উপ সম্পাদকীয়

আদর্শ সংবাদপত্রের ভূমিকা

এস আর শানু খান প্রকাশিত হয়েছে: ১৪-১২-২০১৭ ইং ২৩:৪৯:০৬ | সংবাদটি ৫২ বার পঠিত

সভ্যতার প্রজ্ঞালোকের যুগে সর্বস্তরের মানুষের দুয়ারে প্রতিদিনের বিচিত্র ঘটনাবলি উপস্থাপন করার একমাত্র নির্ভরযোগ্য মাধ্যম হচ্ছে সংবাদপত্র। আধুনিক সভ্যতায় সংবাদপত্রের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রকৃতপক্ষে সংবাদপত্র হচ্ছে সভ্যতার অঙ্গ, বস্তুনিষ্ঠ ঘটনাবলির প্রমাণস্বরূপ। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন প্রেক্ষাপট যেমন রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অবকাঠামো সংবাদপত্রের মাধ্যমেই জানা যায়। সমগ্র পৃথিবীকে হাতের মুঠোয় তুলে ধরার ভার নিয়েছে আজকের সংবাদপত্র। ইলেকট্রনিকস মিডিয়ার সর্বগ্রাসী যুগেও সংবাদ শিক্ষিত মানুষের কাছে একটি অনন্য যোগাযোগমাধ্যম হিসেবে কাজ করে।
চীনেই সংবাদপত্রের উৎপত্তি হয়েছে বলে ধারণা করা হয়। চীনারাই প্রথম মুদ্রণ যন্ত্র আবিষ্কার করে। একাদশ শতাব্দীতে চীনে একধরনের সংবাদপত্র মুদ্রিত হতো। মোগল সম্রাট উপমহাদেশে সম্রাট শাহজাহান শাহ আওরঙ্গজেবের আমলে রাজকর্মচারীদের মধ্যে হাতে লেখা একধরনের সংবাদপত্র প্রকাশিত হতো। ইউরোপে প্রথম সংবাদপত্র প্রকাশিত হয় ইতালির ভেনিস শহরে। তারপর ১৭২১ সালে ইংল্যান্ডের রানী এলিজাবেথের সময় ‘লন্ডন গেজেট’ নামক একটি পত্রিকা প্রকাশিত হয়। বাংলাদেশে সর্বপ্রথম জেসি মার্শম্যান ১৮১৮ সালে ‘সমাচার দর্পণ’ এবং বাঙালি সম্পাদক গঙ্গাধর ভট্টাচার্য কর্তৃক ‘সাপ্তাহিক বেঙ্গল গেজেট’ কলকাতা থেকে প্রকাশ করেন। পূর্ব পাকিস্তানের প্রথম সংবাদপত্র ছিল ‘দৈনিক আজাদী’।
পৃথিবীতে জ্ঞান বিস্তারের যত মাধ্যম আবিষ্কৃত হয়েছে, এর মধ্যে সংবাদপত্রের স্থান সবার শীর্ষে বৈ কম নয়। সভ্য সমাজের নানাবিধ কল্যাণ সাধনে সর্বদা নিয়োজিত থাকে সংবাদপত্র। সংবাদপত্র সব শ্রেণীর মানুষের কাছেই খুবই প্রিয়। কেননা, সংবাদপত্র রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক উভয় ক্ষেত্রেই সচেতনতা সৃষ্টি করে। সংবাদপত্র পাঠ করলে মানুষের যে শুধু পার্থিব জ্ঞানের পথ প্রসারিত হয় সেটা নয়; এ ছাড়াও আরো অনেক প্রচ্ছন্ন জ্ঞানের দুয়ার উন্মোচন করতে সংবাদপত্রের জুড়ি নেই। আগেকার যুগে মানুষ পৃথিবী ঘুরেও যে জ্ঞান অর্জন করতে পারত না, যে জ্ঞানের ধারেকাছে যেতে পারত না বা চিন্তাও করতে পারত না; সেই জ্ঞান এখন ঘরে বসেই মুহূর্তের মধ্যে আয়ত্ত করে নিতে পারে যে কেউই শুধু এই সংবাদপত্রের মাধ্যমে। সংবাদপত্রে যে শুধু দেশ-দশের তথা রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক কিংবা ধর্মীয় অনুশাসনের আলোক ধারাই প্রকাশিত হয়, সেটা কিন্তু একদমই নয়। সংবাদপত্রে সংবাদের পাশাপাশি বহুবিধ জ্ঞানবর্ধক বিষয় ছাপা হয়। কবিতা, গল্প, কার্টুন, রম্য রচনা, উপন্যাস, ছড়া যেগুলো চিত্তবিনোদনে সহায়তা ছাড়াও সাহিত্য চর্চায় যথেষ্ট সহায়তা করে। সংবাদপত্র পাঠের মাধ্যমে একজন সাধারণ মানুষও সর্বোপরি দেশ, জাতি এবং সারা বিশ্বের সব রহস্য সম্পর্কে ধারণা লাভ করতে পারে। সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন কাজের বিজ্ঞপ্তি, পণ্যদ্রব্যের মানের নানাবিধ গুণগানও সংবাদপত্রে উঠে আসে।
সংবাদপত্র বিভিন্ন ধরনের হয়ে থাকে। প্রকাশের কালপরিধি বিবেচনায় সংবাদপত্র দৈনিক, অর্ধসাপ্তাহিক, সাপ্তাহিক, পাক্ষিক, মাসিক ও ত্রৈমাসিক হয়ে থাকে। এ ছাড়াও অনেক পত্রিকা দ্বিমাসিক ও বার্র্ষিক রূপেও প্রকাশ হয়ে থাকে। প্রতিদিন প্রকাশিত সংবাদপত্রকে দৈনিক বলা হয়ে থাকে। দৈনিক পত্রিকায় সংবাদকে প্রাধান্য দিলেও বর্তমানে দৈনিক পত্রিকাগুলোয় দৈনিক সংবাদের পাশাপাশি বিভিন্ন বিভাগ খুলে সাহিত্য চর্চা, শিক্ষা, অর্থনীতি ও ক্রীড়াসংবলিত লেখা ছাপা হয়ে থাকে।
গণতন্ত্রের কথা আসতেই প্রথম উঠে আসে সংবাদপত্র। সংবাদপত্র গণতন্ত্রের সদা জাগ্রত প্রহরী। কোথাও জনস্বার্থ পদদলিত হলে, কোথাও সাধারণ মানুষের স্বার্থের কমতি হলে সংবাদপত্র তার নির্ভীক কণ্ঠে সোচ্চার হয়ে উঠতে একটুও দ্বিধা করে না। জেগে ওঠে ন্যায়ের কঠিন মূর্তি হয়ে। জনগণের স্বার্থে, দেশের কল্যাণের কথা চিন্তা করে সাধারণ মানুষের মুখের কথা, জনমত ও আক্ষেপ তুলে ধরে সংবাদপত্র। এবং গণতন্ত্রের বিরুদ্ধ শক্তিকে অপসারিত হতে বাধ্য করে।
সংবাদপত্রের আদর্শের কথা বলতে গেলে শেষ হওয়ার নয়। সংবাদপত্রের প্রধান ও উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হচ্ছে সত্যকে সত্য ও মিথ্যাকে মিথ্যা হিসেবে দেশবাসীর সামনে তুলে আনে; মেলে ধরে আসল সত্যকে। চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় মিথ্যাকে। একটি আদর্শ সংবাদপত্রকে একটি আদর্শ শৃঙ্খলে আবদ্ধ থাকতে হয়। নীতিতে অনড়, সত্য প্রকাশে সঙ্কোচহীনতা সংবাদপত্রের অন্যতম আদর্শ। দেশের উন্নয়ন ও জনগণের কল্যাণের কথা চিন্তা করে সংবাদপত্র এক দিকে যেমন অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করবে, ঠিক একইভাবে ন্যায়নীতি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে সব সময় সংগ্রাম করে যাবে। সংবাদপত্রকে হতে হবে নির্ভীক ও অকপট। ক্ষুদ্র স্বার্থ বিবেচনা না করে দেশের কথা চিন্তা করে কাজ করে যেতে হবে।
আস্থাহীন সংবাদপত্রের কোনো দাম নেই। সংবাদপত্রকে অবশ্যই সাধারণ জনগণের আস্থা অর্জন করতে হবে। কেননা, সংবাদপত্র একটি ভুল সংবাদ ছাপানোর মাধ্যমে গোটা দেশ তথা সারা বিশ্বতেও তালগোল পাকিয়ে দিতে পারে মিছামিছি, বিভ্রান্তির মধ্যে ফেলে দিতে পারে দেশের শান্তিপ্রিয় সব মানুষকে। দাঙ্গা-হাঙ্গামাসহ খুনখারাবি এমনকি ধ্বংসাত্মক পরিস্থির দিকে নিয়ে যেতে পারে একটা মিথ্যা কিংবা ভুল ভিত্তিহীন সংবাদ। আর তাই আদর্শ সংবাদপত্রকে সব সময় হতে হবে সত্যপ্রিয় ও নিরপেক্ষ।
আজকের সমাজে সংবাদপত্রের প্রয়োজনীতা বলে শেষ করার নয়। সংবাদপত্র জাতিকে অনুপ্রেরণা দেয়। সত্যের পথ অনুসরণে উৎসাহিত করে, মিথ্যার বিরুদ্ধে বিরতিহীন লড়াই করতে সাহস জোগায়, মানুষের ভেতরে ডুবে থাকা সুপ্ত প্রতিভা জাগ্রত করে কল্যাণের দিকে এগিয়ে নিয়ে যায়। যুগের পর যুগ ন্যায় ও সত্যকে পাথেয় করে জনসাধারণকে নানা বিষয়ে শিক্ষার আলো দান করার গুরুদায়িত্ব সংবাদপত্র বহন করে চলছে অবিরত। ভবিষ্যতেও সংবাদপত্রের ক্ষুদ্র পথচলা আরো সুন্দর ও গৌরবোজ্জ্বল হয়ে উঠুক। নিরপেক্ষ ও ন্যায়ের আদর্শে উজ্জীবিত হয়ে উঠুক সব দেশের সব সংবাদপত্র।

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • প্রফেসর ডা. এম এ রকিব
  • রূপে রূপে কুসংস্কার মাওলানা
  • ব্যাংকিং খাত নিয়ে শঙ্কা
  • নৈতিকতার বিপর্যয় : চাই কঠিন সাজা
  • স্থাপত্য বিভাগের আলোকোজ্জ্বল এক দশক
  • বর্নিল আয়োজনে স্থাপত্যকর্মের প্রদর্শনী
  • বই পড়ার মাধ্যমে অসহনশীলতা দূর হতে পারে
  • ধনির সম্পদে গরিবের অধিকার
  • দারিদ্র্য ও বেকারত্ব থেকে মুক্তির পথ
  • শীত গ্রীষ্মে বাঙালির জীবন
  • কবিতা
  • রেসিপি
  • কুয়াশা ভূত
  • ইসলামের প্রচার ও আল্লামা ফুলতলী
  • প্রসঙ্গ : রাষ্ট্র ও সরকার
  • আসুন শীতার্ত মানুষের পাশে দাঁড়াই
  • সামরিক সহায়তা স্থগিত ও পাক-মার্কিন সম্পর্ক
  • জাতীয় উন্নয়ন ও প্রাসঙ্গিক দৃষ্টিভঙ্গি
  • সুশিক্ষা ও মানবিক মূল্যবোধ
  • ব্যাংকিং খাতের গতিশীলতা
  • Developed by: Sparkle IT