উপ সম্পাদকীয়

কৃষি খাত কেন অবহেলিত?

অমিত রঞ্জন দে প্রকাশিত হয়েছে: ১৭-০৬-২০১৭ ইং ২২:৪৫:৫৫ | সংবাদটি ৮৫ বার পঠিত

জাতীয় বাজেট ২০১৭-১৮ অর্থবছরের বাজেট ঘোষণা করেই অর্থমন্ত্রী এই বাজেটকে তা শ্রেষ্ঠ বাজেট হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। কিন্তু অর্থনীতিতে বিশেষজ্ঞ ব্যক্তিদের কেউ কেউ এ বাজেটকে নানা বিশেষণে বিশেষায়িত করেছেন। কেউ বলছেন, এই বাজেট গতানুগতিক, কেউ উচ্চাভিলাষী, কেউ নিকৃষ্ট, কেউ আবার অবাস্তব বাজেট হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। অর্থমন্ত্রী তার বাজেট বক্তৃতার নবম অধ্যায়ে নিজেই বলেছেন, ২০১৭-১৮ অর্থবছরের বাজেট একটি উচ্চাভিলাষী বাজেট। বাজেটের কলেবর দেখলে তা মুখে বলার প্রয়োজন পড়ে না। কারণ ২০১৬-১৭ অর্থবছরের মোট বাজেট ঘোষিত হয়েছিল ৩ লাখ ৪০ হাজার ৬০৫ কোটি টাকা। এবারে তা পরিণত হয়েছে ৪ লাখ ২৬৬ কোটি টাকায়। অর্থাৎ গত অর্থবছরের বাজেটের চেয়ে ৫৯ হাজার ৬৬১ কোটি টাকা বেশি। তবে এত বড় বাজেটের ছোঁয়া কৃষি বাজেটে লাগেনি।
গত এক দশকে কৃষিতে বাজেট ধারাবাহিকভাবে কমছে। আমরা যদি এ সরকারের চলমান দুই মেয়াদের বাজেট পর্যালোচনা করি দেখতে পাবথ কৃষিতে ২০০৯-১০ অর্থবছরের বাজেট মোট বাজেটের ১০.৯ শতাংশ, ২০১০-১১ অর্থবছরে ৯.৮ শতাংশ, ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ৭.৮ শতাংশ, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ৭ শতাংশ, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ৬.৭ শতাংশ, ২০১৭-১৮ অর্থবছরের বাজেট মোট বাজেটের ৬.১ শতাংশ হয়েছে। এই ৬.১ শতাংশের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে কৃষি মন্ত্রণালয়, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়, পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়, ভূমি মন্ত্রণালয় এবং পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়। যদি শুধু কৃষি মন্ত্রণালয়ের বাজেট পর্যবেক্ষণ করি তাহলে দেখতে পাব- ২০১৬-১৭ অর্থবছরে বরাদ্দ ছিল ১৩,৬৭৬ কোটি টাকা (৪.০১), যা ২০১৭-১৮ অর্থবছরে হয়েছে ১,৩,০০০ কোটি টাকা (৩.৪০ শতাংশ)। যদি শুধু টাকার অঙ্কে হিসাব করি, তাহলে গত অর্থবছরের তুলনায় কৃষি মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ কমেছে ৭৬ কোটি টাকা এবং ০.৬১ শতাংশ।
এবার ভর্তুকি প্রসঙ্গে দু-একটি কথা বলতে চাই। ২০১২-১৩ অর্থবছরের মোট বাজেট ছিল ১,৯১,৭৩৮ কোটি টাকা এবং সে বছরে কৃষিতে বরাদ্দ ছিল ১১.৩ শতাংশ। গত এক দশকের বাজেট প্রণয়নে সে বছরই কৃষিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দেখা হয়েছিল এবং বাজেটে ভর্তুকির পরিমাণ ছিল ৯,০০০ কোটি টাকা। তারপর থেকে বাজেটের আকার বড় বা ছোট যাই-ই হোক না কেন ভর্তুকি ঘোষণার পরিমাণ ৯,০০০ কোটি টাকাই স্থির থেকেছে। টাকার অঙ্কে এখানে কোনো পরিবর্তন আসেনি। এবারের ৪,০০,২৬৬ কোটি টাকার বাজেট ঘোষণার পরও তার ব্যত্যয় ঘটেনি। তবে বাজেট ঘোষণা করাই শেষ কথা নয়। এরপর আরও দুটি পর্যায় থাকে, যেটা সম্পর্কে আমরা সাধারণত লক্ষ্যই করি না। বাজেট সংশোধিত হয় এবং তা প্রকৃতপক্ষে কত খরচ হয় সে হিসাব আমাদের কাছে থাকে না। পরের বছরের বাজেটে সংশোধিত বাজেটের চেহারা দেখা গেলেও প্রকৃত বাজেট জানার জন্য আরও একটা বছর অপেক্ষা করতে হয়। সে কারণে তা নিয়ে কাউকে কোনো কথা বলতে শোনা যায় না। এখানে ২০১৫-১৬ অর্থবছরের উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। সে বছরে কৃষিতে ভর্তুকি ঘোষণা করা হয়েছিল যথারীতি ৯ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু সংশোধিত বাজেটে তা নেমে আসে ৭ হাজার কোটি টাকায়। আবার খরচের হিসাব যদি পর্যবেক্ষণ করি, তাহলে দেখব তা মাত্র ৬ হাজার ৪৩২ কোটি টাকা। একইভাবে ২০১৬-১৭ অর্থবছরেও ভর্তুকি ঘোষণা করা হয় ৯ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু সংশোধিত বাজেটে দাঁড়ায় ৬ হাজার কোটি টাকা। প্রকৃত খরচ জানার জন্য আমাদের আরও এক বছর অপেক্ষা করতে হবে।
এবার গুরুত্বের বিবেচনায় কৃষিকে কীভাবে দেখা হচ্ছে তা নিয়ে কিছু কথা বলা প্রয়োজন। অর্থমন্ত্রী বাজেট বক্তৃতায় উল্লেখ করেছেন, আমাদের অর্থনীতি কৃষিনির্ভর। শিল্পের প্রসার এবং তথ্যপ্রযুক্তির ব্যাপক উন্নয়ন সত্ত্বেও এখনও দেশের প্রায় ৪৫ শতাংশ মানুষ কৃষির সঙ্গে সম্পৃক্ত। তাহলে যে খাতে এত মানুষের সম্পৃক্ততা রয়েছে, সে খাতে বাজেট বরাদ্দে এত কার্পণ্য কেন, কেন এ ঔদাসীন্য? সরকার ইতিমধ্যে সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সফলতার স্বাক্ষর রেখেছে। এখন টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে কাজ করছে। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার দ্বিতীয় লক্ষ্যমাত্রাই হলো ক্ষুধা থেকে মুক্তি। যার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে ক্ষুধার অবসান, খাদ্য নিরাপত্তা ও উন্নত পুষ্টিমান এবং টেকসই কৃষির প্রসার। এই দলিলের ২.৪ ধারায় সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে, '২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই খাদ্য উৎপাদন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা এবং অভিঘাত সহনশীল এমন একটি কৃষিরীতি বাস্তবায়ন করা, যা উৎপাদনশীলতা ও উৎপাদন বৃদ্ধি করে বাস্তুতন্ত্র সংরক্ষণে সহায়ক, জলবায়ু পরিবর্তন, চরম আবহাওয়া, খরা, বন্যা ও অন্যান্য দুর্যোগে অভিযোজনের সক্ষমতা বৃদ্ধি করে এবং যা ভূমি ও মৃত্তিকার গুণগত মানের উত্তরোত্তর বৃদ্ধি সাধন করবে।
উপরোক্ত বিষয়গুলো মাথায় রেখে গত নভেম্বর ২০১৬ মন্ত্রিপরিষদ বাংলাদেশের কৃষি ব্যবস্থাকে টেকসই করার লক্ষ্যে 'জাতীয় জৈব কৃষিনীতি' প্রণয়ন করেছে; যা টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের পথে পা বাড়ানোর নমুনা বৈকি এবং এ উদ্যোগটি নিঃসন্দেহে একটি প্রশংসনীয় উদ্যোগ। কিন্তু এ বছরের বাজেটে কি তার কোনো প্রতিফলন আছে। যে সদিচ্ছার জায়গা থেকে নীতি প্রণয়ন করা হয়েছে, বাজেট প্রণয়নে কি সে সদিচ্ছার প্রতিফলন ঘটেছে? জৈব কৃষিনীতির ভূমিকা পর্বের ১.২ ধারায় বলা হয়েছে, 'মাত্রাতিরিক্ত রাসায়নিক সার ও বালাইনাশকের ব্যবহার যাতে জনস্বাস্থ্য ও কৃষি পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব সৃষ্টি না করে, সে জন্য সচেতন নাগরিক সমাজের মাঝে নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত খাদ্যের চাহিদা এবং পরিবেশ সংরক্ষণের আকাঙ্ক্ষা বৃদ্ধি পাচ্ছে। সে নিরিখে জৈব কৃষি বর্তমান বিশ্বে এক আলোচিত অধ্যায় ও দ্রুত বিকাশমান খাত হিসেবে বিবেচিত।' দুঃখজনক হলেও সত্যি যে, এ নীতি বাস্তবায়নে আলাদাভাবে কোনো বরাদ্দ রাখা হয়নি। জীবপ্রযুক্তির মাধ্যমে কৃষিবীজ উন্নয়ন, বর্ধিতকরণ, মান নিরূপণ ও প্রযুক্তি বিস্তারে ২০১৬-১৭ অর্থবছরে বরাদ্দ ছিল পাঁচ কোটি ৩৩ লাখ টাকা। এবারও সমপরিমাণ অর্থ বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এখানে টাকার অঙ্কে কোনো পরিবর্তন আসেনি, বাজেটের আকারের সঙ্গে 'শতাংশ'-এর বিবেচনা তো পরের কথা।
জাতীয় জৈব কৃষিনীতির ধারা-২-এ যে উদ্দেশ্য বর্ণনা করা হয়েছে, সেখানে কৃষির জন্য মাটির স্বাস্থ্যের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে উপস্থাপিত হয়েছে। নীতিতে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনে কৃষি রাসায়নিকের ব্যবহার মাটি ও জনস্বাস্থ্যে বিরূপ প্রভাব তৈরি হয়েছে বলে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে। সুতরাং মাটির ভৌত, রাসায়নিক ও জৈবিক গুণাবলিকে যথোপযুক্ত সমন্বয় করে মৃত্তিকার উর্বরতা বজায় রেখে কৃষি কার্যক্রম পরিচালনা করা, জৈব কৃষির উপযোগী অঞ্চল, স্থান ও ফসল শনাক্ত করার জন্য পর্যাপ্ত অর্থ প্রয়োজন। অথচ মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের গত অর্থবছরের বরাদ্দ ছিল সাত কোটি ৬০ লাখ টাকা। সেখানে এবারে কোনো বরাদ্দই রাখা হয়নি। তাহলে সরকার প্রণীত ও স্বাক্ষরকৃত বা অঙ্গীকারবদ্ধ আইন ও নীতির সঙ্গে এবারের বাজেট কতটা সঙ্গতিপূর্ণ। এই বাজেট কীভাবে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বা টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার দ্বিতীয় মাত্রা পূরণে সক্ষম হবে এবং তা কীভাবে উন্নয়নের মহাসড়কে সুশৃঙ্খল অভিযাত্রায় প্রাণ প্রতিষ্ঠা করবে?

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT