ইতিহাস ও ঐতিহ্য

সিলেটের শীতল পাটি

ইছমত হানিফা চৌধুরী প্রকাশিত হয়েছে: ২০-১২-২০১৭ ইং ০০:৫৩:৪২ | সংবাদটি ৭৭ বার পঠিত

প্রত্যেক সিলেটি মানে, জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত যে ছোঁয়া শরীর জুড়িয়ে থাকে তা হচ্ছে আমাদের শীতল পাটি। স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে শীতল পাটি কি? আয়েশি আরামের গ্রহণযোগ্য মাদুর বা ম্যাটস হচ্ছে সিলেটের ঐতিহ্যবাহি শীতলপাটি। এই শীতল পাটির মূল উপকরণ হচ্ছে এক ধরনের পাতা জাতিয় উদ্ভিদের কান্ড। কিংবা বেত জাতিয় উদ্ভিদ। এই সমান গোত্রের উদ্ভিদ থেকে প্রথম কাগজ প্রস্তুত করা হয়েছিল। ‘মুর্তা নামের পাতা জাতিয় এই উদ্ভিদ, মোটামুটি সিলেট অঞ্চলের সব জায়গায় জন্মে। অপেক্ষাকৃত নিচু জমিতে এই উদ্ভিদ জাতিয় গাছ জঙ্গলের মতো চাষ করা হয়। অনেকটা বাঁশের মতো, একবার রোপন করলে তা থেকে মূলের মাধ্যমে বছরের পর বছর গাছ জন্মাতে থাকে। এর পাতা বাঁশের পাতার চেয়ে একটু বড়। এই পাতা দিয়ে বাঁশি বানিয়ে যদি সুর তুলে তবে তা সবাইকে শুধু আকৃষ্টই করে না, রহস্যের ধু¤্রজালে আটকে রাখে সারাক্ষণ।
যদিও এক সময় বিভিন্ন খাল-বিল ও লোকালয়ের পাশে প্রচুর মুর্তা পাওয়া যেত। কিন্তু বর্তমানে মুর্তা দুঃস্প্রাপ্য হয়ে উঠেছে। এই গাছ খুব সরু হয়। যা ব্যবহারের পরিপক্কতা পেতে, কিংবা ব্যবহার উপযোগী হতে, একটি চারাগাছ এক বছর বয়সি হতে হয়। পরিপক্ক গাছ কেটে আট, দশদিন পানিতে ডুবিয়ে রাখার পর, তা শুকিয়ে মুর্তা গাছের ছাল থেকে হালকা বেত বা আঁশ তৈরি করা হয়। দক্ষ কারিগররা নিপূণ হাতে এই বেত তৈরি করেন। কোন প্রকার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা বা প্রশিক্ষণ ছাড়া, শুধু বংশ পরম্পরায় প্রাপ্ত অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে নিপূণ হাতে এই মুর্তা গাছের ছাল বা বাকল থেকে বেত তৈরি করেন। পরে এই বেতগুলো বিভিন্ন প্রকার রঙে ডুবিয়ে শিল্পীরা দক্ষ হাতে বুনন করেন একের পর এক শীতল পাটি। আগেকার দিনে এই রঙ এর ক্ষেত্রে ছিল অনেক পরিশ্রম বিশেষভাবে প্রস্তুত রং পানিতে মিশিয়ে সেই পানির মধ্যে যে বেতে রঙ দেয়া হবে তা চুবিয়ে রাখতে হত। এর আগে বেতগুলোকে ভালভাবে পরিস্কার করে এর সবুজ পর্দা ফেলে দিয়ে সাদা করা হয়। এই কাজ করতে খুব সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে। যাতে বেত বেশি পাতলা না হয়ে যায়। এই শীতল পাটির বেত প্রস্তুত হয়ে গেলে গ্রামের মেয়েরা পাটি বুনতে বসে যান।
বংশ পরম্পরায় চলে এই কর্ম যা কেমন করে যেন ম্যাজিকের মতো একজনের কাছ থেকে শিখে অন্যজন প্রস্তুত করে নেন শীতল পাটি। এক বেতের উপর আরেক বেত আর আঙ্গুলের স্পর্শ। কোন তার সুতা কিংবা সুই ছাড়া এই শীতল পাটি যখন আট, দশ ফুট লম্বা এবং চার ফুট পাঁচ ফুট মাপে তৈরি এর ছোট কিংবা এর চেয়ে বড় মাপে, এই নকশাও সৃষ্টি হয় শুধু যিনি বানাচ্ছেন সেই কারিগরের মনের তুলির রঙ ডিজাইন, ফুটে উঠছে বেতের পরে বেতের বুনন এক নামতার মতো বুননে। শুধু কি শীতলপাটি এভাবে তৈরি হচ্ছে হাতপাখা, ওয়ালম্যাট, বক্ত, আর কত কি, অনেক কিছু বিলুপ্ত হয়ে গেছে টিকে আছে শীতল পাটি।
বাংলাদেশের গর্ব ঢাকার বিখ্যাত মসলিনের মতো শীতল পাটিও এক সময় ছিল সৌন্দর্য ও শিল্পের প্রতিক। শীতল পাটি হরেক রকমের হয়ে থাকে। এর মধ্যে পয়সা, শাপলা, সোনামুড়ি, জয়পাটি, টিক্কা, সিকি, লাল গালিছা, আধুলি, মিহি প্রভৃতি পাটির কদর ছিল বেশী। কথিত আছে মিহি পাটি এমনভাবে মিহি ও পিচ্ছিল করে তৈরি করা হতো যে একটা পিঁপড়া পর্যন্ত এর উপর দিয়ে হেঁটে যেতে পারতো না। এই শীতল পাটি দিয়ে নামাজের জায়নামাজ প্রস্তুত করা হয়। যেখানে মসজিদের মিনারের আদলে কারুকাজ স্থান পায়। শীতল পাটিতে তাজমহলের ছবিও আঁকতে দেখেছি আবার বাংলাদেশের মানচিত্রের ছবিও আঁকতে দেখেছি। বৃটিশ আমলে রাণী ভিক্টোরিয়ার প্রাসাদে বালাগঞ্জের শীতল পাটি আভিজাত্য হিসাবে সংরক্ষণ করে রাখা হয়েছিল। বিয়েতে নতুন বউকে নতুন শীতল পাটিতে বসানো হত, আবার বিয়ের দিন নতুন জামাই বর সাজতো, উঠানে শীতল পাটি বিছিয়ে। বাড়িতে নতুন জামাই কিংবা পরম কাক্সিক্ষত অতিথি এলে শীতল পাটি বিছিয়ে বসতে দেওয়ার রেওয়াজ ছিল। কেউ অপারগ হলে লজ্জায় পড়তে হতো। শীতলপাটি একসময় হয়ে ওঠে এই অঞ্চলের সভ্যতার মাপকাঠি। কোন বাড়িতে যদি বিয়ের উপযুক্ত মেয়ে থাকে, আর মুর্তার জঙ্গল থাকে, তবে লোকে অহংকার করে বলতো এই বাড়িতে থেকে বউ নিলে (আদি পাটি) শীতল পাটি বানাতে পারবে। বৃটিশ-পাকিস্তান আমলেও শীতল পাটির কদরের কমতি ছিল না। কথিত আছে ভারতবর্ষে এসেছিলেন এমন বাহাদুরি প্রমাণ হিসেবে ভিনদেশিরা ঢাকার মসলিনের পাশাপাশি সিলেটের শীতল পাটি নিয়ে যেতেন স্মৃতি হিসেবে। প্রচলিত আছে মৌলভীবাজারের দাসের বাজারের রূপালী বেতের শীতলপাটি মুর্শিদ কুলী খাঁ স¤্রাট আওরঙ্গজেবকে উপহার দিয়েছিলেন। অতি প্রাকৃতিক এই শীতল পাটি স্বর্ণপদক লাভ করে ১৯০৬ সালে কলকাতার কারুশিল্প প্রদর্শনীতে। সেই পাটির কারিগর ছিলেন বালাগঞ্জের যদুরাম দাস। ১৯১১ সালে বিশ্বের কারু শিল্পের এক প্রদর্শনী ইতালীর রোমে অনুষ্ঠিত হয়। সেই প্রদর্শনীতে রাজনগরের বিল  বাড়ী গ্রামের মনিন্দ্র নাথ এ দেশীয় প্রতিনিধি হিসাবে শীতল পাটি নিয়ে অংশগ্রহণ করে প্রশংসিত হন। ১৯৮২ সালে বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ কারুশিল্পী হিসাবে স্বীকৃতি পান বালাগঞ্জের তেঘরিয়া গ্রামের পবন জয় দাস। এই শীতল পাটির সঙ্গে বাংলাদেশের অনেক ইতিহাস জড়িয়ে আছে। এই শীতলপাটি এবার জাতিসংঘ শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি সংস্থার (ইউনেসকো) নির্বাক সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অংশ।
এক সময় প্রয়োজনের তাগিদে তৈরি এই শিল্প এখন পৃথিবীর এক বিস্ময়। নামের মাঝেই রয়েছে এর গুণ। এই পাটির মূল বৈশিষ্ট্য গরমে ঠান্ডা অনুভূত হয়। কবি, সত্যেন্দ্রনাথ তাঁর ‘খাঁটি সোনা’ কবিতায় শীতলপাটিকে বাংলার মাটির সঙ্গে তুলনা করে বলেছেন-
চন্দনরি গন্ধভরা
শীতলকলা ক্রান্তিহারা
যেখানে তার অঙ্গ রাখি
সেখানটিতেই শীতলপাটি।

শেয়ার করুন
ইতিহাস ও ঐতিহ্য এর আরো সংবাদ
  • পার্বত্য তথ্য কোষ
  • শিতালং শাহ’র গানের ঐতিহ্য
  • দেওবন্দ প্রতিষ্ঠার ইতিহাস
  • পার্বত্য তথ্য কোষ
  • সিলেট অঞ্চলের জলসা : একাল-সেকাল
  • সিলেটের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী
  • ঐতিহ্যের মনিপুরী তাঁত
  • দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের এক সিলেটি বীর সেনানী
  • রেলওয়ে কি হারানো শ্রী ফিরে পাবে যোগাযোগমাধ্যম
  • সিলেটের ঐতিহ্য আর ইতিহাসের অপরূপা এ নদীর নাম সুরমা
  • পার্বত্য তথ্য কোষ
  • বিশ্ব দরবারে সিলেটি শীতলপাটি
  • চুঙ্গা পিঠা : বাঁশ দিয়ে প্রাতঃরাশ
  • কবিতা
  • মুক্তিযুদ্ধে জেনারেল ওসমানী
  • সিলেটি ভাষা ও নাগরী সাহিত্য ধারা
  • লোক সাহিত্যের সমৃদ্ধ জনপদ সুনামগঞ্জ
  • সিলেটের শীতল পাটি
  • পার্বত্য তথ্য কোষ
  • মুক্তিযুদ্ধে বরাক উপত্যকার কবিগান
  • Developed by: Sparkle IT