সম্পাদকীয়

নারী নির্যাতনের নানা রূপ

সৈয়দ ছলিম মোহাম্মদ আব্দুল কাদির প্রকাশিত হয়েছে: ১৬-০৬-২০১৭ ইং ০১:২২:৩৪ | সংবাদটি ১৯৬ বার পঠিত

সাংসারিক জীবনে নারী পুরুষ উভয়ের অধিকার নিশ্চিত করা প্রয়োজন। মহান আল্লাহর সৃষ্টি জগতের সবচেয়ে সুন্দর সৃষ্টি হলো মানুষ। সৃষ্টির সেরা মানুষের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার স্বার্থে নারী-পুরুষের ভূমিকা অপরিহার্য। শারীরিক গঠনের দিক দিয়ে পুরুষ এগিয়ে গেলেও নমনীয় কমনীয়তার দিক থেকে নারীর অবস্থান স্বীকৃত। মেধাশক্তি, শিক্ষা, চাকরী, সমাজ ও রাষ্ট্রের সার্বিক কর্মকান্ডে নারী-পুরুষের অংশগ্রহণ ছাড়া আদর্শ রাষ্ট্র গঠন সম্ভব নয়। একটি দেশ কখনোই উন্নত নয়, যতক্ষণ পর্যন্ত না তার নারীরা উন্নত। নারীর কর্মক্ষেত্র হবে বহুমাত্রিক। ইসলাম ধর্মে নারীর অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। বর্তমান যুগে আমরা নিজেকে শিক্ষিত ও সচেতন বলে দাবী করি। কিন্তু তারপরও নারী নির্যাতনের নানা রুপ থেকে সমাজ নিস্কৃতি পাচ্ছেনা।
সমাজে নারীর প্রতি বৈষম্য ও অবিচার আজ ভাবনার একটি বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সংবাদপত্রের পাতা জুড়ে নারী নির্যাতনের হরেক রকমের খবর। যা আমাদের দুশ্চিন্তার বড় কারণ। রাষ্ট্রীয় আইনকানুন সবই বলতে গেলে সামাজিক সুরক্ষা ও নিরাপত্তার পক্ষে। কিন্তু তারপরও নারী নির্যাতন কমছেনা। আর সমাজে পুরুষ নির্যাতন যে একেবারে হচ্ছেনা তা কিন্তু নয়। তবে এর হার এতই নগন্য যে তা ব্যক্তি পর্যায় ছাড়া প্রকাশ্যে আলোচনায় আসেনা।
আসলে নারী-পুরুষ একে অন্যের স্বার্থ রক্ষা করবে। তারা কোন বিশেষবাদী নয়, প্রকৃতপক্ষে হবে উভয়বাদী। একে অন্যের সম্মান ও মর্যাদা রক্ষা করতে পারে। সাংসারিক জীবনে স্বামী-স্ত্রী একে অন্যের পরিপূরক। বিবাহিত পুরুষের ক্ষেত্রে স্ত্রীর চেয়ে ভাল বন্ধু আর কেউ হতে পারেনা। বিবাহিত জীবনে মধুর সম্পর্কের এক পর্যায়ে স্বামী-স্ত্রী উভয়েই উপলব্ধি করে দু’জনের মুত্যু যেন এক সাথে হয়। অথচ সৃষ্টিকর্তা জানেন কার মৃত্যু কখন হবে। তবে সুখী দম্পতি একটু সময়ও একে অন্যকে ছাড়া থাকতে পারেনা। নারী নির্যাতনের অন্যতম বড় কারণ নৈতিক শিক্ষার অভাব। কারণ ব্যক্তির জীবনে চলার পথে নৈতিক শিক্ষার প্রভাব থাকে।
নারী-পুরুষ কোন খারাপ কাজ করতে গেলেই তার বিবেক প্রথমে তাকে বাঁধা দেয়। বিবেকবোধ জাগ্রত না থাকলে মানুষ অন্যায় কাজ করতে বাঁধার মুখে পড়েনা। সাম্প্রতিক সময়ের দ্যা রেইনট্রি হোটেলে দুই ছাত্রীর উপর সহিংসতা ও ধর্ষণের ঘটনা এর বড় প্রমাণ। অভিযুক্তদের নৈতিক ও পারিবারিক শিক্ষা এমন নি¤œ পর্যায়ের যে ‘বার্থডে’ পার্টির দাওয়াত দিয়ে ধর্ষণ করেই ক্ষান্ত হয়নি, গাড়ী চালক দিয়ে ধর্ষণের পুরো ঘটনা ভিডিও করে। এতে তাদের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল ছাত্রীদেরকে যাতে পরবর্তীতে আবারও ব্লেক মেইলিং করতে পারে। পারিবারিক কুপ্রভাব ছেলের উপর পড়েছে। তাইতো আলোচিত ধর্ষণের ঘটনা জানাজানি হওয়ার পরও ধর্ষকের পিতা প্রথমদিকে পুত্রের পক্ষবালম্বন করে। অবস্থা বেগতিক দেখে একটি পর্যায়ে অবশ্য ব্যবসায়ী পিতা চুপসে যায়। এ অধঃপতনের নেপথ্যে অবৈধ আর্থিক সম্পদও একটি বড় কারণ।
আসলে ছেলে-মেয়েদের চলাফেরার উপর পারিবারিক নিয়ন্ত্রণ থাকা দরকার। আজ কাল সমাজে ছেলে-মেয়েদের উপর পিতা-মাতার নিয়ন্ত্রণ অনেকটা শিথিল। অনেক ক্ষেত্রে ছেলে-মেয়েরা স্বাধীনভাবে অনেক সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকে। ‘স্বাধীনতা’ ভাল কিন্তু মাত্রাতিরিক্ত স্বাধীনতা ও আর্থিক সমর্থন অনেক ক্ষেত্রেই বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
সংসার জীবনের স্বার্থকতা অনেক ক্ষেত্রেই নির্ভর করে পাত্র-পাত্রী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে সঠিক সিদ্ধান্তের উপর। পাত্রপক্ষ ভাল পাত্রীর অন্তরালে অনেক সময় পাত্রীপক্ষের আর্থিক সঙ্গতির বিষয়টিকে বেশী গুরুত্ব দেয়ায় সংসারে অশান্তির সূত্রপাত হয়। যৌতুকের কারণে অনেক পরিবারেই অশান্তি ঘটে । যৌতুকের চাহিদা মিটাতে না পারায় নারীর উপর সহিংসতা বেড়ে যায়। এক্ষেত্রে নারী নির্যাতনের মাত্রা বেড়ে যাওয়ায় তা সংবাদপত্রের পাতায় মৃত্যুর দুঃখজনক সংবাদে পরিণত হয়। বিবাহিত জীবনে কন্যা সন্তান জন্মদানকে কেন্দ্র করে নারী নির্যাতনেরও ঘটনা ঘটে। কিন্তু সন্তান ছেলে না মেয়ে হবে তা সম্পূর্ণ সৃষ্টিকর্তার ইচ্ছের উপর নির্ভরশীল। এখানে নারীর কোন দোষ নেই। অথচ জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা ও সৃষ্টিকর্তার উপর বিশ^াসের ঘাটতির কারণে কন্যা সন্তান জন্মদানের দায়ভার অনেক ক্ষেত্রেই নারীর উপর বর্তানোর প্রচেষ্টা চালানো হয়। অথচ ইসলাম নারীকে মর্যাদা ও সম্মান দিতে নির্দেশ দিয়েছে মেয়ে হিসেবে, স্ত্রী হিসেবে এবং মা হিসেবে। মেয়ে হিসেবে নারী জাতি সম্মানিত ও মর্যাদাশীল। সূরা আর রুমের ২১নং আয়াতে বলা হয়েছে, ‘‘আল্লাহর অন্যতম নিদর্শন এই যে, তিনি তোমাদের মধ্য থেকেই তোমাদের জন্য স্ত্রী সৃষ্টি করেছেন, যেন তাদের কাছে তোমরা বসবাস করতে পারো এবং তিনিই তোমাদের মধ্যে ভালোবাসা দয়ার সৃষ্টির করেছেন।” আর বুখারী শরীফের হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সা.) এর ঘোষণা হলোঃ ‘‘যে মুসলমানের দু’টি কন্যা সন্তান আছে এবং সে তাদেরকে উত্তম সাহায্য দান করে তারা তাকে বেহেশতে দাখিল করবে।”
সমাজে যৌন নিগ্রহের ঘটনা প্রতিনিয়ত ঘটছে। এক্ষেত্রে শিশু থেকে বৃদ্ধা পর্যন্ত কেউ বাদ যাচ্ছেন না। আইয়ামে জাহিলীয়াতের যুগে কন্যা সন্তানকে জীবন্ত পুঁতে ফেলা হতো। ইসলামের বিধান কায়েমের পর নারীর মর্যাদা বৃদ্ধি পায়। ইসলামই নারীকে উত্তরাধিকারের অংশীদার করেছে। তা সে মাতা, স্ত্রী অথবা কন্যা যাই হউক না কেন। এমনকি মাতৃগর্ভে থাকা অবস্থায়ও সে উত্তরাধিকারের অংশীদার হবে। যার মালিকানায় অন্য কারো হস্তক্ষেপের অধিকার নেই। নারী নির্যাতনের আরেকটি রুপ সতীদাহ প্রথার মাধ্যমে দেখা যায় । সতীদাহ প্রথা হচ্ছে মৃত স্বামীর সঙ্গে জীবিত স্ত্রীকে চিতায় তুলে পুড়িয়ে মারা। ভারতবর্ষে সতীদাহ প্রথা ছিল খ্রিষ্ট পূর্বকাল থেকে। সতীদাহ প্রথার উল্লেখ পাওয়া যায় প্রাচীন হিন্ধুধর্মীয় শাস্ত্র এবং সাহিত্যে।
আমাদের জীবনযাত্রা প্রভাবিত হয় মূলত সমাজ দ্বারা। সমাজের প্রচলিত অনিয়ম এক্ষেত্রে প্রভাব ফেলে। একান্নবর্তী পরিবারে শ^শুর-শাশুড়ীসহ অনেক সদস্যই এর অন্তর্ভূক্ত। কিন্তু পরিবারে অনেক ক্ষেত্রে নববধূটি নানা পরীক্ষার সম্মুখীন হয়। তার উপর চাপানো হয় সংসারের দায়িত্ব। সংসারের দায়িত্ব তো ভাল কথা কিন্তু দায়িত্বের নামে স্ত্রীর উপর নির্যাতনের মাত্রা যখন বেড়ে যায় তখন আর সুখের সংসারের মুখ দেখা যায়না। সার্বক্ষণিক নানা সমস্যার মধ্যে দাম্পত্য জীবনে সুখ একটি বড় বিষয়। গোপন বিবাহ, পরকীয়া অনেক ক্ষেত্রে সংসার জীবন বাঁধাগ্রস্ত করে ফেলে। দাম্পত্য জীবনের সুখ ঝড়ো হাওয়ার মত। স্বামী-স্ত্রী দুটি মানুষ। কিন্তু দু’জনের চিন্তা-চেতনা, বিবাদ, চরম হতাশা, নিষ্টুরতা সুখের বিরুদ্ধে বাঁধা হয়ে দাঁড়ায়। সংসার ভাঙ্গার কারণের শেষ নেই। আর্থিক সঙ্গতি বাড়ানোর স্বার্থে নারীর অর্থনৈতিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করার জন্য নানাবিধ কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়। কর্মক্ষেত্রে পুরুষের পাশাপাশি নারীর অধিকার নিশ্চিতকল্পে আধুনিক সমাজে নানা পদক্ষেপ নেওয়া হয়। সাংসারিক ব্যয় নির্বাহের ক্ষেত্রে পুরুষের পাশাপাশি নারীর সমর্থনের প্রয়োজন। তথাপি সংসারে অশান্তি অনেক ক্ষেত্রে রয়ে যায়।
জনশক্তি রপ্তানীর ক্ষেত্রে অনেক সময় নারীকে সহিংসতার মুখে পড়তে হয়। সৌদি আরবে বাংলাদেশ থেকে প্রেরিত নারী গৃহ কর্মীদের উপর নির্যাতন বেড়েছে। নারী গৃহকর্মী পাঠানো নিয়ে ২০১৫ সালে চুক্তির এক বছর পরই ২০১৬ সালের মার্চে রিয়াদস্থ বাংলাদেশ দূতাবাস ঢাকায় নারী নির্যাতনের বিষয়ে রিপোর্ট পাঠায়। এ প্রতিবেদন থেকে গৃহকর্মীর উপর নির্যাতনের খবর প্রকাশ পায়। মার্চ ২০১৬ পর্যন্ত ২২ জন গৃহকর্মীর মৃত্যুর খবরও পাওয়া গেছে (সূত্রঃ দৈনিক প্রথম আলো ১১ জুন, ২০১৭)। প্রবীণ মায়েদের অনেকে আবার পারিবারিক বঞ্চনার শিকার। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তারা আর্থিক কষ্টের মুখে পড়েন। সন্তানরা বৃদ্ধ বাবা মায়ের প্রতি দায়িত্ব পালনে উদাসীন থাকলে তাদের জীবন দুর্বিসহ হয়ে পড়ে। জীবনের শেষ প্রান্তে তাঁদের সময় কাটে দুঃসহ যন্ত্রণায়। সন্তানদেরকে ছোটেবেলা থেকে শিষ্টাচার এবং আদব কায়দা শিক্ষা দেয়া প্রয়োজন। শিশুকাল থেকে উচিত অনুচিতের সীমারেখা বেঁধে দিতে হবে। অর্থ অনেক ক্ষেত্রে নারীর বঞ্চনার ক্ষেত্রে সহায়ক ভূমিকা রাখে। পুলিশ কর্মকর্তার মেয়ে ঐশীকে অধঃপতনের চূড়ান্ত সীমায় নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে সহায়ক হয় অর্থ। আর পৃথিবীর আলোচিত ডায়ানা চার্লসের বিয়েতে অর্থের কোন কমতি ছিলনা। ১১০ মিলিয়ন ডলারের বিয়ে বিশ^ মিডিয়ায় আলোচিত হয়। কিন্তু ডায়ানা প্রিন্স চার্লসের সুখের সংসার বেশী বছর টিকেনি। ১৯৮১ সালের রাজকীয় এই বিয়ের বিচ্ছেদ ঘটে ১৯৯৬ সালে। এই বিয়ে বিচ্ছেদের নেপথ্যে নানা মুখরোচক কাহিনী রয়েছে।
সমাজে প্রেমিক-প্রেমিকার অবাধ বিচরণের চূড়ান্ত পরিণতি অনেক সময় বিয়ে নামক সুন্দর পারিবারিক সম্পর্কের মধ্যে না গড়িয়ে তা নারীর উপর সহিংসতায় রূপ নেয়। তাই সময় থাকতে সতর্কতা অবলম্বন করতে হয়। এক্ষেত্রে উভয় পরিবারের অভিভাবকদের দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখা প্রয়োজন। আইসিডিডিআরবির গবেষণা অনুযায়ী স্ত্রী নির্যাতনের হার বাংলাদেশে এখনো অনেক বেশী। ২০১৬ সালের এপ্রিল থেকে ২০১৭ সালের এপ্রিল পর্যন্ত এ গবেষণা পরিচালিত হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, নারী ও পুরুষের ভূমিকার পরিবর্তন, এনজিও গৃহীত নারী কেন্দ্রিক বিভিন্ন পদক্ষেপ, রাষ্ট্রীয় নীতিতে নারী-পুরুষের সমতা বিধান, নারী শিক্ষার প্রসার ও নারীবান্ধব আইন পুরুষের মধ্যে একধরণের হীনমন্যতার মনোভাব তৈরী করেছে। যা স্ত্রী নির্যাতনের আকারে নারীর প্রতি বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। এছাড়া ব্যক্তিগত ও পারিবারিক পর্যায়ে শিক্ষার অভাব, দারিদ্র, বেকারত্ব, জুয়া, মদ ও মাদকের অপব্যাবহার ও বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্ক স্থাপন স্ত্রী নির্যাতনের বড় কারণ।
গবেষণা সুপারিশে বলা হয়, স্ত্রী নির্যাতনের ক্ষেত্রে বিদ্যমান নানা পর্যায়ের প্রভাব ও বিভিন্ন পর্যায়ে স্ত্রী নির্যাতনের বিরুদ্ধে যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন (সূত্রঃ দৈনিক আমাদের সময় ২৫ মে ২০১৭)। আধুনিক সমাজে নারীর প্রতি সহিংসতা, নির্যাতন ও অবিচার নিরসনকল্পে ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্র কর্তৃক কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ প্রয়োজন। এজন্য আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলা উচিত। একই সাথে সর্বক্ষেত্রে নারী-পুরুষের অধিকারের পাশাপাশি তা বাস্তবায়নের সুরক্ষা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
লেখক : অতিরিক্ত রেজিস্ট্রার, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ^বিদ্যালয়, সিলেট।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT