সম্পাদকীয়

থেরেসা মের পিচ্ছিল পথযাত্রা

মুহা: রুহুল আমীন প্রকাশিত হয়েছে: ১৬-০৬-২০১৭ ইং ০১:২৪:১৭ | সংবাদটি ৮০ বার পঠিত

নির্বাচনের পূর্বে বিভিন্ন মতামত জরিপে যে প্রাক-ফলাফল প্রকাশিত হয়েছিল এবং বিশ্বব্যাপী যে-নির্বাচনী ফল প্রত্যাশিত হচ্ছিল, তা শেষ মুহূর্তে সত্য হলো। জিতেও হেরে গেলেন থেরেসা মে। ঝুলন্ত পার্লামেন্ট-এর নেত্রী হিসেবে ব্রিটেনের রাজনীতি ও সমাজের পরিচালনার কঠিন চ্যালেঞ্জ মাথায় নিয়ে পথ চলতে হবে তাঁকে। হ্যাঁ, হাড্ডাহাড্ডি লড়াই-ই হলো। ব্রেক্সিট ইস্যুতে অভ্যন্তরীণ সমালোচনা, ইউরোপের আঞ্চলিক চাপ এবং বৈশ্বিক মিশ্র প্রতিক্রিয়ার মুখে নিজের অবস্থান দৃঢ়  করার প্রত্যয় নিয়ে ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে মধ্যবর্তী নির্বাচনের আয়োজন করেছিলেন। তাঁর আস্থা ছিল পূর্বেকার নির্বাচনের আদলে জনগণ তাকে পুনরায় নির্বাচিত করবে। কিন্তু তাঁর সে স্বপ্ন ভেঙে গেল এবং ব্রিটিশ রাজনীতি চরম অনিশ্চয়তার নতুন যুগে প্রবেশ করলো।
ব্রিটিশ রাজনীতি অভ্যন্তরীণ আর্থ-সামাজিক অবস্থা, ইউরোপের আঞ্চলিক রাজনীতি এবং বিশ্বরাজনীতির সাম্প্রতিক প্রবাহ থেরেসা মের শক্তিশালী অবস্থা নড়বড়ে করে দিল। ব্রেক্সিট ইস্যুতে ব্রিটিশরা বেশ গোলক ধাঁধায় ছিল। গত নির্বাচনে ব্রেক্সিটের পক্ষে ভোট দিয়ে তারা শীঘ্রই বুঝতে পারলো এক অচেনা ঘুমের ঘোরে অচেতন তারা। সেই ঘোর আস্তে আস্তে কাটতে থাকে। জনমনের এ অবস্থা অনুধাবন করে প্রধানমন্ত্রী মধ্যবর্তী নির্বাচনের ব্যবস্থা করলে জনগণ তা পুরোপুরি কাজে লাগায়। গত নির্বাচনের পূর্বে ব্রিটিশরা হয়ত ধারণাও করেনি ব্রেক্সিট ব্যবস্থা তাদেরকে ইউরোপে কিভাবে একাকী করে দিবে, অসহায় করে তুলবে, বিচ্ছিন্ন করে তুলবে। ব্রিটিশ অর্থনীতি সামগ্রিক চাকরির সুযোগের ঘাটতি জনজীবনে কী নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে, তখন অনেকে তা আঁচ করতে অক্ষম হয়। কিন্তু নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে ব্রেক্সিটের খারাপ দিকগুলো আস্তে আস্তে প্রকাশ হতে থাকে, যা সদ্য সমাপ্ত নির্বাচনে কনজারভেটিভদেরকে বড় ধাক্কা দেয়।
ব্রিটেনের নিরাপত্তা ইস্যুটি গুরুত্বপূর্ণ, অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জ ছুঁড়েছে থেরেসা মের ভাগ্যে। পর পর তিন তিনটি সন্ত্রাসী হামলা ব্রিটিশ নাগরিকদের সামনে নিরাপত্তাহীনতার বিষয়টি বার বার ভীতির সঞ্চার করছে। থেরেসা মে প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হওয়ার আগে ব্রিটেনের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে প্রতিরক্ষার দায়িত্ব ছিল তাঁর উপর। আর প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হওয়ার পর দেশের সামগ্রিক কর্তৃত্ব তাঁর হাতে। লেবার পার্টি নির্বাচনী প্রচারণাকালে প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা রক্ষার ক্ষেত্রে থেরেসা মের অদক্ষতা, অযোগ্যতা এবং অদূরদর্শিতার বিষয়টির বহুল প্রচার করেছে। গত ২২ মে তারিখে ম্যানচেস্টারে আত্মঘাতী বোমা হামলার দু সপ্তাহের কম সময়ে গত ৩ জুনে লন্ডনে পুনরায় সন্ত্রাসী হামলা ভোটারদের মনে দারুণ নিরাপত্তা-ভীতি তৈরি করে যা স্বাভাবিকভাবে কনজারভেটিভদের বিপক্ষে যায়।
কয়েকদিন আগে সন্ত্রাস ইস্যুতে থেসেরা মে অসংলগ্ন উক্তি করে বলেন, সন্ত্রাসীদেরকে কোনোভাবে ছেড়ে দেওয়া হবে না। প্রয়োজনে মানবাধিকার আইন সংশোধন করেও সন্ত্রাস দমনে জোরালো ভূমিকা রাখতে চায় সরকার। এ প্রেক্ষিতে অভিবাসন নীতির বিষয়টি সামনে চলে আসে। পাশ্চাত্য সমাজের একটি বিরাট কনজারভেটিভ গ্রুপ মনে করে সন্ত্রাস ও অভিবাসনের মধ্যে জোরালো ধনাত্মক সম্পর্ক রয়েছে। বিশেষ করে আফ্রো-এশীয় মুসলিম অভিবাসী পরিবার থেকে ছিটকে পড়া পথভ্রষ্ট সন্তানরা পাশ্চাত্য সমাজে সন্ত্রাসের বিস্তার ঘটাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী মে এ বাস্তবতাকে সামনে নিয়ে আসেন কোনোরকম বিচার-বিবেচনা ও সতর্কতা ছাড়া। তার এ মনোভাব ব্রিটিশদের কাছে প্রতিক্রিয়াশীল অনুভূতির অনৈতিক প্রকাশ হিসেবে বিবেচিত হয়। ব্রিটিশরা মনে করেন, ব্রিটিশ জাত্যাভিমান, ব্রিটিশ মূল্যবোধ, ব্রিটিশ সংস্কৃতি ধারণ করেই অভিবাসনের বিষয়টি হ্যান্ডেল করতে হবে। ব্রিটেনের মতো সর্বান্তভূক্তিমূলক সমাজ-সংস্কৃতির পরিবেশে নিয়েই কূপম-ুক ও স্বার্থপর অন্তর্মুখিতার অনুশীলন ও অনুসরণ ব্রিটিশ সমাজে বেমানান। ব্রিটিশরা তাদের স্বতঃস্ফূর্ত ও অন্তর্মুখিতার সঙ্গে বহির্মুখিতা মিশ্রিত করে সর্বান্তমুখিতার সংস্কৃতি ধারণে অভ্যস্ত এবং বহুমুখিতা লালনের আজন্ম সংস্কৃতির পেলব পরশে ব্রিটিশ সমাজ সততসিক্ত। প্রধানমন্ত্রী অভিবাসন নীতির সংস্কারে মানবাধিকার আইনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়ে ব্রিটিশ মানস চিত্রপটে এক নতুন অস্বস্তি সৃষ্টি করছে। গণতন্ত্রের চারণভূমি ম্যাগনাকার্টার লালন কূঞ্জ ব্রিটেনের মানবাধিকার নীতি রচিত হয়েছে দীর্ঘ আলোচনা-পর্যালোচনার ভিত্তিতে। সেই আইনের পরিবর্তন বা সংস্কার কেবল একজন প্রধানমন্ত্রীর খেয়াল বা ইচ্ছার ওপর নির্ভর করে না। উচ্চস্পর্শকাতর ইস্যুটি নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর যেনতেন প্রতিক্রিয়া ব্রিটিশদের কাছ থেকে তাকে দূরে সরিয়ে নিয়েছে।  ব্রিটিশরা চায় তাদের বহু সংস্কৃতির মিলন-মেলা, তাদের ব্রিটিশ সমাজকে সন্ত্রাসমুক্ত শান্তির নীড়ে পরিণত হতে, কোনোভাবে তাদের বহুসংস্কৃতির মূলে কুঠারাঘাত করে নয়। বন্দুকের গুলি দিয়ে হম্বিতম্বি দিয়ে সন্ত্রাস দমন করা যাবে না। বরং সন্ত্রাস সৃষ্টিকারী ইস্যুগুলোর প্রতি প্রয়োজনীয় দৃষ্টিপাতের মাধ্যমে সন্ত্রাস দমনের পথ সুগম করা যাবে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী থাকাকালে পুলিশ ফোর্সের সংখ্যা ঘ্রাস করে থেরেসা মে নিরাপত্তা রক্ষার দিকটিকে কম গুরুত্ব দিয়েছেন বলে বিরোধী শিবিরে ব্যাপক প্রচারণা চালানো হয়েছে। এবারকার নির্বাচনে প্রায় পাঁচ লাখ নতুন ভোটার হয়েছে, যাদের অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রী। নতুন প্রজন্মের কাছে লেবার পার্টি নতুন স্বপ্নময় ব্রিটেনের চালচিত্র তুলে ধরতে পেরেছেন। ব্রিটেনের রাজনীতি, সমাজ ও অর্থনীতির ভবিষ্যত্ নির্মাণে নতুন প্রজন্মের ব্যাপক অংশগ্রহণের সম্ভাবনার কথা জানান দিতে পেরেছেন জেরেমি করবিন। ছাত্রছাত্রীদের শিক্ষাব্যয় কমানোর ঘোষণা দিয়ে লেবার পার্টি নতুন প্রজন্ম ও তাদের অভিভাবকদের মন জয় করে নিয়েছেন। গার্ডিয়ানের বিশ্লেষণ মতে, লেবার পার্টির নেতা করবিনের রাজনীতির প্রতি অনুরাগ, জনসম্পৃক্ততা, সামাজিক ন্যায়ের প্রতি অঙ্গীকার, জনসেবায় বিনিয়োগ, কর ঘ্রাস, বিদ্যুৎ-গ্যাস-পানি খাতে সরকারের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা প্রভৃতি বিষয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে লেবাররা তাদেরকে পেছনে ফেলতে সক্ষম হয়েছেন।
নির্বাচনে আঞ্চলিক রাজনীতির কতিপয় বাস্তবতা কনজারভেটিভদের চপেটাঘাত করেছে। ইউরোপের আঞ্চলিক রাজনীতিতে প্রাচীনপন্থি সনাতনী কনজারভেটিভ ধ্যান-ধারণা প্রসূত বিচ্ছিন্নতার নীতি এখন কম গুরুত্ব পাচ্ছে। বিশ্বায়নের যুগে ধরিত্রীপল্লীতে ইউরোপীয়রা খুবই নিবিড়ভাবে একে-অপরের কাছাকাছি বসবাস করতে চাইছেন। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, গত নির্বাচনে একটিমাত্র আসন পাওয়া চরম কট্টরপন্থি ইউকে ইন্ডিপেন্ডেন্ট পার্টি (ইউকেআইপি) এবার কোনো আসনে জয়ী হতে পারেননি। অধিকন্তু বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত তিন নারী রুশনারা, টিউলিপ ও রূপা এবারকার নির্বাচনে অধিকতর ভাবে ফলাফল করে এ সত্য প্রকাশ করেছেন যে, ব্রিটিশরা মুক্ততার স্নিগ্ধতার আপ্লুত থাকতে চায়, সংস্কারের গ-িতে অন্ধ থাকতে চায় না। ব্রেক্সিট সংক্রান্ত জনগণের ম্যান্ডেট হয়ত আঞ্চলিক অখ- নীতির মোহমুগ্ধতা দ্বারা পরিবর্তিত হওয়ার নতুন সম্ভাবনা ছড়িয়ে দিচ্ছে এ নির্বাচন।
সর্বোপরি বিশ্বরাজনীতির বাস্তবতা বিশেষত, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্বাচন এবং নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে তাকে ঘিরে বিশ্ববাসীর নিরাশা ও হতাশার চিত্রও ব্রিটেনের নির্বাচনে বেশ প্রভাব বিস্তার করেছে। ট্রাম্পের মতো থেরেসা মে অন্তর্মুখী আভ্যন্তরীণ নীতি এবং অসহিষ্ণু পররাষ্ট্রনীতির ঘোষণা দিয়ে মূলধারায় জনগণ ও প্রান্তিক নাগরিকদের কাছে অপ্রিয় হয় উঠেছেন। অপরদিকে লেবার পার্টির জেরেমি করবিন জনসম্পৃক্ততা ও শ্রমিকশ্রেণির স্বার্থ সংরক্ষণের অঙ্গীকার দিয়ে এবং শান্তিপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতির রূপরেখা প্রণয়ন করে ব্রিটিশদের ভোট পাওয়ার পথ সুগম করেছেন। ট্রাম্পকে নিঃসন্দেহে পৃথিবীর জন্য একজন ক্ষতিকর ও অবিবেচক রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে ব্রিটিশরা বিবেচনা করেছেন। আর তাঁর নীতির আদলে ব্রিটিশ সমাজের নীতি প্রণয়নের ঘোষণা দিয়ে থেরেসা মে ছিটকে পড়েছেন জনগণ থেকে।
উপযুক্ত কারণসমূহ থেরেসা মেকে ব্রিটেনের সরকার গঠনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা উপহার দেয়নি। ফলে জোট সরকারের দিকে তাঁকে এগোতে হলো। ঝুলন্ত পার্লামেন্টের নানামুখী জটিলতা ও ঝাকুনির চ্যালেঞ্জ মাথায় নিয়ে মে হাল ধরেছেন ব্রিটেনের। আগের নির্বাচনে থেরেসা মের কনজারভেটিভ পার্টি ৬৫০ আসনের মধ্যে ৩৩০টি আসন পেলেও এবার মাত্র ৩১৮টি আসন ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। অপরদিকে লেবারপার্টি গত নির্বাচনের চেয়ে ২৯টি আসন বেশি পেয়ে এবার মোট ২৬১টি আসনে জয়লাভ করেছে। ব্রিটেনের কোনো নীতিপ্রণয়নে ঝুলন্ত পার্লামেন্ট শক্তিশালী অবস্থান গ্রহণ করতে পারবে না। পদে পদে ক্ষমতাসীনরা লেবারদের কাছ থেকে বাধা-বিপত্তি উপহার পাবেন। লেবারদেরকে তোয়াজ করেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে। ব্রেক্সিট আলোচনাকে বাধামুক্ত করতে অন্তর্র্বতীকালীন নির্বাচনের আয়োজন করে থেরেসা মে তার চারপাশে বাধা-বিপত্তির অজগ্র শিকল বেঁধে দিলেন। লন্ডন স্কুল অব ইকোনোমিক্স এর গবেষক ব্রায়ান ক্লাস নির্বাচনের সিদ্ধান্তকে থেরেসা মের নিজের চাপানো ভুল ও ‘চাপানো ক্ষত’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। বিশ্ববাসী এখন প্রতীক্ষা করবে এ ক্ষত আদৌ শুকাবে কিনা, এ ভুলের মাশুল কিভাবে দিতে হবে সেসব বিষয় দেখার জন্য।
লেবার পার্টির নির্বাচনকালীন ইস্যুতে হারের জনসম্পৃক্ত এজেন্ডাগুলো বাস্তবায়নে থেরেসা মের ঝুলন্ত পার্লামেন্টকে উদ্যোগী হতে হবে। অন্যথায় ঝুলন্ত পার্লামেন্টই অসন্তোষের চৈতী দাবদাহে ভস্মীভূত হবে এবং ওয়েস্ট মিনস্টারে লেবারদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠায় নতুন বাস্তবতা ও প্রেক্ষিত তৈরি হবে।
লেখক: অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT