মহিলা সমাজ

পুরুষতন্ত্রের কোনো বর্ডারলাইন নেই

অদিতি দাস প্রকাশিত হয়েছে: ১৯-১২-২০১৭ ইং ০১:২১:৪৯ | সংবাদটি ২৭৭ বার পঠিত

বছর দেড়েক আগের কথা। যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটিতে যৌন সহিংসতার শিকার হন এক নারী। বিশ্ববিদ্যালয়ের সেরা সাতারু ব্রুক টার্নার ছিলেন এই কলঙ্কিত ঘটনার হোতা। যিনি বিশ্ববিদ্যালয়টির শিক্ষার্থীও বটে। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে, তিনি চৈতন্যহীন অবস্থায় ওই নারীকে ধর্ষণ করেছেন। বিচার প্রত্যাশী নারী ধর্ষক ব্রুক টার্নারের উদ্দেশ্যে এক দীর্ঘ বিবৃতি আদালতের মাধ্যমে পেশ করেন। সেখানে যৌন সহিংসতার শিকার হওয়া এবং এরপর বিচার চাইতে গিয়ে নিদারুণ এক মানসিক যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে যাওয়ার বর্ণনা ছিলো।
সেদিনই অনলাইনে বিবৃতিটি প্রকাশ হয়। শুধু বাজফিডেই ৪ মিলিয়ন বা ৪০ লাখ পাঠক লেখাটি পড়েন। মর্মস্পর্শী বিবৃতিটি পৃথিবীব্যাপী ঝড় তুলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে।
অজ্ঞান ওই নারীকে ধর্ষণের অভিযোগে ব্রুক টার্নারকে ছয়মাসের কারাদন্ড দেয়া হয়। এ সময় তাকে পর্যবেক্ষণে রাখারও নির্দেশ দেয়া হয়।
আমেরিকার মত উন্নত বিশ্বের একটি দেশে ধর্ষণের দায়ে ধর্ষণকারীর মাত্র ছয় মাসের জেল! বিষয়টি খুব অবাক করার মত। আইনের ফাঁকফোঁকর তাহলে সব জায়গায়ই আছে! নাকি তা বিশেষ বিশেষ ব্যক্তির বেলায় প্রযোজ্য?
এই রায় আসলে ধর্ষণের মত বর্বরোচিত ঘটনাকে কেবল প্রশ্রয়ই দেবে বলে মনে করা হচ্ছে। আদালতের এই রায়ের বিরুদ্ধে তাই প্রতিবাদে সোচ্চার হয়েছেন ব্লগ ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারকারীরা। জো ব্রাউন নামে এক লেখকের মন্তব্য, ‘এই বিবৃতির মতো শক্তিশালী কোন লেখা আমি আগে পড়িনি। ব্রুক টার্নারকে প্রতিদিন একবার করে তা পড়ানো উচিত।’
পুরো বিবৃতি জুড়ে বর্ণিত লোমহর্ষক বর্ণনা যে কাউকে ব্যাথিত করবে, সন্দেহ নেই। তবে ঘটনার বর্ণনা যতটা আহত করে, তার চেয়ে কয়েকগুণ বেশি কষ্ট দেয় ধর্ষক টার্নারের বাবা ড্যান টার্নারের মন্তব্য। ছেলের শাস্তি প্রসঙ্গে তিনি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লিখেছেন, ‘মাত্র ২০ মিনিটের কাজের জন্য অনেক বেশি মূল্য দিতে হচ্ছে ব্রুককে’। তাঁর এমন মন্তব্য ‘চোরের মার (পড়তে হবে চোরের বাবার ) বড় গলা’র উৎকৃষ্ট উদাহরণ হতে পারে। পুত্র দ্বারা ধর্ষণের মতো একটি জঘন্য অপরাধের পর একজন বাবার এ রকম মন্তব্য আমাদের হতবাক করে, বিস্মিত করে। সাথে সাথে মনে এই প্রশ্নেরও উদ্ভব হয়, ‘আরো কত বেশি সময় ধরে ধর্ষণের মতো অপরাধ চালিয়ে গেলে বাবার (বাবা নামের কলঙ্ক) কাছে মনে হবে পুত্রের শাস্তির মাত্রা যথার্থ? তথাকথিত সভ্য ও মানবতার বুদ বুদ তোলা আমেরিকার মতো দেশে এখনও পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা কত প্রকটভাবে রয়ে গেছে, এই মন্তব্য তাই যেন চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়। যদিও পুত্রের পক্ষ নিয়ে তার এমন নির্লজ্জ মন্তব্যের পোস্ট ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়ে। তবে সন্দেহ নেই, একজন মানুষের নৈতিক দৃঢ়তা গড়ে দেয় পরিবার। কোন পরিবারে বাবা যদি ব্রুকের বাবার মতো মানসিকতার হন, তাহলে তার সন্তান স্ট্যানফোর্ড কেন, অক্সফোর্ডে পড়লেও প্রকৃত মানুষ হয়ে উঠতে পারবে না। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা তার ভেতরের পশুত্বকে পরাস্ত করতে পারবে না। ব্রুক তো তারই জ্বলন্ত উদাহরণ। পাশাপাশি ঘটনার অন্যতম চরিত্র দুই গার্ড প্রমাণ করেছেন প্রকৃত মানুষ হতে হলে খ্যাতিমান বিশ্ববিদ্যালয়ের খ্যাতিমান শিক্ষার্থী হওয়া জরুরি নয়। ঘটনার শিকার নারী তাঁর বিবৃতিতে তাই গার্ডদের শ্রদ্ধা জানিয়ে লিখেছেন, ‘শেষ পর্যন্ত ওই দুই গার্ডকে আমার সশ্রদ্ধ ধন্যবাদ, যারা আমাকে বাঁচিয়েছেন। এই গল্পের প্রকৃত বীর তারাই।’
আমেরিকার মতো দেশগুলোতেও আইনকানুন কেমন পুরুষতান্ত্রিক রয়ে গেছে তার প্রমাণ এই ঘটনার বিচারিক প্রক্রিয়া। বিশ বছর বয়সের ব্রুকের বিরুদ্ধে তিনটি গুরুতর অপরাধের অভিযোগ থাকলেও পূর্বে কোন অপরাধে জড়িত থাকার রেকর্ড না থাকায় এবং চারিত্রিক সুনামের কারণে শাস্তি কমে আসার আশঙ্কা করা হয়। সে ক্ষেত্রে ছয় মাসের কারাদন্ড দেয়া হলেও হয়ত তাকে কারাভোগ করতে হবে মাত্র তিন মাস।
বিবৃতিটির শেষের দিকের কয়েকটি লাইন এখানে আলাদাভাবে উল্লেখ করতে চাই- ‘এবং আমি সবকিছুর পর বলতে চাই, এই পৃথিবীর মেয়েরা, তোমাদের সঙ্গে আমি আছি। রাতে যখন তোমাদের একা লাগবে, আমি তোমাদের সঙ্গে থাকবো। অন্যরা যখন তোমাদের সন্দেহ করবে, উড়িয়ে দেবে, আমি তোমাদের সঙ্গে থাকবো। আমি সর্বত্র তোমাদের জন্য, তোমাদের সঙ্গে লড়াই করবো। কখনওই যুদ্ধ বন্ধ করা যাবেনা।
বাতিঘর কোথাও যায়না। একা দাঁড়িয়ে আলো দিয়ে যায়। আমি জানি, সব নৌকা আমি বাঁচাতে পারবো না, কিন্তু আমার বিশ্বাস, আজকের এই বয়ান কিছুটা হলেও আলো পৌঁছাবে।
মেয়েরা, তোমরা সুন্দর, সম্মানিত, আত্মবিশ্বাসী ও অমূল্য। তোমরা শাহসী ও শক্তিশালী। কেউ এ শক্তি ছিনিয়ে নিতে পারবেনা। আমি তোমাদের সঙ্গেই আছি, ধন্যবাদ।’
যৌন সহিংসতার শিকার নারীর বিবৃতি থেকে জানা যায়, তাঁকে এবং তাঁর পরিবারকে কত ভয়াবহ পরিস্থিতি পার করতে হয়েছে এবং হচ্ছে। অথচ অপরাধ সংঘটিত হওয়ার সময় ধর্ষিতা ও ধর্ষণকারী দু’জনে মাতাল ছিলেন এমন অজুহাতে গুরুতর অপরাধের শাস্তি হিসেবে ধর্ষণকারীকে মাত্র ছয় মাসের কারাভোগ দেওয়া হয়। এটা কতটা যৌক্তিক তা নিয়ে স্পষ্টতা, প্রশ্ন থেকেই যায়।
ধর্ষণের শিকার যেকোন মেয়ে বা নারীকে চরম খারাপ পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে যেতে হয়। যেসব পুরুষরা জোর করে কারো সাথে যৌন সম্পর্ক করে, বা ভীড়ের মধ্যে কিংবা নিরিবিলি স্থানে সুযোগ পেলেই মেয়েদের শরীরের বিভিন্ন স্থানে স্পর্শ করে, তাদের মানসিক বিকারগ্রস্ত ছাড়া আর কিছু মনে হয় না। কারণ এই মুহূর্তের স্পর্শ তাদের কতটা আনন্দ বা তৃপ্তি দেয়। আদৌ দেয় কিনা, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ থেকে যায়। তাদের প্রতি তীব্র ঘৃণা আর করুণা ছাড়া আর কী-ই বা অনুভূতি হতে পারে। এরকম বিকৃত রুচির কাজ তাদের কতটা আনন্দ দেয় তা নিয়ে সন্দেহ থাকলেও যারা এ ধরণের ঘটনার শিকার হন তাদের জন্য বিষয়টি যে দুঃখের ও অপমানজনক তাতে কোন সন্দেহ নেই। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, আমাদের মতো তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর মানুষকে প্রতিনিয়ত জীবন সংগ্রামের মধ্যে দিয়ে যেতে হয়। নারীদের বেলা বিষয়টি আরো কঠিন। নানা মানসিক চাপ নিয়ে চলতে হয়। দেখা যায়, সপ্তাহে একদিনও মন ভালো রাখা দায় হয়ে দাঁড়ায়। এর মাঝে রাস্তাঘাটে উত্যক্ত বা ইভটিজিংয়ের শিকার হলে মনটা মুহূর্তে বিষিয়ে যায়, বেদনায় নীল হয়। যারা এরকম নোংরা কাজ করে তারা হয়তো মুহূর্তের আনন্দ পায়, পরমুহূর্তে ভুলে যায় বিষয়টি। কিন্তু যিনি ঘটনার শিকার তার বেলা বিষয়টি ভিন্ন। হয়তো এই মন খারাপের বিষয়টি দূর হতে বহু সময় লেগে যায়।
মূল প্রসঙ্গে আবার ফিরি, সবকিছুর পর ধর্ষণের শিকার নারীর দৃঢ় মনোবলকে স্যালুট জানাই। বিবৃতিটি পড়ে যখন চোখ ভিজে আসছিল তখন বারবার মনে হচ্ছিল, এই বিবৃতিটি মনোবল হারানো যে কোন মেয়ে বা নারীকে শক্তি জোগাবে। আসলে মেয়ে হয়ে জন্মানোর কারণে প্রতিনিয়ত কত ধরনের সমস্যা ও বিপদের মুখোমুখি হতে হয় তা কেবল ভুক্তভোগীরাই জানেন। আর এতে প্রশ্রয় যোগায় এই বৈরি সমাজ। তাই বলে কোন অবস্থায়ই হেরে গেলে চলবে না। কারণ হেরে গেলে অপরাধীদেরই জয় হয়। এই বিবৃতিটি তাই হয়ে উঠুক নারীদের অনুপ্রেরণার একটি অংশ। আর যারা এ ধরনের অপরাধ করেছেন বা করছেন তাদের মধ্যে জেগে উঠুক অনুশোচনাবোধ। কমে আসুক এ ধরনের ঘটনা।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT