ধর্ম ও জীবন

ইমাম আবু হানিফা (রহ.) ও তার ফিকহ

মাওলানা আব্দুল হান্নান তুরুকখলী প্রকাশিত হয়েছে: ২২-১২-২০১৭ ইং ০০:১২:১০ | সংবাদটি ৪২২ বার পঠিত

[পুর্ব প্রকাশের পর]
ইলমে তাসাউফ শিক্ষা : ইমাম আবু হানিফা (র.) ছিলেন ইলমে ফিকহ শাস্ত্রের জনক। ইমাম আবু হানিফার মতো এতো বড় আলেম আর হবেন বলে আমার মনে হয় না। সেই মহান শ্রেষ্ঠ আলেম ভাবলেন আমার তো ইলিম পূর্ণ হয়নি, আমি তো প্রকৃত আলেম হইনি। পূর্ণ ইলিম অর্জন ও প্রকৃত আলেম হওয়ার জন্য আমাকে অবশ্যই কামিল পীরের নিকট মুরিদ হতে হবে। তাই ইমাম আবু হানিফা (র.) কামিল পীরের নিকট মুরিদ হলেন। তাঁর পীর ছিলেন দুই জন। এক. ইমাম বাকের (র.), দুই. ইমাম জাফর সাদিক (র.)। সেই ইমাম আবু হানিফা (র.) বলেছেন- যদি আমার জীবনের দু’টি বছর আমার পীর সাহেবের নিকট অতিবাহিত না করতাম তবে আমি আবু নুমান (আবু হানিফা) ধ্বংস হয়ে যেতাম। (সুহবাতুস সালিহীন : পৃষ্ঠা-৩০)
কামিল পীরের নিকট মুরিদ হওয়া ছাড়া প্রকৃত ও পূর্ণ আলেম হওয়া যায় না বলেই ইমাম আবু হানিফ (র.) ইলমে তাসাউফ অর্জনের জন্য কামিল পীরের নিকট মুরিদ হয়েছিলেন।
উস্তাদগণের নাম : ইমাম আবু হানিফা (র.) এর অদম্য জ্ঞান পিপাসা ছিল। তাই তিনি হাজার হাজার উস্তাদের নিকট থেকে ইলিম অর্জন করেন। তাঁর উস্তাদের সংখ্যা ছিল চার হাজারের মতো। তাঁর কয়েকজন উল্লেখযোগ্য উস্তাদের নাম হচ্ছে- এক. হাম্মাদ ইবনে আবু সুলায়মান (রা.), দুই. আদি ইবনে সাবিত আনসারী (রা.), তিন. নাফি ইবনে মাওলা ইবনে ওমর মাদানী (রা.), চার. আব্দুর রহমান হরমুজ আল-আরাজ মাদানী (রা.), পাঁচ. মুহাম্মদ ইবনে মুনকাদির (রা.), ছয়. ইয়াজিদ ইবনে সুহাইব কুফী (রা.), সাত. মুহাম্মদ ইবনে মুসলিম মক্কী (রা.), আট. আমীর ইবনে শুরাহাবিল (রা.), নয়. সালামা ইবনে কুহাইল কুফী (রা.), দশ. আবু জুবায়ের (রা.), এগার. সিমাক ইবনে হারব কুফী (রা.), বার. মুহাবির ইবনে দীসার (রা.), তের. আমর ইবনে দীনার মক্কী (রা.), চৌদ্দ. ইয়াহইয়া ইবনে সাঈদ আনসারী (রা.), পনের. আতা ইবনে আবু রাহাব মক্কী (রা.), ষোল. আল কামাহ ইবনে মারসাদ কুফী (রা.), সতের. ইমাম বাকের (রা.), আঠার. ইমাম জাফর সাদিক (রা.)।
উস্তাদের প্রতি আদব : একজন ছাত্রকে প্রকৃত আলেম হতে হলে তাঁকে অবশ্যই উস্তাদের প্রতি পূর্ণ শ্রদ্ধাশীল হতে হবে। সেই উস্তাদের প্রতি পূর্ণ শ্রদ্ধা প্রদর্শনের অনুপম দৃষ্টান্ত পাই ইমাম আবু হানিফা (রা.) এর পবিত্র জীবনি থেকে। ইমাম আবু হানিফা (রা.) তাঁর উস্তাদগণের প্রতি সর্বোচ্চ সম্মান প্রদর্শন করতেন। ইমাম আবু হানিফা (রা.) নিজেই বর্ণনা করেছেন- ‘আম্মার উস্তাদ হাম্মাদ (রা.) যতোদিন জীবিত ছিলেন আমি তাঁর বাড়ির দিকে পা প্রসারিত করে শয়ন করতাম না, এমনকি বসতামও না।’ উস্তাদের প্রতি সর্বোচ্চ সম্মান প্রদর্শন আলেম হওয়ার পূর্বশর্ত। বেআদব ছাত্র কখনও আলেম হতে পারবে না।
কর্মজীবন : ইমাম আবু হানিফা (রা.) এর প্রধানতম উস্তাদ ইমাম হাম্মাদ (রা.) এর ইন্তেকালের পর কুফাবাসীর অনুরোধে তিনি তার স্থলাভিষিক্ত হন। একদিন ইমাম আবু হানিফা স্বপ্নে দেখেন, তিনি রাসূল (সা.) এর কবর খনন করছেন এতে তিনি উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। তিনি বসরা গমন করে এক ব্যক্তির মাধ্যমে মুহাম্মদ ইবনে সিরীনের নিকট তিনি এর ব্যাখ্যা জিজ্ঞেস করলেন। মুহাম্মদ ইবনে সিরীন (রা.) এর জবাবে বললেন-‘স্বপ্নদ্রষ্টা (আবু হানিফা) রাসূল (সা.) এর হাদিসের ভান্ডারকে বিকশিত করবেন।’ স্বপ্নের ব্যাখ্যা শুনে ইমাম আবু হানিফা (রা.) অত্যন্ত আনন্দিত হলেন এবং অত্যন্ত প্রসন্ন মনে ইলমে হাদিস ও ইলমে ফিকাহ’র দরস শুরু করেন। তাঁর পান্ডিত্যপূর্ণ দরস দানের কথা সর্বত্র ছড়িয়ে পড়লে বিশ্বের বিভিন্ন স্থান থেকে জ্ঞান পিপাসু ছাত্ররা আসেন তাঁর কাছে ইলমে ফিকহ ও ইলমে হাদিস শিক্ষা লাভ করার জন্য। হাজার হাজার ছাত্ররা তাঁর কাছ থেকে ইলমে হাদিস ও ইলমে ফিকহ অর্জন করেন। তাঁর ছাত্রদের অধিকাংশই ছিলেন ফকীহ ও কাজী। আব্বাসীয়া শসক মনসুর কর্তৃক কারারুদ্ধ হওয়া পর্যন্ত তিনি দরস কার্যক্রম চালিয়ে যান। এমনকি কারাগারে বন্দীশালায় থাকাবস্থায়ও পুরো পাঁচ বছর কুরআন, হাদিস ও ইলমে ফিকাহ’র দরস দান করেন। ইমাম মুহাম্মদ শায়বানী (রা.) কারাগারেই ইমাম আবু হানিফার নিকট থেকে ইলিম শিক্ষা লাভ করেছিলেন। ইমাম আবু হানিফা (রা.) ছিলেন মহান চরিত্রের অধিকারী একজন মহান ব্যক্তিত্ব। শিক্ষাদানের সময় ছাড়া তিনি সব সময়ই নিশ্চুপ থাকতেন। তাঁকে দেখলে মনে হতো তিনি গভীর চিন্তায় মগ্ন। কোন প্রশ্ন করলে শুধু এর সঠিক জবাব দিতেন। অন্যথায় চুপ থাকতেন। তিনি সর্বদা কুরআন হাদিসের সঠিক ব্যাখ্যা উদঘাটনে ব্যস্ত থাকতেন। সততায় ও দানশীলতায় তিনি ছিলেন অনন্য। তিনি কখনও কারো নিন্দা করতেন না। ইলিম বিতরণে তৎকালে তাঁর ন্যায় উদার কেউ ছিল না। তিনি একাধারে চল্লিশ বছর বিনিদ্র নয়নে ইবাদতের মাধ্যমে রাত যাপন করেন এবং এশার অজুতে ফজরের নামাজ আদায় করেন। তিনি তাঁর জীবদ্দশায় সত্তর হাজার বার পবিত্র কুরআন শরীফ খতম করেন। ইমাম আবু হানিফা (রা.) রমজানে প্রতিদিন দিনে একবার এবং রাতে একবার কুরআন খতম করতেন অর্থাৎ তিনি রমজান মাসে মোট ষাটবার কুরআন খতম করতেন এবং তারাবীহ নামাজে তো অবশ্যই কুরআন খতম করতেন। রাসূলে পাক (সা.) এর এশক ও মহব্বতে তাঁর অন্তর ছিল কানায় কানায় পূর্ণ। রাসূল (সা.) এর শানে তিনি রচনা করেছেন অগণিত কবিতা। ‘কসিদাতুন নুমান’ এর জ্বলন্ত প্রমাণ। তাঁর রচিত কবিতা পাঠ করলে প্রতিটি মুমিনের অন্তর নবীর প্রেমে ভরপুর হয়ে যায়। ইমাম আবু হানিফা (রা.) ছিলেন এক আপসহীন ব্যক্তিত্ব। নীতির জন্য যে কোনো ত্যাগ স্বীকার করাই ছিল তাঁর চরিত্রের অনন্য বৈশিষ্ট্য। কুফার উমাইয়া গভর্ণর ইয়াজিদ ইবনে আমর ইবনে হুবায়রা এবং পরে আব্বাসীয় খলিফা মনসুর তাঁকে কাজীর পদ দান করলে তিনি তা দৃঢ়তার সাথে প্রত্যাখ্যান করেন। একারণে তাঁকে দৈহিক শাস্তি ও করাদন্ড ভোগ করতে হয়েছে এমনকি বিষপানে তাকে হত্যা ও করা হয়েছে। তিনি নির্যাতিত হয়েছেন, কারাবরণ সহ্য করেছেন এবং মজলুম অবস্থায় দুনিয়া থেকে বিদায়ও নিয়েছেন। তবুও তিনি জালিমের কাছে মাথানত করেন নি। (চলবে)

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT