মহিলা সমাজ

প্রসঙ্গ : রোজা-ডায়বেটিসসহ অন্যান্য রোগে খাদ্য পরিকল্পনা

শাহনাজ বেগম প্রকাশিত হয়েছে: ১৩-০৬-২০১৭ ইং ০২:৫৮:৫২ | সংবাদটি ৮৯ বার পঠিত

পবিত্র রমজান মাস চলছে। রমজান মাসে রোজা / সিয়াম পালন করা প্রত্যেক প্রাপ্ত বয়স্ক ও সুস্থ মুসলমানের উপর ফরয। এ বছরের হিসেবে সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত প্রায় ১৪-১৫ ঘন্টা সময় রোজা অবস্থায় অতিবাহিত হচ্ছে। সাধারণ সুস্থ ব্যক্তির পক্ষে এ সময়ে রোজা পালন করা কষ্টসাধ্য নয়। তবে যারা অসুস্থ / রুগ্ন, দুর্বল, বয়স্ক ব্যক্তি তাদের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট রোগ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ মোতাবেক রোজা পালন করা উচিত।
ডায়বেটিসসহ অন্যান্য রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের রমজান শুরু হওয়ার আগেই চিকিৎসকের পরামর্শ মোতাবেক ঔষধের মাত্রা ও সময় সূচী ইফতার ও সেহরির সাথে মিলিয়ে নিলে রোজা পালন করা সহজসাধ্য হবে। ঔষধের পাশাপাশি খাবার ও ব্যায়ামের ব্যাপারে বিশেষত ডায়বেটিক ব্যক্তিকে অবশ্যই বিশেষ খেয়াল রাখতে হবে। সেহরি ও ইফতারে খাবারের উপাদান (আইটেম) এমন হওয়া উচিত যাতে রক্তে সুগারের মাত্রা স্বাভাবিক মাত্রার চেয়ে কম বেশী হওয়ার আশংকা না থাকে। এক্ষেত্রে সংস্লিষ্ট ব্যক্তিকে জানতে হবে রক্তে সুগারের মাত্রা কম বা বেশী (≤ ৪ মি.লি. মোল / লিটার (বা) ৭২ মি.গ্রাম / ডি.এল এবং খাওয়ার ২ ঘন্টা পর ≥ ১১.১ মি.লি. মোল / লিটার (বা) ২০০ মি.গ্রাম / ডি.এল) হলে কি কি লক্ষণ প্রকাশ পেতে পারে। রক্তে সুগারের মাত্রা কম বা বেশী হলে দুর্বলতা, তৃষ্ণা পাওয়া, ক্ষুধা লাগা, শরীর ঘামা, মাথা ঝিমঝিম করা, চোখে ঝাপসা দেখা, মাথা ব্যথা করা, হাত-পা অবশ বোধ করা, মাথা হালকা বোধ করা, বমি বমি ভাব, জিহ্বা শুকিয়ে আসা ইত্যাদি দেখা / বুঝা যেতে পারে। এক্ষেত্রে সাথে সাথে রক্তের সুগারের মাত্রা পরীক্ষা করতে হবে। যদি কোন অস্বাভাবিকতা দেখা যায় যা জীবনের জন্য হুমকি স্বরূপ সে ক্ষেত্রে রোজা ভাঙ্গার নিয়ম রয়েছে। মহান আল্লাহ্ পাক আমাদের সুযোগ দিয়েছেন অসুস্থ অবস্থায় রোজা না রাখার। যাদের প্রয়োজন তারা কেন এই সুযোগ নিবেন না? যে সকল ডায়বেটিক ব্যক্তির সুগার নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রয়েছে উনাদের খেয়াল রাখতে হবে সারাদিন উপোস থাকার পর ইফতারে এমন খাবার থাকা চাই যা শরীরে সঠিক পুষ্টির যোগান দেয় সেই সাথে রক্তের সুগারের মাত্রা স্বাভাবিক রাখে। তাই এসময় ইফতারে বেশী বেশী সরল শর্করা (চিনি, মিষ্টি জাতীয় খাবার) না খেয়ে জটিল শর্করা (লাল চালের ভাত / লাল রুটি, আঁশ বিশিষ্ট সবজি, ফল) উদ্ভিজ্জ ও প্রাণীজ প্রোটিনের (মাছ, ডিম, দই, ডাল, ছোলা) সংমিশ্রণসহ মিশ্র সবজি ও ফল রাখলে শরীর সুস্থ্য থাকবে। শরীরের বিপাক ক্রিয়া সঠিক রাখতে ও পানি স্বল্পতা দূরীকরণে পানীয় হিসেবে স্বাভাবিক পানির পাশাপাশি কচি ডাবের পানি, কাঁচা আমের শরবত, ইসবগুল / তোকমার শরবত (চিনি ছাড়া) খাওয়া যাবে।
যাদের ডায়বেটিসের সাথে কিডনীরও সমস্যা রয়েছে তাদের মাছ-মাংস, ডাল ও বীচি জাতীয় খাবার, শাক-সবজি ও ফলমূল ব্যক্তির অবস্থা অনুযায়ী নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজন হয়। উচ্চ রক্তচাপ ও হৃদরোগীদের বেলায় আলগা বা অতিরিক্ত লবণ ও লবণাক্ত খাবার, তেল ও চর্বির খাবার যথাসম্ভব এড়িয়ে চলতে হবে। গ্যাস্ট্রিক-আলসারের রোগীদেরও তেলে ভাজা খাবার এড়িয়ে চলতে হবে। ইফতারে সালাদ হিসেবে শশা / ক্ষিরা, আদা কুচি, ধনিয়া / পুদিনা পাতা ও কাঁচা ছোলার সংমিশ্রণ শরীরে ভিটামিন. মিনারেলস ও প্রোটিনের ভালো যোগান দিবে। উল্লেখ্য কাঁচা ছোলা রক্তের কোলেষ্টরল কমাতে সহায়তা করে। ডায়বেটিক ব্যক্তি সন্ধ্যারাতে অন্যান্য সময়ের মত রাতের সমপরিমাণ খাবেন। এসময় রুটি / ভাত, ডাল, মাছ, শাক-সবজি, অল্প তেল মসলায় রান্না করে খাওয়া যাবে। কোন অবস্থাতেই সন্ধ্যারাতের খাবার বাদ দেওয়া ঠিক হবেনা। সেহরির সময় অন্যান্য সময়ের দুপুরের বরাদ্দকৃত খাবারটুকু খেতে হবে। ভাত, মাছ / মাংস, সবজি, দুধ ছোট কলাসহ খাওয়া যাবে। ডায়বেটিক ব্যক্তিরা সেহরী বেশী আগে না খেয়ে শেষের দিকে খাবেন। রোজা অবস্থায় ভারী ব্যায়াম বা বেশী হাঁটার ফলে সুগারের মাত্রা কমে গিয়ে বিপদ হতে পারে। তাই এসময় হালকা হাঁটা চলাই শ্রেয়।
প্রত্যেক ব্যক্তিকে তার ক্যালরীর চাহিদা ও শরীরের বর্তমান অবস্থা অনুযায়ী খাদ্য গ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। এক্ষেত্রে পথ্যবিদ / পুষ্টিবিশেষজ্ঞের পরামর্শ মোতাবেক খাবারের চার্ট / প্লান জেনে সে অনুযায়ী খাবার গ্রহণ করলে ডায়বেটিসসহ বিভিন্ন সমস্যায় বিপদের আশংকা থেকে নিরাপদ থাকতে পারবেন।
রমজান মাস অশেষ বরকত, মাগফেরাত ও নাযাতের মাস। আল্লাহ্ পাক আমাদের সকলকে সুস্থ্য অবস্থায় পুরো রমজানের নিয়ামত হাসিল করার তৌফিক দিন। আমিন ॥
লেখক : নিউট্রিশনিস্ট, নর্থ ইস্ট মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT