ধর্ম ও জীবন

মা-বাবার মর্যাদা ও সমাজের বাস্তবতা

মো. জহিরুল আলম শাহীন প্রকাশিত হয়েছে: ২২-১২-২০১৭ ইং ০০:০৪:৫৭ | সংবাদটি ১০০ বার পঠিত

মা-বাবা আমাদের জন্য আল্লাহ তায়ালার বিশেষ নিয়ামত। মা-বাবার মাধ্যমেই মানব সন্তান পৃথিবীতে আসে। মা-বাবা ছাড়া পৃথিবী কল্পনা করা যায় না। পৃথিবীতে যে দুই জন মানুষ বেশি আপনজন এবং বেশি ভালোবাসেন ও আদর সোহাগ করেন তারা হলেন মা-বাবা। আমাদের বিপদাপদে অসুখে-বিসুখে ছায়ারমতো কাছে থাকেন তারা। নিজে খেয়ে না খেয়ে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে তারা সন্তানের ভরন পোষণ করে থাকেন। গর্ভধারিনী মা দীর্ঘ ৯ মাস ১০ দিন অতি কষ্টের সাথে গর্ভে ধারণ করে থাকেন। এসব বিষয়াদি একটু চিন্তা করলেই আমরা বুঝতে পারবো মা বাবা কি জিনিস। মহান আল্লাহ ইবাদতের পরই মা-বাবার মর্যাদা। আমাদের জন্ম দাতা সেই মা-বাবার মর্যাদা কী আমরা দিচ্ছি? বা সমাজে মর্যাদার পরিবেশ কী দেখা যাচ্ছে ? এমন প্রশ্নের জবাব খুঁজতেই গত মাসটির জাতীয় ও আঞ্চলিক পত্রিকায় বিশেষ নজর রাখি। নানা পত্রিকায় মা-বাবাকে নিয়ে মানবেতর জীবন যাপনের করুণ কাহিনীর সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। আমরা অবাক হচ্ছি।
গত ১৯ সেপ্টেম্বর দৈনিক যুগান্তরের দ্বিতীয় পৃষ্ঠায় প্রকাশিত সংবাদটি আমাকে চোখের জলে ভাসিয়েছে। সংবাদটি ছিল বরিশাল জেলার বাবুগঞ্জ উপজেলার ক্ষুদ্রকাঠি গ্রামের বৃদ্ধ মহিলার তিন ছেলে পুলিশ কর্মকর্তা, একমাত্র মেয়ে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক। সেই বৃদ্ধা বর্তমানে ভিক্ষা করে দিন যাপন করেন। ভাগ্যের নির্মম পরিহাস ভিক্ষা করতে গিয়ে পড়ে যায় এবং মেরুদন্ড ভেঙ্গে যায়। ছেলে-মেয়ে কেউ তার খোঁজ খবর নেয় না। বর্তমানে এমনভাবে জীবন যাপন করছেন যে দিনে একবেলা খেলে অন্যবেলার খাবার আর ভাগ্যে জুটে না। ১৫ অক্টোবর দৈনিকের খবর ছেলেরা খাবার দেয় না, তাই ক্ষুধার যন্ত্রণা সইতে না পেরে বিষ খেয়ে মার আত্মহত্যার চেষ্টা। ১৪ সেপ্টেম্বর খবরে প্রকাশ ঘুরতে যাওয়ার নাম করে বৃদ্ধ মাকে রাস্তায় ফেলে যায় পাষন্ড ছেলে। যুগান্তরে প্রকাশিত খবর কোটিপতি সন্তান বাবার মৃত্যুর খবর পেয়ে বলে, আমি ব্যস্ত আছি বাবার লাশটা আঞ্জুমানে মফিদুল ইসলামে দিয়ে দিন। ১৯ অক্টোবর যুগান্তরে প্রকাশ বৃদ্ধা মাকে রাস্তায় ফেলে মেয়ের পলায়ন।
সোনার বাংলাদেশের বৃদ্ধা মা-বাবাদের এ কোন অবস্থা। আমরা কোন সমাজে বাস করছি? শরীরের রক্ত পানি আর জীবন যৌবন মাটি করে সন্তানদের বড় করা মা-বাবারা এত অবহেলিত কেন? সমাজ সংসারে  মা-বাবার মর্যাদার শিক্ষা কী সমাজ থেকে মুছে যাচ্ছে? সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ ও তার রাসূলের শিক্ষার পথ থেকে কী আমরা মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছি? আধুনিকতার নাম করে কিছু কিছু পরিবার শহর জীবনের স্বাদ উপভোগ করতে যখন ব্যস্ত তখন বৃদ্ধ মা-বাবা ঘরের কোণে বসে মৃত্যুর প্রহর গুনেন। স্বাভাবিক ভাবে চলাফেরার জন্য হাতের লাঠিই এক মাত্র ভরসা। পবিত্র কোরআন শরীফের অন্তত ১৫ জায়গায় মা-বাবার প্রতি সন্তানের কর্তব্যের কথা বলা হয়েছে। কোরআন শরিফে মা শব্দটি ৩৫ বার এসেছে। এক বচনে উম্ম (মা) ২৪ বার এবং বহু বচনে ‘উম্মাহাত’ (মায়েরা) ১১ বার। আল্লাহ তায়ালা তাঁর গুণাবলির সৃষ্টি ও বান্দার মাঝে প্রকাশ ও বিকাশ ঘটাতে এবং প্রভুত্বের যে ৩টি বৈশিষ্ট্য সৃজন, লালন, সংরক্ষণ এসব গুণাবলীর সমাহার আল্লাহ মায়ের মাঝে দান করেছেন। সুতরাং মা আল্লাহর রহমত ও নিয়ামত। আল্লাহতায়ালা পবিত্র কোরআনে ঘোষণা করেন, ‘আল্লাহতায়ালা তোমাদের সৃষ্টি করেছেন, অতঃপর তিনিই তোমাদের মৃত্যু দেবেন। তোমাদের কোন ব্যাক্তি বৃদ্ধ বয়সের দুর্বলতম স্তর পর্যন্ত পৌছে যাবে, এতে করে জানার পর সে অজ্ঞ হয়ে যাবে। আল্লাহতায়ালার অবশ্যই সবজান্তা, সর্বশক্তি মান’ (সুরা আন নাহল, আয়াত ৭০)
পিতা-মাতাকে সেবাযতœ করা কোনো করুণার বিষয় নয়, এটা মা-বাবার অধিকার। মা-বাবার সেবাযতœ করা আল্লাহর বেধে দেওয়া বিধান ও উত্তম ইবাদত। মা সন্তানের নিরাপত্তার জন্য চোখের ঘুমকে হারাম করেছেন। জন্মের পর সন্তানের জন্য মা সারা রাত জেগে থেকেছেন। শিশুকালে রাতে বিছানায় প্রসাবের জায়গায় মা থেকেছেন আর সন্তানকে শুকনায় রেখেছেন বা বুকে রেখে ঘুম পাড়িয়েছেন। সেই মা বৃদ্ধা বয়সে উপনিত হওয়ায় কেউ খবর নেয় না। আদরের ছেলে-মেয়েরা বড় হয়ে মা-বাবার খোঁজ নেয়ার সময় পায় না। অথচ সেই পিতা-মাতা এক সময় সন্তানের সুখের জন্য নিজের সুখ শান্তি বিসর্জন দিয়েছেন। আসলে আমরা আমাদের আশে পাশের সমাজে যা দেখছি তা খুবই দুঃখের বিষয়। ছেলে মেয়েরা প্রতিষ্ঠিত হয়ে বা বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে আর পিতা-মাতার খোঁজ খবর নেয় না। পুত্র বধুরা আর পিতা-মাতাকে ভালো চোখে দেখে না। তারা মনে করেন পিতা-মাতা তাদের জন্য বোঝা। তারা বাসা বাড়ি ভাড়া নিয়ে পিতা-মাতাকে ফেলে এককভাবে বসবাস করতে থাকেন। আর তখনই বৃদ্ধ মা-বাবা একা হয়ে পড়েন। অতি কষ্টে দিন কাটান। পিতা-মাতাকে বৃদ্ধ বয়সে ছেলে-মেয়েরা মারা মারি, গালাগালি ও খাবার দেয় না এবং খোঁজ করে না এমন উদাহরণ আমাদের সমাজে কম নয়। আল্লাহতায়ালা কোরআনে বলেন ‘আমি মানুষকে তার পিতা-মাতার প্রতি সদাচরণের নির্দেশ দিয়েছি। জননী সন্তানকে কষ্টের পর কষ্ট করে গর্ভে ধারণ করেছে এবং তার দুধ ছাড়ানো হয় ২ বৎসরে সুতরাং আমার (আল্লাহ) প্রতি এবং তোমার পিতা-মাতার প্রতি কৃতজ্ঞ হয়। তোমরা তো আবার আমার নিকটই ফিরে আসবে।’ (সুরা লোকমান, আয়াত নং ১৪)
পিতা-মাতা বৃদ্ধ বয়সে চলে আসলে তাদের সাথে সুন্দর আচরণ করতে হবে। তাদের সেবা যতœ করতে হবে। কোনো ভাবেই খারাপ ব্যবহার করা যাবে না। কোনো অশালীন আচরণ বা তাদের মনে কষ্ট হয় এমন আচরণ করা যাবে না। বৃদ্ধ মা বাবাকে ফেলে অন্যত্র চলে যাওয়া আল্লাহ পাক নিষিদ্ধ কাজ বলে উল্লেখ করেছেন। হযরত আবু হোরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত  বিশ্ব নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) এরশাদ করেছেন ‘তোমরা তোমাদের পিতা-মাতা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিও না। কেননা যে ব্যক্তি আপন পিতা-মাতা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিল সে কুফরি করল।’ (বুখারী শরিফ)
আমরা আশে পাশে সমাজে যা লক্ষ্য করছি ছেলে-মেয়েরা পিতা-মাতার কথা শুনছেনা বৃদ্ধ পিতা-মাতাকে কোন মূল্যই দিচ্ছে না। পিতা-মাতার অবাধ্য হয়ে চলা ফেরা করছে। এ ব্যাপারে হাদিস শরীফে এসেছে। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আমর (রা.) থেকে বর্ণিত হযরত রাসূল (সা.) বলেছেন ‘উপকার করে খোঁটা দানকারী, পিতা-মাতার অবাধ্য সন্তান এবং মদ পানকারী জান্নাতে প্রবেশ করবে না’। (নাসাই, মেশকাত শরীফ)
পিতা-মাতার সাথে সব সময় এমন ব্যবহার করতে হবে যেন তাদের মনে বিন্দু মাত্র কষ্ট না আসে। তাদের সাথে সদ্ব্যবহার সন্তানের জন্য আল্লাহর পক্ষ হতে নির্দেশিত ইবাদত সমতুল্য অবশ্যই পালনীয় বিধান। আল্লাহর হক আদায়ের পর পরই বান্দার জন্যই তার পিতা-মাতার হক সবার আগে আদায় করতে হবে। এ ব্যাপারে আল্লাহ বলেন ‘তোমার পালনকর্তা আদেশ করেছেন যে তাঁকে (আল্লাহ) ছাড়া অন্য কারো ইবাদত করো না এবং মা-বাবার সাথে সদ্ব্যবহার করো, তাদেও উভয়ের মধ্য থেকে যে কোনো এক জন বা উভয় জন বৃদ্ধ হয়ে গেলে তোমরা তাদেরকে ‘উহ’ শব্দটিও পর্যন্ত বলবে না। তাদের কে ধমক দেবে না। বরং তাদের সাথে সম্মানের সাথে কথা বলবে, বিনয় ও নম্রতা সহকারে তাদের সামনে অবনত থাকবে এবং তাদের জন্য প্রার্থনা করতে থাকবে হে আল্লাহ আমার পিতা-মাতার প্রতি দয়া করুণ যে ভাবে শৈশবে তারা আমার প্রতি দয়া করেছিল।’ (সুরা বনি ইসরাইল, আয়াত নং ২৩,২৪)।
আল্লাহ কোরআন শরীফে যেখানেই সুন্দর ব্যবহার ও সেবা যতেœর কথা বলেছেন সেখানেই পিতা-মাতার সেবা যতœ ও সুন্দর ব্যবহারের কথা বলেছেন। আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা আল্লাহর ইবাদত করো, তার সাথে কোনো কিছুকে শরীক করো না এবং পিতা-মাতার সাথে উত্তম ব্যবহার করো।’ (সুরা আল নিছা, আয়াত নং ৩৬)।
ইসলামের দিক থেকে জিহাদে অংশ নেওয়ার চেয়ে পিতা-মাতার খেদমত করা উত্তম ইবাদত। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর রা. থেকে বর্ণিত ‘এক ব্যক্তি জিহাদে যাওয়ার জন্য অনুমতি চাইলে নবীজি (সা.) তাকে বললেন, তোমার ঘরে কী তোমার পিতা-মাতা আছে? সে বলল, জি হ্যাঁ। রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন, তাহলে তুমি ফিরে যাও তোমার পিতা-মাতার সেবা যতœ কর। এটাই তোমার জিহাদ (বুখারী)। যারা পিতা-মাতাকে পেয়ে তাদের সেবা যতœ করে না। তাদের মতো হত ভাগ্য আর কেহ নেই। হাদিস শরীফে তাদেরকে চরম দুর্ভাগা বলা হয়েছে। হযরত আবুহুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, তার নাক ধূলি মলিন হোক, আরো বলেন, তার নাক ধূলি মলিন হোক আবার বলেন, তার নাক ধূলি মলিন হোক। জিজ্ঞেস করা হলো, কোন ব্যক্তির হে আল্লাহর রাসূল? তিনি বললেন, ‘যে ব্যক্তি তার পিতা-মাতা উভয়কে অথবা একজনকে বার্ধ্যক অবস্থায় পেল অথচ সে জান্নাতে প্রবেশ করতে পারলো না।’ (মুসলিম শরীফ)
পিতা-মাতার মাধ্যমে আমরা দুনিয়ায় এসেছি, সুতরাং পিতা-মাতা সন্তানের জন্য ত্যাগ তিতীক্ষা স্বীকার করে আমাদের বড় করেছেন তার প্রতিদান কিছুতেই সন্তান দিতে পারবে না। একমাত্র আল্লাই দিতে পারবেন।পিতা মাতার মধ্যে মা সন্তানের জন্য বেশি কষ্ট করে থাকেন। তাই মায়ের মর্যাদা পিতার  ওপরে। হযরত আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণনা করেন, হে আল্লাহ রাসূল, কে আমার উত্তম আচরণ পাওয়ার হকদার বেশি। তিনি বললেন তোমার মা। সে আবার বলল, তারপর কে? রাসূল সা. আবার বললেন, তোমার মা। সে পুনঃরায় বললেন তার পর কে? রাসূল (সা.) বললেন, তোমার পিতা। (বুখারী ও মুসলিম শরীফ)
মহানবী (সা.) পিতার মর্যাদা বোঝাতে গিয়ে বলেছেন ‘পিতার সন্তুষ্টিতে আল্লাহর সন্তুষ্টি এবং তার অসন্তুষ্টিতে আল্লাহর অসন্তুষ্টি।’ (তিরমিযি শরীফ)
এক সাহাবী হুজুর (সা.) কে জিজ্ঞেস করলেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ আমার পিতা আমার নিকট হক চায়। টাকা পয়সা চায়। আমি কী পরিমাণ তাকে দিতে পারি। বিশ্ব নবী (সা.) বললেন, ‘তুমি এবং তোমার সব সম্পদই তোমার পিতার।’ আর আল্লাহ বলেন, ‘তোমার কল্যাণের জন্য যদি তুমি কোন কিছু ব্যয় করতে চাও, তাহলে প্রথমেই ব্যয় কর তোমার পিতা-মাতার জন্য। তার পর নিকট আত্মীয়-স্বজনের জন্য।’ (সূরা বাকারা আয়াত নং ২১৫)
তবে শুধু পিতা-মাতা দুনিয়াতে থাকতেই সন্তানের দায়িত্ব শেষ নয়। মৃত্যুর পরেও দায়িত্ব কর্তব্য পালন করতে হয়। হাদিস মতে পিতা-মাতা মৃত্যুর পর যে দায়িত্ব পালন করতে হয় তাহলো তাদের মৃত্যুর পর দাফন কাফন করার ব্যবস্থা করা, তারা দুনিয়াতে ঋণ রেখে গেলে তা পরিশোধ করা, তারা কোনো অসিয়ত রেখে গেলে তা পালন করা, আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা, তাদের বন্ধু বান্ধবদের সাথে উত্তম ব্যবহার করা। তাদের জন্য সর্বদাই দোয়া করা। ‘রাব্বির হামহুমা কামা রাব্বাইয়ানি ছগিরা’। আল্লাহ আমাদের সবাইকে উত্তমভাবে মা-বাবার সেবা যতœ করার তাওফিক দিন । আমিন ॥

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT