পাঁচ মিশালী

একজন হার না মানা প্রতিবন্ধী

স্বপন মাহমুদ প্রকাশিত হয়েছে: ২৩-১২-২০১৭ ইং ০১:১৭:৪৬ | সংবাদটি ১৫৫ বার পঠিত

গত ৮ আগস্ট সকাল ৮.৩০ মিনিটে পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে চলে গেলেন জাতীয় প্রতিবন্ধী ফোরামের সভাপতি রজব আলী খান নজীব। ২০১৬ এর ৩রা ডিসেম্বর জাতীয় প্রতিবন্ধী দিবসে সফল প্রতিবন্ধী হিসেবে তিনি গৌরবময় পদক মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাত থেকে গ্রহণ করেন।
এ বছর ৩ ডিসেম্বর জাতীয় প্রতিবন্ধ্যী দিবসে তাঁর সংগঠন ‘গ্রীন ডিজএ্যাবল্ড ফাউন্ডেশন’ (জিডিএফ) সকল এনজিও হিসেবে পদক গ্রহণ করে মাননীয় অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত এর হাত থেকে। যা গ্রহণ করেন জিডিএফ এর নির্বাহী পরিচালক জিডি রুমু। এটা গ্রহণ করার কথা ছিল মরহুম রজব আলী খান নজীবের। কিন্তু তার আগেই তিনি পরপারে পাড়ি দিলেন।
আমাদের সমাজে স্বার্থপরতা ও সম্পদশালী হয়ে উঠার নেশা তীব্র আকার ধারণ করেছে। হারিয়ে যাচ্ছে মানুষের প্রতি ভালোবাসা ও মনুষ্যত্ববোধ। তারপরও কিছু মানুষ অনগ্রসর মানুষের জন্য নিজেদের অকাতরে নিবেদন করে যাচ্ছেন। তেমনি একজন পরোপকারী মানুষ সম্পর্কে বর্ণনা করছি, যিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা, মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় এবং গভীর দেশপ্রেমে বিশ্বাসী। এই পরোপকারী মানুষটি হচ্ছেন- অর্থ সম্পদহীন দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ব্যক্তি মোঃ রজব আলী খান নজীব। তিনি ১৯৭২ সালের ১৫ অক্টোবর সিলেট শহরের জিন্দাবাজার এলাকার কাজী ইলিয়াছ মহল্লায় একটি দরিদ্র পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা মরহুম দৌলত খান ছিলেন বিএডিসি’র কর্মচারী ও মাতা জুবেদা খাতুন গৃহিনী। রজব আলী খান দৃষ্টি শক্তি থাকা অবস্থায় মির্জাজাঙ্গাল জুনিয়র বিদ্যালয় এবং দুর্গাকুমার পাঠশালায় কিছু দিন লেখাপড়া করেন। ১৯৭৯ সালে চাইল্ড গ্লুকোমা রোগে তিনি প্রথমে বাম চোখ এবং ৮০ সালে ডান চোখের সৃষ্টি সম্পূর্ণ হারিয়ে ফেলেন। অর্থ-বিত্ত না থাকার কারণে দেশে বিদেশে উন্নত চিকিৎসা করাতে পারে নি তার  পরিবার।
তিনি ১৯৮২ সালে ঢাকা সরকারি অন্ধ বিদ্যালয়ে ব্রেইল পদ্ধতিতে প্রাথমিক শিক্ষা শুরু করেন। পরবর্তীতে মৌলভীবাজার সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে এসএসসি, সিলেট সরকারি কলেজে এইচএসসি এবং মদনমোহন কলেজে ¯œাতক শ্রেণিতে সাধারণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে লেখাপড়া করেন। ছাত্র-জীবনে তিনি পরিবারের পাশাপাশি বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতা নিয়ে অত্যন্ত কষ্ট করে পড়াশুনা করেন। নবম শ্রেণিতে অধ্যয়নরত অবস্থায় ১৯৮৯ সালে বাংলাদেশ জাতীয় অন্ধকল্যাণ সমিতি (বিএনএসবি) সিলেট জেলা শাখার মাধ্যমে দৃষ্টিহীন মানুষের অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠার কাজে যুক্ত হন। সভা, মিছিল, গণসংযোগের মাধ্যমে সমাজকে জাগাবার চেষ্টায় নিজেকে নিবেদন করেন। পাশাপাশি সমিতির পক্ষ থেকে দৃষ্টিহীনদের জন্য সাদা ছড়ি ও আর্থিক সহযোগিতা দানের ব্যবস্থা করেন।
এছাড়া দৃষ্টি প্রতিবন্ধীদের জন্য সমিতির পক্ষ থেকে ব্রেইল এন্ড অডিও লাইব্রেরী নামক একটি প্রকল্প তাঁর উদ্যোগে চালু করা হয়। মোঃ রজব আলী খান ১৯৯৫ সাল থেকে ২০০৬ পর্যন্ত একটানা ১২ বছর (বিএনএসবি) জাতীয় নির্বাহী সদস্য হিসেবে জাতীয় পর্যায়ে অন্ধত্বমোচন, দৃষ্টিহীনদের শিক্ষা সহায়ক উপকরণ প্রদান ও পুনর্বাসনে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন।
রজব আলী জালালাবাদ ফাউন্ডেশনের যুগ্ম মহাসচিব হিসেবে কার্যালয় ও মাঠপর্যায়ে কার্যক্রম বাস্তবায়ন ও পর্যবেক্ষণের ক্ষেত্রে নিরলসভাবে কাজ করেন। জালালাবাদ ফাউন্ডেশনে কাজ করার সময় তিনি সিলেট শহর ও শিক্ষার্থীদের চোখ পরীক্ষা করিয়ে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক দ্বারা রোগ আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসা প্রদান ও ঔষধ প্রাপ্তিতে মূল্যবান অবদান রাখেন। জালালাবাদ ফাউন্ডেশনের একটি প্রতিনিধি দল ১৯৯৫ সালে বাংলাদেশের মহামান্য রাষ্ট্রতির সঙ্গে বঙ্গভবনে সাক্ষাত করে। উক্ত প্রদিনিধি দলের সদস্য হিসেবে তিনিও ছিলেন। উল্লেখিত প্রতিনিধি দল সিলেট বিভাগের উন্নয়নের ব্যাপারে একটি স্মারকলিপি মহামান্য রাষ্ট্রপতির কাছে প্রদান করেন। সেই স্মারকলিপির খসড়াটি রজব আলী খান প্রস্তুত করেন। তিনি ১৯৯৪ সালে নব গঠিত সুরমা অন্ধকল্যাণ সমিতির প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক হিসেবে যুক্ত হন। অল্প দিনের মধ্যে সংগঠনটি তার তত্ত্বাবধানে সারাদেশে পরিচিতি লাভ করে। ১৯৯৭ সালে সিলেট বিভাগের দৃষ্টি প্রতিবন্ধীসহ ব্যক্তিদের উন্নয়ন ও অধিকার প্রতিষ্ঠা দাবিতে জাতীয় সংসদের স্পীকার আলহাজ হুমায়ুন রশিদ চৌধুরীর কাছে একটি স্মারকলিপি সমিতির পক্ষ থেকে প্রদান করা হয়। উক্ত স্মারকলিপির প্রণয়ন ও সাক্ষাতের ব্যাপারে রজব আলী খান মূল ভূমিকা পালন করেন।
১৯৯৬ সাল থেকে বাংলাদেশের ১০ ভাগ প্রতিবন্ধী মানুষের সর্বোচ্চ বেসরকারি সংগঠন জাতীয় প্রতিবন্ধী ফোরাম (এনএফওডব্লিউডি) এর সঙ্গে অসংখ্য কার্যক্রম বাস্তবায়নের বিষয়ে জড়িত হন। ফোরাম এর মাধ্যমে তিনি প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশন গঠন, প্রতিবন্ধী কল্যাণ আইন ২০০১, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের ভাতা, ঋণ, উপবৃত্তি, সনদপত্র প্রদান ইত্যাদি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের সঙ্গে কখনও প্রত্যক্ষ আবার কখনও পরোক্ষভাবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। মোঃ রজব আলী খান নজীবের উদ্যোগে ১৯৯৭ সালের ১লা জানুয়ারি ৬ জন নিবেদিত সমাজ দরদী ব্যক্তিদের নিয়ে গ্রীণ ডিজএ্যাবল্ড ফাউন্ডেশন (জিডিএফ), পূর্ণভূমি সিলেটে প্রতিষ্ঠা করেন। সর্বশেষ তিনি জিডিএফ’র মহাসচিব ও নির্বাহী পরিচালকের দায়িত্ব পালন করেন।
রজব আলী খানের আমন্ত্রণে বর্ণিত কার্যক্রম বিভিন্ন সময় গুণীজনরা পরিদর্শন করেন। যাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য বাংলাদেশস্থ ব্রিটিশ হাই কমিশনার ড. ডেভিট সি কার্টার, অস্ট্রেলিয়ান ডেপুটি হাই কমিশনার জুলিয়ান ইপটিন, পাকিস্তানের হাই কমিশনার আলমগীর বাবর, ডেপুটি হাই কমিশনার আয়াজ মোহাঃ খান, ফ্রেনজ এ্যাম্বেসেডার আন্দ্রে জেব অব কস্টি, বাংলাদেশ সরকারের তৎকালীন প্রতিমন্ত্রী এবাদুর রহমান চৌধুরী, বাংলাদেশ প্রাইভেটাইজেশন কমিশনের তৎকালীন চেয়ারম্যান ইনাম আহমেদ চৌধুরী প্রমুখ।
রজব আলী খান তার নিরলস প্রচেষ্টার ফলে বাংলাদেশের মধ্যে প্রথম স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান হিসেবে সিলেট সিটি কর্পোরেশনের বাজেটে প্রতিবন্ধী নাগরিক উন্নয়ন বিষয়ক অর্থ বরাদ্দ করান। এছাড়া সিলেট জেলা প্রশাসনের মোট শিক্ষা তহবিলের ১০ ভাগ অর্থ প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য সংরক্ষণ করান। বাংলাদেশ ব্যাংক সিলেট কার্যালয়ে র‌্যাম স্থাপন ও প্রতিবন্ধী বিষয়ক ডেক্স চালু করান। জাতীয় প্রতিবন্ধী ফোরামের মাধ্যমে ২০০৭ সালে ২৫ এপ্রিল বাংলাদেশ সরকারের প্রধান উপদেষ্টা এবং ২৯ এপ্রিল প্রধান নির্বাচন কমিশনারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে প্রতিবন্ধী মানুষের উন্নয়নে ও অধিকার নিশ্চিত করার বিষয়টি উত্থাপন করেন। এছাড়াও বাংলাদেশ সরকারের সমাজকল্যাণ মন্ত্রী জনাব এনামুল হক মোস্তফা শহীদ এমপি, অর্থমন্ত্রী জনাব এ. এম. এ মুহিত এমপি, সিলেট সিটি কর্পোরেশনের সাবেক মেয়র বদর উদ্দিন আহমদ কামরান, বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ড. আতিউর রহমান, সৈয়দা জেবুন্নেছা হক এম.পি, সিলেটের বিভাগীয় কমিশনার ও জেলা প্রশাসকের কাছে সিলেট বিভাগের প্রতিবন্ধী মানুষের উন্নয়ন ও অধিকার প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে সম্মিলিতভাবে স্মারকলিপি প্রদান করেন এবং বিভিন্ন সময় বর্ণিত ব্যক্তিবর্গের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে দেশ ও দেশের প্রতিবন্ধী নাগরিকের স্বার্থে দাবিগুলো বাস্তবায়নের জোরালো আবেদন জানান। সিলেটে আন্তর্জাতিক প্রতিবন্ধী দিবস, বিশ্ব সাদা ছড়ি নিরাপত্তা দিবস, জাতী প্রতিবন্ধী দিবস এবং ওটিজম দিবস পালনের ব্যাপারে বেসরকারিভাবে জনাব রজব আলী খান মূল উদ্যোক্তার ভূমিকা পালন করেন। ১৯৯৮ সালে রজব আলী খান আন্তর্জাতিক সেবাধর্মী সংগঠন এপেক্স ক্লাব অব সাউথ সুরমার সদস্য পদ লাভ করেন। ২০০২ সালে তিনি ক্লাব সভাপতি নির্বাচিত হন। তিনি সভাপতি থাকাকালীন অবস্থায় কুষ্ঠরোগী, প্রতিবন্ধী মানুষ, অবহেলিত নাগরিকদের সেবায় মনোনিবেশ করেন। তিনি ২০০২ সালে সভাপতি থাকাকালীন অবস্থায় সিলেটের দক্ষিণ সুরমা নছিবা খাতুন বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে সমাজের অবহেলিত শ্রমজীবী শিশুদের জন্য ‘এপেক্স ভাগ্যাহত শিশু বিদ্যালয়’ চালু করেন। এই বিদ্যালয়ের মাধ্যমে এ পর্যন্ত ৬০০ জন ছেলে-মেয়েকে বিনামূল্যে বই, খাতা, কলম, শিক্ষা উপকরণ, পোশাক প্রদান করে পাঠদান করা হয়েছে। আরো ৫০ জনকে একইভাবে শিক্ষা দান করা হচ্ছে।
রজব আলী খান একজন প্রতিবন্ধী বিষয়ক লেখক, সুবক্তা, ক্রীড়া সংগঠক, সংস্কৃতিকর্মী, সমাজ সংগঠক ও উন্নয়নকর্মী হিসেবে যখন যেখানে সুযোগ পেয়েছেন বক্তৃতা দিয়ে, সঙ্গিত পরিবেশন করে, আলোচনা করে, স্ব-শরীরে কাজ করে সমাজের মানুষকে অনগ্রসর মানুষের জন্য কাজ করার ব্যাপারে উজ্জীবিত করার প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছেন। তার কর্ম তৎপরতার ফলে আমাদের সমাজের লক্ষ লক্ষ মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে উপকৃত হয়েছেন এবং নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন করে সমাজ সচেতন নাগরিক হিসেবে গড়ে উঠেছেন।
মানুষের সেবা, উন্নয়ন ও অধিকার প্রতিষ্ঠায় কাজ করতে গিয়ে রজব আলী খানকে ব্যক্তিগত অভাব অনটন, সামাজিক বাঁধা, বৈষম্য, চরম অপমান ও নির্যাতনের সম্মুখিন হতে হয়েছে। দীর্ঘ ২৫ বছর যাবৎ সমাজকর্মী হিসাবে প্রচন্ড অভাব নিয়ে দিন কাটিয়েছেন।
মোঃ রজব আলী খান তাঁর কর্মের স্বীকৃতি স্বরূপ ১৯৯৩ সালে বিএনএসবি সিলেট শাখার পক্ষ থেকে শ্রেষ্ঠ সমাজকর্মী পুরস্কার, ২০০৭ সালে ‘প্রথম আলো গ্রামীণফোন সম্মাননা পদক’ ২০০২ ও ২০০৭ সালে এপেক্স ক্লাব অব বাংলাদেশ এর পক্ষ থেকে ন্যাশনাল ‘বেস্ট ডেলিগেট এওয়ার্ড’ এবং পাশাপাশি এপেক্স বাংলাদেশের জেলা-৪ এর পক্ষ থেকে ‘সেরা ক্লাব সভাপতি’, সেরা বক্তা দুইবার, সেরা এপেক্সিয়ান দুই বার, বেস্ট ডেলিগেইট একবার, সেরা পর্যবেক্ষক একবার, স্থায়ী সেবা পুরষ্কার ৪ বার অর্জন করেন। বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক ২০০৮ সালে সিলেট জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে ‘সাদা মনের মানুষ’ সম্মামনা পদক লাভ করেন। উল্লেখ্য যে দেশের প্রতিবন্ধী মানুষের মধ্যে তিনিই একমাত্র ব্যক্তি- যিনি এই পুরষ্কার লাভ করলেন।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT