সাহিত্য

বড় মন মহান সেবক

বাছিত ইবনে হাবীব প্রকাশিত হয়েছে: ১৭-০৬-২০১৭ ইং ২২:৩৩:১৪ | সংবাদটি ১১০ বার পঠিত

প্রকৃতিজগৎ একটি সুন্দর নিয়ম মেনে চলে। বীজ থেকে চারা। চারা থেকে গাছ। ফুল ফল হয়ে একদিন মহিরূহ। বহু মহিরূহের সমাবেশে একটি সুন্দর পরিপূর্ণ বাগান। সুস্থ সুন্দর পরিপূর্ণ মানবজীবন সুন্দর বাগানের মতো। অনুরূপ নিয়মে একজন মহান সমাজসেবকের নাম আবুল কালাম আজাদ ছোটন। ‘আলোকিত কৃতীজন’ শেরানামের একটি বিশাল সংকলনগ্রন্থের মধ্য দিয়ে একটি মহৎ জীবনের স্বীকৃতি নিয়ে আজ আমাদের সামনে উপস্থিত। ১৯৫৯ সালে নবীগঞ্জের দীঘলবাকে জন্মগ্রহণকারী বর্তমানে যুক্তরাজ্য ও বাংলাদেশের কৃতীসন্তান, সাংবাদিক, কবি, জীবনিকার, সাংবাদিক, ঔপন্যাসিক, ব্যবসায়ী, সমাজসেবক, কমিউনিটি লিডার ও টি.ভি উপস্থাপক জনাব আবুল কালাম আজাদ ছোটন। আজ যুক্তরাজ্য ও বাংলাদেশের এক অনুপম কীতিমান পুরুষ।
তাঁর সম্মানে শ্রদ্ধাবচন ব্যক্ত করেছেন তার গুরুজন। ভালোবাসার বাণী রেখেছেন তার সহযোদ্ধা সহকর্মীগণ। তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতার আলো ঢেলেছেন অনুগামী তারুণ্য। বড়রা দিয়েছেন ভালোবাসার শব্দময় শিষ। তাঁর শিক্ষক ব্যক্ত করেছেন শ্রদ্ধামিশ্রিত দোয়া ও ভালোবাসা।
তাঁকে নিয়ে লিখেছেন আবদুল গাফফার চৌধুরী, ড. আতফুল হাই শিবলি, কবি কালাম আজাদ, গবেষক আবদুল হামিদ মানিক, কবি শামীম আজাদ, কবি কর্নেল সৈয়দ আলী আহমদ, সাংবাদিক নবাব উদ্দীন, সাংবাদিক আফতাব চৌধুরী, গবেষক ফয়জুর রহমান সহ অনেক বিখ্যাত ব্যক্তিবর্গ।
‘আলোকিত কৃতীজন’ আবুল কালাম আজাদ’র বৈচিত্রময় সুন্দর জীবন ও কর্মক্ষেত্রের পরিচয়বাহী চৌত্রিশ ফর্মার একটি বিশাল গ্রন্থ। একটি অনুপম সংকলন। এতে দেশে বিদেশে অবস্থানরত তিরানব্বই জন লেখক অত্যন্ত আন্তরিকভাবে ব্যক্ত করেছেন তাদের ¯েœহ, শ্রদ্ধা, ভালোবাসা, কৃতজ্ঞতা ও সম্পর্কের কথা। লিখেছেন যুক্তরাজ্যে কর্মরত ও সিলেট অবস্থানরত উল্লেখযোগ্য সাংবাদিক, কবি, সাহিত্যিকবৃন্দ।
অষ্টাদশ শতকের ধ্রুপদি সাহিত্যের ইংরেজ কবি আলেক জান্ডার পোপকে স্মরণ করা যেতে পারে ‘ঞযব ঢ়ৎড়ঢ়বৎ ংঃঁফু ড়ভ সধহশরহফ রং সধহ. একজন গুণী মানুষ সম্পর্কে জানা মানে নিজের মধ্যে কিছু গুণের সমাবেশ ঘটানো। তাঁর সম্পর্কে লেখা মানে তার গুণের স্বীকৃতি প্রদান। কারো গুণে মুগ্ধ না হয়ে তাঁকে নিয়ে লেখা যায় না। তার জীবন কর্ম পছন্দ না হলে তাকে উপস্থাপন করা যায় না।
যে গুণের কারণে আজকের সমাজে তিনি তাঁর তাবৎ অভিধার তালিকায় শীর্ষে অবস্থান করছেন সেটা হচ্ছে সমাজসেবা, মানবসেবা, বা সৃষ্টিসেবা। একবার এক প্রেমিক শেখ সা’দীকে প্রশ্ন করেছিলেন সৃষ্টিসেবা কী? শেখ সা’দী উত্তরে বলেছিলেন: ‘সৃষ্টিটসেবা হচ্ছে নিজেকে তুমি আগুনে নিক্ষেপ করবে, পবিত্র এক রুটি হবে বলে। যা ভক্ষণ করবে পৃথিবী। প্রেমিক আবারও প্রশ্ন করলেন: জীবনধারা কেমন হবে? শেখ সা’দীর উত্তর: ‘মিষ্টি পানির নদীর মতো, যার তীরে মানুষ ও পশু সকলেই এসে ভিড় করবে।’
আজকের আলোচ্য ব্যক্তিত্ব ‘আলোকিত কৃতীজন’ আবুল কালাম আজাদ ছোটন সৃষ্টিসেবাব্রত হৃদয়ে শিক্ষাসেবার মশাল নিয়ে সমাজের সামনে এসেছেন। হালাল রোজগার থেকে দানের যে নির্দেশ পবিত্র কুরআন শরীফে রয়েছে তা তিনি খুব ভালোভাবেই জানেন বলে মনে হয়।
তিরানব্বই জন কৃতী লেখক তাঁর সম্পর্কে এ সংকলনে হাত খুলে লিখেছেন। লন্ডনে ও দেশে প্রতিষ্ঠিত সাংবাদিকবৃন্দের লেখায় তার বর্ণাঢ্য জীবনের সার্বিক দিক অত্যন্ত সুন্দরভাবে ফুটে ওঠেছে। কীভাবে অত্যন্ত স্বল্প সময়ের ব্যবধানে শ্রম, নিষ্ঠা ও আত্মবিশ্বাসের পাখায় ভর করে তিনি সাফল্যের শিখরে আরোহন করেছেন অর্থাৎ তার সংগ্রামী আত্মপ্রত্যয়ী জীবনের কথা ফুটে উঠেছে কলামিস্ট ও প্রাবন্ধিকবৃন্দের বাস্তবসম্মত সুচিন্তাপ্রসূত বিভিন্ন লেখায়। উপকারভোগীরা তুলে ধরেছেন তার বড় মনের পরিচয়। সাংবাদিক আবুল কালাম আজাদ ছোটন’র প্রতি কৃতজ্ঞতার সানন্দ স্বীকৃতি এসেছে তার কলাম ও পত্রিকা পাঠকদের কাছ থেকে।
একজন গুণী সংগঠক ও কমিউনিটি ব্যক্তিত্ব হিসেবে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। দীঘলবাকের ছোটন যে মানসিকভাবে দীঘলবাকেই অবস্থান করছেন। বাঙালি বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির লালন ও চর্চাই যেন তার আরাধ্য। তার চলার প্রতিটি ক্ষেত্রে রেখেছেন, মাতা, মাতৃভূমি, মাতৃভাষা প্রেমের জ্বলন্ত স্বাক্ষর। ১৯৮৯ সালে বের হয় তার প্রথম গ্রন্থ জন্মভূমি। একটি কাব্যগ্রন্থ। সে সময়ের নিবিষ্ট পাঠকবর্গের কাছে অত্যন্ত দরদের সাথে বইটি গৃহীত হয়।
যে মহৎ জীবনের অনুসরণ করে, সেই রচনা করতে পারে মহৎ জীবন। আমাদের সাবেক অর্থমন্ত্রী এ.এম.এস কিবরিয়ার অবদান ও কর্মের উপর ‘একজন কিবরিয়া’ (২০০৬) গ্রন্থটি রচনা করে নিজের মহত্বকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন আবুল কালাম আজাদ ছোটন। এই গ্রন্থের অনেক লেখক এজন্যে ছোটন সাহেবকে জানিয়েছেন অভিনন্দন।
সমাজের অসঙ্গতি, দুঃখ-বেদনা, মানুষের জীবনযন্ত্রণা তাঁকে বেশ দগ্ধ করে। তিনি অনুভব করলেন গল্প, উপন্যাসের মধ্য দিয়েই তা উপস্থাপন সম্ভব। ১৯৯৯ সালে বের হয় তার গল্পগ্রন্থ ‘ছোটনের ছোটগল্প’। ২০১৭ সালে বের হয় উপন্যাস মরুয়ত যা অতি অল্প সময়ে পাঠকপ্রিয়তা লাভ করে।
শিক্ষার আলোই পারে মানুষের দারিদ্র্য ও সমাজের অন্ধকার দূর করে দিতে। আবুল কালাম আজাদ ছোটন’র উপর যাঁরা কলমী আলোকপাত করেছেন তারা সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন তার মনের ভেতর জ্বলন্ত শিক্ষা মশালের উপর। তিনি দিক দিগন্তে ছড়িয়ে দিতে চান শিক্ষা কল্যাণের এই মশাল। বাদশা মিয়া শিক্ষা কল্যাণ ট্রাস্ট, যুক্তরাজ্য নবীগঞ্জ শিক্ষা উন্নয়ন ট্রাস্টসহ অনেক কল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠান তার মস্তিকপ্রসূত সন্তান। তিনি আর্থিক সাহায্য, বৃত্তি বিতরণ করে তার এলাকার মানুষের সামনে খুলে দিয়েছেন নতুন স্বপ্নের দোয়ার। এটাই তাঁর জীবনের সর্বাপেক্ষা বড় অবদান।
দেশে বিদেশের অনেক নামী দামি লেখকের কলমী উচ্চারণে ‘আলোকিত কৃতীজন’ অত্যন্ত উঁচু মাপের একটি সংকলনগ্রন্থ। এর সম্পাদনার দায়ভার গ্রহণ করায় আমি প্রাণীজগৎ বিশেষজ্ঞ লেখক এম. শহিদুজ্জামান চৌধুরীকে জানাই আন্তরিক অভিনন্দন। ৫৪৬ পৃষ্ঠার এই গ্রন্থটি তিনটি পর্বে বিভক্ত। প্রথম পর্বে বাংলা গদ্য ও কবিতা, দ্বিতীয় পর্বে পাঁচ ফর্মায় সজ্জিত অত্যন্ত মূল্যবান ঐতিহাসিক ছবি এবং তৃতীয় পর্বে ইংরেজি ভার্সন। অনেক উল্লেখযোগ্য ছবির মধ্যে যুক্তরাজ্যের রাণীর নিমন্ত্রণে তার সস্ত্রীক উপস্থিতি একটি ঐতিহাসিক ঘটনা।
এদিক থেকে বিবেচনা করলে গ্রন্থটি একের মধ্যে তিনের এক বর্ণিল সংযোজন। এর নেপথ্যনায়ক জনাব আবুল কালাম আজাদ অত্যন্ত বড় মাপের বহুরূপ ও গুণের এক অপূর্ব সমন্বয়। পৃথিবীতে যারা সঞ্চয়মনস্ক তাদের উদ্দেশ্যে রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন:
হায়রে হৃদয়, তোমার সঞ্চয়
দিনান্তে নিশান্তে শুধু পথপ্রান্তে
ফেলে যেতে হয়।
তাদের সামনে আবুল কালাম আজাদ উৎসর্গের জগতে জীবন্ত কিংবদন্তী।
মহাদেব সাহার চারটি চরণ উচ্চারণ করে শেষ করতে চাই,
‘অবশেষে সবই ঝরে যায়
সমাজের হলুদ হাওয়ায়
স্মৃতিমাত্র লিখে রাখে নাম
সেইখানে আমিও ছিলাম।
ঞবিষভঃয ঘরমযঃ নাটকে শেক্সপিয়ার মানুষকে তিনভাগে ভাগ করেছেন:
ঝড়সব ধৎব নড়ৎহ মৎবধঃ,
ঝড়সব ধপযরবাব মৎবধঃহবংং
ধহফ ংড়সব যধাব মৎবধঃহবংং
ঞযৎঁংঃ টঢ়ড়হ ঞযবস.
আমার মনে হয় ছোটন সাহেব দ্বিতীয় সারির অর্থাৎ যারা শ্রম, মেধা দিয়ে মহত্ব অর্জন করেছেন সেই শ্রেণির লোক। এ অর্জন নিঃসন্দেহে অনেক গৌরবের। কারণ চাঁদের যতোটা না সূর্যের দান তার চেয়ে বেশি চাঁদের অর্জন। পৃথিবীতে সবাই যেন নিজস্ব অর্জন অনুযায়ী অহিংস মনে কাজ করে সে জন্য মাদার টেরিজা উচ্চারণ করেছিলেন:
ডযধঃ ও পধহ ফড়, ণড়ঁ ঈধহহড়ঃ
ডযধঃ ুড়ঁ ঈধহ ফড়, ও পধহহড়ঃ
ইঁঃ ঃড়মবঃযবৎ, ডব পধহ ফড়
ঝড়সবঃযরহম নবধঁঃরভঁষ ভড়ৎ এড়ফ.
আবুল কালাম আজাদ ছোট সাহেবের মধ্যে সমাজের সবাইকে কাজে লাগিয়ে উন্নয়নের একটি বিশাল স্বপ্ন রয়েছে। তাই তিনি আজকের সমাজে অত্যন্ত নন্দিত। কারণ, তিনি সমাজ বিনির্মাণে প্রতিশ্রুতিশীল সুপুরুষ।
বইটি প্রকাশ করে পা-ুলিপি প্রকাশন ধন্য হয়েছে এবং তার নিজের প্রতিষ্ঠানের জন্যে নজিরবিহীন ইতিহাস সৃষ্টি করেছে। ঝকঝকে ছাপা, আকর্ষণীয় মুদ্রণ সম্বলিত গ্রন্থটি নির্ভুল না হলেও এর গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে কোনো প্রশ্ন ওঠার অবকাশ নেই। গ্রন্থটির কেন্দ্রবিন্দু আবুল কালাম আজাদ ছোটন সাহেবের প্রিয়তমা স্ত্রী গ্রন্থটি প্রকাশ করে একজন আদর্শ, মনোবান স্ত্রী ও একজন সমাজমনস্বীর পরিচয় দিয়েছেন। আমি তাঁকে জানাই নিরেট জলীয় শুভেচ্ছা। গ্রন্থটির বিনিময় মূল্য অত্যন্ত যৌক্তিক বলে আমার কাছে মনে হয়েছে।
আবুল কালাম আজাদ ছোটন কে নিয়ে লেখা এই গ্রন্থটি তাকে তার বিশাল স্থাপনা সা¤্রাজ্যের চেয়ে অনেক বেশিদিনই এই পৃথিবীতে টিকিয়ে রাখবে। তার দীর্ঘ কর্মময় সফল জীবন কামনা করে শেষ করছি।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT