সম্পাদকীয়

শিশু যখন আসামি

আফতাব উদ্দিন ছিদ্দিকী রাগিব প্রকাশিত হয়েছে: ১৬-০৬-২০১৭ ইং ০১:২৬:৫৩ | সংবাদটি ১৬১ বার পঠিত

মাঝেমধ্যে এমন কিছু ঘটনা ঘটে, যা গল্পকে হার মানায়। হার মানায় শাশ্বত সত্যকে, চিরাচরিত নিয়মকে। সম্প্রতি তেমন কিছু ঘটনা ঘটেছে। প্রথমটির জন্ম রাজধানীর মিরপুরের পাইকপাড়ায়। গত বছরের ২৬ জুন ওই এলাকার মো. হাবিবুর রহমান প্রতিবেশীদের বিরুদ্ধে মিরপুর মডেল থানায় একটি মামলা করেন। মামলায় বলা হয়, মো. মামুন মিয়া ও শাহজাহানের নেতৃত্বে এলাকার প্রায় ৫০ জন লোক লাঠিসোঁটা ও মারাত্মক অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে বাদীর বাড়িতে ঢুকে তাঁর জায়গা-জমি দখলের চেষ্টা করে। তাঁর ঘরের টিনের চাল ভেঙে ফেলে। পরিবারের লোকজনকে মারধর করে। মোবাইল ফোনসেট, সোনার চেন ও নগদ ২৫ হাজার টাকা চুরি করে নিয়ে যায়। এজাহারে আসামিসংখ্যা মোট ২৬। তাতে স্থান পায় মৃত আরিফুর রহমান ও প্রতিবেশী আবুল কাশেমের শিশুপুত্র রুবেলের নাম। এমনকি চার্জশিটেও ওই মৃত এবং শিশু ঠাঁই পায়। গুমরটা ফাঁস হয় ৮ মে। ওই দিন শিশু রুবেলকে কোলে নিয়ে তার মা আদালতে আসেন। তখনই দেখা যায়, রুবেলের জন্ম গত বছরের ৬ জুন। অর্থাৎ মামলার দিন রুবেলের বয়স ২০ দিন। আর চার্জশিটের দিন ১১ মাস। অথচ নথিতে তদন্ত কর্মকর্তা রুবেলের বয়স দেখিয়েছেন ৩০ বছর। আর যে আরিফের বিরুদ্ধে চার্জশিট হয় তাঁর মৃত্যু হয় ঘটনার তিন বছর আগে!
এর আগে গত ২ মে শেরপুরের চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে চাচার কোলে চড়ে জামিন নিতে গিয়েছিল পাঁচ বছরের শিশু রনি। সে নাকি দাঙ্গা-হাঙ্গামা ও চুরির মামলার আসামি!
একই প্রক্রিয়ায় ৬ জুন মা-বাবার সঙ্গে সুনামগঞ্জের আদালতে জামিন নিতে আসে চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ুয়া ৯ বছরের এক শিশু। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ, সে পুলিশের কাজে বাধা দিয়েছে। পুলিশকে মেরে গুরুতর আহত করেছে! ওই মামলায় তার বিরুদ্ধে পুলিশ চার্জশিটও দেয়। পুলিশের নথিতে তার বয়স নাকি ২৪ বছর!
এ ঘটনাগুলো বিস্ময়কর। পুলিশের দুর্নীতি, অপরাধপ্রবণ মানসিকতা, বেপরোয়া আচরণ, অসহযোগিতা ও দায়িত্বে অবহেলা এ দেশে স্বাভাবিক ঘটনা। তাদের সহজাত হয়রানিতে সাধারণ মানুষ নাকাল হওয়ার গল্পটিও পুরনো কাসুন্দি। কিন্তু সেই হয়রানিতে যখন একটি সদ্য ভূমিষ্ঠ শিশু আক্রান্ত হয়, দায়িত্বে অবহেলায় যখন একটি পাঁচ বছরের বাচ্চার কোলে চড়ে কোর্ট-কাছারিতে ছোটাছুটি পর্যন্ত গড়ায় তখন বিষয়টি আর স্বাভাবিক থাকে না। তর্কের খাতিরে ধরে নিলাম আসামিদের তালিকায় শিশুদের নামগুলো ভুলে এসেছে। কিন্তু চার্জশিট? সে তো অনেক স্তর অতিক্রম করে আসে। আমলযোগ্য অপরাধ তদন্তের নিয়ম হলো, তদন্তকারী কর্মকর্তা প্রথমে ঘটনাসংশ্লিষ্ট থানায় রক্ষিত রেজিস্টারগুলো পড়বেন। এরপর সরেজমিনে গিয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করবেন। সাক্ষ্য-প্রমাণ সংগ্রহ করবেন। ঘটনা সম্পর্কে জানেন এমন ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ করবেন। প্রয়োজনে তাঁদের পৃথক বিবৃতি লিপিবদ্ধ করবেন। ওই সময় তিনি কেস ডায়েরি লিখবেন। ঘটনাস্থলের খসড়া মানচিত্র তৈরি করবেন। মামলাসংশ্লিষ্ট কোনো বস্তু কোথাও লুকানো আছে জানলে তল্লাশি চালিয়ে তা উদ্ধার করবেন। সার্বিক তদন্তে আনীত অভিযোগ প্রাথমিকভাবে সত্য মনে হলে এর পরই শুধু চার্জশিট। এখন সেই চার্জশিটে যখন চার বছর আগে মৃত ব্যক্তি বা ১১ মাসের শিশুর নাম যুক্ত হয় তখন একে তদন্ত না বলে, নৈরাজ্য বা স্বেচ্ছাচারিতা বলাই শ্রেয়। অথচ এ তদন্ত প্রতিবেদনই কিন্তু একটি মামলার অন্যতম প্রধান ভিত। একটি খুনের মামলায় পুলিশ যখন ফাইনাল রিপোর্ট দেয়, মামলা কিন্তু সেখানেই শেষ (যদি না ‘না-রাজি’ পিটিশন দেওয়া হয়)। আবার যখন চার্জশিট দেওয়া হয় তখন ওই চার্জশিটের সত্যতা বা শক্ত বুননের ওপর নির্ভর করে মামলার পরিণতি, নির্ধারিত হয় বিচারপ্রার্থী বা নিহতের পরিবারের বিচার-ভাগ্য। সেই চার্জশিটের এমন অন্তঃসারশূন্যতা বা বাস্তববিবর্জিত দশাকে পুলিশের অজ্ঞতা হিসেবেও দেখার সুযোগ নেই। কারণ মাঠপর্যায়ে কাজের আগে পুলিশদের এ বিষয়ে দীর্ঘ প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। সেখানে দ-বিধি, ফৌজদারি কার্যবিধি, পিআরবি, সাক্ষ্য আইনসহ বিদ্যমান ও প্রয়োজনীয় আইনগুলো সম্পর্কে তাদের তাত্ত্বিক ও প্রায়োগিক ধারণা দেওয়া হয়। প্রশিক্ষণ শেষে এমনকি পরীক্ষাও নেওয়া হয়। দ-বিধির ৮২ ধারায় বলা আছে, ৯ বছরের কম বয়স্ক শিশুর কোনো কিছুই অপরাধ নয়। এ আইন তো তাদের অজানা নয়। তা ছাড়া প্রচলিত শিশু আইনে ১৮ বছরের নিচের সবাই শিশু। ওই আইন মতে ৯ বছরের কম বয়সী শিশুর বিরুদ্ধে মামলা করা যাবে না। ৯ বছরের বেশি বয়সী শিশু অপরাধ করলে মামলায় তার বিষয়ে পৃথক অভিযোগপত্র দিতে হবে। তাদের বিচার হবে কিশোর আদালতে। সাধারণ কারাগারে নয়, তাদের রাখা হবে কিশোর সংশোধনাগারে। এমনকি কোনো শিশুকে সরাসরি গ্রেপ্তার বা আসামিও করা যাবে না। আগে বয়স যাচাই করতে হবে। এসব নিয়ম পুলিশ আদৌ মানে কি?
পুলিশের চার্জশিটের ভুলের ফল যে কতটা ভয়াবহ তার একটি দৃষ্টান্ত দিচ্ছি। এক ধর্ষণ মামলায় যাবজ্জীবন সাজা হয় ভোলার চরফ্যাশন উপজেলার আবদুল জলিলের। ঘটনার সময় তার বয়স ছিল ১৫ বছর। সে হিসাবে তার বিচার হওয়ার কথা শিশু আইনে। শিশু আইনে তখন ১৬ বছরের কম বয়স্কদের শিশু (এখন সেটা ১৮) ধরা হতো। কিন্তু মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা চার্জশিটে জলিলকে প্রাপ্তবয়স্ক হিসেবে দেখান। বয়স উল্লেখ করেন ১৬। চার্জশিটের এই একটি ভুলের কারণে তাঁর জীবনের ১৪টি বছর হারিয়ে যায় কারাগারে। পরে প্রকৃত ঘটনা ধরতে পেরে  হাইকোর্ট  ২০১৫ সালে ওই দ- বাতিল করে তাঁকে খালাস দেন। কিন্তু জলিলের জীবনের ১৪ বছর কেড়ে নেওয়া ওই তদন্তকারী কর্মকর্তার শেষ পর্যন্ত কিছু হয়নি। (তথ্যসূত্র : কালের কণ্ঠ)
মিথ্যা মামলার জন্য বাদীর বিরুদ্ধে মামলা করা যায়। ক্ষতিপূরণ চাওয়া যায়। কিন্তু মামলায় শিশুদের এ রকম মিথ্যা পক্ষভুক্তি বা অভিযোগপত্রভুক্তির জন্য পুলিশের বিরুদ্ধে সরাসরি সাজার বিধান নেই। বিষয়টি সাময়িক বরখাস্ত, বিভাগীয় তদন্তেই শেষ। যে ভুলে বা গাফিলতিতে মানুষের বছরের পর বছর কারাগারে কেটে যায়, দুধের শিশু ঘরভাঙা মামলার চার্জশিটভুক্ত আসামি হয়; এমন ইচ্ছাকৃত বা অনিচ্ছাকৃত ভুলের কারিগরদের বিরুদ্ধে অবশ্যই সরাসরি মামলা করার বিধান থাকা উচিত। প্রয়োজনে আইন সংশোধন করে তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করা উচিত।
লেখক : আইনজীবী

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT