ইতিহাস ও ঐতিহ্য

পার্বত্য তথ্য কোষ

প্রকাশিত হয়েছে: ২০-১২-২০১৭ ইং ০০:৫৩:১৮ | সংবাদটি ৭৮ বার পঠিত


[পূর্ব প্রকাশের পর]
৫। শিক্ষাগত উচ্চ যোগ্যতার বলে, প্রধান তিন সম্প্রদায় চাকমা মারমা ও ত্রিপুরাদের কর্মসংস্থানের হারও বেশি। কোটা ও সরকারি আনুকূল্যে তারা সর্বাধিক সুবিধা প্রাপ্ত লোক। এরশাদ আমলে কর্মসংস্থান ও নিযুক্তি বন্ধ থাকা সত্ত্বেও সরকার ও স্থানীয় সেনা কর্তৃপক্ষের আনুকূল্যে বিভিন্ন সংস্থার লোভনীয় পদে, কোনো পরীক্ষা ও প্রতিযোগীতা ছাড়াই ১৮০০ উপজাতীয় যুবক যুবতীর কর্ম সংস্থান হয়েছে। স্থানীয় পরিষদ ও উন্নয়ন বোর্ডেও অনেকের নিযুক্তি ঘটেছে। এই নিয়ম বহির্ভূত আনুকূল্যের লক্ষ্য হলোঃ তাদের মন জয় করা ও বিদ্রোহী বাহিনীতে যোগদান থেকে বিরত রাখা। অথচ বাস্তবে তার কিছুই হয়নি। (তাং- রোববার ১৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪০৬ বাংলা, ৩০ মে ১৯৯৯ খ্রি./ দৈনিক গিরিদর্পণ, রাঙামাটি)
৬। পার্বত্য চট্টগ্রাম মূলতঃ খাস পাহাড় ও বনাঞ্চলের সমষ্টি। জনবসতি অঞ্চল রূপে এটি কখনো বিবেচিত ছিলো না। মোগল আমলে এখানে জুম নোয়াবাদ নামীয় এক অস্থায়ী বন্দোবস্তি ব্যবস্থার আওতায়, পূর্ব সীমান্তবর্তী মুক্তাঞ্চলবাসী কুকি নামীয় উপজাতীয় জুমিয়াদের, বর্ষা মওসুমে কিছু এলাকায়, কার্পাস তুলা চাষ ও সরবরাহের শর্তে, জুম চাষ করতে দেওয়া হতো। চাষ ও ফসল কাটা শেষে তারা নিজেদের মুক্তাঞ্চলে ফিরৎ চলে যেতো। তখন বর্তমান উপজাতিদের কারোরই আগমন ও অধিবাস গড়ে উঠেনি। বন সম্পদের ব্যাপক বিস্তৃতির কারণে তা সংরক্ষণের কোনো প্রয়োজনও ছিল না। বরং আবাদ ও বসতি বৃদ্ধির প্রতি সরকারের আগ্রহ বেশি ছিলো এবং তাই ছিলো রাজস্ব আয় বৃদ্ধির সূত্র। তবে বসতিহীনতার এক পর্যায়ে ব্রিটিশ আমল এসে যায় এবং তখন আরাকানে, চাকমা ও মগ সম্প্রদায়ের পরস্পরের মাঝে সংঘর্ষ ঘটে। যদ্দরুণ নির্যাতিত চাকমা সম্প্রদায় আরাকান ত্যাগ করে বাংলাদেশী সীমান্ত ভূক্ত বন ও পাহাড়ে এসে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়। পরে বার্মার আভা রাজ্য কর্তৃক আরাকান বিজিত হলে, স্থানীয় প্রতিবাদী মগেরাও দেশ ত্যাগ করে, এ পারে আশ্রয় গ্রহণ করে। ঐ আরাকানী উদ্বাস্তু ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে নিযুক্ত ব্রিটিশ কর্মকর্তা মি. ¯িœরিল কক্স, এখনো শহর কক্সবাজার নামের ভিতর স্মৃতি হয়ে আছেন।
পরে শরণার্থী চাকমা ও মগদের সাথে আরো ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র উপজাতীয় লোকেরা এসে যোগদান করে। বন পাহাড় সংরক্ষণের কোনো প্রয়োজন না থাকায়, বিপুল সংখ্যক শরণার্থী জুমজীবি উপজাতীয়দের অবাধে বসতি স্থাপন ও জুম চাষের দ্বারা জীবিকা সংগ্রহে উৎসাহিত করা হয়। তারা বার্মার বিরুদ্ধে ব্রিটিশ সহযোগী যোদ্ধা রূপেও মূল্যায়িত হয়, যদ্দরুণ সহজে অভিবাসীর মর্যাদা লাভ করে। পরে বন ও পাহাড় মূল্যবান ও সমৃদ্ধ রাজস্ব সূত্র রূপে প্রতিভাত হলে ১৮৬৫ সালে আইন নং ৭ ধারা নং ২ জারি ও তা ফেব্রুয়ারি ১৮৭১ সালে কলকাতা গেজেটে প্রকাশ করে, সরকার পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রায় সমুদয় অঞ্চলকেই বনরূপে ঘোষণা দান করেন। পরবর্তীতে ১২২০.৯৬ বর্গমাইল অঞ্চল নিয়ে গঠিত হয় সংরক্ষিত বনাঞ্চল এবং ৩১৬৬ বর্গমাইল নিয়ে গঠিত হয় অশ্রেণিভূক্ত রাষ্ট্রীয় বনাঞ্চল বা ইউ এস এফ। অবশিষ্ট ৬৯৬.০৪ বর্গমাইল মাত্র বসতি বা আবাদী অঞ্চল রূপে স্বীকৃতি পায়, যার ২৫৬ বর্গমাইল এলাকা পরে কর্ণফুলী হ্রদের জন্য অধিগ্রহণ করা হয়। এবার শুভঙ্গরের ফাঁকি এটাই যে ৩১৬৬ বর্গমাইল ব্যাপ্ত অশ্রেণিভূক্ত রাষ্ট্রীয় বনাঞ্চলটি, এখন বসতিমুক্ত নেই। এখন এটি ভিন্ন মৌজাধীন অঞ্চল ও জুম ক্ষেত্র, যার তত্ত্বাবধায়ক কর্তৃপক্ষ হলেন তিন উপজাতীয় সর্দার ও তিনশত তেয়াত্তর জন মৌজা প্রধান বা হেডম্যান, যারা জেলা প্রশাসক কর্তৃক নিযুক্ত। তারা সরকারের তত্ত্বাবধায়ক নিযুক্তিকে অবজ্ঞা করে এটাকেই বলেন উপজাতীয় ভূমি অধিকার। সরকারের উদার আচরণের ভীষণ কুফল হলোঃ তারা অবাধে খাস পাহাড় ও বনের প্রাকৃতিক সম্পদের ভোগ ব্যবহারের নিজস্ব বাণিজ্যিকরণ ও ধ্বংস সাধনে লিপ্ত। জুমের দ্বারা বন, বন্যপ্রাণী ও পরিবেশ ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। কাজটি বেআইনী হলেও তা কখনো আমলে নেওয়া হয় নি। এখন সংগঠিত উপজাতীয় শক্তি এমনই বেয়াড়া যে অপমান, বদলী ও প্রাণের ভয়ে, সরকারি কর্মকর্তা, কর্মচারী ও বাহিনী সদস্যরা সর্বদা তটস্থ থাকেন। জোতের পারমিটের নামে সংরক্ষিত বনাঞ্চলের মূল্যবান কাঠ সম্পদ আহরিত হচ্ছে আর বিনা শুল্কে পাচার হয়ে যাচ্ছে। অশ্রেণিভূক্ত রাষ্ট্রীয় বনাঞ্চল তো উপজাতিদের সামাজিক জোতভূক্ত বাগানেই পরিণত হয়ে গেছে। তার গাছ, বাঁশ, বল্লি, জ্বালানী কাঠ, বেত, ছন, লতা, পাতা ইত্যাদি অবাধে আহরিত হয় ও বাজার হাটে প্রকাশ্যে বিকোয়। সরকার এগুলোর শুল্ক লাভ থেকেও বঞ্চিত। অবাধ গৃহস্থালী ব্যবহারের অধিকারের মানে তো খরিদ বিক্রি ও বাণিজ্য করা নয়। এগুলোকে পণ্য অনুদান ধরা হলে, প্রতি উপজাতীয় পরিবার বার্ষিক লক্ষাধিক টাকার আর্থিক সুবিধা ভোগ করে থাকেন, যা দৃশ্যতঃ অনুদান বলে অনুভূত নয়।
বৈষয়িক ও আর্থিক সুযোগ সুবিধার অতিরিক্ত এই মূল্যবান আনুকূল্য অবহেলা যোগ্য নয়। তজ্জন্য তাদের মাঝে স্বীকৃতি ও কৃতজ্ঞতাবোধ না থাকাটাও বিস্ময়কর।
৭। সরকারি অর্থে পরিচালিত উন্নয়ন বোর্ড ও জেলা পরিষদগুলোর উন্নয়ন কার্যক্রম দুর্নীতিগ্রস্ত হলেও, তাতে দুর্গম ও বিচ্ছিন্ন অঞ্চলগুলো পর্যন্ত সড়ক ও নৌ যোগাযোগে সমৃদ্ধ। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য সেবা প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত বিস্তৃত। প্রাতিষ্ঠানিক নির্মাণ কাজের ব্যাপকতা সর্বত্রই দৃশ্যমান। স্কুল, কলেজ, বৌদ্ধ মন্দির, কমিউনিটি সেন্টার, পালি টোল, সেচ নালা, বন্যা প্রতিরোধ বাঁধ কারিগরী ও শিল্প প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, খেলার মাঠ, টিউবওয়েল, স্বাস্থ্য সম্মত পায়খানা, সিঁড়িঘাট, বাজার হাট ইত্যাদির উন্নয়ন ও নির্মাণে এই সংস্থাগুলো অত্যন্ত তৎপর। উন্নয়ন ক্ষেত্রের অভাবে ভবিষ্যতে হয়তো ব্যক্তিগত ঘর বাড়ি নির্মাণ, ব্যবসা ও শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়া, বিনিয়োগ সহায়তা দান ইত্যাদির উদ্যোগের প্রতিও এ প্রতিষ্ঠানগুলো এগুবে। লক্ষ্য হবে ব্যাপক জনকল্যাণ ও জীবন মানের উন্নয়ন।
এই গঠনমূলক উদ্যোগ গ্রহণ ও বাস্তবায়ন অবশ্য যোগ্য ও সেবা ধর্মী নেতৃত্বের উপস্থিতি আবশ্যক, নতুবা এগুলো হয়ে যেতে পারে অপব্যয়ের ক্ষেত্র ও লুটপাটের আখড়া। ক্ষমতার পাদ পীঠে, স্বার্থান্ধ লোকের আগমন অবশ্যই ঘটে। তাদের প্রধান লক্ষ্য হয় মাল পানি কামান ও আখের গোছান। তা না হয়ে উন্নয়ন বোর্ড আঞ্চলিক ও জেলা পরিষদ সমূহের মাধ্যমে যে বিপুল অংকের উন্নয়ন বিনিয়োগ হয়েছে, তার যথাযথ সদ্ব্যবহার হলে, পার্বত্য চট্টগ্রামের চেহারা আরো সুন্দর ও স্বাস্থ্যকর হতো। গরীব দেশের টাকা, ততোধিক গরীব অঞ্চলের ভাগ্যোন্নয়নে যথাযথভাবে ব্যয়িত না হওয়া এবং চাটার দলের পেটে যাওয়া, বড়ই দূর্ভাগ্যের বিষয়। অনেকে খেদ করে বলেন, পার্বত্য অঞ্চলের উন্নয়নে যত টাকা ব্যয় হয়েছে, তাতে কর্ণফুলী হ্রদও ভরে যেতো। অথচ উন্নয়ন তত দৃশ্যমান নয়। অধিকাংশ চাটার দলের পেটে গেছে। কেউ করেছে ছিনতাই ও চাঁদাবাজী। কেউ বসিয়েছে ভাগ। ঘুষ, কমিশন, সালামী তো আছেই। এটা চাটার দলে পাহাড়ী অপাহাড়ী সবাই যুক্ত। [চলবে]

শেয়ার করুন
ইতিহাস ও ঐতিহ্য এর আরো সংবাদ
  • পার্বত্য তথ্য কোষ
  • হত্যাকারির নাম বলা যাবে না
  •  প্রযুক্তির অপব্যবহারে বিপন্ন নারী-শিশু ও যুবসমাজ
  • মুক্তিযুদ্ধে লাউয়াই
  • সুবিধাবাদীদের পরিণতি
  • পার্বত্য সংকটের মূল্যায়ন
  • ঝরনা কলম : আজ বিলুপ্তপ্রায়
  • মুক্তিযুদ্ধে পুণ্যভূমি সিলেটের সূর্যসন্তানরা
  • মমতাজের টুকরো টুকরো লাশ
  • গ্রাম বাংলার ছনের ঘর
  • পার্বত্য সংকটের মূল্যায়ন
  • স্মৃতিতে এমসি কলেজ
  • যেভাবে নামকরণ হলো ইছামতি
  • বারঠাকুরী নামকরণের ইতিকথা
  • পার্বত্য তথ্য কোষ
  • মুক্তিযুদ্ধে ছাতক : ইতিহাসের এক স্মরণীয় অধ্যায়
  •   যেকোনো মূল্যে ঋণখেলাপি সংস্কৃতি বন্ধ করতে হবে
  • পার্বত্য তথ্য কোষ
  • পার্বত্য তথ্য কোষ
  • বাঙালির রক্তস্নাত ঐতিহাসিক ভাষা আন্দোলন
  • Developed by: Sparkle IT