সাহিত্য

রোদপোড়া একজন কৃষকের প্রতিবিম্ব

সেলিম আউয়াল প্রকাশিত হয়েছে: ২৪-১২-২০১৭ ইং ০১:২৭:২৫ | সংবাদটি ১৪৩ বার পঠিত

শিল্পের নানা পথে হাঁটা রবীন্দ্র পরবর্তী সফল পরিব্রাজক সৈয়দ শামসুল হক। তার হৃৎ কলমের টান আমার হৃদয়ে প্রথম দাগ কাটে। হৃৎ কলমের দুয়েকটি লেখা ছেড়াখোড়াভাবে পড়ার আগেই তার বালিকার চন্দ্রযান ও খেলারাম খেলে যা পড়ে ফেলেছিলাম। বালিকার চন্দ্রযান কোন একটি পত্রিকার ঈদ সংখ্যায় পড়ি। হৃৎ কলমের টানে লেখাগুলোর শব্দদেয়ালের আড়ালে লেখকের জীবন, তার পর্যবেক্ষণ-বিশ্লেষণ-নিরীক্ষা অবলোকন করে তার প্রতি আগ্রহী করে তুলে আমাকে। তার পেলিকান কলমের মতো আমারো একটি সোনামাখা পারকার কলম ছিলো। দামী পেলিকান কালি দিয়ে সে কলমে লিখেছি, তার মতো টাইপ রাইটারেও আমার অনেক লেখা গুছিয়েছি। হৃৎ কলমের টানে যখন বাজারে এলো কিনে নিলাম। সাহিত্য সংস্কৃতির ইতিহাস ঐতিহ্য সকল বিষয়ে তিনি নিজের ভালো লাগা, মন্দ লাগা ভাবনা তুলে ধরেছেন। একইভাবে বাংলার মুখÑÑছোট্ট বিষয় যাকে বলে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র বিষয়ও কি সাবলীলভাবে তুলে এনেছেন তাতে। নিজের চিরচেনা দৃশ্যকে মূর্ত করে তুলেছেন তিনি।
সৈয়দ শামসুল হক একজন বড়ো মাপের কবি এবং একই সাথে একজন বড়ো গদ্য লেখকও। তার গদ্যভাষা বড়ো নিরীক্ষামন্ডিত মনে হতো আমার কাছে। তার ছোটগল্প, উপন্যাস ও প্রবন্ধে যে ভাষাশৈলীর দেখা পাওয়া যায়, তা একান্তই তার নিজস্ব এবং আপন পরিচয়ে পরিচিহ্নিত। তার একটি সাক্ষাতকারে পড়লাম ‘ভাষা হচ্ছে লেখকের নির্বাচন করা ব্যবহার্য রঙের মতো। এ রঙের ছাপই একজন লেখকের যে কোন লেখাকে আলাদা করে চেনাবে।’ আমার মনে হয় এ বিষয়ে শামসুল হক সফল। তার কবিতা পাঠ করলে তার কন্ঠ আলাদাভাবে বেজে উঠে। কাব্যনাট্য পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায় অথবা নূরুলদীনের সারাজীবনÑএ তার নিজস্ব পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়। নূরুলদীনের সারাজীবন-এ তিনি তুলে এনেছেন হাজার বছরের ইতিহাস। পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায় ও নূরুলদীনের সারাজীবন কাব্যনাট্যে সংলাপ এনেছেন সেই রংপুর অঞ্চলের মানুষের মুখ থেকে। যে মাটি থেকে উঠে এসেছেন সৈয়দ শামসুল হক। ‘বাংলাদেশে কাব্য নাট্য নিয়ে খুব বেশি কাজ হয়নি। বাংলাদেশে প্রথম কাব্যনাট্য লেখেন কবি ফররুখ আহমদ (১৯১৮-১৯৭৪)। তাঁর নৌফেল ও হাতেম (১৯৬১) অন্যতম কাব্যনাট্য। এতে কাব্যের প্রভাব বেশি, গভীর-নীতিধর্মের প্রসার লাভও করে। পরবর্তীকালে আলাউদ্দিন আল আজাদ, সাজেদুল আউয়াল ও সৈয়দ শামসুল হক কাব্যনাটক লিখেছেন। বাংলাদেশের কাব্যনাটকে আমাদের নিজস্ব সামাজিক, রাজনৈতিক ঘটনা, ইতিহাস-ঐতিহ্য ব্যবহৃত হয়েছে। এ কাব্যনাটকে গণচেতনার স্বরূপ লক্ষ করা যায়। এ ধারায় সৈয়দ শামসুল হক সবচেয়ে প্রধান ব্যক্তিত্ব।’  মোস্তফা তারিকুল আহসান, সৈয়দ শামসুল হকের সাহিত্যকর্ম, বাংলা একাডেমি জুন ২০০৮)
সৈয়দ শামসুল হকের প্রথম প্রকাশিত বই হচ্ছে তাস। এটি ছিলো একটি গল্পগ্রন্থ। সাহিত্যের প্রায় প্রতিটি শাখায় কাজ করার পাশাপাশি তিনি লিখেছেন গল্প। তার মৃত্যু হলো ২৭ সেপ্টেম্বর ২০১৬। সেই সেপ্টেম্বরেই ঢাকায় রোগ শয্যায় শুয়ে শুয়ে লিখেছেন আটটি গল্প। গল্পগুলোর অনুলেখন করেছেন তাঁর স্ত্রী কথাশিল্পী আনোয়ারা সৈয়দ হক। তার শেষ গল্পটি জলেশ্বরীর ট্রেনের বাঁশি।
শিশুরাও বঞ্চিত হয়নি সৈয়দ শামসুল হকের লেখা থেকে। শিশুদের জন্যে তিনি উপন্যাস লিখেছেন, গল্প লিখেছেন, ছড়া লিখেছেন, কবিতা লিখেছেন। তার কিশোর উপন্যাস আনু বড় হয় (১৯৮৬), কিশোর রহস্য উপন্যাস হডসনের বন্দুক (১৯৯৮) উল্লেখযোগ্য।
খেলারাম খেলে যা অথবা বালিকার চন্দ্রযান অথবা নিষিদ্ধ লোবান প্রতিটি উপন্যাসই আলাদা আলাদা সত্ত্বা নিয়ে দাঁড়িয়ে। নিরীক্ষা সৈয়দের প্রতিটি পথচলায় বিদ্যমান। খেলারাম খেলে যা-তে দেয়ালে লেখা সাহিত্যের চমৎকার অবতারণা। বালিকার চন্দ্রযান-এ ইংলিশ তরুণতরুণীদের সংলাপকে আলাদাভাবে নির্দেশণার জন্যে  সাধুভাষায় সংলাপ বর্ণণা অথবা নীলদংশন (১৯৮১)Ñএ ভূপেন হাজারিকার ভাষায় ‘চেতনাতে নজরুল’-এর একটি সার্থক ছবি ফুটিয়ে তুলেছেন।
সাহিত্যের সবগুলো ডালপালায় সৈয়দ শামসুল হক হাত বুলিয়েছেন নিজের আলাদা মমতায়। এইসব কাজ কারবার তার সাহিত্যকর্ম জমিনে দিয়েছে নতুন ফসল, গর্বিত ফসল উচু করেছে মাথা নতুন মাত্রায়। এইভাবে তার অপরাপর লেখাগুলোতে নতুন শস্য ফলাবার নিরন্তর প্রয়াস।
সৈয়দ শামসুল হক শক্তিমান কবি হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। নিজের অস্তিত্ব চেতনা ও অনুভবকে নতুন শরীর গতরে মূর্ত করেছেন কবিতায়। জীবন চেতনার গভীরতায়, নিজস্ব শিল্পরীতিতে, প্রকরণ নিরীক্ষায় সহায়তায় তার কবিতার নিজের একটি দুনিয়া তৈরী হয়েছে।
পরাণের গহীন ভিতর সনেটগুচ্ছের কথা বলা যায়। তিনি একটি উপভাষা দিয়ে এইসব সনেট প্রতিমা গড়েছেন। বিশ্বসাহিত্যের বিভিন্ন ভাষার কবিদের কবিতা ইংরেজি ভাষা থেকে অনুবাদ করেছেন।
সৈয়দ শামসুল হককে বলা হয় সব্যসাচী লেখক। সব্যসাচী শব্দের অর্থ দুহাতে তীর চালনায় অভিজ্ঞ ব্যক্তি। মহাভারতের নায়ক অর্জূনকে বলা হতো সব্যসাচী। তিনি দুহাতে তীর ছোড়ায় শুধু দক্ষই ছিলেন না, লক্ষ্যভেদেও ছিলেন অভ্রান্ত। সৈয়দ হক তেমনি যেন দুহাতে লিখেছেন। তিনি কবি, গল্পকার, ঔপন্যাসিক, প্রবন্ধকার, নাট্যকার, অনুবাদক, কলাম লেখক ও ভাষ্যকার। ইংরেজিতে সব্যসাচীর প্রতিশব্দ হচ্ছে অগইওউঊঢঞঊজ. তিনি তা তো বটেই বরং সব্যসাচীরও পরের অনেক কিছু। তার সৃজনশীলতা অক্ষরলিপির নানান মাধ্যমে যেভাবে ছড়িয়ে আছে, সেখানে আবার সীমাবদ্ধ নয়।
চলচ্চিত্রের জন্যে লেখা মানুষের মুখে মুখে ফেরে তার গান হায়রে মানুষ রঙ্গিন ফানুস দম ফুরাইলে টুস..। আরো গান তার হাত দিয়ে বেরিয়েছে। চলচ্চিত্রের জন্যে চিত্রনাট্য লিখেছেন তিনি। সুতরাং ছবির চিত্রনাট্য তার লেখা। তিনি প্রামাণ্য চলচ্চিত্রও নির্মাণ করেছেন। শওকত ওসমানের ছোট গল্প অবলম্বনে ছোটদের জন্যে আব্বাস নামের একটি চলচ্চিত্রও বানিয়েছেন।
টেলিভিশন ব্যক্তিত্বও ছিলেন তিনি। সৈয়দ হকের বক্তব্য বেশ ক’বার বাংলা একাডেমির বার্ষিক সাধারণ সভায় শুনেছি। ভরাট গলা। লক্ষ্য করেছি লেখায় তিনি যেমন নিরীক্ষাপ্রেমি, তেমনি কথা বলায়ও। বাংলা একাডেমির সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে তিনি ব্যবহার করতেন অসংখ্য অনুপ্রাস। বক্তব্য ভাষাও চমৎকার এবং ব্যতিক্রমী।
সাংবাদিকতার পথেও হেঁটেছেন কিছুকাল তিনি। বিবিসি’র মতো বিশ্বখ্যাত সংবাদ সংস্থায়ও কাজ করেছেন সৈয়দ শামসুল হক।
শামসুল হক ছবি আঁকতেন, ভাস্কর্য গড়তেন। তার খুব ইচ্ছে ছিলো আশি বছর বয়েস পেরুলে নিজের আঁকা ছবিসব নিয়ে এক্সিভিশন করবেন। অসুস্থতায় তা আর হয়ে উঠেনি।
‘সব্যসাচী’ নামে সৈয়দ হকের একটি পারিবারিক প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানও ছিলো। শামসুর রাহমানের ইলেকট্রার গান, রফিক আজাদের প্রিয় শাড়িগুলি- সব্যসাচী বের করেছিলো এই গ্রন্থসব।
সৈয়দ শামসুল হকের আরেকটি ব্যাপার ছিলো অনুসরণীয়। তা হচ্ছে তিনি যে কোন অনুষ্ঠানের দাওয়াত পেলে নির্দিষ্ট সময়ের আগে অনুষ্ঠানস্থলে হাজির হতেন। তার কথা হলো ‘যথাসময়ে নেমন্তন্নে উপস্থিত না থাকলে নিমন্ত্রণকারীকে সম্মান দেখানো হয় না’। কবি-লেখককে নিয়ে সাধারণভাবে যে ধারনা তারা আউলা আত্মভোলাÑÑসৈয়দ হক ছিলেন তার উল্টো। তিনি জিনস পরতেন, স্মার্টভাবে চলতেন। লেখালেখির বিষয়টি ছিলো তার কাছে সাধনার মতো। তিনি প্রতিদিন গোসল সেরে, শেভটেভ করে নাস্তা সারতেন। তারপর পরিস্কার পরিচ্ছন্ন পোশাক পরে লিখতে বসতেন। তিনি বলেছেন, ‘আমি জীবনের সবকিছুকেই উদযাপন করি। একটি কাক্সিক্ষত লেখা শেষের পর নিজেকে নিজেই একটি লাঞ্চ বা ডিনার উপহার দিই।’
লেখালেখির ব্যাপারে সৈয়দ শামসুল হক কতো সিরিয়াস ছিলেন, তার স্ত্রী আনোয়ারা সৈয়দ হকের স্মৃতিচারণে পাওয়া যায়। তিনি লিখেছেনÑ‘ওই উত্তাল গণজাগরণে (উনসত্তরের গণ অভ্যুত্থান) দিনগুলোতেই কিনা গায়ে পাকিস্তান এয়ারফোর্সের উর্দি চাপিয়ে পাক আর্মির চাকরি করে গেছি। (আনোয়ারা সৈয়দ হক তখন ছিলেন পাকিস্তান বিমান বাহিনীর মেডিকেল কোরের ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট ডা. আনোয়ারা বেগম। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে তিনি পালাতে পারেননি। মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিতে পারেননি। নিজের ডিউটি করেছেন নয়টি মাস।) খেয়ে পরে থাকার তাগিদে তাদের দাসত্ব (একরকমের) করে চলেছি। সেই দিনগুলোতে আমার স্বামী সৈয়দ শামসুল হক লিখে চলেছেন ‘বৈশাখে রচিত পঙক্তিমালা’। দিন নেই, রাত নেই, নাওয়া নেই, খাওয়া নেই, পরিবারের সঙ্গে কথাবার্তা নেই, লিখে চলেছেন তিনি। লাইনের পর লাইন। লাইনের পর লাইন। ভোরে ঘুম থেকে জেগে উঠে ইউনিফর্ম গায়ে চাপিয়ে এয়ারফোর্স স্কোয়াড্রনে রওয়ানা হবার আগে দেখি তিনি আমার আগেই ঘুম থেকে জেগে উঠে সেই বিশাল ডাইনিং টেবিলের কোণে বসে সাজিয়ে তুলছেন পঙক্তির পর পঙক্তি। আবার দুপুর দুটোর পরে বাড়ি ফিরে দেখি উনি তখনও আপন মনে লিখেই চলেছেন। [অবরুদ্ধ, পৃষ্ঠা-৩৭)-৪
মৃত্যুর কিছুদিন আগে সৈয়দ শামসুল হক চিকিৎসার জন্যে ইংল্যান্ড যান। যাবার আগে একটি সাক্ষাতকার দিয়েছিলেন। সেই অসুস্থ অবস্থায় তিনি পড়ছিলেন নানা বই। সেইসব বইয়ের কথা, অসুস্থ শরীরে চালিয়ে যাওয়া লেখালেখির কথা, নানা ভাবনার কথা ছিলো সেই সাক্ষাতকারটিতে। সেই সাক্ষাতকারে তিনি বলেছিলেন, ‘কোরআনের অংশবিশেষ অনুবাদও করেছি আমি; কবিতার মতো কিছু আয়াত। যথেষ্ট সংখ্যক নয় বলে প্রকাশ করিনি।’ কোরআনের অংশবিশেষ অনুবাদের বিষয়টি আমাদের কাছে অনালোকিত রয়ে গেছে। তার এই অনুবাদ কর্ম পাঠক সম্মুখে আসলে আমরা অন্য এক সৈয়দ শামসুল হককে জানতে পারতাম। মৃত্যুর দরজায় দাঁড়িয়ে তার কোরআন ভাবনা আমাদেরকেও আলোড়িত করতো অন্তত: খানিকটা। এই সাক্ষাতকারের অন্যত্র তিনি কোরআন উচ্চারণের পূর্বে ‘পবিত্র’ শব্দটি সংযোজন করে নিশ্চয় তার বিশ্বাসের স্বাক্ষর রেখেছেন। সৈয়দ শামসুল হকের একটি প্রধান বিষয় তিনি তার আদর্শের প্রতি নিষ্ঠাবান। তার আদর্শের সাথে আমরা একমত হই অথবা না হই, এটা স্বীকার করতে হবেÑতিনি তার আদর্শের কথা নিরন্তর বলেছেন তার লেখাজোখায়, কাজে কর্মে।
সবচেয়ে বড়ো কথা লেখালেখির ব্যাপারে তিনি ছিলেন নিষ্ঠাবান কৃষক, রোদে পুড়ে পুড়ে শরীর অঙ্গার করে যিনি ফলাতেন সোনালী ফসল ।
রচনা: ১২.১০.২০১৬
সহায়ক সূত্র: ১. আহসান, মোস্তফা তারিকুল, সৈয়দ শামসুল হকের সাহিত্যকর্ম, বাংলা একাডেমি জুন ২০০৮,  ২.শাহাদুজ্জামান, আমার থিকাও দু:খী যমুনার নদীর কিনার, প্রথম আলো ৩০.০৯.২০১৬,  ৩. মজিদ, পিয়াস, সাক্ষাৎকার, সৈয়দ শামসুল হক, প্রথম আলো ৩০.০৯.২০১৬, ৪.তালুকদার, জাকির (২০১৭), কথাশিল্পে অবদানের জন্য বহুমাত্রিক আনোয়ারা সৈয়দ হক (প্রবন্ধ), সাহিত্য সংস্কৃতির মাসিক পত্রিকা ‘শব্দঘর’ জুন-জুলাই২০১৭ (সম্পাদক মোহিত কামাল)

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT