পাঁচ মিশালী

নায়গ্রা জলপ্রপাত

প্রফেসর মো. আজিজুর রহমান লসকর প্রকাশিত হয়েছে: ২৩-১২-২০১৭ ইং ০১:১৯:২০ | সংবাদটি ১২৪ বার পঠিত

[পূর্ব প্রকাশের পর]
নির্মল হাস্য কৌতুকের মধ্য দিয়ে আমরা এগিয়ে চললাম। হাইওয়ের পাশে মাঝে মাঝে দেখা যায় ছোট-বড় প্রাকৃতিক জলাশয়। একটি জলাশয়ে অনেকগুলো পানকৌড়ি পাখি! অতি পরিচিত বাংলাদেশের পানকৌড়িদের মতো! এদের দেখে হঠাৎ মনে পরিচিতির আনন্দের ছোঁয়া অনুভব করলাম। ইচ্ছে হলো কাছে গিয়ে বলি, আমি তোমাদের জন্য বাংলাদেশের পানকৌড়িদের শুভেচ্ছা নিয়ে এসেছি। ওরা আমার কথা না বোঝলেও বাংলাদেশের পানকৌড়িদের পেলে আপন করে নিতো। কারণ ওরা একই প্রজাতিভুক্ত। কেবল একই প্রজাতিভুক্ত মানুষরা বিভিন্ন বর্ণ, বিভিন্ন ভাষা, বিভিন্ন জাতি ইত্যাদিতে বিভক্ত! পানকৌড়ি ও অন্য প্রাণীরা নয়!
গাড়িতে বসে এক সময় নজরে এল বিরাট আকারের পাখাযুক্ত অনেকগুলো উইন্ডমিলের সুউচ্চ স্তম্ভ। সুমন বললো, এসব বায়ু চালিত ইউন্ডমিল থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে পার্শ্ববর্তী খামারগুলোতে বিতরণ করা হয়।
একটানা ড্রাইভ করে সুমনও ক্লান্ত। মন্ট্রিয়ল থেকে প্রায় তিনশ’ কিলোমিটার দূরে ম্যালোরি টাউন নামক স্থানে অবস্থিত মহাসড়ক পান্থশালা ‘অন্ রুট ইন-এ’ আমরা বিশ্রামের জন্য থামলাম। তিন দিন পর ফেরার পথে মহাসড়কের অপর পাশে ঠিক এরকম একটি পান্থশালায় থেমেছিলাম। হাইওয়েতে লম্বা বিরতিতে এরকম অনেক পান্থশালা রয়েছে। সবগুলোর গঠনশৈলী, পার্কিং ব্যবস্থা, খাবার মেন্যু ইত্যাদি একই রকম। কারণ সব অন রুট ইনগুলোর মালিক একই কোম্পানী। একই কোম্পানীর পরিচালনাধীন থাকায় এগুলোর মধ্যে পার্থক্য নেই। উঁচু ছাদ বিশিষ্ট প্রধান হলঘরখানা বিরাট পরিসর নিয়ে গঠিত; তাই চলাফেরার আরাম বোধ হয়। বসার জন্য যথেষ্ট সংখ্যক চেয়ার টেবিল রয়েছে। আমরা এখানে বসে সঙ্গে আনা চিকেন রোল ও অন্যান্য খাবার গ্রহণ করলাম। হঠাৎ সুমন আমার হাতে এক কাপ গরম কফি তোলে দিল। এখানকার কফি হাউস (মান্নাদের কফি হাউস নয়) থেকে কিনে এনেছে। আমি সাথে সাথে তাকে ধন্যবাদ জানালাম। এ সময় এক কাপ কফি খুবই কাম্য ছিল।
বহু জাতির দেশ কানাডা। পান্থশালায় নানা বর্ণের মানুষ, নানা রকমের পোশাক, নানা রকমের ভাষা। কিন্তু সবাই কানাডিয়ান। একই আইনে বিশ্বাসী ও শ্রদ্ধাশীল। এপ্রিলের শেষ দিন; যথেষ্ট শীত নেই; তবু আমার গায়ে জ্যাকেটটি বিরাজ করছে। অনেক সাদা চামড়ার নরনারীকে দেখতে পেলাম গ্রীষ্মের সংক্ষিপ্ত পোশাকে চলাফেরা করছেন।
কেবল পাকস্থলীর দাবি পূরণের লক্ষ্যে পান্থশালায় পদধূলি দেয়া হয়নি, দেহ থেকে অনাকাক্সিক্ষত জল ইত্যাদি বিয়োজন করাও অন্যতম লক্ষ্য ছিল। এখানে শৌচাগার খুবই পরিস্কার পরিচ্ছন্ন। শৌচাগারে প্রচুর বাদামি রঙের টিস্যু পেপার মজুত রয়েছে। কিন্তু পানির কোন টেপ নেই। কারণ শৌচাগারে পানি, বদনা না মগ এর প্রয়োজনীয়তা পাশ্চাত্যের মানুষ কল্পনাও করতে পারে না! তা তাদের সভ্যতা-সংস্কৃতিতে নেই। তাছাড়া পান্থশালায় ফ্লোর পরিসর বিশাল, তবুও সালাত তথা প্রার্থনার জন্য এক চিলতে স্থান বরাদ্দ নেই। কোন কোন জায়গায় মিলে। হিথ্রো বিমান বন্দরে আছে। এসবের মধ্যেই দেখা যায়, মুসলমানদের অভ্যাস ও সংস্কৃতির সাথে পাশ্চাত্যের সংস্কৃতির স্পষ্ট পার্থক্য!
যা হোক! পান্থশালায় বেশ কিছু সময় কাটানোর পর আমরা কিছুটা রিফ্রেশ অর্থাৎ তরতাজা হয়ে গাড়িতে আরোহণ করলাম। এখানে আমরা নিজেদের উদরের সেবা করছি। এবার গাড়ির উদরের সেবায় সুমন গাড়িকে নিয়ে পান্থশালা সংলগ্ন ফিলিং স্টেশনে গিয়ে গাড়ির জন্য কয়েক লিটার তরল খাবারের ব্যবস্থা করলো। গাড়ি আবার কঠিন খাবার হজম করতে পারে না। কিন্তু সেকালের কয়লা চালিত স্টিম ইঞ্জিন পারত। এখনো ওরা বিলুপ্ত। বিলুপ্ত হয়ে ওরা বেঁচে গেছে! তা না হলে ক্ষণে ক্ষণে ওরা আকাশ জোড়ে যে পরিমাণ কালো ধোঁয়া উদ্গিরণ করতো, আজকালকার পরিবেশবাদীরা তা কখনো সহ্য করতে পারত না! ডান্ডা মেরে একেবারে ঠান্ডা করে দিত! যা হোক। আল্লাহকে স্মরণ করে সুমন টরন্টোর পথে আবার গাড়ি স্টার্ট দিলো।
[চলবে]


শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT