুষ-গুনাহের কাজ করে তখন তার অন্তরে একটি কালো দাগ পড়ে। এভাবে অব্যাহতভাবে গুনাহ চললে পুরো অন্তর এক পর্যায়ে কালো হয়ে যায়। আর কালো অন্তর দিয়ে ইবাদত করলে তাতে কোনো স্বাদ অনুভূত হয় না। বিশেষ করে রোযা রেখে কারো সাথে ঝগড়ার লিপ্ত না হওয়া। নবী (সা:) বলেন, যদি কেউ রোযাদারকে গালি দেয়, তাহলে সে যেন বলে দেয় ‘আমি রোযাদার’ অর্থাৎ সে যেন তার সাথে ঝগড়ায় লিপ্ত না হয়।
এক ব্যাক্তি নবী (সা:) এর কাছে এসে বলল ইয়া রাসুলাল্লাহ! আমাকে কিছু উপদেশ দিন। রাসুলাল্লাহ (সা:) বললেন, তুমি রাগ করনা লোকটি আবারো বলল আমাকে আরো কিছু উপদেশ দিন। নবী (সা:) তাকে আবারো বললেন তুমি রাগ করনা। এভাবে তিনবার লোকটিকে নবী (সা:) কারো সাথে রাগ না করতে নির্দেশ দিলেন। রোযা রেখে উপবাস থাকার কারণে অনেকেই ঝগড়া, মারামারি, রাগ, অন্যায়, কথা বা কাজে লিপ্ত হন। যা রোজার সওয়াব অর্জনের বিরাট প্রতিবন্ধক। এ ব্যাপারে সবার সচেতনতা কাম্য।
গীবত করা ঃ গীবত একটি মারাতœক গুনাহের কাজ। গীবতের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে নবী (সা:) বলেন, তোমার ভাইয়ের অগোচরে তার সম্পর্কে এমন আলোচনা করা যা শুনলে সে অপছন্দ করবে।
গীবত এমন একটি মারাত্মক গুনাহ, যার ভয়াবহতা বুঝাতে গিয়ে নবী (সা:) একদিন সাহাবাদেরকে প্রশ্ন করলেন বলতো, সবচেয়ে অসহায় কে? সাহাবারা জবাবে বললেন, সবচেয়ে অসহায় তো ঐ ব্যাক্তি যার টাকা পয়সা নাই, সমাজে তেমন কোনো সম্মান নাই। নবী (সা:) বললেন, না সে সবচেয়ে অসহায় নয়। সবচেয়ে অসহায় হল ঐ ব্যাক্তি যে কিয়ামতের দিন পাহাড় সম নেকী নিয়ে উঠবে, অথচ কিছুক্ষণ পর একজন ব্যক্তি আসবে, যার গীবত করা হয়েছিল সে এসে তার প্রয়োজনীয় নেকী নিয়ে নেবে। এর পরও লোকেরা আসতে থাকবে। এক পর্যায়ে ঐ ব্যাক্তির সব নেকি শেষ হয়ে যাবে। এরপরও লোকেরা আসতে থাকবে যখন ঐ ব্যাক্তির কোনো নেকি অবশিষ্ট থাকবেনা তখন যাদের গীবত করা হয়েছিল তাদের গুনাহ ঐ ব্যাক্তির ঘড়ে চাপিয়ে দেয়া হবে। ফলে পাপের বোঝা নিয়ে তাকে জাহান্নামে প্রবেশ করানো হবে। তখন ঐ ব্যাক্তির চেয়ে আর অসহায় কেউ থাকবেনা গীবত বা পরনিন্দা রোযার সওয়াব অর্জনের প্রতিবন্ধক। অতএব গীবত থেকে বেঁচে থাকা রোযার অন্যতম দাবী।
অতএব, আসুন রোযার মাধ্যমে আমরা নিজেকে পরিশুদ্ধ করার চেষ্টা করি। আল্লাহ যেন আমাদেরকে সেই অনুযায়ি আমল করার তওফিক দেন। আমিন।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT