ধর্ম ও জীবন

হাফিজে কুরআন ও খতমে তারাবি

একরামুল হক ভাদেশ্বরী প্রকাশিত হয়েছে: ১৬-০৬-২০১৭ ইং ০১:২৯:৫৫ | সংবাদটি ১৪৪ বার পঠিত

কোরআন নাযিলের প্রথম দিন থেকে কোরআন হিফজের পদ্ধতি চালু হয়। এমনকি প্রাথমিক পর্যায়ে কোরআন সংরক্ষণের পন্থা ছিল, যে আয়াত নাযিল হয়, তা সাথে সাথে মুখস্ত করে নেওয়া, পরবর্তীতে এর সাথে আর বিভিন্ন পদ্ধতি যুক্ত হয়েছে। রাসূলে পাক (সা:) এর জীবদ্দশায় যখনই ওহি আসত তখনই স্বয়ং রাসূলে করীম মুখস্ত করতেন এবং উপস্থিত সাহাবায়ে ক্বেরাম (রা:) মুখস্ত করতেন এবং লিখেও রাখতেন। হিফজ করার পদ্ধতি এবং তারতিব নবীজী নিজে শিখিয়ে দিতেন।
একবার বিশিষ্ট সাহাবী হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রা:) নদ্দর (রা:) কে বললেন-তুমি আমাদের থেকে কোরআন শরীফ হিফজ কর, যে রূপ আমরা নবীজী থেকে হিফজ করছি।
আবু দাউদ শরীফে বর্ণিত আছে সাহাবায়ে ক্বেরামের একটি বিরাট জামাত কোরআনের হাফিজ ছিলেন। সাহাবীদের মধ্যেও প্রায় দশ হাজার হাফিজে কোরআন ছিলেন বলে তথ্য পাওয়া যায়। তন্মধ্যে সাঁইত্রিশ জনের নাম বিশেষভাবে উল্লেখ্যযোগ্য।
বর্ণিত আছে মহিলা সাহাবীদের মধ্যেও অনেকে হাফিজে কোরআন ছিলেন, তন্মধ্যে বিশেষ চারজন হচ্ছেন-উম্মুল মোমিনীন হযরত আয়েশা সিদ্দিকা (রা:), উম্মুল মোমিনীন হযরত হাফসা (রা:), উম্মুল মোমিনীন হযরত উম্মে সালমা (রা:), উম্মে ওয়ারাক্বা বিন নওফল (রা:)। এসব হাফিজ ও আলিম সাহাবীদের মাধ্যমে নবীজির জীবদ্দশায় আরব, আফ্রিকা, রাম, চীন, ভারত প্রভৃতি দেশে প্রভৃতি দ্বীনের প্রচার-প্রসার এবং হিফজে কোরআনের পদ্ধতি পৌছতে থাকে।
কুরুনে ছালাছা তথা সাহাবী, তাবী ও তবে তাবীয়ানের যুগেও মুবাল্লিগে দিনের মধ্যে হাফিজে কোরআনের আধিক্য বিদ্যমান ছিল।
ইসলামের তৃতীয় খলিফা হযরত উসমান (রা:) এর খেলাফত কালে হাফিজ সাহাবীদের খতম তারাবীর ইমাম নিযুক্ত করা হয়। আয়িম্মায়ে মুজতাহিদীনের জীবনী আলোচনা করলেও দেখা যায় অধিকাংশ মুহাদ্দীস, মুফাসিসর এবং মুফতি কোরআনে হাফিজ ছিলেন, প্রাথমিক জীবনে তাঁরা কোরআন হিফজ করে নিতেন, তারপর অন্যান্য ইলিম অর্জন করতেন। এতে বিভিন্ন ধরনের ইলিম অর্জনের ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ সহজতর হত। কারণ শরীয়তের প্রধান নছ বা দলিল হচ্ছে কালামুল্লাহ শরীফ। তাই তখন মক্তবের শিক্ষা ছিল হিফজ করা। যেমন আমরা দেখতে পাই ইমাম বুখারী (রা:), ইমাম আজম আবু হানিফা (র:), ইমাম শাফী (রা:), ইমাম জালাল উদ্দীন সুয়তী (রহ:), ইমাম জালাল উদ্দীন মহল্লীর (র:), বড় পীর হযরত আব্দুল কাদির জিলানী (রহ:), শেখ আহমদ ছিরহিন্দি (রা:), হযরত মুজাদ্দীদে আলফে ছানী (রা:), শাহ ওলী উল্লাহ মুহাদ্দিছে দেহ লবী (র:), হাফিজ আহমদ জৈনপুরী (র:), কারামত আলী জৈনপুরী (র:), কাজী সানাউল্লাহ (র:), পনিপথি (র:) প্রমুখ উলামায়ে দ্বীন বাল্যকালে পবিত্র কোরআন হিফজ করে ফেলেছেন।
ইসলামের তৃতীয় খলিফা হযরত ওমর (রা:) এর খেলাফত কালে মদীনা মনোয়ারার কোরআন হিফজের প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠে। তিনি উৎসাহিত করতেন অধ্যয়ন কারীদের জন্য বৃত্তি ও শিক্ষকদের সম্মানী ভাতা প্রদানের ব্যবস্থা করেন। হযরত ওমর ইবনে আজিজ (র:) এর খেলাফতের সময় কোরআন হিফজের ছাত্রদের জন্য ফ্রি থাকা, খাওয়ার ব্যবস্থা করেন। উনবিংশ শতাব্দির মধ্যখানে বিভিন্ন স্থানে কোরআন হিফজের সতন্ত্র প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠে।
বর্তমানে বাংলাদেশ, ভারত ইত্যাদি পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে হিফজে কোরআনের অসংখ্য মাদ্রাসা ও খেদমত আনজাম দিয়ে যাচ্ছে। ইরানেতো হাফিজে কোরআন বলতে সমস্ত কোরআনের তাফসীর সহ পূর্ণ কোরআন মুখস্ত করাকে বুঝায়। বর্তমানে বিভিন্ন বোর্ড বা সংস্থার আন্তর্জাতিক ভাবে হিফজ প্রতিযোগিতার আয়োজন করে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে হাফিজ কোরআনগণকে দ্বীনের একান্ত খাদিম হিসাবে গড়ে তোলার নিমিত্বে হাফিজিয়া মাদ্রাসা সমূহ এবং সংশ্লিষ্ট বোর্ড গুলোর নি¤œলিখিত বিষয়াদি বিবেচনা পূর্বক সিলেবাস এবং কার্যক্রম পরিচালনা করা উচিত বলে মনে করি।
১। কোরআন হিফজের ক্ষেত্রে অনেকে দীর্ঘ সময় বা কয়েক বৎসর ব্যয় হয় এতে, প্রাথমিক লেখাপড়ার বয়স প্রায় শেষ হয়ে যায়। অনেকেই এরপর আর কোনো লেখাপড়া করে না বা সুযোগ পায় না। ফলে দেখা যায় অনেক হাফিজে কোরআন নিরক্ষর। এক্ষেত্রে হিফজ প্রতিষ্ঠানে থাকা কালে তাদেরকে বাংলা, ইংরেজী, অংক ইত্যাদি বিষয়ে প্রাথমিক জ্ঞান প্রদান অপরিহার্য।
২। পবিত্র কোরআনের হিফজ সমাপ্ত করার পর বয়স কম হলেও একজন হাফিজে কোরআন অন্তত: রমদ্বানুল মোবারকে খতম তারাবির ইমামতির যোগ্যতা লাভ করে। কিন্তু এক্ষেত্রে অনেকেই সেই খতম তারাবির সাথে সংশ্লিষ্ট, প্রয়োজনীয় মাছালা মাছায়েল না জানার কারণে যেমন নিজে বিভ্রান্তির শিকার হন। তেমনই মুসল্লীদেরও বিভ্রান্ত করেন। এজন্য হিফজের সাথে সাথে অন্ততঃ এ সংক্রান্ত অবশ্যই মাসআলা-মাসায়েল শিক্ষা দেওয়ার অত্যাবশ্যকীয়।
৩। বর্তমানে কিছু কিছু খতমে শধিনাহ এবং খতমে তারাবিতে অনেক হাফিজে কোরআন এত দ্রুত তিলাওয়াত করেন যে, হরফ, শব্দ কিছুই বুঝা যায় না। ব্যাপারটা এমন যে, যত দ্রুত তেলাওয়াত করতে পারেন তিনি তত ভাল হাফিজ। প্রকৃত ব্যাপার কিন্তু সেরুপ নয়। কোরআনের হক আদায় করে তিলাওয়াত না করলে ছওয়াবতো হবেই না, বরং বিপরীতে গুণাহ হতে পারে। তাই হাফিজে কোরআনের শিক্ষাকালীন সময় সঠিক উচ্চারণ পদ্ধতি তেলাওয়াতে অভ্যস্ত করতে হবে। এক্ষেত্রে আরব দেশ সমূহের হাফিজে কোরআনের তেলাওয়াতের বিভিন্ন ক্যাসেট বর্তমানে বাজারে পাওয়া যায়। যেগুলো সংগ্রহ করে অনুশীলন করা প্রয়োজন।
খতমে তারাবির প্রয়োজনীয়তা ঃ খতম তারাবিহ পড়লে কী পুণ্য পাওয়া যায় তা নি¤েœ উল্লেখ করা হল। (১) খতমে, তারাবির মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ কুরআন শরীফের খতমের ছওয়াব পাওয়া  যায়। (২) এক খতমে সত্তর খতমের ছওয়াব পাওয়া যায়। (৩) পবিত্র কুরআন তেলাওয়াত শুনলে ক্বলব পরিস্কার হয়। (৪) হাফিজ সাহেবের নামাজ পড়ার কারণে ঈয়াদ শক্তি বৃদ্ধি হয়। (৫) হাফিজে কোরআনের মান মর্যাদা বৃদ্ধি পায়। (৬) হাফিজ সাহেবের ইয়াদ বহাল থাকায় মুসল্লিয়ানে কেরাম দোয়া পান। (৭) প্রতি বৎসর অসংখ্য অগণিত হাফিজে ক্বোরআন হিফজ সমাপন করছেন সেই পরিমান মসজিদ হচ্ছে না। তাই প্রতিটি মসজিদে দুই জন করে হাফিজে কুরআন খতমে তারাবিহ নামাজের জন্য প্রতি রমজান শরীফে প্রতিটি মসজিদ কমিটির নিকট আবেদন সেই খতম তারাবিহ নামাজের অংশ নেয়া এবং প্রস্তাবগ্রহণ করে বাস্তবায়িত করে পূর্ণাঙ্গ কুরআন নামাজে শুনার এবং হাফিজ সাহেবদের পড়ার তাওফিক দান করেন। কারণ কুরআন তেলাওয়াত শুনলে অন্তর পরিস্কার হয়। অনেকে বলে খতম তারাবিহ পড়ানোর হাফিজ সাহেবদের হাদিয়া দেওয়ার ব্যবস্থা নেই, কিন্তু ঐ গ্রামে ওয়াজ মাহফিলে প্রতিবৎসর ঢাকা থেকে মাওলানা সাহেবকে বিমান টিকেট করে যুবকরা এক হিস্টুরি শুনে ৩০/৪০ হাজার টাকা দিয়া বিদায় দেয়, ফজরের নামাজ। ওয়াজ মাহফিলে ১টা পর্যন্ত সমাপ্ত করে নামাজ ক্বাজা হয় । দুঃখের বিষয় হাফিজ সাহেবদের হাদিয়া দেওয়ার চিন্তায় খতমে তারাবিহ থেকে বঞ্চিত হবেন না।
যে ব্যক্তি সমস্ত কোরআন শরীফ মুখস্ত করে ফেলেন, তার মেধাশক্তি বৃদ্ধি পায় এবং প্রখর হয়, এটার কোরআন মাজীদের ফয়েজ ও বরকত। কাজেই এই নিয়ামতকে কাজে লাগিয়ে অবশ্যই তাঁদেরকে উচ্চতর ইলিম অর্জনে মনযোগী হতে হবে। একজন হাফিজে কোরআন উৎসাহিত হলে দুনিয়ার যে কোন প্রকার ইলিমই তার জন্য কঠিন নয়। আল্লাহপাক সকলকে তৌওফিক দিন। আমিন।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT