সাহিত্য

জানাজা

দেলোয়ার হোসেন দিলু প্রকাশিত হয়েছে: ১৭-০৬-২০১৭ ইং ২২:৩০:৪০ | সংবাদটি ৮৯ বার পঠিত

লোকটা তিন দিনের জ্বরে-ই মারা গেল। বয়স কম ছিল না ৬৮ বছর প্রায়। রাতে গ্রামের কিছু লোক জানল, সকাল হতে না হতেই খবর ছড়িয়ে পড়ল গ্রামের আনাচে কানাচে তার যত শিষ্য ছিল ধীরে ধীরে তাদের কাছে খবর ছড়িয়ে গেল তাদের গুরু মারা গেছেন। তারা এক এক করে আসতে লাগলেন তবে  বাজারের চায়ের স্টলে মাঠে ময়দানে বেশি করে  আলোচনা হতে লাগল তার কৃতকর্মের কথা। কেউ কেউ বলছে লোকটি মরেছে ভালোই হয়েছে অনেক লোককে জ্বালিয়েছে। ঐ গ্রামের কোন লোকই তার বাড়ির রাস্তা দিয়ে যাতায়াত করত না। যদি কারো বিশেষ প্রয়োজন হয় তবে নাক মুখ চেপে রাস্তা পার হতে হতো। গাঁজা আর মদের গন্ধে তার বাড়ির চারপাশে যাওয়া যেতনা। নিষেধ করা সত্বেও গাঁজা খাওয়া বন্ধ হত না কোন নিষেধও সে  মানত না। মোল্লা মৌলভীরা কতবার তার বাড়িতে গিয়ে বলে এসেছেন কোন কাজ হয়নি। গ্রামের মাতব্বর শালিস বসালেন, লোকট শালিস বোর্ডের সামনে দাঁড়িয়ে বলল, হুজুর মাই বাপ কাল থেকে আর এসব হবে না, আমি ওয়াদা করলাম। কিন্তু ওয়াদা আর রক্ষা করা হয় না, কয়েক দিন যাবার পর আবার শুরু হয় গান বাজনা, গাঁজা আর মদের আসর। তার শিষ্য চেলারা রাতের পর রাত গান বাজনা আর গাঁজা মদের আসরে মাত করে রাখে বাড়ির প্রতিটি কার্যক্রম।
তার পাশের বাড়ির লোকজন আবার গ্রাম্য শালিসীর কাছে বিচার প্রার্থী হলেন সেই থেকে মাতব্বর আবার শালিসী ডেকে তাকে দশের বাদ (এক ঘরে) করে রাখার জন্য সবাইকে আদেশ দিলেন। দিন দিন লোকটির কার্যক্রম বেড়ে যেতে লাগল গান বাজনা, ঢাক ঢোল, মদ গাঁজা প্রতি রাত বসত এসবের আসর।  
আসরে আগত ভন্ড ফকির, গাঁজাখোর, মদখোর গ্রামের কিছু উঠতি বয়সের ছেলে নষ্ট হতে শুরু করল তারা গ্রামের আনাচে কানাচে গাঁজা খাওয়া শুরু করল। রাস্তায় মেয়ে-ছেলেরা ভয়ে বের হত না। মদ খেয়ে রাস্তায় মাতলামি করতে লাগল, সারা গ্রামে এক অনাচার শুর হল। সে দিন রাস্তায় এশার নামাজ পড়ে ইমাম সাব ও মুয়াজ্জিন সাব সঙ্গে আরো দুজন মুসল্লি যাচ্ছিলেন। পথে মদ খেয়ে একজন মাতলামি শুরু করল, তাদের  উদ্দেশ্যে যা ইচ্ছা তাই বলল, পর দিন শুক্রবার জুম্মার নামাজের শেষে বিষয়টি মসজিদ কমিটির কাছে উপস্থাপন করা হল। মসজিদ কমিটি জবাব দিল মাতব্বর সাব আর ইমাম সাব যা আদেশ দেবেন গ্রামের মানুষ তা মেনে নেবে। মানুষের মনে বিরুপ প্রতিক্রিয়া শুরু হল। গান বাজনার কোন সময় ঠিক ছিল না, তাছাড়া রাত-দুপুরে মেয়ে ছেলের আস্তানা ছিল ঐ লোকটির বাড়ি।
পাশের বাড়ির মাস্টার সাহেব বললেন, নামাজের সময়টুকু তারা অবসর দিত না, গান বাজনা করত, ঘরের বউ ঝিয়েরা নামাজ পড়তে সমস্যা হত তাদের গান বাজনার শব্দে। বন্ধ করার জন্য বললে  উল্টো উপদেশ শুনিয়ে দিত। লোকটি কোন ওজর আপত্তিও শুনতনা। বড় বেশি বেড়ে গিয়েছিল, বুঝলেন বেশি বেড়ে গেলে মানুষের যা হয়।  
মৃত ব্যক্তির লাশ দুই দিন পড়ে রইল বাড়ির উঠানে। গ্রামের কেউ দেখতে ও আসেনি। গ্রামের মসজিদের ইমাম সাহেব ঘোষণায় জানিয়ে দিলেন ঐ লোকের জানাজায় কেউ যাবেন না, বেশ কেউ যায় নি। গ্রামের মাতব্বর জানালেন, যে ঐ ব্যক্তির জানাজায় যাবে তাকে ঐ ব্যক্তির মত একঘরে  করে রাখা হবে। লোকটার আত্মীয়স্বজন যারা ছিলেন তারা পড়লেন মহা সমস্যায়। জানাজা না পড়লে দাফনও করা যাবে না। কে যেন লোকটার আত্মীয়কে বলল ইমাম সাব ও মাতব্বর সাবকে খুশি করতে পারলে একটা কিছু হবে, তারা গ্রামের মানুষকে বললেই একটা সমাধান হয়ে যাবে। এই দিন রাতেই ইমাম সাব ও মাতব্বর সাবকে গিয়ে অনুনয় বিনয় করল এবং বলল আর কোন দিন এইসব অনাচার আমরা হতে দেব না  আমরা এই সব বন্ধ করে দেব, মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে আমরা ওয়াদা করছি। শর্ত শোনা গেল এসব অনাচার সমাজ বিরোধী কাজ কোন দিনই ঐ বাড়িতে আর হতে দেবেন না। এক বাক্যে লোকটির আত্মীয়-স্বজন রাজী হয়ে গেলেন। ইমাম সাহেব জামাতে  ফতোয়া দিলেন। একজন মুসলমান মারা যাবার পর তার ভালো মন্দের বিচার মানুষের দেখার আর কোন অধিকার থাকে না । ভালো মন্দের বিচার করবেন আল্লাহ।
পরদিন সকালে লাশ মসজিদে আনা হল। বেশ লোকও হয়েছে জানাজায়। তবে কিছু অপরিচিত মুখ দেখা গেল জানাজায়, ওরা কোথা থেকে এসেছে, মৃত ব্যক্তির সাথে ওদের সম্পর্ক কিÑ কেউ কিছু জানল না। কেউ কেউ বলল ঐ আগন্তুকরা নাকি মৃত ব্যক্তির নতুন ভক্ত বা শিষ্য।
জানাজা আরম্ভ করার আগে মৃত ব্যক্তির ছেলে লাশের পাশে গিয়ে সবার দিকে ফিরে সালাম দিল এবং বলল আমার বাবার কাছে কারো কোন টাকা পয়সা পাওনা আছে কি না? থাকলে বলেন আমরা শোধ করে দেবো। সবাই বলল, না কোন পাওনা নেই। কিন্তু একজন পেছন থেকে বলল লোকটা যে কষ্ট মানুষকে দিয়েছে তার দেনা কে শোধ করবে?
একটা চাপা উত্তেজনা শুরু হল। এক থেকে আরেক জন কথা বলেই চলেছে। লোকটার লাশ যে সামনে আছে কেউ কেউ ভুলে গেছে। ইমাম সাব বুঝতে পারলেন পরিস্থিতি খুবই খারাপের দিকে যাচ্ছে। তিনি মাতব্বর সাবের দিকে তাকালেন, তাদের মনে মনে কি কথা হল বুঝা গেল না। তবে ইমাম সাহেব বলে উঠলেন ভাই সাহেবান আপনারা একটু চুপ করেন, শান্ত হোন। মৃত ব্যক্তির লাশ সামনে রেখে বিবাদ করা ভালো নয়, উচ্চস্বরে কথা বলা ভালো নয়, কোরআন হাদিসে মানা আছে। লোকটা যতই খারাপ কাজ করে থাকুক, যতই মানুষকে কষ্ট দিয়ে থাকে সে মারা গেছে, দুনিয়ার কাজ তার শেষ। তার বিচার এখন আমাদের করার দায়িত্ব না। তার বিচার করবেন আল্লাহ। আমাদের দায়িত্ব মৃত ব্যক্তির জানাজা দেওয়া। চলেন সবাই আমরা আমাদের দায়িত্ব পালন করি। সবাই লাইনে দাঁড়ান। আল্লাহু আকবর।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT