ধর্ম ও জীবন

ইসলামের প্রথম মসজিদ

মুহাম্মদ নাজমুল ইসলাম প্রকাশিত হয়েছে: ০৯-০৬-২০১৭ ইং ০২:৪৫:৫৭ | সংবাদটি ১৭৬ বার পঠিত

মসজিদ মসজিদে কুবা। ইসলামের প্রথম মসজিদ। সাহাবায়ে কেরামের প্রাণের মসজিদ। যে মসজিদ সম্পর্কে পবিত্র কোরআনুল কারিমে বর্ণিত হয়েছে, প্রথমদিন থেকেই এ মসজিদের ভিত্তি তাকওয়ার ওপর প্রতিষ্ঠিত। (সুরায়ে তাওবা : আয়াত ১০৮)
মসজিদে নববী থেকে এ মসজিদের দূরত্ব প্রায় ৩ কিলোমিটার। মসজিদে কুবা মদিনা শহরের দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত। কুবা নামক স্থানের নামানুসারে এ মসজিদটিকে কুবা মসজিদ বলা হয়।
প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হিজরতকালে মদিনার যাত্রাপথে নিজেই এই মসজিদের ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন। উল্লেখ্য, ইসলাম ধর্ম প্রচারের শুরুর দিকের কথা। তখন বিধর্মীদের অত্যাচার আর নিপিড়নের কারণে মক্কায় অবস্থানরত মুসলমানরা ধীরে ধীরে মক্কা থেকে মদিনায় হিজরত করতে থাকেন। ৬২২ খৃস্টাব্দের ২২ সেপ্টেম্বর বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম  মদিনার নিকটবর্তী কুবা নামক স্থানে উপস্থিত হন। এই সময় হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কুবাতে এই মসজিদের ভিত্তি স্থাপন করেন।
পবিত্র মসজিদে নববীর পর সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ ও দক্ষিণ মদীনার দ্বিতীয় বৃহত্তম মসজিদ হচ্ছে কুবা মসজিদ। হিজরি প্রথম বর্ষে এই মসজিদটি নির্মিত হয়। হাদীসে কুবা মসজিদের মর্যাদা এবং এর বৈশিষ্ট্য বর্ণিত হয়েছে। বলা হয়েছে, ‘যে ব্যক্তি এখানে অজু করে এক ওয়াক্ত নামাজ পড়বে, সে এক উমরাহ হজের সমান সওয়াব লাভ করবে।’ মহানবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রতি শনিবার এখানে নামাজ পড়তে আসতেন। তিনি উটে চড়ে কিংবা পায়ে হেঁটে আসতেন এবং দুই রাকাত নামাজ পড়তেন। ইতিহাসে দেখা যায়, ইসলামের তৃতীয় খলিফা হযরত ওসমান ইবনে আফফান (রা:) প্রথম এই মসজিদটির সংস্কার করেন। খলিফা হজরত ওমর বিন আবদুল আজিজ (রহ.) মসজিদটির প্রথম মিনার তৈরি করেন। এভাবেই অনেকদিন কেটে যায়। পরবর্তীতে ৪৩৫ হিজরিতে আবু ইয়ালি আল-হোসাায়নি কুবা মসজিদ সংস্কার করেন। তিনি মসজিদের মিহরাব তৈরি করেন। ৫৫৫ হিজরীতে কামাল আল-দীন আল ইসফাহানি মসজিদে আরও কিছু সংযোজন করেন। এর পরবর্তী সময়ে ৬৭১, ৭৩৩, ৮৪০ ও ৮৮১ হিজরীতে উসমানী খিলাফতের সময় মসজিদটি সংস্কার করা হয়। আধুনিককালে সৌদি শাসনামলে হজ্ব মন্ত্রণালয় মসজিদটির দায়িত্ব গ্রহণ করে, যা মূল ডিজাইনে অধিকতর সংস্কার এবং সংযোজন করে। বর্তমান কুবা মসজিদ ইসলামী ঐতিহ্যের পাশাপাশি আধুনিকতম সুযোগ-সুবিধা সম্বলিত একটি অনন্য স্থাপত্য। মসজিদটিতে একটি অভ্যন্তরীণ প্রাঙ্গনসহ কয়েকটি প্রবেশ দ্বার আছে। মসজিদের উত্তর দিক মহিলাদের জন্য সংরক্ষিত রয়েছে।
বর্তমানে মসজিদে ৪টি মিনার এবং ৫৬টি গম্বুজ রয়েছে। ১১২ বর্গমিটার এলাকা ব্যাপী ইমাম এবং মোয়াজ্জিনের থাকার জায়গা, ১টি লাইব্রেরি, প্রহরীদের থাকার জায়গা ও সাড়ে ৪শ’ বর্গমিটার স্থানে ১২টি দোকানে একটি বাণিজ্যিক এলাকা বিদ্যমান। মসজিদে ৭টি মূল প্রবেশদ্বার এবং ১২টি সম্পূরক প্রবেশ পথ রয়েছে। প্রতিটি ১০ লাখ ৮০ হাজার থার্মাল ইউনিট বিশিষ্ট ৩টি কেন্দ্রীয় শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র মসজিদকে ঠা-া রাখছে।
ঐতিহাসিক কুবা মসজিদ শ্বেতবর্ণের একটি অনন্য স্থাপত্যকর্ম, যা বহু দূর হতেও দৃষ্টিগোচর হয়। নান্দনিক এবং মনকাড়া ডিজাইনের এ মসজিদটি এক পলক দেখতে বিশ্বের আনাচে কানাচে থেকে পর্যটকরাও প্রচুর ভিড় জমান।
তাফসীর কুরআন
আবু দাউদ শরীফে বর্ণিত হয়েছে যে, লোকেরা যে কোনো সফর থেকে আসুক না কেন, বাড়ীতে সদর দরজা দিয়ে প্রবেশ করতো না। তাই এ আয়াত নাযিল হয়।
প্রকৃত ব্যাপার যেটাই হোক না কেন, কোনো সাধারণ সফরের ব্যাপারে তাদের এরূপ অভ্যাস থেকে থাক কিংবা হজ্জের ব্যাপারে এটা সুনিশ্চিত যে, মুসলমানরা একে একটা পুণ্যের কাজ বলে বিশ্বাস করতো। তাই তাদের এই ধারণাকে খন্ডন করতে এ আয়াত নাযিল হয়। উক্ত ভিত্তিহীন কাজটির বিলোপ সাধন এবং মোমেনের দৃষ্টিতে সত্যিকার পুণ্যের কাজ কি, তা জানিয়ে দেয়াই এর উদ্দেশ্য।
বস্তুত প্রকৃত পুণ্য ও সওয়াবের কাজ হলো তাকওয়া বা খোদাভীতি। আল্লাহর সার্বক্ষণিক উপস্থিতি এবং গোপন ও প্রকাশ্যে আল্লাহর প্রত্যক্ষ তদারকী ও তত্ত্বাবধান সম্পর্কে সচেতন হওয়ার নামই তাকওয়া। তাকওয়া এমন কোনো আনুষ্ঠানিক বা বাহ্যিক কাঠামো সম্বলিত ব্যাপার নয়, যা ঈমানের মূল তত্ত্ব সম্পর্কে সজাগ করে না এবং একটা জাহেলী প্রথা ছাড়া অন্য কোনো তাৎপর্য বহন করে না।
আয়াতের শেষাংশে বাড়ীর সদর দরজা দিয়ে প্রবেশ করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। সেই সাথে তাকওয়া ও আল্লাহভীতি অবলম্বনের নির্দেশের পুনরাবৃত্তি করা হয়েছে এবং তাকে মুক্তির উপায় হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে। এভাবে কোরআন মানুষের মনকে ঈমানের আসল তত্ত্বের সাথে পরিচিত করে। সেই তত্ত্ব হচ্ছে তাকওয়া। সে বলে যে, এই তত্ত্বের ওপর দুনিয়া ও আখেরাতের সার্বিক কল্যাণ নির্ভরশীল।
এই সাথে কোরআন ঈমানের দৃষ্টিকোণ থেকে অসার ও নিস্ফল জাহেলী প্রথাকে বাতিল ঘোষণা করতো চাঁদের মাধ্যমে আল্লাহ যে মূল্যবান নেয়ামত দিয়েছেন এবং মানুষের সময় নির্ধারণ ও হজ্জের সুবিধা করে দিয়েছেন তা অনুধাবন করার জন্যে মোমেনদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন। একটি মাত্র ক্ষুদ্র আয়াতেই সে এইসব শিক্ষা দিয়েছে।
যুদ্ধবিগ্রহ প্রসঙ্গে কতিপয় নির্দেশ
এরপর সাধারণভাবে যুদ্ধ বিগ্রহ সম্পর্কে বিশেষভাবে মাসজিদুল হারামের কাছে ও নিষিদ্ধ মাসে যুদ্ধবিগ্রহ সম্পর্কে বক্তব্য এসেছে। সেই সাথে আল্লাহর পথে অর্থ ব্যয়ের আহ্বানও জানানো হয়েছে। জেহাদের সাথে এর সম্পর্ক অত্যন্ত নিবিড় ও ঘনিষ্ঠ। ১৯০ নং থেকে ১৯৫ নং পর্যন্ত আয়াতসমূহে এ বিষয়ে বক্তব্য রয়েছে।
কোনো কোনো হাদীসে বর্ণিত হয়েছে যে, এ আয়াতগুলোই হচ্ছে যুদ্ধবিগ্রহ সম্পর্কে নাযিল হওয়া প্রথম আয়াত। এর আগে সূরা হজ্জে আল্লাহর পক্ষ থেকে মোমেনদেরকে শধু এতটুকু বলা হয়েছে যে, কাফেরদের পক্ষ থেকে চাপিয়ে দেয়া যুদ্ধের শিকার মযলুম মুসলমানদেরকে যুদ্ধে লিপ্ত হওয়ার অনুমতি দেয়া হলো। মোমেনরা তখন বুঝতে পেরেছিলেন যে, এই অনুমতি আসলে তাদের ওপর জেহাদ ফরয করা ও তাদেরকে ক্ষমতাসীন করার পূর্বাভাস মাত্র। সূরা হজ্জের সেই আয়াতগুলোতে বলা হয়েছে, ‘যাদের ওপর আক্রমণ চালানো হয় তাদেরকে যুদ্ধের অনুমতি দেয়া হলো। ককেননা তারা নির্যাতিত আর আল্লাহ তাদেরকে সাহায্য করতে অবশ্যই সক্ষম। যাদেরকে নিজেদের ঘরবাড়ী থেকে অবৈধভাবে বহিষ্কার করা হয়েছে শুধুমাত্র এ জন্যে যে, তারা বলেছিলো আল্লাহ আমাদের প্রভু।’
বস্তুত আল্লাহ যদি মানুষকে মানুষ দিয়ে প্রতিহত না করতেন, তাহলে উপাসনালয়সমূহ ও মসজিদসমূহ-যাতে আল্লাহর নাম বেশি করে স্মরণ করা হয় তা ধ্বংস হয়ে যেত। আল্লাহকে যে সাহায্য করে, তাকে আল্লাহ অবশ্যই সাহায্য করবেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ মহাশক্তিধর মহাপ্রতাপশালী। (সেইসব মযলুম মোমেনকে অনুমতি দেয়া হয়েছে) যাদেরকে আমি পৃথিবীতে ক্ষমতাশীল করলে তারা নামায কায়েম করবে, যাকাত দেবে, সৎ কাজের আদেশ দেবে ও অসৎ কাজ নিষিদ্ধ করবে। আল্লাহর হাতেই রয়েছে সব কিছুর শেষ পরিণতি।’
এজন্যে তারা জানতেন যে, কোন কারণে তাদেরকে অনুমতি দেয়া হয়েছে এবং এই যুলুমের প্রতিশোধ নেয়ার জন্যে কেন আহ্বান জানানো হয়েছে। ইতিপূর্বে যখন তারা মক্কায় ছিলেন, তখন তাদেরকে যুলুম প্রতিহত করা থেকে বিরত রাখা হয়েছিলো। তাদেরকে বলা হয়েছিলো, ‘তোমাদের হাত গুটিয়ে রাখো এবং নামায কায়েম করো, যাকাত দাও।’ নিশ্চয়ই হাত গুটানোর এই নির্দেশের পেছনে আল্লাহর কোনো মহৎ উদ্দেশ্য নিহিত ছিলো। যা তিনি নিজেই স্থির করেছিলেন। মানবীয় চিন্তাশক্তি যদিও এর সকল কারণ নির্ণয় করতে সক্ষম নয় তথাপি এর কিছু কিছু সম্ভাব্য কারণ আমরা অনুমান করতে পারি।
এই বিরতি ও সংযম অবলম্বনের আদেশের প্রথম যে কারণটি আমরা দেখতে পাই তাহলো প্রথম প্রথম আরব মুসলমানদেরকে ধৈর্যধারণের জন্যে মানসিকভাবে প্রস্তুত করা, যাতে তারা নেতার প্রতি অনুগত থাকতে ও অনুমতির অপেক্ষা করতে পারে। জাহেলীয়াতের যুগে তারা অতিমাত্রায় লড়াকু ও জংগী স্বভাবসম্পন্ন ছিলো। যুদ্ধের প্রথম ডাকেই তারা হুংকার দিয়ে রাস্তায় নেমে পড়তো এবং ন্যায় অন্যায় বাছবিচারের জন্যে কিছুমাত্র ধৈর্যধারণ করতো না। অথচ মুসলিম উম্মাহকে যে বিরাট ও মহৎ কাজের জন্যে প্রস্তুত করা হচ্ছিলো, তার স্বাভাবিক দাবী ছিলো এই যে, এই অসংযত মানসিকতাকে নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে, তাকে পরিকল্পনা ও প্রজ্ঞাভিত্তিক নেতৃত্বের অনুগত করতে হবে, নেতা ঠান্ডা মাথায় ভেবে চিন্তে ও স্থির মস্তিকে পরিকল্পনা করে যে সিদ্ধান্ত নেয় তা মেনে নেয়ার জন্যে প্রস্তুত করতে হবে। এমনকি এই আনুগত্যের বিনিময়ে যদি আবেগে, উত্তেজনায় ও প্রতিহিংসায় অধীয় হয়ে প্রথম ডাকেই যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে গোত্রীয় অভিজাত্য চরিতার্থ করার অভ্যাসকে জলাঞ্জলীও দিতে হয়, তবে তাও দিতে হবে। (চলবে)

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT