সম্পাদকীয়

তীব্র প্রতিবেশ সংকটে ধসছে পাহাড়

পাভেল পার্থ প্রকাশিত হয়েছে: ১৬-০৬-২০১৭ ইং ০১:২৫:২৩ | সংবাদটি ১৩২ বার পঠিত

আবারও পাহাড়ধসে মৃত্যুর মিছিল বাড়ছে পাহাড়ে। ২০১৬ সালে চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে পাহাড়ি বিপর্যয় না ঘটলেও ২০০৭ সালে নিদারুণ পাহাড়ধসে নিহত হন ১২৭ জন। ২০১৫ সালে চট্টগ্রাম জেলায় পাহাড়ধসে নিহত হন ৬ জন, ২০১৪ সালে একজন, ২০১৩ সালে দু'জন, ২০১২ সালে ২৮ জন, ২০১১ সালে ১৭ জন, ২০১০ ও ২০০৯ সালে তিনজন, ২০০৮ সালে ১৪ জন। এর আগে কখনোই পাহাড়ধসে আদিবাসী জীবন ও বসত নিশ্চিহ্ন হতে দেখা যায়নি। কিন্তু ২০১৭ সালের জুনে পাহাড়ধসে রাঙামাটিতে চাকমা ও বান্দরবানে খিয়াং আদিবাসীদেরও মৃত্যু ঘটেছে। তার মানে ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ে কেবল বাঙালি নয়, অনেক আদিবাসীকেও আজকাল বসত করতে হচ্ছে। এবারের পাহাড়ধসে যেসব এলাকায় পাহাড়ি আদিবাসীদের মৃত্যু ঘটেছে, সেসব পাহাড় মূলত নগরায়ন দ্বারা প্রভাবিত এবং বসতির জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। ২০১৭ সালের ১২ জুন মধ্যরাত থেকে ১৩ জুন ভোরে রাঙামাটি, বান্দরবান ও চট্টগ্রামে পাহাড়ধসে প্রায় ১৩৭ জন মানুষ নিহত হয়েছে। বেসামরিক জনগণের পাশাপাশি কয়েকজন সেনাসদস্যেরও করুণ মৃত্যু ঘটেছে। ২০০৬ সাল থেকে পাহাড়ধস এবং এর প্রতিকার নিয়ে লিখেছি নানা সময়। প্রশ্ন তুলেছি নানাভাবে। পাহাড়ধসের ঘটনাকে এক তীব্র প্রতিবেশ সংকট হিসেবে অবিরামভাবে এর প্রতিকার দাবি করেছি রাষ্ট্রের কাছে। কিন্তু রাষ্ট্র এসব লেখা ও প্রস্তাব গুরুত্ব দেয়নি। তাই পাহাড়ধসে মৃত্যুর করুণ মিছিল প্রতি বর্ষাকালে ঘটেই চলেছে। পাহাড়ধসের অন্যতম কারণ পাহাড়ের সঙ্গে সম্পর্কহীন জীবনের বসবাস। ঐতিহাসিকভাবে যেসব জনগোষ্ঠীর সঙ্গে পাহাড়ের কোনো সম্পর্ক নেই, তারা পাহাড়কে দেখে একটা জায়গা হিসেবে। যেখানে বসবাস করা যায়, চাষবাস করা যায়, পোলট্রি ফার্ম করা যায়, হোটেল-রেস্টুরেন্ট করা যায় বা একটি নিরাপত্তা চৌকি বসানো যায়। পাহাড় যাদের কাছে জীবন্ত সত্তা নয়, তারাই বাংলাদেশে পাহাড়ি এলাকায় পাহাড় কেটে সর্বনাশ করেছে। আর এ কারণেই বর্ষাকালের অবিরত বর্ষণে পাহাড় ধসে পড়ছে। ভূতাত্ত্বিকভাবে বাংলাদেশের এসব পাহাড়শ্রেণির মাটির গঠন ও বুননের বৈশিষ্ট্য এমনই যে, এসব পাহাড় এলোপাতাড়ি কাটা হলে এবং পাহাড়ের উপরিভাগের বৃক্ষ আচ্ছাদন সরে গেলে বৃষ্টির পানিতে ভিজতে ভিজতে এসব পাহাড় ধসে পড়বে। এমন ঘটনা শুধু বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে ঘটছে না, উত্তর-পূর্ব ভারতের মেঘালয় রাজ্যের বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী পাহাড় টিলাও ধসে বাংলাদেশের ওপর পড়ছে। ২০০৮ সালের ২০ জুলাই পশ্চিম খাসি এলাকার কালাপাহাড় ধসে বাংলাদেশের সুনামগঞ্জের তাহিরপুরের সীমান্তরক্ষী ক্যাম্পসহ আশপাশের ধানি জমি ও বসতবাড়ি পাহাড়ি বালুর নিচে চাপা পড়ে। উত্তর-পূর্ব ভারতের মেঘালয় পাহাড়েও একই ঘটনা ঘটছে, এলোপাতাড়ি পাহাড় কেটে কয়লা, চুনাপাথর তোলা হচ্ছে। ফাঁঁপা পাহাড় বৃষ্টির পানিতে ধসে পড়ছে ভাটির বাংলাদেশের হাওরে। এ বছর হাওরের তলিয়ে যাওয়ার এটিই বড় কারণ ছিল।
২. বাংলাদেশে নিদারুণভাবে একটির পর একটি পাহাড় বিপর্যয় হলেও এর কোনো সুরাহা হয়নি আজও। অবকাঠামো উন্নয়ন, সড়ক নির্মাণ, রিয়েল এস্টেট বাণিজ্য, করপোরেট কৃষি ও তথাকথিত উন্নয়নের নামে একটির পর একটি পাহাড় প্রশ্নহীনভাবে খুন করা হয়। অথচ দেশে মুমূর্ষু পাহাড়ের আহাজারি থামানোর জন্য কোনো কার্যকর আইন নেই, নেই রাষ্ট্রের কলিজায় পাহাড়ের প্রতি এক টুকরা দরদ। ১৫ জুন ২০১০ ভোরে কক্সবাজার ও বান্দরবানে পাহাড়ধসে প্রায় অর্ধশত মানুষ নিহত হন। কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার টুইন্যা পাহাড়ধসে পাঁচজন মারা যায়। ২০০৮ সালের ৬ জুলাইও এখানে পাহাড়ধসে চারজন মারা যায়। পাশাপাশি কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ সড়ক নির্মাণ কাজে নিয়োজিত সেনাসদস্যদেরও করুণ মৃত্যু ঘটেছে তখন। এবারও পাহাড়ধসে বন্ধ রাস্তা ঠিক করতে গিয়ে সেনাসদস্যের মৃত্যু ঘটেছে। তার মানে বাংলাদেশের সেনাসদস্যদের আরও বেশি পাহাড় ও পাহাড়ের বিপদ সম্পর্কে সজাগ থাকা জরুরি। পাহাড় বাস্তুসংস্থান ও প্রতিবেশ বিষয়ে আরও জানাশোনা জরুরি। ১১ জুন ২০০৭ সালে অবিরাম বর্ষণে চট্টগ্রামের সেনানিবাস এলাকার লেবুবাগান, কুসুমবাগ, বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা, বান্দরবানে পাহাড়ধসে নিহত হয় ১৩০-এরও বেশি পরিবেশ উদ্বাস্তু মানুষ। যাদের অধিকাংশই নদী ভাঙনসহ নানা দুর্যোগে উদ্বাস্তু হয়ে চট্টগ্রামের পাহাড়ি এলাকায় বসতি গেড়েছিলেন। বাংলাদেশের ইতিহাসে স্মরণকালের সেই ভয়াবহ পাহাড়ধসের পরও পাহাড় রক্ষায় কোনো কার্যকর উদ্যোগ তৈরি না হওয়ায় এবারও পাহাড়ের পর পাহাড়ের কঙ্কাল ধসে পড়েছে। কোনো পাহাড়ের ঢাল ৪৫ ডিগ্রি বেশি হলেই তাতে ভূমিধসের আশঙ্কা থাকে। চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকায় কোথাও কোথাও পাহাড় কেটে ৯০ ডিগ্রি করা হয়েছে। ১৯৭৪ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পাহাড়ি এলাকায় যে ভূমিধস হয়েছিল তার বিস্তার এত ভয়াবহ ছিল না।
৩. দেশের অনেক আদিবাসী পাহাড়ি জনগণ পাহাড়ের নামকরণের সঙ্গে স্থানীয় প্রাণবৈচিত্র্য, পাহাড়ের প্রতিবেশ, জাতিগত সংস্কৃতি এবং কোনো সামাজিক স্মৃতিময় ঘটনাকে গুরুত্ব দিয়ে দেখেন। বান্দরবানের রুমা উপজেলার রেমেক্রী-প্রাংসা ইউনিয়নেই বাংলাদেশের সবচেয়ে উঁচু পাহাড়গুলোর অবস্থান। বাংলাদেশের সর্বোচ্চ পাহাড়টির যে নামটি সর্বাধিক পরিচিতি পেয়েছে তহজিংডং নামে, তা মারমা ভাষার শব্দ। মারমা ভাষায় ত-জিং-টং মানে সবুজ পাহাড়, বম এবং মিজো আদিবাসীদের ভাষাতে এর নাম চিং চির ময় ক্লাং, বাঙালিরা একবার এর নাম দিয়েছিল 'বিজয়'। ক্যাক-ক্রো-টং (ক্রেওক্রাডং) পাহাড়টির নামও মারমা ভাষার, মানে হলো পাহাড়ের শীর্ষদেশ। বম ও মিজো ভাষাতে এর নাম ক্রেওক্রক্লাং। ১৯৮৬ সালে বাংলাদেশ মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউট পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়গুলোর যে তালিকা তৈরি করে তাতে দেখা যায়, পার্বত্য চট্টগ্রামের ১১টি রেঞ্জের ২৯টি পাহাড়ের ভেতর পাঁচটি রেঞ্জের ৯টি পাহাড়ের নামই পাংখোয়া ভাষার। রাঙামাটি জেলার বরকল উপজেলার একটি পাহাড়ের নাম থাংনাং। থাংনাং নামের এক পাহাড়ি পোকার নামে পাংখোয়ারা এই পাহাড়ের নাম রেখেছেন। রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার সাজেক উপত্যকার বড় পাহাড়ের নাম সাজেক থ্লাং, পাংখোয়া ভাষায় এর অর্থ অপূর্ব সুন্দর পাহাড়। সোয়ান-লু, দুমলুং, লুংজিয়াক, বোয়ারলুই, রালআউ, রাইনখ্যাং, লুলেই, সাইচাল, চিপুই, চাংপাল এ রকমের নানা নামে স্থানীয় পাহাড়কে পাংখোয়ারা চিহ্নিত করেন। আবার হাতির নামেও গড়ে উঠেছে অনেক পাহাড়ি এলাকা। শেরপুরের ডালু কোচেরা নানা পাহাড়ি টিলার নাম রেখেছেন হাতিবান্ধা, হাতিপাগার। নেত্রকোনার দুর্গাপুরের মেনকীফান্দা পাহাড়ের কাছে একটি টিলার নাম মংমাগেত্তাক। পাহাড়ের টিলার রাস্তায় একবার এক হাতির গলা আটকে গেলে স্থানীয় মান্দি আদিবাসীরা এই পাহাড়ের এমন নাম রাখেন। রাঙামাটির পাংখোয়া আদিবাসীরা একটি পাহাড়ের নাম দিয়েছেন সাইরেং, এককালে ওখানে হাতি শিকার হতো বলে। পাহাড়ের অধিবাসীরা পাহাড়কে দেখেন জীবনযাপনের অংশ হিসেবে। অনেক আদিবাসী জনগণ নিজেদের পাহাড়ের সন্তান মনে করেন। কিন্তু বহিরাগত বাঙালি সেটেলার ও পাহাড় ব্যবসায়ীদের কাছে পাহাড় পবিত্র জীবনসত্তা নয়, তাই এলোপাতাড়ি পাহাড় কেটে পাহাড়ের প্রতিবেশ ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলা হয়। দেশের প্রায় সব পাহাড়েই আজ এই তীব্র প্রতিবেশ সংকট চলছে। এই প্রতিবেশ সংকট না থামালে পাহাড়ে মৃত্যুর মিছিল থামবে না।
৪. পাহাড়ে বাইরে থেকে বসবাস করতে আসা বহিরাগত সবাই পাহাড়কে দেখেছে মাটির স্তূপ বা ঢিবি হিসেবে, কখনও খনি হিসেবে আবার কখনও পর্যটন ব্যবসার স্পট হিসেবে। তাই পাহাড়ের পর পাহাড় কাটা হয়েছে। উধাও করা হয়েছে পাহাড়ের প্রাণবৈচিত্র্য, উচ্ছেদ করা হয়েছে পাহাড়ের যুগ-যুগান্তরের আদিবাসীদের। দীর্ঘদিন থেকেই পাহাড় কাটা এবং পাহাড় বাণিজ্যের বিরুদ্ধে জনদাবি উঠলেও রাষ্ট্র এ বিষয়ে কোনো বিশ্বস্ত পাহাড়বান্ধব উদ্যোগ নেয়নি। আর তাই ধসে পড়ছে একটির পর একটি পাহাড়। সাম্প্রতিক পাহাড়ধসে নিহত ও ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের প্রতি রাষ্ট্রের বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। জরুরি পাহাড় রক্ষায় কঠোর আইনি উদ্যোগ গ্রহণ। যাতে দেশের এক টুকরো পাহাড়ও কোনোভাবে কোনো উন্নয়ন বা বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে কাটা না হয়। আশা করি, আর কোনো পাহাড় পাহাড়খেকো মানুষের দয়ামায়াহীন ভোগ্য বাণিজ্যিক পণ্যে পরিণত হবে না। পাহাড় কেটে কেটে গড়ে উঠবে না আর কোনো পরিবেশ উদ্বাস্তু মানুষের ঝুঁকিপূর্ণ বসত। পাহাড়ি এলাকার আদি বাসিন্দাদের অংশগ্রহণের ভিত্তিতে নিশ্চিত হবে পাহাড়ের প্রাকৃতিক বাস্তুসংস্থান, মানুষ বা আর কোনো প্রাণ উদ্বাস্তু হবে না তার আপন পাহাড় থেকে। কোনো পরিবেশ উদ্বাস্তু মানুষও পাহাড়খেকোদের কাটা পাহাড়ে এসে লাশ হবে না আর। রাষ্ট্রের সবার জন্যই নিশ্চিত হবে পাহাড়ের সমঅধিকারের বাস্তুসংস্থান। দেশের মুমূর্ষু পাহাড়ের আহাজারি থামানোর দায়িত্ব রাষ্ট্রের। আশা করি, রাষ্ট্র অচিরেই পাহাড় ও পাহাড়ের মানুষকে বুকে আগলে হয়ে উঠবে প্রতিবেশ-ন্যায়পরায়ণ।
লেখক : গবেষক।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT