উপ সম্পাদকীয়

বুদ্ধিজীবি হত্যা : বিজয় উল্লাসে বিষাদ

এম এ মালেক চৌধুরী প্রকাশিত হয়েছে: ১৪-১২-২০১৭ ইং ০৩:১৮:৪৫ | সংবাদটি ১০৭ বার পঠিত

রক্তঝরা ব্যতিত স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছে এমন দেশের সংখ্যা বিরল। সব ঔপোনিবেশিক শাসকেরা রক্ত-খাদক ছিল। এ পিপাসা না মেটা পর্যন্ত তারা উপনিবেশ ছাড়তে চায়নি। বলা হয়, ভারত ভাগ হয়েছে কংগ্রেস ও মুসলিম লীগ নেতৃবৃন্দের পরস্পরের মুখোমুখি বসে পাতানো আলোচনার মাধ্যমে-কোন প্রাণহানি ছাড়া। কথাটা আদৌ সত্য নয়। সে প্রসঙ্গে পরে আসছি।
কোন রূপরেখায় ভারত ভাগ হবে অর্থাৎ পাকিস্তানের ভাগে কোন কোন অঞ্চল যাবে তা আগেই গোপনে ফয়সালা করে রেখেছিলেন বড়লাট লর্ড ব্যাটেন এবং কংগ্রেস নেতা জওহরলাল নেহরু। কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের সামনা সামনি বসে আলোচনাটা ছিল ¯্রফে আনুষ্ঠানিকতা-শুধু বড়লাট  ও নেহরুর পরিকল্পনা ও রূপ-রেখার অনুমোদন লাভ। যেন বাংলাদেশের মুসলমান পাত্র-পাত্রীর বিবাহের মোহরানা ও অন্যান্য প্রাসঙ্গিক বিষয়ের সিদ্ধান্ত যা আগেই সাব্যস্থ করে রাখা হয় এবং পরে পান-চিনির একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করে উভয়পক্ষের মুরব্বিয়ানদের সামনে তা এমনভাবে উপস্থাপন করা হয় যেন এতদসংক্রান্ত কোন চূড়ান্ত ফয়সালা আগে হয়নি। এ অনুষ্ঠানে সেসব সাব্যস্থ করা হবে। উরভরফব ধহফ ভঁষব ভাগ করে শাসন কর- ব্রিটিশরাজের এ থিওরি ভারত বিভক্তিতেও প্রয়োগ করা হয়। বাংলা এবং পাঞ্জাব ভাগ করার সিদ্ধান্ত আগেই করে রেখেছিলেন বড়লাট ও নেহরু। এ দু’প্রদেশ ভাগ করা মানে সাম্প্রদায়িক দাঙা সৃষ্টি। তো, লর্ড মাউন্ট ব্যাটেনের কড়া ধমকে বাংলা ও পাঞ্জাব দ্বিখন্ডিত করার প্রস্তাব মুসলিম লীগ নেতৃবৃন্দ শেষ পর্যন্ত মেনে নিতে বাধ্য হোন। ধমকটা ছিল এ রকম যে এ প্রস্তাব না মানলে তোমাদের পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার দাবি ছাড়তে হবে। তো, ব্রিটিশের এ পলিসি বাস্তবে সংগঠিত হতে সময় লাগেনি। ১৯৪৬ সালেই পশ্চিম বাংলা (কলিকাতা নগরী সহ), বিহার এবং পাঞ্জাবে লেগে যায় সাম্প্রদায়িক দাঙা। কচু কাটা হয় প্রায় দশ লক্ষের মতো মানব সন্তানের। শুধুমাত্র ধর্ম বিশ্বাসের কারণে সহাবস্থানে হাজারো বছর যাবত বসবাসরত প্রতিবেশী তার প্রতিবেশীকে কাতল করে।
আমরা প্রত্যক্ষদর্শী যে, বাংলাদেশের স্বাধীনতা বড়ই চড়াদামে কেনা। স্বাধীনতার জন্য এতো পরিমাণ রক্ত পৃথিবীর কোন জাতিকে বিসর্জন দিতে হয়নি। প্রায় ত্রিশ লক্ষ মানুষের রক্ত¯œাত এবং তিন লক্ষ মা-বোনের সম্ভ্রমহানির বিনিময়ে অর্জিত আমাদের স্বাধীনতা। মুখের ভাষার জন্যও অভাগা এ জাতিকে রক্ত ঝরাতে হয়েছে। অবশ্য এ সত্য বিষয়টি অস্বীকার করা যায় না যে বাংলা মুলুকেই মীর জাফরদের জন্ম হয়েছে। অনেকে বলে থাকেন মুক্তিযুদ্ধে এতো বেশি প্রাণহানির প্রধান কারণ হলো এ দেশের এক অংশ মানুষের স্বাধীনতার বিরুদ্ধাচারণ। কুড়ালের পাছায় গাছের টুকরো ঢুকায় যেমন কুড়াল গাছ কাটার শক্তি পেয়েছে তেমনি বাঙালি এক অংশের পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীকে সহযোগিতা করায় রক্তপাত বেশি হয়েছে। স্বাধীনতার বিপক্ষ শক্তির সহযোগিতা না থাকলে, এমনকি তারা নীরব থাকলেও অবশ্য (অনেকে প্রাণের মায়ায় রাজাকার হয়েছিল) এতো পরিমাণ মানুষ মারা যেতো না, নারীদের সতিত্ব লুণ্ঠিত হতো না, নয় মাস সময়ও লাগতো না। এমনকি ভারতকেও পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার প্রয়োজন দেখা দিতো না। ছলিমুদ্দি, কলিমুদ্দি, রাম-রহিম বিরেশদেরকে তো খান সেনারা সনাক্ত করতে পারতো না। বাঙালিরাই তাদেরকে চিনিয়েছে, হত্যা করেছে।
যুদ্ধের ময়দানে বা সম্মুখ গেরিলা যুদ্ধে মারা গেলে সাধাণরতঃ আক্ষেপের পরিমাণ কম হয় যেহেতু সে বাঁচা মরার লড়াইয়ে গেছে। যদিও সে রকম মৃত্যুতে মৃতের পরিবারের বিলাপ কান্না আমরণ চলতে থাকে। তাই স্বাধীনতার ছয়চল্লিশ বছর পরও স্বজন হারানোর বেদনা ও বিলাপের সুর বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ইসলাম বিরোধী কোন যুদ্ধ ছিল না। এটা ছিল শুধুমাত্র বাঙালির স্বাধীনতা লাভের যুদ্ধ। কিন্তু সে যুদ্ধকে স্বাধীনতা বিরোধী বাঙালি কিছু লোক ইসলামকে ব্যবহার করে স্বাধীনতাকামী মানব সন্তানদের নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করেছে। যুদ্ধের ময়দানে যুদ্ধকালীন অবস্থায়ও নারী, শিশু এবং বৃদ্ধ লোকদেরকে হত্যা আল্লাহর নবী (সা.) বারবার নিষেধ করেছেন এবং যারা এ গর্হিত কাজ করবে তারা জাহান্নামী বলে তিনি হুশিয়ার করে গেছেন। আল্লাহর রাসূল (সা.) যতোটি যুদ্ধ পরিচালনা বা সাহাবায়ে কেরামগণ নেতৃত্ব দিয়েছেন এ বিধানের কোন ব্যত্যয় ঘটেনি। এমনকি কারবালার ময়দানে ইয়াজিদ বাহিনী আমাদের নবী পরিবারবর্গকে শহীদ করেছে তারা কিন্তু নবী পরিবারের কোন শিশু ও নারীকে হত্যা করেনি। যুদ্ধকালীন অবস্থা ছাড়াও কোন মানব সন্তান হত্যা, সে বিশ্বাসী হোক আর অমুসলমান হোক, নবী করিম (সা.) তা কবিরা গুনাহ ও ঘাতক জাহান্নামী বলে তাঁর উম্মতকে সতর্ক করে গেছেন। মহাগ্রন্থ আল কুরআনেও অকারণে মানব সন্তান হত্যা, কোন প্রাণী হত্যা জগন্য মহাপাপ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। ব¯ুÍতঃ কুরআনের আলোকেই মহানবীর এতদসংক্রান্ত ঘোষণা।
গুম করা, গুম করে হত্যা বা বাসা বাড়ী থেকে তুলে নিয়ে মানুষ মারার নির্মম প্রচলন শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে। বিশেষভাবে ১২, ১৩, ১৪ নভেম্বরে (একাত্তরের) এ দেশের বুদ্ধিজীবিদের হত্যাকান্ডের মাধ্যমে। সে দিনগুলোতে দেশের সেরা মানব সন্তানদেরকে বাসা বাড়ী থেকে ডেকে নিয়ে মিরপুরের বদ্যভূমিতে যেভাবে হত্যাকরা হয়েছে তা কোন ধর্মের বিধানে নেই। টিভিতে বা পত্রিকার পাতায় মিরপুরের বদ্যভূমিতে দেশের সেরা সন্তানদের লাশের মিছিল অবলোকনে পাষাণ হৃদয়ের লোকেরও আত্মা কেঁপে ওঠবে। বিজয়ের দু-তিন দিন আগে দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তানদেরকে হত্যা করে হন্তারকেরা কি সুখ পেয়েছে জানিনা, তবে জাতির অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে। স্বাধীনতা প্রাপ্তিতে কতো মানুষ যে কতো নির্মমভাবে জীবন দিয়েছে তাদের সবার নাম-ঠিকানা আজ পর্যন্ত জানা যায় নি। তবে আমাদের অবশ্যই স্মরণে থাকতে হবে যে মিরপুরের বধ্যভূমিতে বলিকৃত দেশের সেরা সন্তানগণসহ ত্রিশ লক্ষ শহীদান নিজেদের জীবন বিসর্জন দিয়ে আমরাসহ অনাগত প্রজন্মের জন্য এই স্বাধীন সার্বভৌম দেশটি দিয়ে গেছেন। তো, জাতির এসব শ্রেষ্ঠ সন্তানদের নামে সরকারি প্রতিষ্ঠান, রাস্তা, সড়ক এবং বিভিন্ন সেতুর নামকরণ করলে অন্ততঃ শত বছর পরে প্রজন্মও তাঁদের স্মরণ করবে এবং জাতিরও কিছুটা দায়মুক্তি হবে।
লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট।

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • প্রসঙ্গ : রিকসা ভাড়া
  • পেছন ফিরে দেখা-ক্ষণিকের তরে
  • অবাধ ও সুষ্ঠু নিবার্চনের প্রত্যশা
  • শিক্ষাক্ষেত্রে তথ্যপ্রযুক্তির প্রসার
  • বাংলাদেশে প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার
  • বাংলাদেশের উৎসব
  • ‘শান্তি জিতলে জিতবে দেশ’
  • মানবাধিকার মুক্তি পাক
  • অদম্য বাংলাদেশ
  • নারী আন্দোলনে বেগম রোকেয়া
  • আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও জনমানস
  • অরিত্রী : অস্তমিত এক সূর্যের নাম
  • স্বপ্নহীন স্বপ্নের তরী
  • মৌলভীবাজার জেলা প্রাথমিক শিক্ষার গুণগত মান
  • নয়া রাষ্ট্রদূত কী বার্তা নিয়ে এসেছেন?
  • ফেসবুক আসক্তি
  • কোম্পানীগঞ্জ উপজেলায় পৌরসভা প্রসঙ্গে
  • শিক্ষার্থীদের শাস্তি এবং অরিত্রী প্রসঙ্গ
  • রাষ্ট্রায়ত্ত বৃহৎ শিল্প টিকিয়ে রাখা ও উন্নয়ন জরুরি
  • হাফিজ মোবাশ্বির আলী
  • Developed by: Sparkle IT