সাহিত্য

শামসুল করিম কয়েস : পুরনো দিনের কথা

জামান মাহবুব প্রকাশিত হয়েছে: ১৭-০৬-২০১৭ ইং ২২:২৬:৩৮ | সংবাদটি ১৩৬ বার পঠিত

১৯৬৭ সাল। তখন আমার স্বপ্নের মাঝে বসবাস। সিলেট সরকারি পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ে অষ্টম শ্রেণিতে পড়ি। থাকি শেখঘাট সরকারি কলোনিতে। দলবেঁধে স্কুলে যাই। দলবেঁধে বাসায় ফিরি। স্কুলের পাঠ্য বইয়ের পাশাপাশি নানা রকম বই সঙ্গে আনি। গল্প, কবিতা, উপন্যাস আরো কত কী। সেসব বইয়ের কতক বন্ধুদের কাছ থেকে ধার নেয়া, কতক লাইব্রেরি থেকে আনা। দিনরাত পড়ায় বুঁধ হয়ে থাকি। সুযোগ পেলে লেখালেখির কসরত করি। বন্ধুদের বাহবা জোটে। কেউ বলে ‘কবি’, কেউ বলে ‘ভাবুক’। ঘনিষ্টজনরা বলে, ‘একদিন নিশ্চিত তুই নামকরা সাহিত্যিক হবি।’
শুনে বুকের ছাতি দেড় হাত উঁচু হয়ে ওঠে। আচার-আচরণে গাম্ভীর্য এসে যায়। কখনো মনে হয়, অনাগত ভবিষ্যত আমার মাঝেই শ্রেষ্ঠ সাহিত্যিকের বীজ বুনে চলেছে। আমি কম কিসে?
ঠিক এমনি এক সন্ধ্যায় এলেন আমার চাচাত ভাই শামসুল করিম কয়েস। কোথাও বেশিক্ষণ বসে থাকা তাঁর ধাতে নেই। খানিকটা লাজুক। সবার সাথে বড়ো একটা মেশেন না। কথা বলেন দ্রুত।  সব সময় ব্যস্ততার ভাব। ঢাকার পত্র-পত্রিকায় নিয়মিত তাঁর ছড়া-কবিতা-গল্প বেরুচ্ছে। এক নামে চেনে সবাই।
ভয়ে ভয়ে বলি: ‘কয়েস ভাই, আমিও ইদানিং লেখালেখি করি। দেখবেন?’ বলেই উত্তরের অপেক্ষা না করে লেখার খাতাটা বের করলাম। তিনি উলটে পালটে দেখে গম্ভীরভাবে বললেন : তুই খাতাটা নিয়ে আমাদের বাসায় আসিস্!’
আমার মন খুশিতে নেচে উঠল। রোববার স্কুল বন্ধ। সকালবেলা হেঁটে হেঁটে চলে যাই দরগামহল্লার বাড়িটায়। কোণের রুমে থাকেন কয়েস ভাই। টেবিলে বই, বিছানায় বই। বাঁধানো মাসিক সওগাত, মাহে নও, টাপুর টুপুর, কচি ও কাঁচা থরে থরে শেলফে সাজিয়ে রাখা। আমি মুগ্ধ, বিহ্বল।
কয়েস ভাই সহাস্যে বললেন : কি খাবি বল্!’ বললাম : কিছুই খাব না। আমার লেখাগুলো আগে দেখে নিন।’ কয়েস ভাই ঘরের ভেতরে গেলেন। প্লেটে খাবার নিয়ে এসে বললেন : নে, খা। তোর খাতাটা বের কর, দেখি।’
আমি খাব কী, রুদ্ধশ্বাসে প্রতীক্ষা করছি, লেখাগুলো দেখে তাঁর নাক সিঁটকে ওঠে কী-না। কিন্তু না, প্রশান্ত মুখে বললেন: চর্চা চালিয়ে যা। তোর হাত বেশ ভালো।’
আত্মবিশ্বাস জাগল, তা হলে আমিও লিখতে পারি। এরপর সময় পেলেই কয়েস ভাইয়ের দরগামহল্লার বাসায় যাই। তিনি আমার গল্প কবিতা-ছড়া মনোযোগ দিয়ে পড়েন। কলম চালিয়ে একটু-আধটু সংশোধন করে দেন। সাপ্তাহিক যুগভেরী, দেশবার্তা সহ নানা পত্রিকায় আমার লেখা ছাপা হতে শুরু করে।
একদিন নিয়ে গেলেন সমস্বর লেখক ও শিল্পী সংস্থার অফিসে। সেখানে পরিচয় হল কবি দিলওয়ার, হেমচন্দ্র ভট্টাচার্য, মাহমুদ হক, কাদের নওয়াজ খান, নৃপেন্দ্র লাল দাশ, দিলীপ কুমার ভট্টাচার্য, তুষার কর, মোস্তফা বাহার প্রমুখের সাথে। সে এক আনন্দময় জগৎ। প্রতি সপ্তাহে সাহিত্য আসর বসে। সবাই নতুন লেখা নিয়ে এসে পাঠ করে শোনান। চুলচেরা বিশ্লেষণ হয়। নতুন উদ্দীপনায় মেতে উঠি। লিখতে থাকি গল্প, কবিতা, ছড়া। শামসুল করিম কয়েস আমার জীবনে নতুন দ্বার উন্মোচন করে দিলেন।
ঊনসত্তর সালে যখন দশম শ্রেণিতে পড়ি, তখন ঢাকায় গেছি বেড়াতে। রাস্তায় দেখা কয়েস ভাইয়ের সাথে। বললেন: কিরে, কাজ আছে?’ ‘বললাম: না।’ বললেন: চল্ ইকবাল ভাইয়ের বাসা থেকে ঘুরে আসি।’ ইকবাল ভাই তাঁর ঘনিষ্ট আত্মীয়। পূর্ব পাকিস্তান হাই কোর্টের বিচারপতি। বেইলী রোডে বাসা। লাল-দালানের বিরাট বাড়িতে ঢুকতে বিন্দুমাত্র বেগ পেতে হল না। দারোয়ান কয়েস ভাইকে চেনে। দুরু দুরু বুকে বাড়িতে ঢুকলাম। এতো বড় মাপের কোনো ব্যক্তির বাড়িতে যাওয়া এই প্রথম। ভাবি বেরিয়ে এলেন। নানা রকম নাস্তা খাইয়ে উঠে আসার সময় বললেন: কয়েস ওকে নিয়ে এসেছিস, দুপুরে খেয়ে যাবি।’ কয়েস ভাই খুব ব্যস্ততা দেখিয়ে বললেন: নিশ্চয়ই। তবে বিশেষ কাজ আছে। ওকে নিয়ে আবার আসব ভাবি।’
বাসা থেকে বেরিয়ে রাস্তায় এসে বললেন: আর আসছি নাকি! বরং চল্ আরেক জায়গায় যাই।’
আমার চোখ ফেটে পানি এসে যাবার জোগাড়। এতো বড় একজন বিচারপতির বাসায় দুপুরের নিমন্ত্রণ খেতে পারব না? অভিমান ভরা কন্ঠে বললাম: থাক্, আর কোথাও যাবার দরকার নেই।’
কয়েস ভাই আমার হাতটা টেনে নিয়ে বললেন: আরে আয়, আয়।’ ঢাকেশ্বরী রোডে দৈনিক আজাদের বিরাট অফিস। ভেতরে ঢুকতেই উল্লাস ভরা কন্ঠ শুনলাম: কয়েস এসেছে, কয়েস এসেছে।’ কয়েস ভাই বললেন: এটা মুকুলের মাহফিলের অফিস কক্ষ। উনি বাগবান ভাই। আসল নাম হাবিবুর রহমান। আর এর নাম তো শুনেছিস্, শাহাদাত হোসেন বুলবুল।’ আরো ক’জন তরুণ লিখিয়ে খালেক-মিন-জয়েন উদ্দিন, সালেহ আহমদ, আবু সালেহ প্রমুখ টেবিলের চারপাশ ঘিরে ছিলেন। শামসুল করিম কয়েসের ছোট ভাই এই পরিচয়ে সবাই মুহূর্তেই আমাকে আপন করে নিলেন। জমে উঠল আড্ডা। অনুভব করলাম, কয়েস ভাই শুধু সিলেটেই নন, ঢাকার লেখকদের কাছেও সমান জনপ্রিয়।
এই জনপ্রিয়তা তাঁর চাকুরি জীবনেও দেখেছি। বাংলাদেশ বেতার সিলেট কেন্দ্রের সহকারি আঞ্চলিক পরিচালক হিসেবে যে কক্ষটি তাঁর জন্যে বরাদ্দ ছিল, সে কক্ষটি সব সময় কবি-সাহিত্যিক-শিল্পীদের কল-গুঞ্জনে মুখর থাকত। তিনি ভিড় এড়িয়ে চলেন- সবার সাথে অবাধে মেলামেশা কম। তবে নিজস্ব গন্ডিতে তিনি তুমুল আড্ডাবাজ, অসম্ভব মিশুক। নিজের গন্ডীর বাইরে কোনো সভা কিংবা অনুষ্ঠানে তাঁকে কদাচিৎ দেখা যায়।
শামসুল করিম কয়েস আমার চে’ বয়সে বেশ বড়। আমার মুরুব্বি কিন্তু তাঁর সাথে যখন গল্প গুজবে মেতে উঠি, তখন যে কেউ ভাবতে পারে, সমবয়সী দুই বন্ধু। এমনই ঘনিষ্ট এবং আন্তরিক সম্পর্ক আমাদের।
মনে আছে, একবার সেই তারুণ্যে উদ্দীপ্ত দিনগুলোয় তাঁর ছড়ার কট্টর সমালোচনা করতে গিয়ে যুগভেরিতে লিখেছিলাম: ‘শামসুল করিম কয়েস ছাই ভষ্ম কী যে লিখেন, তিনিই জানেন। ভেবেছিলাম, খুব কড়া বকুনি দেবেন। কিন্তু আশ্চর্য, এ ব্যাপারে তাঁর কোনো প্রতিক্রিয়াই নেই।
শামসুল করিম কয়েস ব্যক্তিগত জীবনে রসিক, আড্ডাপ্রিয়। তাঁর লেখায় রসভা-ার যেন উথলে উঠে। বিচিত্র এবং আজগুবী বিষয় উপস্থাপনে তাঁর জুড়ি মেলা ভার। অবশ্য এর পেছনে আছে তাঁর সমাজ-মনষ্কতা, শ্লেষ ও বিদ্রুপ; কখনো কখনো কৌতুক। মজার একটা ছড়ার উদাহরণ দিই-
‘... ছাগল দিয়ে করলে জমি চাষ
ধানের মাঠে ফলবে বরুয়া বাঁশ...।’
শামসুল করিম কয়েসের শ্রেষ্ঠ কীর্তি ‘বাংলা সাহিত্যে সিলেটের অবদান।’ দুই খ-ে সমগ্র গ্রন্থাবলি। সহজ-সরল ভাষায় এ অঞ্চলের কবি-সাহিত্যিকদের যে পরিচিতি তিনি তুলে ধরেছেন, তাতে হয়ত পা-িত্যের কচকচানি নেই, যুক্তির মারপ্যাঁচ নেই, তবে আন্তরিকতা ও ¯িœগ্ধতায় সমুজ্জল। কয়েক বছর আগে চাকরি থেকে তিনি অবসর নিয়েছেন, কিন্তু সাহিত্যচর্চায় আজও তিনি নিরলস। ভাবীকালের সাহিত্য-গবেষকরা শামসুল করিম কয়েসের সৃষ্টিকর্মে প্রচুর তথ্য-উপাত্ত লাভ করবেন, তাতে সন্দেহ নেই। এ কারণেই তিনি বার বার আলোচিত হবেন। বর্তমানকালের মত ভবিষ্যতেও এ সংক্রান্ত লেখায় তথ্য সূত্রে উল্লেখিত হবে তাঁর নাম। আর এখানেই শামসুল করিম কয়েসের সৃষ্টিকর্মের সার্থকতা।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT