মহিলা সমাজ

জীবন সংগ্রামে বিজয়ী বালাগঞ্জের ৫ জয়িতা

মো. জিল্লুর রহমান জিলু প্রকাশিত হয়েছে: ১৩-০৬-২০১৭ ইং ০২:৫৯:৩২ | সংবাদটি ১৩৪ বার পঠিত

দরিদ্রতা দূরীকরণ, আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টি, বাল্যবিবাহ বন্ধ, শিক্ষা এবং সমাজসেবায় বহুমুখী সক্ষমতা অর্জনে এগিয়ে চলছেন নারীরা। দৃঢ় অঙ্গীকার থাকলে স্বপ্ন পূরণ যে কঠিন কিছু নয় তার প্রমাণ বালাগঞ্জের ৫ নারী ‘জয়িতা’।
‘জয়িতা অন্বেষণ বাংলাদেশ’ কর্মসূচির আওতায় ২০১৬ সালে বালাগঞ্জ উপজেলা পর্যায়ে জীবনযুদ্ধে বিজয়ী ৫ ‘জয়িতা’ জুলেখা বেগম, লাভলী বেগম, আমেনা বেগম শিরীন, মোছা. সৈয়দুন নেছা এবং সুক্তি রাণী দাস।
জুলেখা বেগম। পারিবারিক নির্যাতনের দুঃসহ স্মৃতি ভুলে নতুন উদ্যমে জীবন চালিয়ে নেয়া এক সংগ্রামী নারী। স্বামী, শ্বাশুড়ী আর ননদ অনবরত শারীরিক, মানসিক নির্যাতনে অতিষ্ঠ করে তুলতো তাকে। একদিন তার স্বামী দুই পুত্রসন্তানসহ পিতৃহীন জুলেখাকে ফেলে আসে তার মায়ের কাছে। কয়েক মাস পর ২য় বিয়ে করে বসে স্বামী আব্দুল সোবহান। তারপরও অনেকটা জোর করে স্বামীর সংসারে ফিরে আসেন জুলেখা।
আবার শুরু হয় নির্যাতন। মারধর করে বের করে দেয়া হয় ঘর থেকে। শেষ পর্যন্ত তালাকের শিকার হতে হয় তাকে। সংসার থেকে দুই পুত্রসন্তানসহ জুলেখাকে ফিরে যেতে হয় মায়ের গৃহে।
বেসরকারি সংস্থা বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির মাধ্যমে আইনী লড়াই করে স্বামীর কাছ থেকে আর্থিক দ- আদায় করতে সক্ষম হন জুলেখা। সেই টাকা দিয়ে সেলাই মেশিন কিনে দর্জির কাজ করছেন তিনি। পারিবারিক অত্যাচার, নির্যাতনের বিভীষিকা ভুলে দুই পুত্র সন্তান আর মা-কে সঙ্গে নিয়ে এখন আরেক জীবন চালিয়ে যাচ্ছেন সংগ্রামী জুলেখা বেগম।
লাভলী বেগম। বালাগঞ্জ উপজেলার কাশিপুর গ্রামের বাসিন্দা। তিনি ব্যক্তিগত উদ্যোগে অর্থনৈতিক সাফল্যের জন্য জয়িতা নির্বাচিত হয়েছেন। স্বামী তফুর মিয়া একজন সিএনজি চালক। স্বামী গৃহে প্রচ- দারিদ্রতার শিকার লাভলী বেগম একদিন ভাগ্য বদলের দৃঢ় শপথ নেন। ‘সুঁই, সুতা’কে অবলম্বন করে শুরু হয় তার যাত্রা। নকশীকাঁথা সেলাই এবং তা বিক্রি করে অর্জিত টাকা তাকে বাড়তি প্রেরণা যোগায়। অতঃপর একটি সেলাই মেশিন ক্রয় করে শুরু করেন দর্জি পেশা। ভাগ্যের চাকা বদলে যায় লাভলী বেগমের। স্বামী সন্তান নিয়ে অনেক সুখী তিনি। তার কাছে সেলাই প্রশিক্ষণ নিচ্ছে গ্রামের কিশোরী মেয়েরা। উপার্জিত টাকা দিয়ে ১৫টি ছাগল কিনে তা লালন-পালন করছেন। নির্মাণ করেছেন পাকাঘর। দিন বদলের হাওয়ায় পাল্টে গেছে লাভলী বেগমের জীবন ও সংসার।
আমেনা বেগম শিরীন আরেক জয়িতা। তার গ্রামের নাম প্রসন্নপুর। স্বামীর নাম নানু মিয়া। পড়ালেখার প্রতি অদম্য আকর্ষণ থাকলেও এসএসসি পাশের পর বিয়ে হয়ে যায়। তারপর স্বামীর সংসারে পড়তে হয় অভাব-অনটনের ঝাঁপটায়। নিরুপায় শিরীন চাকুরী নেন একটি বেসরকারি সংস্থায়। কঠোর পরিশ্রমে টাকা জমিয়ে এবং ধার-দেনার মাধ্যমে ৫০ হাজার টাকা দিয়ে স্বামীকে একটি খাবারের হোটেল খুলে দেন। বালাগঞ্জ বাজারে অবস্থিত হোটেল আরেক ধাপ এগিয়ে দেয় শিরীনকে। নিজের চাকুরী এবং হোটেল ব্যবসার পাশাপাশি গরু, ছাগল প্রতিপালন করে অনেক স্বচ্ছল জীবনযাপন করছেন প্রসন্নপুর গ্রামের গৃহবধু আমেনা বেগম শিরীন।
মোছা. সৈয়দুন নেছা। কঠোর পরিশ্রম আর দৃঢ় মনোবল তাকে এনে দিয়েছে সম্পদ এবং সম্মান। ৬ সন্তানের জননী সৈয়দুন নেছা নিজে এখন পরিবারের প্রাণ। দারিদ্রতার সাথে যুদ্ধ করে তিনি এখন জয়িতা। দর্জির কাজের পাশাপাশি হাঁস-মোরগ, গরু-ছাগল পালন করে এখন তিনি লাখপতি। ৩টি মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন। বাকি ২মেয়ে ও ১ছেলে পড়ালেখা করছে। নিজের সাংসারিক উন্নতির কারণে সামাজিকভাবেও তিনি এখন প্রতিষ্ঠিত। দু’দফা স্থানীয় পূর্ব পৈলনপুর ইউনিয়ন পরিষদের সংরক্ষিত ১নং ওয়ার্ডের সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। তিনি স্থানীয় ঐয়া গ্রামের বাসিন্দা। তার স্বামীর নাম মো. মোশাহিদ আলী।
সুক্তি রাণী দাস। তিনি উপজেলার তেঘরিয়া গ্রামের একজন নারী সমাজকর্মি। বাল্যবিবাহ বন্ধ, নারী অধিকার প্রতিষ্ঠাতা এবং নারীর ক্ষমতায়নে তার সক্রিয় অবদান সবার কাছে প্রতিভাত। এসব ব্যাপারে বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতি, প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল, জৈন্তিয়া ছিন্নমূল সংস্থাসহ সরকারি, বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থার মাধ্যমে তিনি প্রশিক্ষণ লাভ করেছেন।
ইতোমধ্যে এলাকায় একাধিক বাল্যবিবাহ বন্ধ করতে তার সক্রিয় অংশগ্রহণ রয়েছে। নারী শিক্ষা, নারীর ক্ষমতায়ন, পুষ্টি, পারিবারিক সহিংসতা প্রতিরোধ এবং নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে দীর্ঘদিন থেকে কাজ করছেন সুক্তি রাণী দাস। এসব কার্যক্রমের পিছনে তাকে অকুণ্ঠ সমর্থন দিয়ে যাচ্ছেন তার স্বামী মাখন লাল দাস।
স্থানীয়ভাবে সুপরিচিত সুক্তি রাণী দাস বর্তমানে উপজেলার পশ্চিম গৌরীপুর ইউনিয়ন পরিষদের সংরক্ষিত ২নং ওয়ার্ডের নির্বাচিত সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT