পাঁচ মিশালী

চোরের আত্মকাহিনী ও তার দুঃখ

রমেন্দ্র চৌধুরী (রঞ্জু) প্রকাশিত হয়েছে: ২৩-১২-২০১৭ ইং ০১:১৮:৩৫ | সংবাদটি ৭৩ বার পঠিত

লিখতে চেয়েছিলাম দুর্নীতি, ঘুষ, প্রতারণা এ সব নিয়ে। এটা আমাদের চাকুরিজীবী সহ বিভিন্ন পর্যায়ের মানুষের চরিত্র ও আচরণে বিদ্যমান। এ সব সকলেরই জানা। তবে মনে হলো ঘুষ, দুর্নীতি সবই চলছে। দুদক ধরপাকর করছে। তবে যে পর্যায়ে দুদক এখনো যেতে পারছে না তার সংখ্যাও অনেক। এরা রাঘব বোয়াল নয়। এরা মাঝারি গোছের কর্মকর্তা কর্মচারী। সমাজ ধ্বংসের দায় এদেরও। তবে এরা সমাজে সহনশীল হয়ে গেছে। তাই ভাবছি চোরের আত্মকাহিনী নিয়ে লিখাই ভাল।
নদী কথা বলে না তবুও নদীর আত্মকাহিনী আমরা লিখি। ছোটবেলায় রচনা পরীক্ষাপত্রে লিখেছি। চোরও কথা বলে না। তার আত্মকাহিনী লিখা যাবে না কেন। তাই লিখছি চোরদের আত্মকাহিনী। বদ্ধ জলাশয়ে যদি লাজ সরমের একটুও তরঙ্গ উঠে মন্দ কী।
আমি একজন চোর আমার আত্মকাহিনী। আমাকে নাম ধরে কেউ ডাকে না। চোরা বলেই ডাকে। তবে আমার ও একটি নীতি আছে সেকথা কেউ জানে না। আমি গৃহস্থের ঘরে চুরি করি না। সে কষ্ট করে জীবন চালায়। আমি চুরি করি তার, যে গৃহস্থ মানুষের টাকা চেয়ারে বসে বসে খায়। এটাকে বলে ঘুষ। তার সাথে আমার তফাৎ তিনি অফিসে বসে করেন, আর আমি রাতে তাদের বাসা চুরি করি। এখানে দোষ দেখি না। কারণ চোরে চোরে মাসতুতো ভাই।
আজকাল সমাজটা অন্যরকম হয়ে গেছে। চোর ধরলে এমনকি চোর সন্দেহেও গণপিটুনি দিয়ে একেবারে মেরে ফেলে। এখন আমার খুব ভয়। ভাল মানুষদের বলছি এটা ভাল না। কারণ মেরে ফেললে এটা কী খুন হয় না? বিচার তো বিচারক করবেন। বিচারে খুনি আর চোরে তফাৎ অনেক। খুনি তখন টের পাবে কত ধানে কত চাল। অপ্রাসঙ্গিক হলেও সত্য যে, সরকারী বেসরকারী সবখানেই চুরি দুর্নীতির মহোৎসব চলছে। বাঙালি চুরি ছ্যাচরামি অপছন্দ করে সমাজে ঘুষখোর দুর্নীতিবাজদের আবস্থা দেখলে কি তা মনে হয়? শুধু শুধু আমার দোষ। তাই বলে আমি আমাকে সাফাই করছি না। আমার চাকরি নাই, খাদ্য নাই, কর্মের ব্যবস্থাও নাই। তাই বলে চুরি করব এটাও ঠিক না। এই স্পষ্ট বলাটাকেই বলে আত্মকাহিনী।
শুধু আমার জীবনের নোংরা কথাটাই বলবো? যাদের চাকরি আছে, খাদ্য আছে, তারা ঘুষ খায় দুর্নীতি করে তাদের কাহিনী কে লিখবে। আমি চোর আর ওরা ঘুষখোর। তফাৎ শুধু দিনে আর রাতের কর্মে। সমাজের কাছে বিচার চাইব না কেন? ঘুষখোররা টাকা কামাই করে ধনে মানে সমাজে উচু আসনে অবস্থান করছে। কোন উৎস ছাড়াই অঢেল টাকার মালিক বনেছে তারা। তাদের কি জনতা চোর চোর বলে ধাওয়া করে গণপিটুনি দেয়? আমরা দু’জনেই তো সভ্যতার সীমানায় থাকি না। আমিও ছিচকে চোর। আমি দিন এনে দিন খাই। আর ওরা ছিচকে ছ্যাচরা ঘুষখোর। পরের টাকায় বাড়ি করে। একেই বলে চোরের উপর বাটপারি। শালা টাকাটা পেলেই আস্তে করে একটা দালান কোঠা তৈরি শুরু করে। তাতে আমিও মরি সেও মরে। আমি এখন আর তার ঘরে  ঢুকতে পারি না। সে মরে লোকে বলে ‘বাপদাদার নাম নাই চান মোড়লের বিয়ে।’ অর্থাৎ বাপের কিছুই ছিল না তার আবার পাক্কা বাড়ি। পাক্কা বাড়ি গড়ে সভ্যতার সাজে সাজেন। আর আমার দারিদ্রতা আরও বেড়ে যায়। সাথে আমার ক্ষোভও বেড়ে যায়। সরকার কেন এদের সম্পদের উৎস জানতে চায় না। কেউ চোর সন্দেহে গণপিটুণিতে মরে আর কেউ ঘুষ খেয়ে খেয়ে সম্পদ গড়ে। আমি চুরি করে দৌড় দিলে শুরু হয় হৈ, চৈ, ধর ধর চোর চোর। জনতা ভিড় জমায়।
আমার খুব দুঃখ কোন ঘুষখোরকে কি কেউ কোন দিন ধাওয়া করেছে? তবে আমিও কম চালাক নই। রাতের বেলায় আমি ও মিশে যাই তাদের সাথে। আমিও বলি ধর ধর। শুধু কি আমি মিশে যাই? ঐ ঘুষখোরটা!! চালাকিতে তার সাথে পেরে উঠি না। সেও ঘুষ খেয়ে সমাজে মিশে যায়। এই অনুষ্ঠানে সেই অনুষ্ঠানে চাঁদা দিয়ে দিয়ে সমাজে একটা স্থান করে নেয়। আমি চোর আর সে ঘুষখোর। সে সভা সমিতিতে পদ পায়, মঞ্চে বসে, বক্তৃতা করে মিশে যায় মানুষের সাথে। এখানেই মাসতুতো ভাই ঘুষখোরের সাথে তফাৎ। সমাজের প্রতি আমার খুব দুঃখ। আমার বিরুদ্ধে সারা সমাজ। কিন্তুু ঐ ঘুষখোরদের কেউ দেখেও দেখে না। তাকেও তো অবাঞ্চিত ঘোষণা করা উচিত। তাহলে আমার বদনাম আমি মাথা পেতে নিতাম। কিন্তুু তা না করায়, আমি চোর এ ভাবটাও আমাকে লজ্জা দেয় না। তাই আমি বদলাই না। মনে হয় ঠিক মত কামাইতে পারলে সমাজে পিছনে যাই বলুক সামনে এক কাপ চা ভাগিয়ে একটু মুচকি হাঁসি দিয়ে বলে চলি দেখা হবে। এভাবে কুপথে টাকাওয়ালা ঘুষখোর স্বীকৃতি পায় এতে আমার খুব জ¦ালা হয়।
আমার আত্মকাহিনী!! আমি কত ভালো একবার ভেবেছেন কি? আমি চোর আমি অনায়াসে বলে যাচ্ছি। আর আমার ঐ মাসতুতো ভাই ঘুষখোর চোররা কি আত্মকাহিনী লিখতে পারবে? আত্মকাহিনী লিখতে জীবনের সকল কর্মকান্ড লিখতে হয়। তাই অন্য যে কেউ লিখতে পারলেও কোন ঘুষখোর তা পারবে না। লিখলে তা হবে মিথ্যাচারের গল্প। যাক, আমিতো জীবনভর চোর। আমার অনেক কাহিনী। ছোট করে একটা কাহিনী শুনুন। একদিন আমি দিনের বেলায় বেরিয়ে পড়লাম। একটা মোবাইলের সুবিধা করার ইচ্ছা। তবে দামি না হলে বিক্রি করা যায় না। তাই একটি অফিসের আনাচে কানাচে ঘুরছি। হঠাৎ করে কর্কশ কন্ঠে গালাগালি শুনতেছি। আমাকে কে চেনে। আমি আজোবধি ধরা খাই নাই। তাই আমি দাগি চোর নই। সাহস করে একটু এগিয়ে দেখলাম একজন নেতা, বড় নয় পাতি নেতা, তবুও নেতা বলে কথা। একজন কর্মচারীকে গালি দিচ্ছেনÑ শালা চোরের চোর। ভিক্ষের হাতে টাকা নিয়েও বলছে আজ না কাল। লোকটা ভয়ে চেয়ার ছেড়ে দাড়িয়ে বার বার কাতর কন্ঠে জড়সড় হয়ে বলছে এই করে দিচ্ছি.....ভাই ভাই.....। নেতা যথেচ্ছা গালি দিয়ে যাচ্ছে। অফিস থেকে কারো কোন প্রতিবাদ নাই। কারণ তাদের সকলেই একই খুরে মাথা কামানো। আমি খুব আচ্ছা করে মজা পেলাম। এ কারণেই পেলাম, শালা আমি মরলে একবারই মরব, আর তুমি যমে না নেয়া পর্যন্ত অনেক বার মরবে। পাবলিকের বকুনি, বসের বকুনি, নেতার বকুনি আর গরিবের দীর্ঘশ^াসতো আছেই। আমি চোর আমার মনে পুলিশ পুলিশ, আর তোমার মনে কখন কে বলে ঘুষখোর ঘুষখোর। তোমাকে মানুষ ঘৃণা করে, আমাকে কেউ চিনে না। আমি কিছুটা হলেও বাঁচি, তুমি একেবারেই মরো। তবে নেতা যখন বকছিলেন চোরের ঘরের চোর সেখানে আমার একটু লাগছিল। কারণ ঐ ঘুষখোর সেতো আমার মাসতুতো ভাই। ছেলে বানিয়ে গুলিয়ে দিল না? কারণ আমার প্রতিজ্ঞা আমি চোর হলেও ছেলেকে চোর বানাবো না। ভবিষ্যতে আমার ছেলে যেন এ গালি না শুনে। আমিতো সমাজের উন্নতি চাই। তাই আমার ছেলেকে তা করতে দেব না। কিন্তুু আমার ঘুষখোর চোর ভাই সমাজে যে নজরেই থাকুক সে সমাজে চলতে পারে। এটাই তার জন্যে কাল। কারণ তার ছেলে পেলেরা ভাল শিক্ষা পাবে না। সে তার বাবাকে যেভাবে  দেখেছে সেভাবেই গড়ে উঠবে। সমাজে একই ধাঁচে স্থান করে নিতে লজ্জা পাবে না। সেও ভিন্ন পথে দুপয়সা কামাইয়ের চেষ্টা করবে। এতে সমাজ ক্রমাগত অবনতির দিকে চলতে থাকবে। তবে একথা সত্যি আজকাল অনেক ভাল ভাল ছেলেরা কর্মক্ষেত্রে আবির্ভূত হচ্ছে। খুবই আশার কথা। এই সংখ্যাও খুবই আশাব্যাঞ্জক। ক্যাডার বা ননক্যাডার মিলেই সংখ্যায় বেশ। আমি চোর আমাকেতো কেউ চিনে না। আমি বলব আমার কাজকে ঘৃণা করুন। আর ঘুষখোর ভাইদের সমাজে ঠাই দিবেন না, তাকেও তার কাজকে ঘৃণা করুন। তাহলে আমরা উভয়ই ভাল হবো গড়ে উঠুক নন্দিত সমাজ। তবে চোর নাহি শুনে ধর্মের কাহিনী এ প্রবাদ কি অসত্য হবে? এসত্য অসত্য হোক কামনা করে আমি আমার আত্মকাহিনী শেষ করলাম।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT