শিশু মেলা

শৈশব-কৈশোরের বাগান

রাফিদ চৌধুরী প্রকাশিত হয়েছে: ১৫-০৬-২০১৭ ইং ০২:২১:১৭ | সংবাদটি ১০২ বার পঠিত

বাংলাদেশের সর্বপ্রথম চা বাগান মালনীছড়া চা বাগান। ১৮৫৪ সালে যে বাগানটির জন্মের মাধ্যমে এদেশেও শুরু হয় চা বাণিজ্যের। যদিও তখন সিলেট বাংলার অধীনস্থ ছিল না। মালনীছড়া চা বাগানের আয়তন ৬১০ হেক্টর। নীল আকাশের নিচে যেন সবুজ গালিচা পেতে আছে সজীব প্রকৃতি। উঁচু নিচু টিলা এবং টিলাঘেরা সমতলে সবুজের চাষাবাদ। মাঝে মাঝে টিলা বেষ্টিত ছোট ছোট জনপদ। টিলার কিনার ঘেঁষে ছুটে গেছে আঁকাবাঁকা মেঠোপথ। কোনো যান্ত্রিক দূষণ নেই। কোথাও আবার ধাবমান পথে ছুটে চলেছে রুপালী ঝর্ণাধারা। প্রকৃতির সকল সৌন্দর্য্যের সম্মিলন যেন এখানে।
আমার বাবা সেই মালনীছড়া চা বাগানের ডাক্তার হওয়ায় চির সবুজের সমারোহের মাঝেই কেটেছে আমার শৈশব এবং কৈশোর। স্কুল নামক ঝামেলার বয়স যখন হয়নি তখন থেকেই চা বাগানের দিনের একেকটা সময় ভিন্ন ভিন্নভাবে উপভোগ করেছি। শুধু আমি না, যে কেউ এমন প্রকৃতিকে উপভোগ করবে।
আব্বুর কাজের নির্দিষ্ট কোনো সময় নেই। বলতে গেলে ২৪ ঘন্টাই তাঁর দায়িত্ব। গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন থাকলেও কান সজাগ রাখতে হয়। কারণ চা শ্রমিকদের শরীরে অসুস্থতা যখন দানা বাধে তখনই তারা ডাক্তারের শরণাপন্ন হয়। সেটা রাত তিনটা বাজলেও তারা ডাক্তারের কাছে শরণাপন্ন হতে দ্বিধাবোধ করবেনা। আর শরীর একটু গরম হলেই তারা এসে বলে ‘ডাক্তার বাবু দরজা খোলো, ২০৪ ডিগ্রি জ্বর হইশে!’
আব্বু ফজরের আযানের সাথে সাথেই ঘুম ত্যাগ করতেন। ফজরের নামাজের আগে এবং পরে সারা বাসা পায়চারি করে বেড়াতেন। আম্মুর ভাষায় যেটাকে বলে সার ঘর তছনছ করা। আব্বুর ঐ তছনছের কারণে আম্মার ঘুম আগেই যেমন ভাঙ্গতো, সাথে আমারও ভেঙ্গে যেতো। আমার ঘর আলাদা হলেও দরজা লাগাতে ভয় হতো। তাই আব্বুর ঐ তছনছের শব্দ আমার কানে বারেবারে যাওয়ার কারণে আমার ঘুম ভেঙ্গে যেতো। ফজরের নামাজে যখন যেতাম তখন তো অন্ধকার থাকে। কিন্তু যখন ফিরতাম, তখন তো আলো ফুটে উঠতো। আর ঐসময়ের প্রাকৃতিক দৃশ্যটা যে দেখবে, তার চোখ আটকে যাবে ঐ দৃশ্যের মাঝে। এই দৃশ্য এখনও আমি উপভোগ করি।
শুধু সকালবেলাই না। যারা হাওর-বাওর ঘুরতে যান তারা জানবেন ভালো। কারণ হাওরের রুপ একেক সময় একেক রকম। সকাল বেলা এক রূপ বিকালবেলা এক রূপ আবার সন্ধ্যা বেলা আরেক রূপ। চাঁদনী রাতে অবশ্য আরেক রূপ। ঠিক তেমনিভাবে চা বাগানেও আমি একেক বেলা একেকভাবে উপভোগ করি। রাত আটটার পর অবশ্য পুরো নিশুতি মনে হয়। ঐসময়টাও আবার অন্য রকমের আমেজ।
চা বাগানের প্রকৃতি যেমন উপভোগ্যকর, তেমনি চা শ্রমিকরা অনেক আনন্দের যোগানদাতা। এদের সাথে না মিশলে বোঝা যাবে না, এরাও যে অনেক আন্তরিক। এদের মাঝে যে লুকিয়ে আছে কতো শতো গল্প তা এদের সাথে ভাব না জমালে জানতে পারা যাবেনা। এরা কিভাবে আসাম কিংবা এই দেশে এলো! কি আশা দেয়া হয়েছিল! কেমন ভবিষ্যৎ বাণী তাদের দেয়া হয়েছিল! এই ধরনের গল্প একেকজনের কাছে একেক রকম। তবে তাদের কাছ থেকে এইসব কথা শুনতে গেলে আগে তাদের কাছে নিজেকে বিশ্বাসযোগ্য হিসেবে প্রমাণ করতে হয়।
চা শ্রমিকরা মাঝে মাঝে বড় কোনো গাছের নিচে বসে আসর জমায়। সেই আসরে অতিরিক্ত মানুষ আসলো কি আসলো না সেটা এতো খেয়াল করেনা। তারা যে কজন আছে সে কজন মিলেই তাদের আসর শুরু করে দেয়। তাদের এই আসরে গানটাই বেশি হয়। এই সমস্ত গানের মাঝে লুকিয়ে থাকে তাদের জীবনের সুখ-দুঃখ। আদিকাল থেকেই এইসব গান চলে এসেছে বর্তমানে। কিন্তু সেই আদি সুরগুলি আজো যে কারোরই মন ছুঁয়ে যাবে। কালি দাশ গুপ্তের লেখা একটি গান আছে যেটা প্রায় সবাই গায়। এবং সব বাগানের শ্রমিকের মুখে মুখেই রয়েছে সেটা। গানটি হলো
মিনিরে মিনিরে মিনিরে
মিনিরে মিনিরে মিনিরে
চল মিনি আসাম যাব,
দেশে বড় দুখ রে
আসাম দেশেরে মিনি
চা বাগান ভরিয়া।
এই চার লাইনের মাঝে লুকিয়ে আছে ছোট একটা গল্প। তাদের আত্মকথা এই চার লাইনে ফুটে উঠেছে। তাছাড়া আরো অনেক গান, কীর্তন করে তারা একটু সময় পেলেই। যখনই তারা সময় পায় তারা বিভিন্ন আসরে বসে। সেই আসরগুলি থেকে অনেক কিছু শেখার আছে।
কিন্তু চা বাগানের ডাক্তার সাহেবের ছেলে বলে আমি তাদের ঐসব আসরে গিয়ে যোগ দিতে পারিনা। বাইরে থেকে এসে অনেক মানুষ যোগ দিলেও আমি যোগ দিতে পারিনা। প্রকৃতির আসল নিদর্শনের একটি হলো তাদের এই আসর। কিন্তু আমি এই প্রকৃতিটা উপভোগ করা হতে বঞ্চিত। একটা দেয়াল অথবা কাঁটাতারের বেড়া দেয়া। দেয়ালটা আমায় সেই প্রকৃতি উপভোগ করা হতে বঞ্চিত করেছে। শুধু দূর থেকেই দেখেছি, না হয় কারো মুখে শুনেছি। 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT