ধর্ম ও জীবন

শান্তিপূর্ণ সমাজ গঠনে পারস্পরিক মুখাপেক্ষিতা

হাফিজ আখতার হোসাইন প্রকাশিত হয়েছে: ১৬-০৬-২০১৭ ইং ০১:৩১:২৯ | সংবাদটি ১১০ বার পঠিত

প্রাকৃতিক নিয়মে যারা যতটুকু অধিকার নির্দিষ্ট আছে তা অর্জন করার আইনগত ও সামাজিক অধিকারে সকলে সমানভাবে তা লাভ করবে।
কয়েকজন বড়বড় ধনী ধন-সম্পদের উৎসমুখ দখল করে নিজেদের ইজারাদারী প্রতিষ্ঠিত করে নেবে আর ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্যে বাজারে বসা ও দুরূহ করে তুলবে, ইসলাম কখনো এটা পছন্দ করেনা। সে কারণে সুদ, ফটকাবাজী, জুয়া, মজুদদারী এবং ইজারাদারী ভিত্তিক বাণিজ্যিক চুক্তি ইসলাম চিরতরে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে।
সাথে সাথে যাকাত, ওশর, খেরাজ ভরণ-পোষণের ব্যয়, দান-খয়রাত ও অন্যান্য কর-আরোপ করে এমন চমৎকার পরিবেশ গড়ে তুলেছে, যাতে প্রত্যেক মানুষ তার ব্যক্তিগত যোগ্যতা, শ্রম ও পুঁজি অনুপাতে উপার্জনের উপযুক্ত সুযোগ-সুবিধা লাভ করতে সক্ষম হয়। এবং সুখী-সমৃদ্ধ শান্তি ও প্রেমময় একটি জীবন ও সমাজ গড়ে উঠে।
দুনিয়ার সব মানুষকে সবরকম রিয্ক ও নিয়ামাত প্রচুর পরিমাণে এবং সমানভাবে দেয়া হলে তাদের পারস্পরিক হানাহানির সীমা ছাড়িয়ে যেত, কারণ ধন-সম্পদের প্রাচুর্যের কারণে কেউ কারো মুখাপেক্ষী থাকতনা এবং কেউ কারো কাছে নতি স্বীকার করতনা।
অপরদিকে ধনাঢ্যতার একটি বৈশিষ্ট্য হল, ধন যত বাড়ে, লোভ-লালসা পাল্লা দিয়ে বৃদ্ধি পেতে থাকে।
আল্লাহ তায়ালা যদি সকলকে সমানভাবে প্রাচুর্য দান করতেন, তাহলে এর অপরিহার্য পরিণতি দাড়াত এই যে, একে অপরের সম্পত্তি করায়ত্ব করার জোর-জবরদস্তি প্রয়োগ ব্যাপক হয়ে যেত। মারামারি কাটাকাটি সহ অন্যান্য কু-কর্ম তখন নিত্য-নৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাড়াত।
তাই আল্লাহ তা’য়ালা কাউকে ধন-সম্পদ, কাউকে স্বাস্থ্য ও শক্তি সম্পদ, কাউকে রূপ সৌন্দর্যে আবার কাউকে করেছেন জ্ঞান ও প্রজ্ঞায় অনন্য।
ফলে প্রত্যেকেই কোন না কোন বিষয়ে একে অপরের মুখাপেক্ষি হয়ে আছে। আর এই পারস্পরিক মুখাপেক্ষিতার উপরই সভ্যতার ভীত প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। পারস্পরিক এ মুখাপেক্ষীতা আছে বলে পৃথিবীতে আজও আমরা ভালো আছি। পবিত্র কুরআনে তাই ইরশাদ হচ্ছে।
“আল্লাহ তা’য়ালা যদি তার সকল বান্দাহকে উপচে পড়া রিয্ক বা জীবিকা দান করতেন, তবে তারা পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করত।
তাই তিনি যার যার উপযোগী করে জীবনোপকরণ বরাদ্দ করে থাকেন। কারণ, তিনি তো তাঁর বান্দাদের প্রয়োজন সম্পর্কে ভালো করেই জানেন। (সূরা শুরা, আয়াত নং ২৭)
অন্যত্র এসেছে, আল্লাহ তা’য়ালা তাঁর বান্দাদের প্রতি খুব সদয়। তিনি যাকে ইচ্ছে করেন অপরিমিত রিয্ক বা জীবনোপকরণ দিয়ে থাকেন। তিনি খুব প্রবল ও প্রতাপশালী আল্লাহ। (সূরা শুরা-১৯)
আল্লাহ তা’য়ালা বলেন, তারা কি জানেনি যে, আল্লাহ যার জন্যে ইচ্ছা জীবনোপকরণ বৃদ্ধি করে দেন এবং তা পরিমিত ভাবে প্রদান করে থাকেন। নিশ্চয় এতে বিশ্বাসী সম্প্রদায়ের জন্য নিদর্শনাবলী-তারা আল্লাহকে চিনার যথাযথ উপায় বিদ্যমান রয়েছে। (সূরা যুমার-৫২)
আল্লাহ তা’য়ালা প্রত্যেককে অপরের মুখাপেক্ষী করে বিশ্বব্যবস্থা এমনভাবে সাজিয়েছেন যে, কেউ যদি ইজারাদারী বা এ জাতীয় অন্য কিছু দ্বারা বাধা সৃষ্টি না করে তাহলে এ ব্যবস্থা আপনা আপনি প্রাকৃতিক সকল সমস্যার সমাধান করে দিবে। পারস্পরিক মুখাপেক্ষিতা এই ব্যবস্থাকে বর্তমান অর্থনীতির পরিভাষায় “আমদানি-রফতানির” ব্যবস্থা বলা হয়।
আল্লাহ তা’য়ালা জীবিকা ব্যবস্থা নিজের হাতে রেখে দিয়ে সাথে সাথে প্রত্যেকের মনে কাজের প্রতি প্রেরণা সৃষ্টি করে দিয়েছেন। যা তার জন্য অধিক উপযুক্ত এবং সে তা স্পষ্টভাবে আঞ্জামও দিতে পারে।
পবিত্র জীবন বিধানে তাই ইরশাদ হয়েছে?
“সালাত সমাপ্ত হলে আল্লাহ তা’য়ালার নিয়ামাত অনুগ্রহ, রিযক বা জীবিকার সন্ধানে তোমরা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়। আর তোমাদের ব্যবসা-বাণিজ্যের মাধ্যমে তাকে বেশি পরিমাণে স্মরণ করতে থাক। বুঝতে পারলে এটাই তোমাদের জন্য উত্তম ! (সূরা জুমআ-৯)
আল্লাহ তা’য়ালা মানুষকে পরিশ্রম নির্ভর করে সৃষ্টি করেছেন। তিনি বলেন : নিশ্চয় মানুষকে আমি বিভিন্ন কষ্ট ও পরিশ্রম নির্ভর করে সৃষ্টি করেছি। (সূরা বালাদ-৪)
মানুষের সবচেয়ে বড় ও পরিশ্রমের কাজ হল শেষ নিকাশে সৃষ্টিকর্তার দরবারে একসাথে সারা জীবনের হিসাব প্রদান করা। তিনি তো সে বিচার দিবসে একচ্ছত্র অধিপতি হবেন। (সূরা ফাতিহা-৩)
এটা অন্য জীব-জানোয়ারের বেলায় নাই, এ কারণেই মানুষ শ্রেষ্ঠ মর্যাদার অধিকারী’। আল্লাহ তা’য়ালা তাই বলেন, মানুষকে আমি অনেক সৃষ্ট বস্তুর উপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছি। তাদেরকে আমি মর্যাদাবান করেছি, জলে-স্থলে চলাচলের জন্য বাহন দিয়েছি। সর্বোপরি তাদেরকে উত্তম জীবনোপকরণ প্রদান করেছি। (সূরা বানি-ইসরাঈল-৭০)
আমদানি-রফতানির, স্বাভাবিক নিয়ম হল, যে বস্তুর আমদানি কম অথচ চাহিদা বেশি, তখন তার মূল্য বৃদ্ধি পায়। আবার যখন আমদানি রফতানির তুলনায় বেড়ে যায় তখন মূল্য হ্রাস পায়। এ উৎপাদনটা তখন আর লাভ জনক হয় না।
সমাজের শান্তি-শৃংখলা বজায় রাখার স্বার্থে ইসলাম আমদানি ও রফতানি নামক শক্তির মাধ্যমে সম্পদ উৎপাদন ও বন্টনের কাজ নিজের হাতে রেখে দিয়েছে।
জীবনের অধিকাংশ সমস্যা স্বাভাবিক নিয়মেই সমাধান হচ্ছে। উদাহরণত: দিন কাজের জন্য এবং রাত্রি নিদ্রার জন্য বরাদ্দ হয়েছে।
এ বিষয়গুলো কোন চুক্তি বা মানবিক পরিকল্পনা প্রণয়নের অধিনে রাখা হয়নি। অথবা এ গুলোকে যদি রাষ্ট্রের পরিকল্পনায় রাখা হত, তাহলে বিশ্বময় কৃত্রিম সঙ্কট তৈরি হত। সমাজ, রাষ্ট্র দেশ ও জাতি ধংস হয়ে যেত। তাই এগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে আপনা-আপনি ফয়সালা হচ্ছে। পবিত্র কুরআনে তাই ইরশাদ হচ্ছে-তারা কি আপনার পালনকর্তার রাহমত, রিযক বা জীবিকা বন্টন করে? আমার নবী জেনে রাখ। আমি তাদের মধ্যে তাদের রিযক বা জীবিকা পার্থিব জীবনে বন্টন করে দিয়েছি। (সূরা যুখরূফ-৩২)
ইসলামী-সাম্য এভাবে যুগে-যুগে, কালে-কালে সমাজ জীবন ও বিশ্বভূবনে অনাবিল শান্তি স্থাপন করেছে।
আমাদের সকলেরও উচিত ইসলামী সাম্য অনুসরণ করে জীবন ও জগতকে একটি শান্তিপূর্ণ রাজ্যে রূপান্তরিত করা। তাহলে প্রতিনিধির দায়িত্ব পালন সফলতার সিড়ি বেয়ে সৃষ্টিকর্তার পরম সন্তুষ্টি বয়ে আনবে।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT