উপ সম্পাদকীয়

রোজা এক মাস, শিক্ষা বারো মাসের

মো. মাসুদুর রহমান প্রকাশিত হয়েছে: ১৫-০৬-২০১৭ ইং ০২:১৮:১৮ | সংবাদটি ১৩৯ বার পঠিত

হিজরি সনের বারো মাসের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ একটি মাস রমজান। এটি প্রশিক্ষণের মাস। এ মাসের প্রধান উদ্দেশ্য হলো, শরীয়তের নির্দেশিত পন্থায় রোজা আদায়ের মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন করা। মহান আল্লাহতায়ালা বলেন,“হে মু’মিনগণ! তোমাদের জন্য রোজা ফরজ করা হলো, যেমন ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্বে যারা ছিল তাদের প্রতিও; যাতে করে তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পার।” (সূরা-বাকারা, আয়াত:১৮৩)।
তাকওয়া হলো, মহান আল্লাহকে জীবনের সর্বাবস্থায় হাজির-নাজির জেনে তার আদেশকৃত বিষয়গুলোকে মান্য করা বা পালন করা এবং তার নিষেধকৃত বিষয়গুলোকে ত্যাগ করা। অর্থাত্ নামাজ, রোজা, হজ, যাকাতসহ অন্য ইবাদতগুলো ঠিক নিয়মে একাগ্রচিত্তে নিয়মিত আদায়করত আল্লাহর ভয়ে জীবনের প্রতিক্ষেত্রে মিথ্যা বলা, গীবত করা, চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, প্রতারণা, ঘুষ, দুর্নীতি, জুুলুম, ওজনে কম দেওয়া, খাদ্যে ভেজাল দেওয়া, ধর্ষণ, খুন, সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ ইত্যাদি থেকে বিরত থাকার নামই প্রকৃত তাকওয়া। মহান আল্লাহতায়ালা বলেন,“রাসূল (সা.) তোমাদেরকে যা প্রদান করেন তা গ্রহণ করো, আর যা নিষেধ করেন তা থেকে বিরত থাক।” (সূরা-হাসর, আয়াত:৭)।
রমজান মাসে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে সুবেহ সাদিক থেকে শুরু করে সূর্যাস্ত পর্যন্ত পানাহার, অশ্লীলতা ও যৌনবৃত্তি থেকে নিবৃত্ত থাকার নামই রোজা। এ রোজাই একজন প্রকৃত রোজাদারকে তাকওয়ার পর্যায়ে পৌঁছে দেয়। অনেক নেশাগ্রস্ত  লোক এ মাসে নেশা করা কমিয়ে দেয়। নিজে মিথ্যা বলে না এবং অন্যকেও মিথ্যা বলা থেকে নিরুত্সাহিত করে। রোজার কারণে পরনিন্দা ও গীবত করা থেকে বেঁচে থাকার সর্বোচ্চ চেষ্ট করে। নিজে ঝগড়া করে না এবং অন্যকেও ঝগড়া-ফ্যাসাদ থেকে নিবৃত করে। অনেকেই অযথা রাগ-ক্রোধ থেকে বিরত থাকে। মানুষের প্রতি মানুষের সহানুভূতি ও ভালোবাসা বাড়ে। কর্মের প্রতি জবাবদিহিতা ও দায়িত্ববোধ বেড়ে যায়। এগুলোই রোজার প্রকৃত শিক্ষা এবং এগুলোই প্রশিক্ষণ।
রমজানের শিক্ষাগুলো বাকি মাসগুলোতে ধরে রাখতে পারলে একজন সাধারণ মু’মিন হতে পারে পরিপূর্ণ মুসলমান। আর পরিপূর্ণ মুসলমান হওয়া প্রত্যেকের জন্যই আবশ্যক। মহান আল্লাহতায়ালা মু’মিনদেরকে পরিপূর্ণ মুসলমান না হয়ে মৃত্যুবরণ করতে নিষেধ করেছেন। আল্লাহপাক বলেন, “হে বিশ্বাসীগণ! তোমরা আল্লাহকে যথাযথভাবে ভয় কর, আর তোমরা মুসলমান (পরিপূর্ণ ) না হয়ে মৃত্যুবরণ কর না।” (সূরা-আল ইমরান, আয়াত:১০২)। কিন্তু বাস্তবতায় দেখা যায় যে, রমজান মাস চলে গেলে অনেকের মধ্যে আবার আগের বদ-অভ্যাসগুলো নতুন করে দেখা দেয়। আবার আল্লাহর ইবাদত ছেড়ে দেওয়া হয়, আল্লাহর ভয় কমে যায়, চুরি, ডাকাতি, খুন, প্রতারণা, ঘুষ, ওজনে কম দেওয়া, খাদ্যে ভেজাল, দুর্নীতি ইত্যাদি স্বাভাবিক গতি পায়। অথচ রমজানে অর্জিত তাকওয়ার দাবি হলো: শুধু রমজান মাসে রোজা নষ্ট বা রোজার ক্ষতি হওয়ার ভয়ে মিথ্যা বলা নিষিদ্ধ নয় বরং বছরের সবসময়ই নিষিদ্ধ। এ ব্যাপারে মহান আল্লাহপাক বলেন,“মিথ্যার আশ্রয় নেয় তারাই যারা আল্লাহর আয়াতে বিশ্বাস করে না।” (সূরা-নাহল,আয়াত:১০৫)। এ প্রসঙ্গে রাসূল (সা.) বলেছেন,“তোমরা মিথ্যাচার থেকে দূরে থাক, কারণ মিথ্যা মানুষকে পাপের পথে পরিচালিত করে এবং পাপ পরিচালিত করে জাহান্নামের দিকে।” (বুখারি, মুসলিম)। অনুরূপভাবে যে কোনো মাধ্যমে প্রতারণা করা সবসময়ই হারাম। এ ব্যাপারে রাসূল (সা.) বলেছেন,“যে ব্যক্তি প্রতারণা করে, সে ব্যক্তি আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়।” (তিরমিযি)। ওজনে কম দেওয়া সর্বদাই নিষিদ্ধ। এ ব্যাপারে আল্লাহপাক বলেন,“যারা মাপে-ওজনে প্রতারণা করে তাদের জন্য রয়েছে কঠিন শাস্তি। যারা লোকের থেকে নেওয়ার সময় বেশি নেয় এবং যখন অন্যকে দেয় তখন কম দেয়।” (সূরা-মুতাফফিফীন,আয়াত:১-৩)। খাদ্যে বা যেকোনো পণ্যদ্রব্যের দোষ গোপন করে বিক্রি করা বা ভেজাল দিয়ে বিক্রি করা সবসময়ই হারাম। এ প্রসঙ্গে মহানবী (সা.) বলেছেন,“যে ব্যক্তি ক্রেতাকে অবহিত না করে দোষযুক্ত পণ্য বিক্রি করে, সে অবিরাম আল্লাহর ক্রোধ ও ফেরেস্তাদের অভিশাপে পতিত থাকবে।”(ইবনে মাজাহ)।
অপরের অধিকার হরণ করা সর্বদাই হারাম। বিশ্বনবী (স.) বলেছেন, “যে ব্যক্তি কারো একবিঘা জমি জবরদখল করেছে, কিয়ামতের দিন তার গলায় সাত তবক জমি বেড়িরূপে পরিয়ে দেওয়া হবে।”(সহীহ বুখারি)। আমানতের খিয়ানত করা সবসময়ই হারাম। অর্থাত্ গচ্ছিত সম্পদ বা তথ্যের বিচ্যুতি করা এবং অর্পিত দায়িত্ব থেকে সরে গিয়ে অবৈধভাবে অর্থ উপার্জন করা হারাম। বর্তমান সময়ের বহুল আলোচিত কতিপয় প্রকাশ্য আমানতের খিয়ানতের উদাহরণ হলো:ঘুষ দেওয়া ও নেওয়া, দায়িত্বের প্রতি অবহেলা এবং দুর্নীতি। ইসলামে ঘুষ নেওয়া বা দেওয়ার মাধ্যমে কাউকে অন্যায় সুবিধা দেওয়া-নেওয়া, ঘুষের মাধ্যমে চাকরি নেওয়া-দেওয়া, ঘুষের জন্য প্রশ্নপত্র ফাঁস করাসহ যে কোনো ধরনের দুর্নীতি করা নিষিদ্ধ । এ ব্যাপারে রাসূল (সা.) বলেছেন,“ঘুষ দাতা ও ঘুষ গ্রহীতা উভয়ই জাহান্নামের আগুনে জ্বলবে।”(তাবারানী)।
অন্য হাদীসে রাসূল (সা.) বলেছেন,“সাবধান! তোমরা প্রত্যেকেই তত্ত্বাবধায়ক বা দায়িত্বশীল, আর তোমাদের প্রত্যেককেই তার দায়িত্ব সম্বন্ধে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।” (বুখারি ও মুসলিম)। অতএব, রমজান মাসে মহান রবের ইবাদতকরত যাবতীয় হারাম কাজ বর্জন করে রমজানের যথার্থ অর্জন বা শিক্ষা ‘তাকওয়া’কে বাকি ১১ মাস তথা জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ধরে রাখা বা বাস্তবায়ন করা প্রকৃত রোজাদারদের কাজ। এ কাজটি প্রত্যেক মানুষের চরিত্রে নৈতিকতার বীজ বোনে এবং ঐ নৈতিকতাকে পূর্ণরূপ দিয়ে সমাজ বা রাষ্ট্র থেকে সব ধরনের অনিয়ম বা দুর্নীতি দূর করতে পারে। কারণ তাকওয়া বা আল্লাহর ভয় মানুষকে সব ধরনের পাপ কাজ থেকে বিরত রাখার শ্রেষ্ঠ ও অদ্বিতীয় মাধ্যম। তাই রোজা হোক একমাস কিন্তু এর শিক্ষা থাকুক বার মাস। লেখক : শিক্ষার্থী।

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • ফিলিস্তিন ও শান্তিপ্রক্রিয়া
  • গ্যাস নিয়ে কিছু কথা
  • সততা একটি মহৎ গুণ
  • আদর্শ সংবাদপত্রের ভূমিকা
  • স্মৃতিতে চৌদ্দই ডিসেম্বরের সেই বিভীষিকাময় রাত
  • প্রযুক্তি ব্যবহারে নিরাপদ থাকুন
  • কবিতা
  • ধোকাবাজের খপ্পরে
  • কিশোর মুক্তিযোদ্ধা
  • ডোনাল্ড ট্রাম্পের জেরুসালেম ঘোষণা
  • বুদ্ধিজীবি হত্যা : বিজয় উল্লাসে বিষাদ
  • শিক্ষার্থীদের ঝরেপড়া ও তার প্রতিকার
  • আত্মার পরিশুদ্ধি ঘটাতে রমজানের তাৎপর্য
  • পাহাড়ে ভূমিধস
  • কৃষি খাত কেন অবহেলিত?
  • অভাজনের বাজেট ভাবনা
  • পথ ও পথিক
  • রোজা এক মাস, শিক্ষা বারো মাসের
  • দ্রব্যমূল্য লিখন ও ভোক্তার ভোগান্তি প্রসঙ্গ
  • এক ঘরে কাতার : মধ্যপ্রাচ্যে নতুন রাজনৈতিক সংকট
  • Developed by: Sparkle IT