ধর্ম ও জীবন

তাফসীর

প্রকাশিত হয়েছে: ১৬-০৬-২০১৭ ইং ০১:৩২:৫২ | সংবাদটি ৮৫ বার পঠিত

এ কারণেই হযরত ওমর ইবনুল খাত্তাব ও হামযা ইবনে আব্দুল মোত্তালেবের মতো প্রথম যুগের বীর মোমেনরা তাদের অসাধারণ শৌর্য বীর্য সত্তেও মোমেনদের ওপর ক্রমাগত যুলুম নির্যাতন চলতে দেখেও ধৈর্যধারণ করতে পেরেছিলেন, রসূল (স.)-এর আদেশের অপেক্ষায় নিজেদের আবেগ-উত্তেজনাকে দমন করতে পেরেছিলেন এবং সর্বোচ্চ নেতৃত্বের নির্দেশের কাছে নতি স্বীকার করতে সমর্থ হয়েছিলেন। সর্বোচ্চ নেতৃত্বের পক্ষ থেকে এখন একথাই বলা হচ্ছিলো যে, ‘তোমরা হাত গুটিয়ে রাখো, নামায কায়েম করো ও যাকাত দাও।’
এ কারণেই ওই সকল মহান ব্যক্তির জাত্যাভিমান ও আনুগত্যে, শৌর্য বীর্যে ও স্থিরতায় এবং প্রতিরোধ স্পৃহায় ও আত্মসংযমে পূর্ণ ভারসাম্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলো। কেননা তাদেরকে একটি মহান ও গুরুত্বপূর্ণ কাজ সম্পন্ন করার জন্যে প্রস্তুত করা হচ্ছিলো।
মক্কী জীবনে সশস্ত্র সংগ্রাম থেকে মোমেনদেরকে বিরত রাখার পেছনে দ্বিতীয় যে কারণটি আমরা সক্রিয় দেখতে পাই তা এই যে, আরবের সাধারণ সামাজিক পরিবেশে আত্মমর্যাদাবোধ, উদারতা, মহানুভবতা ও মযলুমের প্রতি সহানুভূতি ও সাহায্য করার মানসিকতা, এক ঘা খেয়ে পাল্টা দুই ঘা বসিয়ে দেয়ার মতো লোক যখন মুসলমানদের মধ্যে বিদ্যমান তখনও তাদের ক্রমাগত নির্যাতন সহ্য করায় সাধারণ আরবদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হতে পারতো।
তাদের সুপ্ত মহানুভবতা ও আত্মমর্যাদাবোধ মাথা চাড়া দিয়ে ওঠা ও তাদেরে হৃদয়ে ইসলামের প্রতি দরদ ও আকর্ষণ সৃষ্টি হওয়ার সম্বাবনা ছিলো। বাস্তবেও এটি সংঘটিত হয়েছিলো যখন সমগ্র কোরায়শ ‘শা’ বে আবু তালেব’ নামক পার্বত্য উপত্যকায় বনু হাশেম গোত্রকে অন্তরীণ ও বয়কট করে রেখেছিলো, যাতে বনু হাশেম গোত্র রসূল (স.)-কে রক্ষা করার স্পৃহা ও মনোবল হারিয়ে ফেলে। বনু হাশেমের ওপর কোরায়শের এই যুলুম যখন চরম আকার ধারণ করলো, তখন কিছু লোকের মধ্যে স্বতস্ফূর্ত সহানুভূতি ও আত্মমর্যাদাবোধ উথলে উঠলো। তারা গোপনে বয়কটের চুক্তিপত্র ছিড়ে ফেললো। এভাবে এই সার্বজনীন সহানুভূতি বোধের প্রভাবে গোটা বয়কট প্রক্রিয়ার বিলুপ্তি ঘটলো।
বস্তুত রসূল (স.)-এর জীবনেতিহাসকে যখন আমরা একটি আন্দোলনের ইতিহাস হিসাবে অধ্যয়ন করি, তখন আমাদের স্পষ্টত মনে হয় যে, আরব গণমানসে এই স্বভাবসুলভ সহমর্মিতা ও আত্ম মর্যাদাবোধ জাগিয়ে তোলার লক্ষ্যেই ইসলামী নেতৃত্ব মুসলমানদেরকে সশস্ত্র প্রতিরোধ থেকে বিরত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলো।
এর সাথে সংশ্লিষ্ট আর একটি বিষয় এই যে, ইসলামী নেতৃত্ব তখন ঘরে ঘরে রক্তাক্ত যুদ্ধ বেধে যাক তা চায়নি। এক একজন মুসলমান তখন এক একটি পরিবারের সদস্য ছিলো। এই সকল পরিবারের লোকেরাই তাদের ওপর অত্যাচার চালাচ্ছিলো  এবং তাদেরকে ইসলাম থেকে ফিরে আসার জন্যে চাপ দিচ্ছিলো। এই সর্বব্যাপী নির্যাতন ও নিগ্রহের জন্যে কোনো একটি একক কর্তৃপক্ষ দায়ী ছিলো না। সেদিন যদি মুসলমানদেরকে এই যুলুমের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর অনুমতি দেয়া হতো, তাহলে এই অনুমতির অর্থ দাঁড়াতো ঘরে ঘরে যুদ্ধ বেধে যাওয়া এবং প্রত্যেক পরিবারে রক্তপাত হওয়া।
এতে করে আবর সমাজের চোখে ইসলাম পরিবারে পরিবারে ভাংগন ধরানো ও ঘরে ঘরে যুদ্ধের আগুন জ্বালানো একটি আন্দোলন বলে পরিচিত হতো। কিন্তু হিজরতের পরে আর পরিস্থিতি সে রকম থাকেনি। তখন মুসলিম দলটি একটা স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠানের আকারে মক্কায় বিদ্যমান অন্য একটি কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিলো, তার বিরুদ্ধে সৈন্য সমাবেশ ও আক্রমণ পরিচালনা করছিলো। মক্কায় প্রত্যেক মুসলমান নিজ নিজ পরিবারে ব্যক্তিগত পর্যায়ে যে পরিস্থিতির সম্মুখীন ছিলো, এটি তা থেকে সম্পূর্ণ ভিন্নতর পরিস্থিতি। মুসলমানদেরকে যে মক্কায় যুলুম নিপীড়নের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে দেয়া হয়নি, তার পেছনে এই কয়টি মহৎ উদ্দেশ্য আপাত দৃষ্টিতে আমাদের চোখে পড়ে।
এর সাথে এটাও যোগ করা যেতে পারে যে, মুসলমানরা সে সময় সংখ্যালঘু ছিলো এবং মক্কায় শত্রু বেষ্টিত ছিলো। সে সময় তারা যদি প্রকাশ্য সামরিক নেতৃত্বে পরিচালিত একটি সংগবদ্ধ জংগী দল হিসাবে আত্ম প্রকাশ করতো এবং মোশরেকদের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হতো, তাহলে তাদেরকে ব্যাপক হত্যাকান্ডের শিকার হতে হতো। তাই আল্লাহর ইচ্ছা হলো যে, তাদের সংখ্যা বৃদ্ধি পাক এবং তারা একটি নিরাপদ ঘাঁটিতে আশ্রয় নিক।
এটি যখন সম্পন্ন হলো তখন তিনি তাদেরকে যুদ্ধের অনুমতি দিলেন। (চলবে)

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT